নানা রঙের অরিন্দম
Saturday, 25 February 2023
ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন
Tuesday, 10 September 2019
লেখনী সংবাদ
ছোটগল্প ✒লেখনী সংবাদ
© সংরক্ষিত
দোকান থেকে সদ্য কেনা পেন টায় লিখতে বসেছি নতুন গল্প.....বউ গেছে বাপের বাড়ি পুজোর কেনাকাটা করতে! অতএব বাড়ি এখন ঠান্ডা! ঘড়িতে দেখে নিলাম সাতটা বাজতে চলেছে! বাইরে বীভৎস গুমোট! হাঁসফাঁস করতে করতে ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিলাম......মনে হল মুখের উপর চুলের মতন কি একটা উড়ে এসে পড়ল! ভাবলাম হয়ত মনের ভুল.....লিখতে বসে বেবাক গন্ডগোল হয়ে গেল! প্লটই মাথায় আসছেনা! অগত্যা শুরু করলাম এইভাবে
" বর্ষার রাত......দূর থেকে গির্জার ঘড়িতে রাত ন"টার ঘণ্টাধ্বনির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে! আচমকা রান্নাঘরের দরজাটা দমকা হাওয়ায় খুলে গেল! টের পেলাম আমি ঘরে একা নই...!"
এই পর্যন্ত লিখে একটু দম নিলাম! পাঠকরা এই গল্প দারুণ খাবে....এইসব সাতপাঁচ ভাবছি আচমকা চোখ গেল ঘড়ির দিকে! কাঁটা টা ন টার ঘরে স্থির হয়ে আছে! বাতাসের বেগ টা একটু বাড়ল মনে হল! বাগানের দিক থেকে শনশন আওয়াজ শোনা গেল! আচমকাই রান্নাঘরের দরজার একটা পাল্লা সশব্দে খুলে গেল! আমার শিরদাঁড়ায় তখন কারেন্ট বইছে! মনে পড়ে গেল দোকানীর ভয়ার্ত চোখ পেন টা বিক্রির সময়ে.....
মনে হল খাটের ওই সাইডে কে যেন বসে....! ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি একটা মহিলা রাত পোশাকে পিছন দিকে মুখ করে বসে! তার চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে! কাঁপতে কাঁপতে হাতে ধরা পেনটার দিকে তাকালাম! নিব বেয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে পাতায়.....মনে হল মহিলাটি আস্তে আস্তে ঘুরে বসছে আমার দিকে....কুকুর কাঁদছে কোথাও তীব্রভাবে.........!
কপিরাইট সংরক্ষিত © অরিন্দম নন্দী
নিঃসঙ্গতা
#নিঃসঙ্গতা
লেখনী কপিরাইট অরিন্দম নন্দী
© নতুন অফিসের চাকরিতে জয়েন করার একসপ্তাহের মাথাতেই নতুন ফ্ল্যাটের চাবিটা হাতে পেল শিবানি! একটা শিরশিরানি আনন্দের সাথে অন্যরকম এক্সাইটমেন্ট ফিল হয়েছিল মেয়েটার! প্রথম থেকেই বাড়ির লোকজনে আপত্তি জানিয়েছিল এতদূরে চাকরি করা নিয়ে....এরকম একা একা একটা ফ্ল্যাটে থাকবে....তার উপর সুন্দরী... একটা কিছু হয়ে গেলে! দিনকাল তো ভাল নয়! কিন্তু শিবানি সেগুলোকে পাত্তাই দেয়নি! সে জানে সে সুন্দরী! কলেজে ক্লাস করার সময় ক্লাসরুমেই চল্লিশ জোড়া চোখের কামুক আহ্বান তাকে সইতে হয়েছে! বলাবাহুল্য তারা কেউ পাত্তা পায়নি! আসলে মেয়েটি একটু অন্য টাইপের! প্রেমের ঘ্যানঘ্যানানি তার মোটে সহ্য হয় না! কলেজ পাস করে আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশুনা করে যখন সে এই চাকরিটা পেল তখন একটা জিনিস সে উপলব্ধি করতে পেরেছিল দুনিয়াতে টাকা জিনিস টার গুরুত্ব অসীম! বাবার বুকের অসুখের এবার একটা হিল্লে হবে! অনেক টাকার খরচ.... অবশ্য তার স্যালারির পরিমানটা ও কম অঙ্কের নয়! মেয়েটার চোখের সামনে মূহুর্তে ভেসে উঠল রঙিন ভবিষ্যৎ! আচমকাই চাবি ঘুরানোর খুৎ করে একটা শব্দের সাথে চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায় শিবানির! দেখে কেয়ারটেকার ছেলেটা আপ্রাণ চেষ্টা করছে চাবিটা ঘুরানোর....কিন্তু ঘুরছেনা! কিছুতে যেন আটকে রয়েছে চাবিটা! বাচ্চা ছেলে! সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একসা! কেমন যেন মায়া হল শিবানির! ছেলেটিকে বলে
- সরে দাঁড়াও! আমি একটু দেখি!
- দিদি....আপনি পারবেন? ছেলেটির চোখেমুখে বিস্ময়!
- দেখিনা.....বলে চাবিটা নিয়ে নিল হাত থেকে! ভাল করে লক্ষ্য করল চাবিটার অগ্রভাগ ঈষৎ বেঁকে গিয়েছে! ওই জন্যেই হয়তো ভিতরে ঢুকছে না! ছেলেটাকে একটা হাতুড়ি আনতে দিয়ে শিবানি লম্বা প্যাসেজের শেষ প্রান্তে বিশাল জানলার কাঁচের পাল্লাটার পাশে এসে দাঁড়াল! সন্ধে হব হব করছে! দূরে কোলিয়ারির আলোগুলো একে জ্বলে উঠছে! ফ্ল্যাটের ভিতরের অংশে একবার ঝটিতি চোখ বুলিয়ে নিল সে! বড় অদ্ভুত এই ফ্ল্যাট টা! চারতলা এই ফ্ল্যাটের প্রত্যেক ফ্লোরে দশটা করে ফ্ল্যাট মুখোমুখি সাজানো! মোট চল্লিশ টা ফ্ল্যাটের এই অ্যাপার্টমেন্টে তারই প্রথম পায়ের ধুলো পড়ল! বাকিরা ফ্ল্যাট বুক করলেও এখনো জিনিসপত্র সমেত ওঠেনি! প্রত্যেক ফ্লোরের কমন গ্রাউন্ডে একটাই লাইট! কিরকম একটা আলো আঁধারির খেলা চলছে! ছেলেটা এখনো আসছেনা! একটা হাতুড়ি আনতে কত সময় লাগে? আরো একবার ভালো করে তার দরজার সামনে এসে লকের ফুটো পরীক্ষা করতে লেগে গেল! লক টা নতুন! অল্প আলোতেও ঝকমক করছে! কোথা থেকে যেন একটা ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে আসছে! উৎস ঠিক ঠাহর করতে পারল না অন্ধকারে! কানে শুনতে পেল কে যেন সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছে! হয়তো ওই ছেলেটাই....আচমকাই শিবানি শুনতে পেল সামনের দরজার ল্যাচ কি হালকা মোচড়ে ঘুরে গেল! দরজাটা নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে ক্যাঁ..আ...চ শব্দে আপনা থেকেই খুলে গেল! তারপরেই সে যেটা ফিল করল সেটা আর বাকি পাঁচটা মেয়ে ওখানে কি রি অ্যাক্ট করতে জানিনা! শিবানী ফিল করল মাথার উপর দিয়ে সামনের অন্ধকার ঘরটা থেকে একটা ঝুলকালি মার্কা ছায়া বেরিয়ে বাতাসে মিশে গেল! সাথে একটা বোঁটকা গন্ধ ও বেরিয়ে গেল যেন! শিবানীর সর্বাঙ্গে যেন ঘামের স্রোত বইতে লাগল! সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে কেয়ারটেকার ছেলেটা ও কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে! শিবানী আস্তে আস্তে তাকে বলে
- লাগেজ গুলো ঢুকিয়ে দিও ঘরে! খুব ক্লান্ত লাগছে!
কথা ক'টা বলেই ঢুকে গেল ঘরে! কেমন বমি বমি পাচ্ছে তার!
© ফ্ল্যাটের ভিতর ঢুকেই শিবানী টের পেল কতদিনের ভ্যাঁপসা গন্ধ
তাকে যেন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল!ব্যালকনির সাইডে একটা ছেঁড়া পর্দা
কবেকার পতপত করে উড়ে জানান দিচ্ছে কতকাল এখানে কোন আগন্তুকের পায়ের ধুলো পড়েনি।নাহ এবার কোমর বেঁধে তাকে নেমে পড়তে হবে ঘরের জঞ্জাল সাফ করার জন্য। অফিসের দয়ায় এই ফ্ল্যাট খানি পাওয়া। এত স্বর্গ সুখ আশা করাটাও বোকামি, কারেন্টের সুইচবোর্ড খানি অন্ধকারের মধ্যে চেষ্টা করল হাতে পাবার, কিন্তু কিছুই ঠেকল না!ধুলোয় ভরা দেওয়াল গুলো কেমন যেন অস্বস্তির শিহরণ জাগিয়ে গেল তার মনে! কিরে বাবা! সুইচবোর্ড নেই নাকি ঘরে? হতেই পারে না! আবারো দেওয়াল হাতড়ে হাতড়ে ব্যালকনির ছেঁড়া পর্দাটার কাছে চলে আসে সে! ব্যালকনির লাগোয়া একটু বাড়ানো অংশ! কবেকার শুকানো ফুল টবের উপর নেতিয়ে পড়েছে! সন্ধে সবে হয়েছে। অনেক নীচে ছোট্ট হয়ে যাওয়া শুঁড়ি রাস্তায় একটা দুটো পিপড়ের মত মানুষের মাথা দেখা যাচ্ছে! দেখে একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচল শিবানী! যাক এখানেও মানুষ আছে তাহলে! খুব খিদে লেগেছে টের পাচ্ছে এখন! সেই কোন সকালে বেরিয়েছে! অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে ব্যাগ টা খোঁজার চেষ্টা করতে গিয়েই একটা হিম শিহরণ মেরদন্ড বরাবর নীচের দিকে নেমে গেল! মনে পড়ল ঢোকার আগে ছেলেটাকে বলেছিল ব্যাগটা ঢোকানোর কথা ......................কিন্তু ঢোকার পর তো খেয়াল করেনি
দরজাটা ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল কিনা! ব্যাগ টা নিয়ে ছেলেটাই বা কোথায় গেল? আন্দাজে কয়েক পা পিছিয়ে যেখান দিয়ে ঢুকেছিল সেই জায়গায় ফিরে এল! তার বুকের অস্বাভাবিক ওঠানামার শব্দ সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে এখন! তার সাথেই অস্বস্তিকর ভ্যাঁপসা সোঁদা গন্ধটা আবার উঠে আসছে কোথা থেকে যেন! গলা ফাটিয়ে ডাকতে লাগল ছেলেটিকে। কিন্তু তার গলা তার কাছেই ফিরে আসে ব্যর্থ পরিহাসে! উন্মাদিনীর মত দেওয়াল হাতড়াতে লাগল। অন্তত একটা সুইচবোর্ড যেন হাতে পায়, কিছু নেই। অন্ধকার টা যেন ক্রমশ চেপে বসছে! দেওয়ালে হাতড়াতে গিয়ে টের পেল একটা নরম মাংসল আঙ্গুল জাতীয় কিছু হাতে ঠেকছে। হাড়হিম হয়ে যায় শিবানীর। কারণ যে জায়গা দিয়ে সে ঢুকেছে সেখানে দরজার বদলে নিরেট দেওয়ালের উপরেই সে ওটাকে ধরেছে। কার একটা হাত........অন্ধকারে সেটাকে পরম বিশ্বস্ত মনে হয় শিবানীর। কানের কাছে একটা ফিসফিসে আওয়াজ ভেসে আসে
- আমার এতদিনের নিঃসঙ্গতা কাটল। এবার থেকে তুমি আর আমি.........................................!!
একটা তীব্র আর্তনাদে অন্ধকার ফ্ল্যাটবাড়িটার কোণা কোণা গমগম করে উঠল!
তারপর সব শান্ত! ব্যালকনিটার ছেঁড়া পর্দাটা তখনো উড়ে যাচ্ছে উদাসী হাওয়ায়।
© অনেকদূরে বসে থাকা লতিকার মুখে আজ হাসি ফুটেছে! এবার তার বোনের বিয়েটা দিতে পারবে! হাতে ধরা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার মধ্যবিত্ত পরিবারে খুশির পয়গাম নিয়ে ফ্যানের হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে
নিঝুম ফ্ল্যাটবাড়িটার নীচে বসে থাকা কেয়ারটেকার ছেলেটার মুখেও হাসি ফুটছে ক্রুরতার
সঙ্গে.....আজ রাতেও শিকার আসছে! নিঃসঙ্গতা ভাঙতে! এই নিয়ে তিন নম্বর..........
রাস্তার মোড়ে একটা কুকুরের করুণ অশুভ কান্নার সাথেই ছেলেটি রেণু রেণু হয়ে মিলিয়ে গেল জংলা ঝোপে! ফ্ল্যাটবাড়িটার দরজা জানালাগুলি তখন আপনা থেকেই ঢেকে যাচ্ছে নিরেট সিমেন্টের আস্তরণে.....!!!!
সমাপ্ত
© অরিন্দম
স্বত্ব সংরক্ষিত
Monday, 9 September 2019
উর্ধক্রম অধঃক্রম

©অরিন্দম নন্দী
আমি মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম! একটু আড়চোখে তাকালাম মেয়ের দিকে! অবস্থা ভালো নয়! মেয়ের মনে জমছে কালো মেঘ! এক্ষুনি ভাসিয়ে বৃষ্টি নামবে! আমার কেমন মায়া হল! বললাম- মা তুই তো এমন ছিলি না! তুই ভাল পড়া বুঝিস! তাড়াতাড়ি কাজ টা সেরে ফেল না!
- বাউবাউ! মেয়ের ক্ষীণ গলা! সচকিত হয়ে উঠলাম! কি হয়েছে মা?
- বাউবাউ অ্যাসেন্ডিং ডিসেন্ডিং মানে কি?
ছোট থেকে বড় আর বড় থেকে ছোট বলতে গিয়ে হোঁচট খেলাম! মানে খাওয়াটাই ধার্য ছিলো! মেয়ের প্রশ্নে ট্যারা শিবনেত্তর হয়ে বসে রইলাম! কোনটা সঠিক? মোবাইল গুঁতিয়ে সঠিক তথ্য জেনে মেয়েকে বলতে যাচ্ছি বউ রণরঙ্গিণী মূর্তি নিয়ে ঘরে ঢুকল! হাতে খোলা ডাল ঘুটানোর কাঁটা! তা থেকে ফোঁটা ফোঁটা ডাল মাটিতে পড়ছে! শিয়রে সংক্রান্তি! ওই অস্ত্র আজ আমার না হয় মেয়ের পিঠে পড়বেই! বউ নাদ গর্জনে বলছে শুনলাম- এই এক বাপ হয়েছে! মেয়েটাকে একটু দেখাতে পারে না! খালি মোবাইল আর মোবাইল! এই কি করেছিস দেখি!
মেয়ে ততক্ষণে আমার পিছনে! আমি একটু মিনমিনে গলায় বলার চেষ্টা করলাম- ইয়ে গিন্নী আমি দেখছি তো! তুমি ওই কাঁটা ইয়ে মানে ডাল নিয়ে যাও! আমি পড়িয়ে দিচ্ছি!
- দুচ্ছাই! বউ দুপদাপ করে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা মারল! মেয়েটাও আমার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে আদুরে ছোট্ট দুটো হাতে গলা জড়িয়ে বলে- বাউবাউ অ্যাসেন্ডিং কথাটার মানে তুমি জান না তাই না? খানিক লজ্জিত হয়ে বললাম না রে মা ঠিক তা না! জানতাম কিন্তু গুলিয়ে ফেলেছিলাম! আসলে আমি ছোটবেলায় উর্ধক্রম অধঃক্রম শিখেছিলাম তো!
- বাউবাউ ঠাম্মি আমাকে এটাই শিখিয়েছিল! এটা তো আমি জানি!
- সেকি! অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি! তাহলে পারলি না কেন? তোর মা তো ক্ষেপে ব্যোম!
- তুমিও তো পারনি! আমি ইংরেজি ভাল বুঝিনা বাউবাউ! আমার বাংলা ভাল লাগে! আর আমার অধঃক্রম লিখতে ভাল লাগেনা! ঠাম্মি বলে জীবন টা উর্ধক্রমের মত! সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠো! এক দুই তিন চার......একশো! তুমি আমাকে বাংলা শেখাবে?
মেয়েকে বুকে চেপে ধরলাম! এই একরত্তি মেয়ের সমস্যা সমাধান করতে আমি এগিয়ে আসবই! বাপকেই এগিয়ে আসতে হবে! আমার মায়ের কাছে খেলাচ্ছলে গল্পচ্ছলে নিভু নিভু হ্যারিকেনের আলোয় যা শিখেছিলাম তা জীবনের শিক্ষা! সেখানে অ্যাসেন্ডিং ডিসেন্ডিং এর মত শব্দব্রহ্ম আমাদের মগজধোলাই করে নি! মেয়ের দিকে তাকালাম! কচির চোখের পাতায় চিকচিক করছে জল! কাছে টেনে নিলাম!
- বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর নদেয় এল বান!
- শিবঠাকুরের বিয়ে হবে তিনকন্যে দান! আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়ে কচি গলায় বলে উঠল! অবাক হয়ে গেলাম! বললাম তুই জানিস?
- হ্যাঁ! ঠাম্মি খুব ভালো বলে! আমার ভালো লাগে!
বাপবেটির মধ্যে একটু ভালো লাগার ওমটুকু উর্ধক্রম ধরে ধীরে ধীরে ছাদ ছুঁল! মনকে কলে ফেলতে নেই! দরকার নেই মাছিমারা কেরানী করে! ফড়িং এর ডানায় ভর করেই মেয়ে আমার এগিয়ে চলুক! নাই বা উন্নতি হোক ইংরেজি শব্দব্রহ্ম র! অনেক সময় আছে! অধঃক্রমের পাকে হিসেব মেলানোর অঙ্কে মেয়েকে ফেলতে চাই না! মেয়ে তখন আমার বুকে! বাইরে টিপটুপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে! মেয়ে আস্তে আস্তে বলল
- বাউবাউ শিব ঠাকুরের বিয়ে দেখাতে নিয়ে যাবে?.....
সমাপ্ত
© অরিন্দম নন্দী
Sunday, 10 March 2019
নারী রূপেণ সংস্থিতাঃ
- ইডিয়ট কোন কাজটাই ভাল করে পার না! না বাইরে না ঘরে! পাঁচশো টাকা ফাইন.....
- অনু প্লিজ প্লিজ মেরোনা! এই শোনো না আজ বাইরে ডিনার করব! প্লিজ
- ইউ ইডিয়ট! তুমি জানোনা আমার কি হয়?.....
- প্লিজ প্লিজ সোনা! লাভ ইউ...প্লিজ! সরি....এই দেখো কান ধরেছি!
ততক্ষণে দুটো শরীর সোফাতে আছড়ে পড়েছে! দায়িত্ব আর ভালোবাসাতে কোন খেদ নেই বোঝাতেই অনামিকা যেন আরো বেশি করে সৌম্যর বুকে নিজের মাথা ঘষতে লাগল! ততক্ষনে উপরের উইন্ড বেল এর ঘন্টাগুলো বাজতে শুরু করেছে নতুন অনুরাগে..জীবনের সাত রঙে!
মায়াবিনী
- তুমি কি করছ? কাঁচের মত আওয়াজ ভেসে আসে!
- আম....আম্মি.....বাক্য বেরোয় না!
- হি হি হি ছেলের কান্ড দেখো! ভয়েই মোলো! কেন ভয় আমাকে তোমার......বলতে বলতেই এগিয়ে এসে আমার পাশে বসে পড়ে! কি অদ্ভুত মদিরা! কি দুর্নিবার আঘ্রাণ! তাকিয়ে দেখি বুকের আঁচল খসে মাটিতে পড়েছে! দুটি পদ্মপাতার গহন অন্ধকার আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে!
- কি অঙ্ক করছ দেখি!.... আমার হাত থেকে খাতাটা নিয়ে নেয় সে! কি ঠান্ডা আঙুল গুলো! এক আঙুল তফাতে আমার থেকে অবন্তী কাকিমার লাল লিপস্টিক লাগানো ঠোঁট দুটো! স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ভিতর থেকে চেরা দুটো বেরিয়ে আসছে! কাকিমার বুক দুটো অস্বাভাবিক ওঠানামা করছে! আমি চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললাম! স্থান কাল পাত্র হারিয়ে ফেলেছি! নিষিদ্ধ আহ্বান শরীর মনকে অবশ করে দিচ্ছে! সেই সময় একটা চিল চিৎকার ভেসে এল কানে! চোখ খুলে দেখি বাসন্তী মাসি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে! হাতে কি একটা প্যাকেট! সেখান থেকে গুঁড়ো বের করে আমার সারা মাথায় মাখিয়ে দিচ্ছে! সাথে দুর্বোধ্য মন্ত্র উচ্চারণ, কাকিমা ছেঁকা খাওয়ার মত ছিটকে পড়ল দূরে! পড়েই একটা হুঙ্কার ছাড়ল মাসির দিকে! তারপর যেন ভেসে ভেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল! স্পষ্ট দেখলাম শাড়ির নীচে কোন পা নেই......! বট গাছটায় তখন ঝড় চলছে! বাড়িতে সবাই ফিরে এলে মাসি গম্ভীর মুখে বলে এ বাড়ির কাজ আর তাকে দিয়ে পোষাচ্ছে না! এবার তাকে ছুটি দেওয়া হোক! মা তো আকাশ থেকে পড়ে! এত দিনের বিশ্বস্ত লোক! হাতে পায়ে ধরে তাকে সেদিনের মত নিরস্ত করা হল! ঘটে যাওয়া বিভীষিকার সাক্ষী ছিলাম আমরা মাত্র দুই জন!
কপি পেস্ট করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ
তরণী_মাঝির_ঘাট
- হ্যাঁ মা চিন্তা কোরো না সব ঠিক আছে!
- পায়খানা কোথায় করবি?
কি জ্বালা! জননী আমার ইয়ে নিয়েও উদগ্রীব! বললাম - মা এখানে একটা বড় নালা আছে দেখে এসেছি! সবাই যায়! আমিও এক ফাঁকে....
- ও বাবু সাবধানে যাস পড়ে যাস নে! জননীর আরেক প্রস্থ চিৎকার!
বুঝলাম ফোন না ছাড়লে আমার দফারফা হবে! অগত্যা বললাম - মা রাখছি! খুব জোর পাইসে! বলেই খুটুস! লাইন কাট! লুঙ্গি সামলে সাবধানে বেরিয়ে এসে দেখি বেলা অনেক হল! দূরে ধানক্ষেতের আলপথ ধরে কয়েকটি বউ মাথায় খড়ের আঁটি বয়ে চলেছে কোথায়! সামনের পেঁপে গাছ টায় একটা সঙ্গী হীন শালিক খুঁজে চলেছে জুড়িকে! হঠাৎ কেমন কান্না এল! দমকে গলা দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল মা গো!
- অ মাষ্টার! বলচি তাড়াতাড়ি চলেন! ঘাট বন্ধ হয়ে যাবে! এই আপনার জন্য আমারে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতি হয়! নেহাত অতগুলান টাকা আমারে দ্যান বলি....না হলি চলি যেতুম!
নৌকায় উঠে দেখি মাঝির মুখে স্পষ্ট আতংকের ছাপ! বলি- ও বসির ভাই! এরকম তাড়া দাও কেনে? সবে তো বিকেল পাঁচটা!
- মাষ্টার তুমি শহরের মানুষ! এসব বুঝবে নি! আমরা জলের মানুষ.... নদীর ধারে আলো ঘুরলি বুঝতি পারি সে বেড়িয়েচে!
- কে বসির ভাই!
প্রশ্ন টা করে ভুল করলাম কি না জানি না! কিন্তু বসির মিয়াঁ বিড়বিড় কি সব বলতে লাগল! মেসে ফিরলাম মনে একটা খচখচানি নিয়ে! কিসের এত আতংক সবার মনে? সিলিং এর উপরে বাদুড় গুলোর ডানা ঝাপ্টানি মনের অস্বস্তি টাকে বাড়িয়ে দেয় আরো দ্বিগুণ!
- তা মাস্টার কি বাজার করতে এয়েচ?,...একটু রাগ হল! জবাব দিলাম- না না! গামছা পড়ে মাছ ধরতে এয়েচি!
- মাস্টার বেশ রসিক দেখতিচি! আরেকজন পাশ থেকে খ্যাঁক খ্যাঁক খানিক হেসে নিল! শুনে পিত্তি জ্বলে গেল আমার!
- তা একটা কতা বলি! তুমি আমার ছেলের মতো তাই বলতিসি! তুমি আর সন্ধের পরে ওই নদীর ধারে যেওনা বাপু!
- কেন? এরকম বলছেন কেন? একটু অবাক হলাম!
- না আসলে নতুন লোক তো! হাওয়া বাতাস ভালো না তাই....বুড়োটা কেমন চেপে যায়! স্পষ্ট বুঝতে পারি পাশেরজন হাত চিপে থামিয়ে দিয়েছে ইশারায়!
- শোনো বাছা একটা কতা বলি! বুড়ো আবার খেই ধরে....যদি আমাকে বাবার মত মানো তাইলে যেওনা! আলো বাতাস দেখা গেলে ভাল নয়!
মনে একটা খটকা লাগল! বললাম- কি ব্যাপার বলুন তো? বসির ও এই আলোর ব্যাপার বলতে চাইল! কিন্তু কিছুই বললো না! কি হয়েছে?
- থাক বাবা! তোমার স্কুলের দেরি হয়ে যাবে! বৃষ্টি থেমে গেছে! সাবধানে যাও বাবা!
তাকিয়ে দেখি বটের ঝুড়ি থেকে টুবটাব জল পড়ছে! চারদিকে লাল বটফল! আঁধার টা এখনো কাটেনি! বিনা বাক্যব্যয়ে বেরিয়ে গেলাম! বাজার করে ফেরার পথে মন্দিরের সামনে এসে দেখি বুড়ো গুলোর সভা ভেঙে গিয়েছে! ঠিক তখনই নদীর দিক থেকে শনশন করে ঠান্ডা জোলো হাওয়া ভেসে এল! তাকিয়ে দেখলাম জল ফুলে ফেঁপে উঠছে! নদীর ওপারেই মন্দির! কালিমন্দির! খুব জাগ্রত! তার পাশেই নৌকার ঘাট! লোকে বলে মরণ ঘাট! কেন বলে জানিনা! হঠাৎই দেখলাম নদীর পাড়ে একবুক কাদায় একটা লোক আপাদমস্তক চাদরে জড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে! মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা। ঠিক এই সময়ে কাছে পিঠে কোথাও একটা বাজ পড়ল! বাজের আলোয় দেখলাম ভিতরে চাদরের গহ্বরের অংশ টুকু ফাঁকা! কোন মুখ নেই সেখানে! বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল! দ্বিতীয় পলক পড়ার পরেই দেখি কেউ নেই সেখানে! কি দেখলাম! মনের ভুল? কি একটা লুকাতে চাইছে এখানকার মানুষে? একগাদা গিজগিজে প্রশ্ন নিয়ে ফিরে এলাম মেসে! স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে!
- হেই! সরে বস! এত জায়গা আছে
- সার আপনি পড়ান! আমাদের এভাবেই বসতে বলিছে!
- মানে? কে বলেছে? কেনই বা বলবে? আমার আকাশ থেকে পড়ার মত অবস্থা!
- সার তা বলতে পারবুনি আপনাকে!
আমি একটু থম মেরে যাই! কে শেখাচ্ছে এসব আজগুবি চিন্তাধারা ক্লাস সিক্সের বাচ্চাদের! বুঝে পাই না!
পিরিয়ড শেষে দমবন্ধকর পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মুক্ত করে স্কুলের সামনেই বিশাল প্রসারিত মাঠের এক কোণায় নিজেকে সেঁধিয়ে দিচ্ছিলাম আচমকা স্টাফরুম থেকে আমার নাম ধরে টি আই সি দেবদুলাল বাবু হেঁকে উঠলেন! রাগ হলো ভদ্রলোকের উপর খুব! একটু জিরোবার জো নেই! দোনামনা করে স্টাফরুমে গিয়ে দেখলাম উনি আমার দিকে কাঁচুমাচু মুখে চেয়ে রয়েছেন! ব্যাপারটা কিছু বুঝলুম না! টি আই সি মরিয়া হয়ে বলছে শুনতে পেলাম
- অরিন্দম বাবু আপনাকে এ যাত্রা উদ্ধার করতেই হবে! সমূহ বিপদ! কাজটা না হলে ট্রেজারি থেকে স্যালারি আসবে না!
আমি যেন খাবি খেলাম! আমি কাজ টা না করলে সবার মাইনে বন্ধ!! একবার গোটা ঘরটার উপর চোখ বুলিয়ে নিলাম! দশ জোড়া চোখ আমাকে গিলে খাচ্ছে যেন! একটু সময় নিয়ে বলে উঠলাম কি কাজ করতে হবে আমাকে বলুন? টের পেলাম গলাটা বেশ শুকিয়ে গেছে..!
টি আই সি একটু গলা খাঁকারি দিলেন তারপর যেটা প্রত্যাশিত ছিল সেটাই শুনিয়ে দিলেন! স্যালারি বিল তৈরি করতে হবে! যে করত সে ব্যাটা পেট খারাপ নিয়ে বাড়ি পড়ে রয়েছে আজ সাত দিন! কে নাকি কাঠি করেছে টি আই সি কে যে নতুন মাস্টার খুব এফিসিয়েন্ট এসব কাজে! ওকেই দেওয়া হোক! অতঃপর এই........
দূরের কালিমন্দিরের দিক থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে! মনে মনে মহাশক্তিরূপিণী করালবদনী কে প্রণাম করলাম! তুমিই দেখো মা! আরেকটা ব্যাপার লক্ষ করলাম! ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত! গরমের মাসে এত কুয়াশা আসছে কোথা থেকে? তাজ্জব ব্যাপার! আর কুয়াশা গুলো যেন আমাকেই ধরতে আসছে!
ঘাটে পৌঁছে দেখি জনমানবশূন্য! বসির নেই! এদিক ওদিক তাকিয়েও সে ব্যাটার কোন পাত্তা পেলাম না! গলা ফাটিয়ে দুইবার ডাক ছাড়লাম! বিদ্রুপের মত সে আওয়াজ বেথেনী নদী ফিরিয়ে দিল আমার কাছে! দুই হাতে মাথা চেপে ধপ করে নরম বালি মাটির উপর বসে পড়লাম! সারারাত কি এখানেই কাটবে না কি আমার? গলার কাছ তিতকুটে ভাবটা বেড়ে গেছে! জল ও নেই! কুয়াশাগুলো যেন ঘনত্ব বাড়িয়েই চলেছে! দৃশ্যমানতা আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে থেকে! কেমন যেন ভয় টা চেপে বসতে লাগল মনের উপর! আচমকা মনে পড়ে গেল বটের ঝুড়ির নীচে পোড়ো মন্দিরে বসা সেই বুড়োটার সাবধান বাণী.....এখানে নদীর তীরে নাকি আলো ঘোরাঘুরি করে! ঠিক তখনই চোখ গেল তরণী মাঝির ঘাটের দিকে! লোকে যাকে মরণ ঘাট বলেই চেনে! কুয়াশা সেখানেই যেন বেশী! তারপর দেখলাম মাটির কাদাস্তর ভেদ করে একটা আলোর গোলা উঠে আসছে! কুয়াশার ভিতর সেটা আরো ভৌতিক দেখাচ্ছে! ভালো করে কুয়াশার ভিতর দিয়ে সেই আলোক পিন্ডের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পেলাম...যেটা দেখলাম বুকের ধকধকানি প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল! দেখলাম ওই আলোকপিন্ড খানি কিছুই নয় একটা হ্যারিকেন.... বাতাসে ভাসমান!.... আর হ্যারিকেনের আবছা আলোর পাশেই একটা চাদরে ঢাকা মুখ! সে মুখের ভিতর কিছুই নেই! কৃষ্ণ গহ্বর! সেটা যেন খুব দ্রুত আমার দিকেই এগিয়ে আসছে! পালাবার চেষ্টা করলাম কিন্তু বৃথা চেষ্টা! মাটির সাথে কে যেন সেঁটে রেখেছে আমাকে! কানে মন্ত্রধ্বনির মত একটা ফ্যাঁসফেঁসে আওয়াজ ভেসে আসছে! স্পষ্ট শুনলুম বলছে কেউ
- মাস্টার আমি টাকাগুলো নেইনি! আমাকে মেরে ফেলিছে! আমার বেটিকেও বাঁচতে দেয়নি! ভাতের থালায় বিষ মিশাইছে! মাস্টার তুই এর বিচার কর...কর বিচার!
স্পষ্ট বুঝতে পারছি জ্ঞান হারাচ্ছি! তাও দাঁতে দাঁত চিপে শেষবারের মত জিজ্ঞাসা করলাম - কে মেরেছে? কে.....?
- তোদের লোক মাস্টার... তোদের লোক
বাকি কথা গুলো শুনতে পেলাম না আর...প্রতিধ্বনি হয়ে মিলিয়ে যেতে লাগল রেণু রেণু হয়ে কুয়াশার মাঝে! জ্ঞান হারালাম আমি......
- অরিন্দম বাবু সব ঠিকঠাক তো? যা রিপোর্ট পাচ্ছি তাতে তো.....
- আচ্ছা তরণী মাঝি কে? ওনাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে আচমকাই জিজ্ঞেস করলুম!
দেখলাম টি আই সি র মুখ টা কেমন পাংশুটে হয়ে উঠল! স্পষ্ট শুনলাম উনি বলছেন- ক্কে....ক্কে? কার কথা বলছেন আপনি? বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন মানুষটি!
- তরণী মাঝি! নৌকা চালাত! স্বাভাবিকভাবেই বললাম!
- চালাত মানে? বলতে বলতে পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘেমে যাওয়া মুখটা মোছার চেষ্টা করল!
- মানে এখন আর চালায় না...
- তা আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন এসব? আমি কি করব?
- তার সাথে আমার একদিন ঘাটে দেখা হয়েছিল! অক্লেশে কথা কটা বলে ফেললাম!
সে আপনার নাম করছিল! আপনি নাকি তাকে চেনেন?
দেখলাম উনি যেরকম উঠে দাঁড়িয়েছিলেন সেরকমই হঠাৎ ধপ করে বসে পড়লেন! তারপর হঠাৎ কড়া গলায় বলে উঠলেন
- আপনি এখন আসুন! আর হ্যাঁ! গাঁজাখুরি গল্পে মন না দিয়ে পড়ানোয় মন দিন! আপনারই ভালো হবে! শেষের কথাগুলো উনি যেন কিরকম দাঁত চিপে শোনালেন আমায়! মাথায় রোখ চেপে গেল! ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছি হঠাৎ কি মনে হতে আচমকা আবার টেবিলের সামনে ফিরে এলাম! মুখটা ওনার কানের পাশে নিয়ে ঝুঁকে আস্তে আস্তে ফিসফিস করে বললাম- এর শেষ আমিও দেখে ছাড়ব স্যার! বলেই চমকে উঠলাম! এ গলার আওয়াজ তো আমার নয়! এ তো অবিকল ঘাটে শোনা সেই কন্ঠস্বর! আর দাঁড়ালাম না! টি আইসি র আতঙ্কিত মুখটাকে পেছনে ফেলে বেরিয়ে আসলাম ঘরটা থেকে! মাঠ পেরিয়ে দখিনা বাতাসের মাতন লেগেছে তখন!
মনটা আর আগের মত ভার নেই! মাথার উপর একটা চিল অনেক উঁচুতে অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরেই যাচ্ছে...হয়ত শিকারের সন্ধানে! নদীর ঘাটের সেই রহস্যময় লোকটাও হয়ত শিকার খুঁজে চলেছে! কিন্তু কাকে? কে সে? তাকে পেলেই কি এই ভৌতিক মিথের অবসান ঘটবে? প্রশ্ন গুলো।মাথার ভিতর গিজগিজ করছে.... আচমকাই চোখ গেল স্কুলের গেটের দিকে, হ্যাঁ! স্পষ্ট দেখলুম বসির কে! গামছা দিয়ে মুখটা বাঁধা!
ভীতসন্ত্রস্ত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ইতিউতি চাইছে! মুখচোখে এক তীব্র আতংকের ছাপ স্পষ্ট! মনে হল এই স্কুলে তো বসিরের কেউ পড়েনা, আর বসির বিয়েই করেনি! তাহলে? বসিরের দিকে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই আমাকে দেখতে পেয়ে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার। প্রায় দৌড়ে কাছে চলে এল বলতে গেলে!!
- কি ব্যাপার বসির? এইসময় এখানে? কাকে খুঁজছ?
- এজ্ঞে আপনারেই দাদাবাবু। হাঁফাতে হাঁফাতে উত্তর দিল মানুষটি। স্পষ্ট টের পেলাম কী একটা আতংক তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে!
- সে এয়েচিল বাবু? বসিরের প্রশ্নে একটু চটকা ভাঙে। জিজ্ঞেস করি- কার কথা বলছ বসির?
- তরণী?....তরণী মাঝি?? স্পষ্ট বুঝলুম বসিরের গলায় খানিকটা আতংক ছলকে পড়ল! কিন্তু তা সত্বেও নিজে চমকে উঠলুম এই কারণে যে বসির তরণীর কথা জানল কিভাবে! তাকিয়ে দেখি বসিরের দুই চোখে যতরাজ্যের আতংক জড়ো হয়েছে! থরথর করে কেঁপেই যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি দুইহাত ধরে কাছের একটা গাছবেদীতে বসিয়ে দিতেই চমকে উঠলাম! বসিরের গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! বললাম
- একি বসির ভাই? তোমার তো জ্বর!
বসিরের মনে হল সে কথা কর্ণগোচর হলনা।
কেবল আমার কাঁধের উপর দিয়ে স্কুল বাড়িটাকে জুল জুল করে দেখতে লাগল।
- বসির.....বসির, কি হল? তোমাকে বলছি,গায়ে জ্বর নিয়ে এলে কি করে?
- বড় বিপদ দাদাবাবু! বিশাল বিপদ ঘনায়ে আসতিছে। আপনি পলায়ে যান।
চমকে উঠলাম বসিরের কথা শুনে। এত প্রত্যয় বিশ্বাস কোথা থেকে পাচ্ছে মানুষ টা? আচমকা বহুদূরে থাকা আমার মায়ের মুখটা ভেসে উঠল দৃষ্টিপটে। গলা দিয়ে বেরিয়ে এল অস্ফুটে দুটি শব্দ- মা গো!
- বসির....বসির ভাই! প্লিজ খুলে বলো কিসের বিপদ? বলো....প্লিজ! আমার কাতর মিনতিতেই কিনা জানিনা বসির মুখটা একটু তুলল! জ্বর তপ্ত লালবর্ণযুক্ত দুটি চোখ মেলে স্থির ভাবে তাকিয়ে থেকে বলল- দাদাবাবু আপনি খুব ভালো মানুষ, কিন্তু এখন যে কথাগুলো বলব সেগুলো শোনার জন্য শক্ত হতি হবে আপনারে!
- আমি ঠিক আছি! তুমি বলো...দৃঢ় ভাবে বললাম।
- দাদাবাবু, এ স্কুল থেকে অনেক বাচ্চা গায়েব হয়ে গেছে জানেন কি? এমনকি এই দশ বছর আগেও পাঁচটা বাচ্চা স্কুল থেকে গায়েব হয়ে যায়, খবর রাখেন?
আমি যেন খাবি খেলাম! মাথা ঝিমঝিম করছে, আমাকে তো এই খবর কেউ দেয়নি! দম নেবার জন্য উপরে তাকালাম, ঘূর্ণায়মান চিলটা আর নজরে এলোনা। মাথা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
- এই ঘটনার সাথে কোনওভাবে নদীর ধারের সেই অলৌকিক ঘটনার মিল আছে কি? বসির আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসল তারপর বলল- গভীর সম্পর্ক আছে মাস্টার! ঐ হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাগুলোর একজন ছিলো আমাদের তরণীদার মেয়ে!
আচমকাই মনে হল কানের কাছে যেন বিস্ফোরণ ঘটল! তরণীর মেয়ে?...... তাহলে নদীর ঘাটে সে খোঁজে??....মেয়েকে খুঁজে বেড়ায়?..….কিন্তু ও যে বলল বিষ দিয়ে....ঝটিতি জিজ্ঞেস করলাম বসিরকে- কিন্তু বসির, তরণী বলছিলো বিষ দিয়ে.....
- জানি মাস্টার! এখনো অনেক কিছু শোনার বাকি আছে, ঘাবড়াবেন না! আপনার কোন ক্ষতি হবেনা।
বসিরের গলায় কি একটা প্রত্যয় ছিলো জানিনা চুপ করে গেলাম। বসির শুরু করল তার আখ্যান....
- হালার পো! এই শোন আইজ রাত্তিরে বাড়ি যামুনা। পোলামাইয়াগুলারে ভালো কইরা খাওয়াইতে গ্যালে আরো টাকা লাগব খন! আইজ রাত্তিরে কামের লাইগা নাঁওরে ঘুরাইতে হইব! কি রে! ক! পারবি না?
বসির একটু ভাবনার মধ্যে পড়ে যায়! এই খামখেয়ালি মানুষ টার কথা শুনতে গেলে ঝুঁকির সম্ভাবনা আছে বৈকি! রাতে অগভীর নদীর চড়ায় লুকিয়ে থাকে কামোট! তরবারির চেয়েও ধারালো তাদের দাঁতের সারি। নৌকা আটকে গেলে অগভীর চড়ায় নেমে ঠেলতে গেলেই হয়েছে। তার উপরে জলপুলিশ আর নারী পাচার বাহিনীর নিত্য আনাগোনা! কি বলবে ভেবে পায়না বসির! একটু আমতাআমতা করে বলে
- বেশ তাই হবে খন! কিন্তু আমি নীচে নেমে নৌকা ঠেলতি পারব না। ও তোমারেই করতি হবে। তরণী হোঃ হোঃ শব্দে হেসে ওঠে। দুইচরের বনানী আরো ঘন হতে শুরু করেছে। হাসানের ঘাট আর বেশি দূরে নয়। তরণী দাঁড় ছেড়ে নৌকার পাটাতনের উপর লাফিয়ে নেমে এল। তারপর দুই আঙুল মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে এক অদ্ভুত শিসধ্বনি দিল। বসির বুঝল চালের বস্তা নামানো লোকেদের আগাম হুঁশিয়ারি দিল মানুষটি। কাজ হাসিল হলেই টাকা নিয়ে মনপবনের নাঁও খানি বেরিয়ে পড়বে রাতের অন্ধকারে।
- হেই! কি হয়েচে?
- শসসসস..…....হালার পো! শুনতে পাচনে ক্যান? ওই দেক! তরণী অনির্দিষ্ট জলরাশির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখাতে চাইল। প্রথমটা কিছু দৃষ্টিগোচর হলনা বসিরের! তারপর দেখতে পেল একটা লঞ্চ আলো নিভিয়ে সন্তর্পণে এগিয়ে চলেছে। যেদিকটা এগিয়ে চলেছে সেইদিকের ঘন ঝোপের ভিতর থেকে একটা টর্চ ক্রমাগত সিগনাল পাঠিয়েই চলেছে। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার লঞ্চটাতে কোন পতাকা বা নিশানি লাগানো নেই! বসিরের মাথায় তখন গিজগিজ করছে প্রশ্ন! এ কাদের লঞ্চ?...........আলো নেই কেন?.......... টর্চ টা কে মারছে? এদের উদ্দেশ্যই বা কি? ভাবতে ভাবতেই বসিরের কানে আচমকা একটা শব্দ ভেসে এল- ঝপাং!
অন্ধকারে কে যেন জলে ঝাঁপ দিয়ে মিলিয়ে গেল! নৌকাটা সামান্য দুলে উঠেই আবার স্থির হয়ে গেল। বসিরের তখন মনে ঝড়......তরণী নৌকায় নেই!!
অগত্যা বসিরকে জলে নামতে হল, তার আগেই নোঙর খানি বুদ্ধি করে জলে ফেলে দিয়েছিল! গায়ে হিমঠান্ডা জল সূঁচের মত বিঁধছে বসিরের, কিন্তু থামলে চলবেনা! তরণী বিনাবাক্যব্যয়ে এমন লাফ লাগাল? এত রাতে মানুষ টার কি ভয় ডর ও নাই? নিঃশ্বাস বন্ধ করে ডুবসাঁতার দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে যায় বসির। চারপাশে কামোট গুলোর অদৃশ্য উপস্থিতি টের পায় সে। এই অগভীর চড়ায় মৃত্যুদুত গুলো কোথায় ওঁত পেতে আছে কে জানে? পাঁচপীর এর নাম জপতে জপতে বসির অনেকটা দূর এগিয়ে গেল। কিন্তু তরণীর কোথাও পাত্তা নেই, গেল কোথায় লোকটা? আলো নেভানো লঞ্চটাও এতক্ষণে ঝোপজঙ্গল মেশানো ঘাট টায় ভিড়ে গেছে। লঞ্চটা আর একশো ফুট এর কাছাকাছি এসে গিয়েছে। আর ঝুঁকি না নিয়ে বসির তার ভাসমান শরীর টাকে জলের উপর ঝুঁকে পড়া গাছ গুলোর মধ্যে সেঁধিয়ে দেয়। গাছের পাতায় বসে থাকা ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকিগুলি তখন বসিরের চারপাশ আলোকিত করে জ্বলছে আর নিভছে। এ বড় স্বর্গীয় দৃশ্য মনে হয় জলের মানুষ টার কাছে। ঠিক তখনই বসির অনুভব করে তার পাশে আরও একটি শরীর ভাসছে। সে চমকে উঠতেই পাশ থেকে তরণীর চাপা স্বর ভেসে আসে
- এই চোপ! মাটি করে দিস নি হালার পো!
- আরে তরণী দা এখানে কেমন কইরে
..... বসিরের গলায় তখন বিস্ময়।
- বুঝলি বসির, ব্যাপারখান ভালো ঠেকতেসে না। এরা মনে হয় মেয়েছেলে ধরতে এয়েচে বুঝলি?
কথাটা শুনে বসিরের বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়। বুঝতে পারে কেন লঞ্চের আলো নেভানো ছিল, তাও সাহস করে জিজ্ঞাসা করল- ও তরণী দা কি করে বুইলে গা!
- আরে হারামজাদা লঞ্চের ভিতর থিক্যা মাইয়া মানষের কান্না শুনতে পাইচি। আমার ভালো ঠেকতেসে না বুঝলি? তুই এইহানে খাড়ান দে! আমি দেখতাসি। বসির সাথে সাথে তরণীর হাত চেপে ধরল- না না! তোমারে আমি কিসুতেই যাইতে দিমুনা, চল ফিইর্যা যাই, কথাটা বলে বসির বুঝল ভাল কাজ করেনি। তরণীর ভিতরের আহত বাঘটাকে খুঁচিয়ে তুলল সে। শুনতে পেল তরণী হিসহিসিয়ে বলছে- শোন রে হালা, তরণী মদ্দা মানুষের ছা! অতগুইলা মাইয়া মানষেরে ফেইল্যা নিজের জাত দিমুনা। তুই চইল্যে যা। আমি একাই যামু গিয়া।
বুড়োর কথায় কি যেন ছিল! বসির হাতের বাঁধন শিথিল করতেই তরণীর শরীর টা কালসাপের মত হিলহিলে আন্দোলন তুলেই কালো জলের অতলে মিলিয়ে গেল! তারপর চারদিক চুপচাপ। নিঃসীম বন জংলার অন্ধকারে জোনাকিদের আবছা আলোতে বসির দেখল একটা ছায়ামূর্তি জলের গভীরে আলোড়ন তুলে লঞ্চের দিকে এগোচ্ছে! ঠিক তখনই ধারে কাছে কোথাও একটা তক্ষক ডেকে উঠল! অমঙ্গল! বড়ই অমঙ্গল! ইয়া আল্লাহ! মানুষ টার হেফাজত কর! বসিরের চোখ উত্তেজনায় বুজে এল।
হালার পো...... পারলুম নি....ইশকুলের মাস্টার....... মেয়েগুলারে......আমার মাইয়াডারে ও......বিষ দিয়া....ওহানে...!
বসিরের মগজে তখন একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটছে। বলে- দাদা! তুমার মাইয়াডা কোথায়? কে মেরেছে তোমায়? তোমার কিছু হবেনা! ডাক্তারের কাছে নিয়া যাইতাসি! বলেই শরীর টাকে কাঁধের উপর ফেলতেই চমকে গেল! মানুষ টা কথা বলছেনা! পাগলের মত বসির হুঙ্কার দিয়ে ওঠে-
ওই ওই ঘুমাস নে দাদা! ঘুমাস নে! ওঠ! ভাবি রে কি মুখ দেখাইব! তোর মাইয়াডারে আমি নিয়া আসতিছি ওঠ!
এত আকুতিতেও নিষ্প্রাণ শরীর সাড়া দেয়না! বসির অবাক চোখে দেখে শরীর টাকে আস্তে আস্তে ঘিরে ধরছে জোনাকির ঝাঁক! জলের ঝাপটা তরণীর নিষ্প্রাণ পা দুটোকে ধুইয়ে দিচ্ছে! বসিরের কন্ঠ চিরে বেরিয়ে আসে একটা চিৎকার - আল্লাহ! তুই এত বেরহম কেনে? কেনে তুই মানুষ টার জান নিলি? উত্তর আসেনা উপর থেকে! নক্ষত্র শুধু তাকিয়ে দেখে ভাষাহীন ভাবে! নিঃসীম নদীবক্ষে একটা বিয়োগান্ত পরিণতি ঘোলাজলে পাক খেয়ে দীর্ঘশ্বাস কে আরো ভারী করে তোলে!
(ক্রমশ)
- দাদাবাবু! মানুষ টারে শোওয়াইয়ে যখন লঞ্চে উঠলাম তহন সব কিছু শ্যাষ হইয়া গ্যাসিল গো! বসির ডুকরে উঠল!
চারপাশে তখন আঁধার ঘনিয়ে এসেছে! ইতিহাসের স্মৃতিচারণায় কখন যে স্কুল ছুটি হয়ে গেছে খেয়াল করিনি! বসির দেখলাম চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে বসে আছে! জিজ্ঞাসা করলাম- কি দেখেছিলে বসির ভাই?
- এজ্ঞে লঞ্চে উঠেই দেখি কতগুলা ভীত মুখ আমার দিকে তাকায়ে আছে! তার মধ্যে একটারে আমি চিনি! আমাদের মহল্লার হাসিনা! ওরেও ধরপাকর কইর্যা নিয়া যাইতেসিল! কিছু কওনের আগেই পাটাতনের কোণায় আমারে দ্যাখায় দিল একটা প্রানহীন শরীর রে! আমি ছুইট্টে গেলাম দাদাবাবু! তরণীর মেয়ে ছিল উটা...! বলতে বলতে অবরুদ্ধ আবেগে কেঁপে উঠল বসির! আমি ঝুঁকে বসিরের কাঁধ চেপে ধরলাম! বসির বলে চলল
- দাদাবাবু আমি ওর ছোট্ট মুখখানা বুকে চেপে ধরেসিলাম গো! সাড়া দেয়নি ছোট্ট মুনিয়া! সারাদিন হারামি গুলান ওরে কিছু খাইতে দ্যায়নি! শুকনো মুখে বাপু বাপু করে ব্যারায়েসে! সন্ধের দিকে খুব চিল্লাইতেসিল! বাপের কাছে যাইবে বলে! বাঁচায়ে রাখলে পুরা দলটা পুলিশের জালে ধরা পড়ত! তাই ভাতের সাথে বিষ মিশায়ে খাইতে দিসিল মাইয়াডারে! হাসিনা দ্যাখসে! বাপ টা চড়ায় পড়ে রইসে আর মাইয়াডা আমার কোলে! আল্লারে ক্ষমা করুম না দাদা....
অবাক হয়ে দেখি বসিরের মত শক্ত সমর্থ মানুষ কাঁদছে! কেমন যেন মনে হল আমার বুকের ভিতর থেকে এক তীব্র যন্ত্রণা বুক চিরে বেরিয়ে আসছে! সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম - মেয়েটাকে স্কুল থেকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কে নিয়ে গেছিল বসির ভাই?
প্রশ্ন টা জিজ্ঞেস করেই মনে হল বসিরের মনে কেমন একটা ভাবান্তর দেখা গিয়েছে! জলভরা লাল চোখ দুটো দিয়ে আমাকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থেকে বলল- চলুন দাদাবাবু আপনারে ও পারে দিয়া আসি! রাতে আবার আইব খন! নিজের চোখে দেইখ্যে লিবেন! চলেন...
রহস্যে ভরা স্কুল বাড়িটা ছেড়ে বেরিয়ে আসলাম! ভাদ্রমাসের গরম টা ভালই পড়েছে! মনে পড়ে গেল আজ কৌশিকী অমাবস্যা! দূরের কালিমন্দিরে তখন ঘন ঘন ঘন্টাধ্বনি সন্ধ্যারতির সূচনা করছে! মনে তখন অশান্ত ঘূর্ণিঝড়! বসির আবার রাতে এসে নিয়ে যাবে বলছে! মন বলছে আজ রাতেই কিছু একটা হবে! কিন্তু কি? কি হতে চলেছে? বসিরের নৌকা ছেড়ে দিল! আজ বেথেনীর জল ও কিরকম চুপ! যেন মহাপ্রলয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুণছে! ঠিক তখনই ধারে কাছে কোথাও তক্ষক ডেকে উঠল! মন টা ছ্যাত করে উঠল! বসির বলেছিল তক্ষকের ডাক অমঙ্গলের! তাহলে কি আবার অমঙ্গল কিছু হতে চলেছে? বসিরের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে চমকে গেলাম! বসিরের মুখে একটা ক্রুর হাসি খেলে চলেছে! চোখে চোখ পড়তেই কিরকম যেন সহজ হয়ে গেল! আমি চোখ নামিয়ে জলের দিকে তাকাতেই আরেক প্রস্থ খাবি খেলাম! জলের রঙ ঘন কালো আর নীলে মেশানো! ভয় পেয়ে দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম! একি! দিকচক্রবাল যেখানে সূর্য মেশে সেখানে ঘন কালো আর নীল মেঘের সমারোহ! যেন দেবী কালিকার গাত্র থেকে রঙ ধার নিয়েছে প্রকৃতি!! চারপাশে ভয়ংকর অমানিশার রং তুল্য জলরাশি খেলে বেড়াচ্ছে! এ বেথেনীকে আমি চিনিনা! বসির আমাকে ওপারের ঘাটে নামিয়ে দিতে দিতে বলল- দাদাবাবু তৈরি থাকবেন! মায়ের মন্ত্র শুরু হয়ে গিয়েছে! আপনাকে নিতে আসব! কিন্তু একটা কথা আজ দানাপানি যেন পেটে না পড়ে! উপোস দ্যান শরীর টারে! মা তাই চায়!
কথাগুলো বলে বসির চলে গেল নৌকা নিয়ে! আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো কথা গুলো শুনে গেলাম! প্রশ্ন মাথায় ঢোকা বন্ধ হয়ে গিয়েছে! এ কি সব হয়ে চলেছে আজ....বসির কি দেখাবে....আমি কি ভাবে তৈরি হব অনাগত ভীষণ ভবিষ্যতের জন্য.....মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল...মা...মা গো!
- বাবু খেয়েছিস! এই এক স্বরে মনে হল সমস্ত গ্লানি সমস্ত উদ্বেগ দূর হয়ে গেল! বললাম - না মা! এই খাব! স্নান টা সেরে আসি! খুব গরম!
- আজ একটু সাবধানে থাকিস বাবু! জননীর কন্ঠে উদ্বেগ টা যেন কানে লাগল আমার!
- কেন মা? কি হয়েছে?
- আজ... আজ না... আমি... মায়ের গলাটা কেমন জড়িয়ে গেল! তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলাম - কি মা? আজ কি? বল? মনের মধ্যে তখন অজানা আশংকায় তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে!
- আজ সকাল থেকেই একটা তক্ষকের ডাক শুনেই যাচ্ছি আমি! অথচ আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় ওই প্রাণীর থাকার সম্ভাবনা একেবারেই নেই! তোর বাবাকেও বললাম! হেসেই উড়িয়ে দিল! বাইরে বেড়িয়ে খোঁজ ও করলাম! দেখতে পেলাম না!
- ওহ ও তোমার শোনার ভুল! যথাসাধ্য উদ্বেগ চেপে বললাম!
- আমি তা জানিনা বাবু! মায়ের মন তো! সাবধানে থাকিস! শেষদিকে মনে হল মা কাঁদছেন! কি হল কে জানে মাকে বলে বসলাম- তুমি বৃথাই চিন্তা করছ মা! তোমার ছেলে ঘরে ফিরে আসবেই! দেখে নিও! এখানে আরেক মা সবসময় চোখে চোখে রাখছেন! তুমি ভয় পেও না মা!
- হে মা কালী আমার ছেলেটাকে দেখো মা! মা ফোন কেটে দিল! এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যে চারদিক ডুবে গেল! মন্দিরের দিক থেকে কাঁসরের আওয়াজ তীব্রতর হয়ে উঠেছে! মা ও তক্ষকের ডাক শুনছে কেন! কি একটা অমঙ্গলের কালো ছায়া ঘুরছে দেখছি চারপাশে! বিনাবাক্যব্যয়ে স্নান টুকু সেরে নিলাম! মা কে মিথ্যা বলেছিলাম! আজ দানাপানি টুকু পেটে দেওয়া যাবে না! বসিরের নিষেধ আছে! কি দেখাতে চাইছে কে জানে! পরিষ্কার জামাকাপড় পড়ে বেরিয়ে এলাম।
দূরের বেথেনী আজ ভয়ংকর চুপচাপ! কলধৌত প্রবাহিনীর স্বাভাবিক ছন্দ টুকু আজ অনুভব করতে পারছিনা! কি হয়েছে আজ প্রকৃতির? এমন গুমোট অস্বস্তিকর ঠেকছে কেন? ওপারের জনবসতিতে জ্বলে ওঠা মিটমিটে আলোগুলোর অস্তিত্ব ও কেমন দুর্বোধ্য ঠেকছে আজ! হঠাৎই বেথেনীর দিক থেকে একটা ঠান্ডা শীতল হাওয়ার স্রোত ভেসে এল! তারপরই চোখ গেল ওদিকের ঘাটের দিকে! কুয়াশার আস্তরণ ধীরে ধীরে ঘিরে ধরছে ঘাটটাকে! আচমকা কানে এল ক্ষীণ কন্ঠস্বর!
- আইসেন দাদাবাবু! সে খুঁজতিসে!
বসিরের গলার আওয়াজ! এপারের ঘাটে কখন যে নৌকা ভিড়েছে খেয়াল করিনি! দেখি বসির ডাকছে! বিন্দুমাত্র সময় ব্যয় না করে নৌকাতে উঠে বসলাম! নিস্তরঙ্গ নদীতে একটু যেন ঢেউ উঠল! বসির নৌকা ছেড়ে দিয়েছে! উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি দূরে নক্ষত্র গুলো মিটমিট করে যেন মহা বিভীষিকার সাক্ষী হতে চলেছে! নদীর জল ঘোলা থেকে আস্তে আস্তে ঘোর কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করছে!
- জলের দিকে তাকাবেন না! ফিসফিস করে বলল বসির।
- ভয় হচ্ছে খুব বসির ভাই! কি চলছে চারদিকে কিছু বুঝতে পারছি না।
- ভয় পাইবেন না মাস্টার! আপনার উপর মায়ের আশীর্বাদ আছে! শুধু দেইখ্যে যান!
রহস্যময় নদীবক্ষে ঘোর অমানিশার অন্ধকারে নৌকাতে ভাসমান এক স্কুল মাস্টারের বুকের দুরু দুরু বুকের শব্দ ক্রমে দাঁড় টানার শব্দে হারিয়ে যেতে লাগল! দুই দিকের চরের বনানী আরো ঘন হতে থাকে! অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে দূরে নদীর বাঁক টা ডানদিকে অনেকটা বেঁকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে দৃষ্টিপট থেকে! ফিসফিস করে শুধালাম
- বসির ভাই আমরা কোনদিকে যাচ্ছি!
কোন উত্তর পেলাম না! অন্ধকারে নৌকার উল্টোদিকে দাঁড় টানা মানুষটিকে স্পষ্ট দেখতেও পাচ্ছি না! আচমকা একটা অপার্থিব গলার কন্ঠ ভেসে আছে- দ্যাখেন মাস্টার! গলাটা শুনে চমকে উঠলাম! এ তো....এ তো বসিরের গলা নয়.....বসির কোথায় গেল? সামনে বসে থাকা অপার্থিব ছায়ামূর্তি টি আঙুল তুলে কি একটা যেন দেখাতে চাইছে! তাকিয়ে দেখেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল...অবিকল বসিরের গল্পে শোনা আলো নেভানো লঞ্চটা! ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে আমার চিরপরিচিত ঘাটের দিকে! তরণী মাঝির ঘাট....আচমকাই চোখ গেল জংলা ঝোপ টার দিকে! একটা টর্চের আলো ক্রমাগত সিগন্যাল দিয়েই যাচ্ছে লঞ্চ টাকে! আচমকাই নৌকাটা দুলে উঠল! সামনে বসে দাঁড় বাওয়া অপার্থিব ছায়ামূর্তিটি ঝাঁপ দিয়েছে জলে! তাকে ঘিরে কেমন যেন অর্ধবৃত্তাকার আলো ঘুরেই চলেছে! তাকিয়ে দেখি ওগুলো জোনাকি......আর লোকটি বসির নয়...অবিকল সেদিন ঘাটে মুলাকাত হওয়া সেই অলৌকিক মানুষ টা...তরণী! আমার বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে ততক্ষণে! চেঁচিয়ে উঠলাম -তরণী যেওনা! মেরে ফেলবে....যেওনা! সেই চিৎকারেই কিনা জানি না দেখলাম ঘাটের দিক থেকে টর্চের আলোর জ্বলা নেভা বন্ধ হয়ে গেল! লোকটা আমার উপস্থিতি টের পেয়ে গিয়েছে! হঠাৎ খেয়াল করলাম নৌকাটা তীর বেগে ঘাটের দিকে ছুটছে! আরও একটা অদ্ভুত কান্ড দেখলাম জলে তখন ঘূর্ণি লেগেছে! তাকিয়ে দেখি সেই ঘূর্ণির রঙ টকটকে লাল! যেন রক্ত উঠছে জলের অতল থেকে! মাথা ঘুরে গেল! প্রানপণ শক্তিতে নৌকার কাঠ ধরে বসে রয়েছি! আস্তে আস্তে চোখের সামনে গোটা লঞ্চটা ঘূর্ণির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল! বহু লোকের মরণ আর্তনাদ তখনও কানে ভেসে আসছে! হঠাৎ দেখি একজন আমার নৌকার পাটাতনে ওঠার চেষ্টা করছে! কিন্তু পারলোনা! জলের অতল থেকে দিগন্ত জোড়া রক্তাক্ত জিভ উঠে এসেই তাকে গিলে নিমেষে তলিয়ে গেল! ভয় পেয়ে উপরে তাকিয়েই দেখি উপরে জড়ো হয়েছে রক্তাক্ত মেঘপুঞ্জ! সেখান থেকে হাঁতির শুঁড়ের মত একটা অংশ নীচের দিকে নেমে আসছে! নৌকা ততক্ষণে ঘাটে লেগে গিয়েছে! কালবিলম্ব না করে লাফ দিয়েই ছুটলাম সামনের দিকে! বেশিদূর যেতে হলনা! ফাঁকা মতন জায়গায় দেখি জনা কুড়ি অল্পবয়সী মেয়েদের একটা দল আতংকে ঠকঠক করে কেঁপেই চলেছে! নিমেষে গোটা ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিলাম! চেঁচিয়ে বললাম কোথায় গেছে? ওরাই হাত তুলে আমার স্কুলের দিকে নির্দেশ করে দেখিয়ে দিল! শরীরে তখন অসুরের শক্তি ভর করেছে আমার! ছুটলাম! স্কুলের গেটে পোঁছে দেখি একটা ছায়ামূর্তি গেট খোলার চেষ্টা করছে! বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়তেই তার পকেট থেকে একটা কৌটো মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি দিতে লাগল! বিহ্বল ভাবে তাকিয়ে দেখি কিছুদূরে মাটিতে গড়াচ্ছে আমাদেরই টি আই সি......দেবদুলাল বাবু! নিমেষে তরণীর মারা যাবার আগের কটা কথা কানে ভেসে এল....ইশকুলের মাস্টার! তাহলে এই নরখাদকই দিনের পর দিন স্কুলের নিষ্পাপ মেয়েগুলোকে বেচে দিত? তরণীর অমন নিষ্পাপ মেয়েকে এই মেরেছে বিষ দিয়ে? কত ফুলের মত জীবন এরই হাতে নষ্ট হয়েছে? মাথায় আগুন চেপে গেল! জানোয়ার টার মাথা টা ধরে স্কুলের লোহার গেটে বার বার ঠুকতে লাগলাম....বল! বল! হারামজাদা! এরকম কেন করেছিস বল! পাপি! বুক থেকে তখন অব্যক্ত এক যন্ত্রণা বেরিয়ে আসছে!
- হাঃ.....হাঃ....হাঃ অরিন্দম বাবু! অনেক টাকা! প্রচুর টাকা! আপনাদের মত গরীব মাস্টারগুলোর দিন আরামসে কেটে যাবে! কেউ জানবে না! আসুন! আমি আপনি ভাগ করে নিই আসুন!
রক্তাক্ত মুখে জানোয়ার টা আমাকে লোভের টোপ দেখাতে চাইল! আমি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে জামার কলার ধরে মাঠের মাঝখানে নিয়ে এলাম! ততক্ষণে সারামাঠ ধরে কালবৈশাখীর আস্ফালন শুরু হয়ে গেছে! আচমকাই চোখ গেল মাঠের এককোনায়! একটা নিষ্পাপ বাচ্চা মেয়ে হাতে থালা নিয়ে দাঁড়িয়েছে! ভাতের উপর টুপটাপ নাক থেকে রক্ত ঝড়ছে! স্পষ্ট শুনলাম ফিসফিস করে বলছে- মাস্টার তুমি একে ছেড়োনা! আমার বাপু কে মেইরেছে! আমার খুব খিদে পেয়েচে মাস্টার! একটু ভাত দাও....ভাত দাও....ভাত দাও.....!
আমি জানিনা আমার কি হল? চোখে জলের ধারা নামছে! বুকে আগুন! শরীরে ভর করেছে অসুরের শক্তি! নিমেষে শরীর টাকে উঠিতে স্কুলের লোহার গেটের উপর ছুঁড়ে দিলাম.....আমুল গেঁথে গেল পুরো শরীর টা! দেবদুলালের শরীর টা একবার কাঁপুনি দিয়েই চিরকালের মত নিথর হয়ে গেল! উপরে তাকিয়ে দেখি বিশাল রক্তের এক ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়েছে......তার মধ্যে উঁকি মারছে আস্তে আস্তে এক বিশাল মুখ! এ মুখ আমি যেন কোথায় দেখেছি......মনে পড়েছে.....মন্দিরে.......আমাদের মা! দেবী কালিকা! আস্তে আস্তে টের পেলাম কেমন একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি হচ্ছে! রক্তের হোলি খেলেও কিরকম একটা স্বর্গীয় অনুভুতির আস্বাদ.......দেব দুলালের বডি টা আস্তে আস্তে ওপরের ওই রক্ত ঘূর্ণির পানে উঠে যাচ্ছে! কানে তখন তীব্র ভাবে বাজছে মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি...জ্ঞান হারালাম!
বেথেনী তার নিজের ছন্দে বয়ে যায়! মা ছেলের ভালোবাসায় তার ও জলে লাগে খুশির ছন্দ!!........
(সমাপ্ত)
ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন
ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন প্রত্যাশা মতই ভোটের চিঠি টা হাতে পেয়েই বিরক্তিতে ভুরু দুটো কুঁচকে গেছিলো। জানতাম আসবেই, এ এমন প্রেম! কি...
-
তারিখ ৪.১২.২০১৬। স্থান হাবড়া চৈতন্য কলেজ। সময় সকাল ১০ টা....কলেজ প্রাংগনের সবুজ মাঠে নবাগত নবাগতা তরুণ তরুণী দের ভিড়।জীবন যুদ্ধে প...
-
অকাল বসন্ত গল্প © অরিন্দম নন্দী রোজকার মত আজকেও ক্যান্টিনের কোণার দিকের চেয়ারটায় এসে বসল অদিতি। লাহিড়ী স্যারের ক্লাস আপ...
-
#নিঃসঙ্গতা লেখনী কপিরাইট অরিন্দম নন্দী © নতুন অফিসের চাকরিতে জয়েন করার একসপ্তাহের মাথাতেই নতুন ফ্ল্যাটের চাবিটা হাতে পেল শিবানি! একটা শিরশ...


