Sunday, 7 January 2018

পাউরুটি


মোড়ের মাথায় একটা বেকারির দোকানের দিকে রাজু একদৃষ্টে চেয়ে থাকে!কত থরে থরে সাজান কেক প্যাটিসের সমাহার! তার ক্ষুধার আগ্রাসী দৃষ্টি সেগুলোকে যেন গোগ্রাসে গিলতে থাকে! পাশে বসে থাকা একটা শীর্ণকায় কুকুর রাজুর কোলে মাথা ঘষে! রাজু পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়!

-তোর খিদে লেগেছে না রে? জল খাবি? অবলা প্রাণী টি লেজ নাড়িয়ে সম্মতি জানায়! রাজু ভিখিরি! বাবার পরিচয় সে জানেনা! শুধু আবছা মায়ের মুখটা তার মনে পড়ে! সেদিনের বর্ষার সেই অভিশপ্ত সন্ধ্যায় মায়ের দলা পাকিয়ে যাওয়া শরীরটা কে আগলে বসেছিল রাজু! তার অবুঝ মন এটা বোঝেনি যে একটা ফুল পাঞ্জাব লরির নিচে চাপা পড়া শরীর তার ছোট্ট হাতের অসহায় চাপড়ানিতে সাড়া দেবেনা! মুখে জল দিতে চেয়েছিল! মুখ বেয়ে সে জল নেমে গিয়েছিল পিচের রাস্তায়! মায়ের শরীরটা মিউনিসিপালিটির লোক গুলো যখন টেনে ভ্যানে ওঠাচ্ছে রাজু তখন ও মাকে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে মগ্ন ছিল! ঘুম ভেঙে দেখে চারিদিকে মায়ের স্মৃতি চাপ চাপ রক্ত! চারিদিকে অসহায়ের মত তাকায়! কোথায় তার মা? তার বুকফাটা চিৎকার প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এসেছিল তার কাছে নির্মম ভাবে! তার মা আর ফিরে আসেনি! আকস্মিক ভাবেই জুটে গিয়েছিল তার জীবনে এই পথভোলা কুকুরটি! 
সেইথেকে কুকুরটি রাজুর ছায়াসঙ্গী।
আজ রাজুর ভিক্ষা ভাল হয়নি! সকাল থেকে খালি পেটে ভিক্ষা করে সে ক্লান্ত! সন্ধেবেলা উপোষী পেটে ক্ষুধার্তের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল বেকারির দোকানঘরের দিকে! যাবে নাকি সে একবার দোকানে! ভিক্ষাপাত্রটি এগিয়ে দিলে হয়ত দয়া মিলতে পারে! অবলা প্রাণীটি অনেকক্ষণ না খেয়ে রয়েছে! তার মুখে সে অন্তত কিছু দিতে পারবে! একবুক আশা নিয়ে সে দোকানের দিকে এগোল! পরনের শতচ্ছিন্ন জামাটা আরেকটু ভাল করে জড়িয়ে নিল! ঠান্ডা লাগছে! কয়েক দিন বাদেই বড় দিন! কেকের দিন! দোকান উপছে পড়ছে ভিড়! আচমকা রাজুর চোখ গেল দোকানের বাইরে সাজানো চেয়ারগুলোর একটাতে! তারই সমবয়সী একটি মেয়ে চেয়ারে বসে পরম মনোযোগে হাতে ধরা পাউরুটি সদ্ব্যবহার করে চলেছে! রাজুর পেটের সর্বনাশী খিদেটা যেন আরেকটু চাগিয়ে উঠল! মেয়েটাও রাজুকে দেখতে পেয়েছে.....রাজুর ভয় হল এই বুঝি কিছু মনে করল! মেয়েটি এক পা দুই পা করে রাজুর দিকে এগিয়ে গেল! বলে উঠল তুমি খাবে? রাজু কোনমতে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল ভয়ে ভয়ে! মেয়েটি রাজুর হাতে আধখাওয়া পাউরুটি ধরিয়ে বলল নাও খেয়ে নাও! আমি বাপিকে বলে আরেকটা আনছি...বলে ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়! রাজুর হাতে তখন অর্ধেক রাজত্ব! কুকুরটার দিকে তাকাল! সেও আত্মহারা হয়ে লেজ নাড়ছে! আচমকা রাজুর শতচ্ছিন্ন জামার কলারটা ধরে কে মাটিতে ফেলে দিল! কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুখে ঘুসি এসে পড়ল! যন্ত্রণায় ছোট্ট শরীর টা কুঁকড়ে গেল! শালা শুওরের বাচ্চা! চুরি করা হচ্ছে! হারামি তোকে মেরেই ফেলব! বেকারি মালিকের গর্জনে চারদিক কেপে ওঠে! রাজু অস্ফুটে বলতে চায় কাকু আমার খিদে পেয়েছে! আমি চুরি করি নি! কিন্তু তার সেই অস্ফুট কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায় জনতার রোষে! তলপেটে জোরদার একটা লাথি এসে পড়ে! রাজুর দুই নাক দিয়ে রক্তের ধারা বেরিয়ে আসে! সে কোনমতে পাউরুটি ছুড়ে দেয় অবলা প্রাণীটির দিকে! কিন্তু সেও খাওয়া ভুলে সামনে এত পশুকে একসাথে দেখতে থাকে! এরই মধ্যে মেয়েটি কোথাথেকে দৌড়ে আসে! হাত জোর করে মিনতি জানায় তোমরা ওকে এভাবে মের না! আমিই ওকে খেতে দিয়েছিলাম! ক্রোধোন্মত্ত জনতা থমকে দাঁড়ায়! একজন তাড়াতাড়ি এগিয়ে রাজুর নিথর শরীর টা কোলে তুলে নেয়! দুই নাক বেয়ে উষ্ণ রক্তের ধারা আরেকটু বেরিয়ে আসে! স্বগতোক্তি শোনা যায় ইসসস এভাবে কেউ মারে! কেউ রাজুর মুখে জল দিতে চায়! মুখ থেকে গড়িয়ে তা রক্তের সাথে মিশে যায়! আস্তে আস্তে ভিড় কমে আসে! রাত গভীর হয়! মৃতদেহের উল্টো দিকে অবলা প্রাণীটি তখনো বসে থাকে রুটির টুকরো টি নিয়ে! রাজুর যে খুব খিদে পেয়েছিল! ওই ত দূরে শুয়ে আছে রাস্তায় একা একা! আস্তে আস্তে রুটি মুখে এগিয়ে যায় প্রাণীটি! রাজুর মুখে ঢুকিয়ে দেয় খন্ডটি! রাজুর খুব খিদে পেয়েছিল! অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে আসছে......বড়দিনের অপেক্ষায়!!!!!

© অরিন্দমনবপল্লী


No comments:

Post a Comment

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন  প্রত্যাশা মতই ভোটের চিঠি টা হাতে পেয়েই বিরক্তিতে ভুরু দুটো কুঁচকে গেছিলো। জানতাম আসবেই, এ এমন প্রেম! কি...