Friday, 12 January 2018

অকাল বসন্ত





অকাল বসন্ত
গল্প © অরিন্দম নন্দী

রোজকার মত আজকেও ক্যান্টিনের কোণার দিকের চেয়ারটায় এসে বসল অদিতি। লাহিড়ী স্যারের ক্লাস আপাতত শেষ! খুব খিদেও পেয়েছে! একটা পিৎজার অর্ডার করে এদিকওদিক তাকাতে লাগল সে! না! সোমনাথ কে কোথাও চোখে পড়ল না তার! বুকটা কেমন হুহু করে উঠল তার! এই নিয়ে পরপর পাঁচদিন হল সোমনাথ কলেজ আসছেনা! লাহিড়ী স্যারের ক্লাসগুলো মিস করা নিয়ে নয়! অন্য এক অজানা আশংকায় অদিতির বুকটা কেঁপে উঠল!
সোম কি তাকে অ্যাভয়েড করছে! এটা মাথায় আসতেই অদিতির বুকটা নিমেষে ঠান্ডা হতে শুরু করল! তার সোমের উপর কলেজের অনেক মেয়েদেরই ক্রাশ আছে! সেই সুবাদে মেয়ে মহলে তার শত্রু সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে! সেদিন শর্মিষ্ঠা ও বলছিল কাকে নাকি পিছনে বসিয়ে বাইকে গড়িয়াহাট মার্কেটে ঘুরছিল সোম! কথাটা শোনার পর থেকেই দুই বান্ধবীতে আড়ি! কথা বলাও বন্ধ! হাজার হোক! সোম তো একান্ত তারই!! কতবার তার বুকে মুখ রেখে পারফিউম এর একটা অদ্ভুত মাদকতাময় গন্ধটা অদিতি নিত তার খতিয়ান অদিতি নিজেও রাখেনি! এই সোম আজ তার নয়! ভাবতেও কিরকম যেন একটা বুক ভার করা কষ্ট নেমে যায় অদিতির! জানুয়ারি র শেষ চলছে! চারদিকে ঠান্ডা আমেজ টা রয়ে গেছে! মাঝে মাঝেই ক্যান্টিনের জানলা দিয়ে আসা উদাসী বসন্তের হাওয়া অদিতি কপালের সামনের অবাধ্য চুলের গুচ্ছকে নামিয়ে আনছে বারবার। অদিতির মনে পড়ে আজ থেকে এক বছর আগে এক বসন্ত পঞ্চমী তে.......সবেমাত্র কলেজের গেট দিয়ে হলুদরঙা শাড়ি উড়িয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকছে অদিতি! এলোচুলে ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকে তাকে অন্যান্য মেয়েদের থেকে একটু অন্যরকম লাগছিল! আচমকা তার সেই হরিণীগতি থমকে দাঁড়ায়! শাড়ির আঁচল টা বেমালুম এক হ্যাঁচকা টানে অনেকটাই নেমে এসেছিল কাঁধ থেকে! ফাজিল কতগুলো ছেলে পাঁচিলের উপর বসেছিল! মজাদার দৃশ্য বা সুঠাম নারী শরীর দেখার উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন তাদের বাজানো সিটির আওয়াজ অদিতির কানে গরম সিসে ঢেলে দিয়েছিল! তাদের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি হেনে পিছনের দিকে ঘাড় ঘুরিয়েই সে দেখল আঁচলের খানিকটা ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই হয়ে গেছে! বাইকের একটা হ্যান্ডেলের সাথে জড়িয়ে এই বিপত্তি! চোখ থেকে জল বেরিয়ে এল রাগে দুঃখে! সামনে পাঁচিলে বসা ছেলেগুলো তখনো একটানা সিটি বাজিয়ে চলেছে! একটু ঝুঁকে আঁচল টা ঠিক করতেই বিভাজিকা ক্রমে প্রকট হতে যাচ্ছিল আচমকা একটা বলিষ্ঠ হাত তার কাঁধ ধরে থামিয়ে দিল! অদিতি অবাক হয়ে দেখল একটা ছ ফুটি যুবক তার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে শাড়ির কুচি ঠিক করে দিচ্ছে! অদিতির বিহ্বল দৃষ্টির সামনে যুবকটি তার কুঁচি ঠিক করে উঠে দাঁড়াল! অদিতির মুখটা ঠিক তার বুকের কাছে! এক অদ্ভুত মনমাতানো পারফিউমের গন্ধে অদিতি কেমন যেন দিশাহারা হয়ে যায়! টের পায় যুবকটি তার ছেঁড়া আচল টি তার গায়ে জড়িয়ে দিচ্ছে! সানগ্লাস খুলে নীলাভ চোখ দুটি মেলে বলেছিল
- দুঃখিত আপনার শাড়ির জন্য! আসলে আমার এই বাইক টা তাড়াহুড়োয় ভিতরের দিকে ঢোকানো হয় নি! আমি সোম! সোমনাথ! পল সায়েন্স ফার্স্ট ইয়ার! বলতে বলতেই হাত বাড়িয়ে দেয়! 
- আমি অদিতি! বাংলা ফার্স্ট ইয়ার! পেশীবহুল হাতটি ধরে হ্যান্ডশেক করে বলে ওঠে! 
- আজ পুজোর দিনে কি কাণ্ড হয়ে গেল বলুন দিকি! আমি আবারো খুব দুঃখিত!
- না না ঠিক আছে! আমি বাড়ি ফিরে চেঞ্জ করে নেব! দ্বিধা কাটিয়ে অদিতি বলে ওঠে!
- চলুন! আপনাকে ড্রপ করে দিয়ে আসি! আজ পুজোর দিনে প্রায়শ্চিত্ত আর বন্ধুত্ব দুটোই একসাথেই হয়ে যাক!
এই রসিকতায় দুজনেই একসাথে হেসে উঠল! 
- অদি?? এই অদি! কি হল? চুপ করে আছ কেন? কি হয়েছে?
আচমকা কার কন্ঠস্বরে চটকা ভাঙে অদিতির! তাকিয়ে দেখে সামনে সোমনাথ বসে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে! 
💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜

বেশ খানিকটা সময় নীরব কেটে গেল! দুই জোড়া চোখ পরস্পরের উপর নিবদ্ধ! একজোড়া চোখ হতবুদ্ধি, বাকরূদ্ধ.......আরেক জোড়া গভীর অভিমানে চোখের কোণে চিকচিক করছে মুক্তোদানার মত অশ্রুবিন্দু!
- কোথায় ছিলে?? অদিতিই নীরবতা ভাঙে!
- ইয়ে মানে.....কেন কি হয়েছে?
- কোথায় ছিলে??....এবার গলার স্বর আগের থেকে ঈষৎ চড়া! একফোঁটা মুক্তোদানা গড়িয়ে পড়ল ফর্সা নিটোল গাল বেয়ে!
সোনা! প্লিজ সবাই শুনছে!...
- শাট আপ! জাস্ট....! তোমরা ছেলেরা সবাই.....! কথা শেষ করতে পারেনা অদিতি অবরূদ্ধ আবেগে! মুখটা আরো লাল হয়ে ওঠে!
- কাজ ছিল প্লিজ! পুরোটা শোনো!
- না আমি শুনবোনা! কিছু শুনবোনা! পাঁচ দিন....! হ্যাঁ...পাঁচ দিন! মজা পেয়েছ আমার সাথে? খেলছ আমার সাথে মিঃ সোম? বলতে বলতে সটান উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে অদিতি! গোটা ক্যান্টিন ঘুরে তাকায় তাদের দিকে!
- তুমি সেদিন কাকে বাইকে নিয়ে ঘুরছিলে গড়িয়াহাট মার্কেটে?
- ওহ শিট! অস্ফুট একটা ধ্বনি বেরিয়ে যায় সোমের গলা থেকে! 
অদিতি আর সামলাতে পারেনা নিজেকে! সপাটে একের পর এক চড় মারতে থাকে সোমের গালে! গোটা ক্যান্টিন হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে! 
- সোম.... তুমি....আমার! আর কারুর না! তোমায় না পেলে নিজেকে শেষ তো করবই...তোমাকেও! কথা গুলো বলে হাপড়ের মত হাঁপাতে থাকে অদিতি!
আশ্চর্য! সোম একবারো অদিতিকে আটকালো না! অম্লান বদনে মারগুলো হজম করে গেল! তারপর শান্ত সহজ স্বরে বলে উঠল
- রাগ পড়ল? এবার আমি কিছু বলি?
অদিতি আর সামলাতে পারেনা! সোমের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে! 
জ্যাকেটের মধ্যে মুখ গুঁজে ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে অদিতি!
- তোমার লেগেছে না খুব? কাঁদতে কাঁদতেই জানতে চায় অদিতি!
- না গো! সুড়সুড়ি লেগেছে! আবহাওয়া টা হালকা করতে চায় সোম! 
- বাজে কথা রাখো না সোম প্লিজ! মেয়েটা কে ছিল তোমার বাইকে! আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে প্লিজ বলো!
ততক্ষণে ক্যান্টিনের আবহাওয়া অনেকটাই শান্ত হয়ে এসেছে! সোম অদিতিকে সামলে নিয়ে জ্যাকেট টা ঠিক করতে করতেই বলে
- এখানে নয় সোনা! আমার সাথে এসো একটা জায়গায়! 
- কোথায় যাব?
- আরে চলই না!
- ঠিক আছে চল! অদিতি তার সোমকে বুঝে উঠতে পারছিল না ছেলেটা ঠিক কি করতে চাইছে! কিছু কি লুকাচ্ছে তার কাছ থেকে? ভাবতেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল তার! ঠিক এই সময়েই কোকিল টা বাইরের কোন গাছের আড়াল থেকে উদাসী সুরে ডেকে উঠল! 
💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜💜
সোম তার বাইক টা একটা নির্জন কালীমন্দিরের সামনে স্ট্যান্ড করল! বাইক থেকে নেমে অদিতি ঘোর বিস্ময়ের সাথে চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল! কত পুরোনো কালের মন্দিরটা! তার দক্ষিণ দিকের দালানের গা বরাবর মন্দিরের দেওয়াল ফাটিয়েই এক বিশাল বটবৃক্ষ আকাশে উঁকি মারছে! বটের ঝুরি চারদিকে নেমে এসে জায়গাটিকে আরো অন্ধকারাবৃত করে তুলেছে! অদিতির এবার কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল! এ কোন জায়গায় নিয়ে এল সোম তাকে? পরক্ষণেই মনে হল সোম তো আছে পাশে! ভয় টা নিতান্ত অযৌক্তিক! 
এইসব ভাবতে ভাবতে এতটাই তন্ময় হয়ে গেছে যে সোম কোথায় আছে সে কথা বেমালুম ভুলেই গেছে অদিতি! চটকা ভাঙল উপরে বট থেকে ভেসে আসা পাখপাখালির চিৎকারে! তাকিয়ে দেখে সোমনাথ নেই!....নির্জন মন্দির বেদীতে সে একা দাঁড়িয়ে আছে! বুকটা ধক করে উঠল অদিতির! সোম কোথায় গেল! গলা ফাটিয়ে চিৎকার ছাড়ল...
- সো...ও...ও....ও...ম.....ম! তুমি কোথায়? 
কোন জবাব এলোনা! অদিতির গলার আওয়াজ প্রতিধ্বনি তুলে মিলিয়ে গেল পুরোনো মন্দিরটার কোণায় কোণায়!
এবার অদিতির কেমন যেন গা ছমছম করতে লাগল! তার সামনের মন্দির টা নোনাধরা দেওয়াল নিয়ে যেন বিদ্রুপ করছে অদিতিকে! অদিতির বুকটা ঘন ঘন নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সাথে ওঠানামা শুরু করল! একটা চাপা আতংক গ্রাস করতে লাগল মেয়েটাকে! ছেলেটা গেল কোথায়??..........

মাথার উপরে ঘন ডালপালা গুলো থেকে অবিশ্রান্ত পাখপাখালির আওয়াজ ভেসে আসছে! সোমের বাইক টা নির্জন বেদী চত্বরে একা একা দাঁড়িয়ে আছে! কিন্তু ধারে কাছে কোথাও অদিতির তাকে চোখে পড়লনা! এবার সত্যি সত্যি বুক ফাটিয়ে কান্না পেয়ে গেল অদিতির! সোম কেন এরকম করছে তার সাথে? সেকি বোঝেনা তাকে ছাড়া অদিতির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে! এরকম ভালোবাসা তো মানুষ বহু ভাগ্য করে পায়! কাঁপা কাঁপা পায়ে অদিতি মূল ফটকে প্রবেশ করল! অনেক জায়গা ভেঙে গেছে! কেমন যেন একটা সোঁদা গন্ধ! আচমকা পিছন থেকে কে যেন অদিতির কাঁধে হাত রাখল! সে স্পর্শ তার বড়ই চেনা! এ ভুল হবার নয়! আরেক টা হাত কোমরকে বেষ্টন করে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল- ভয় পাচ্ছ কেন? আমি যতদিন বেঁচে থাকব তোমার আশ্রয় আমি হব!
অদিতি শুধু একবার অস্ফুটে বলে উঠল
- সোম......!! অদিতির টানা দীঘির মত চোখ দিয়ে অবিরত মুক্তোদানা ঝরতে থাকে! সোম তাকে আরো ঘন বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে!
- সোম!! তুমি আমার অকাল বসন্ত! কোন পুরুষের বুকে মাথা রেখে ভালবাসার অর্থ জানতে পারতাম না যদি না তুমি আমার জীবনে আসতে! আমার বাবা ছোটবেলাতেই মারা যান! মা আমার দিকে ফিরেও তাকাত না! বড় হয়েছি মাসির কাছে! নিশ্চিন্তের আশ্রয় তোমার বুকেই আমি পাই সোম! 
- অদিতি আমি একটা চাকরী পেয়ে গেছি!
বোধহয় কানের কাছে বাজ পড়লেও অদিতি এতটা বিস্মিত হত না! ফ্যালফ্যাল করে সোমের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইল বড় ডাগর দুটি চোখ মেলে! 
- কি বলছ কি? কি বলছ......???
- হ্যা গো! ঠিকই বলছি! চাকরী পেয়েছি আমি!
- সত্যি???.......সোম আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না..! একটু যেন গলাটা ধরে আছে অদিতির।
- অদি! একটা কথা বলব?
- হ্যাঁ বল সোম! আজ তুমিই বল আমি শুনি! আমার বুকের ক্ষত আজ কতটা ঠাণ্ডা করে দিয়েছ তা তুমি নিজেও জাননা! বল সোম! বলতে বলতে অদিতি আরো ঘন হয়ে আসে সোমের বুকের কাছে! 
- তোমাকে একটা জিনিষ আজ সারাজীবনের জন্য দিতে চাই! নেবে?
- কি সোম?
কথা না বলে সোম জিন্সের পকেট থেকে একটা সিঁদুর কৌটো বের করে আনে! কিছুটা সিঁদুর আঙুলে নিয়ে অদিতির নরম রেশমী চুলের সিঁথিতে পরিয়ে দেয়! আধো আলো অন্ধকারের ছায়াখেলায় ভাগ্য বিড়ম্বিতা মেয়েটির কপালে ধ্রুবতারার মত কণা গুলি অভ্র রাশির মত জ্বলতে থাকে! অদিতি বিহ্বলের মত দাঁড়িয়ে থাকে! প্রেম- মন- শরীর- কায়া সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়! চাতক পাখির মত সোমের ওষ্ঠের কাছে নিজের অধর কে সমর্পণ করে দেয় সে! আরেক টি উন্মত্ত হাত গভীর আশ্লেষে সোমকে জড়িয়ে ধরে! আশ্চর্য...! সোম তাকে একা পেয়েও ভোগ করছে না! সোমের ঠোঁট অদিতিকে হালকা ছুঁয়েই বেরিয়ে যায়!
- না সোনা! প্লিজ! এখন নয়! তোমাকে সমাজের সামনে যেদিন অগ্নিসাক্ষী মেনে আপন করব সেদিনই সব দেব! আজ নয়! আজ শুধু মায়ের মন্দিরে মাকে একটা কথাই জানাব বিপদ আপদ যাই আসুক তোমাকে আমার আশ্রয় থেকে চ্যুত করব না! কোনোদিনো না!
- সোম আমাকে ছেড়ে যাবেনা তো তুমি? সত্যি বলছি সেদিন আমি বাঁচব না!
- আরে পাগলি কি বলে যাচ্ছ কখন থেকে! এত জোরে বুকে জড়িয়ে ধরেছি তাও এত ভয় কেন তোমার?
- এত সুখ তো এই অভাগীর কপালে সহ্য হয়না সোম! 
অদিতির কথা শেষ হতে না হতেই গাছের ফাঁক দিয়ে আবার কোথায় যেন কোকিল টা ডেকে উঠল! একটা উদাসী হাওয়া মন্দিরটার চত্বরে অদিতির নরম শরীর টা, সোমের কানের লতি ছুঁয়ে দক্ষিণের দালানের দিকে ধেয়ে যায়! 
সোনা! আরেকটা সারপ্রাইজ আছে! 
- আরো!!!......সহ্য করতে পারব তো! অদিতির গলাটা একটু কেঁপে যায়!
- আরে এসোই না! সোম অদিতির হাতটি নিজের হাতে নিয়ে দক্ষিণের চাতাল বরাবর এগিয়ে যায়! কিছুদূর এগিয়ে একটা পরিষ্কার মত জায়গায় তারা দুজনে দাঁড়ায়! অদিতি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে কিছুদূরে একটা কাঠের টেবিল পাতা! তার উপরে দুই দিকে জ্বলছে দুটি মোম! দুই দিকে দুটি পাত্রে গরম স্যুপ থেকে ধোঁয়া উঠছে! আর মাঝখানে..... রেড ওয়াইনের বোতল একখানি! 
- সোম!!......অদিতি অস্ফুটে বলে ওঠে! এগুলো কি? 
- একটু সামান্য আয়োজন! এগুলো করতেই আজ সামান্য দেরী হয়ে গেল! ভাবলাম হোটেলে সারপ্রাইজ না দিয়ে এই নির্জন জায়গায় ভালো মানাবে আমাদের দুজনের! ভালো হয়নি? জিজ্ঞাসু চোখে সোম অদিতির দিকে তাকায়!
অদিতি সোমের বুকে একটা আলতো চুমু খেয়ে বলে উঠল
- আমার কল্পনার ও বাইরে ছিল এই দিন সোম! 
- এসো! সোম অদিতিকে ধরে টেবিলের একটা চেয়ারে বসিয়ে নিজে উল্টোদিকের চেয়ারে এসে বসে! তারপর সরাসরি অদিতির চোখের দিকে তাকায়! 
মোমের আলোয় তার অদিতিকে সত্যি খুব মোহিনী লাগছে! এক হালকা চুলের রেশ অদিতির কপালের সামনে এসে ঝুঁকে রয়েছে! ঠোঁটের পাশের তিল টাও গজদন্তর উপরে মোহের মাত্রাটাকে বাড়িয়ে তুলেছে যেন! চারদিকে আঁধার আরো ঘন হয়ে আসছে! 
- কি দেখছ! অদিতি মুচকি হেসে শুধায়!
- তোমাকে! ভাবছি বিয়ের রাতে তোমাকে কি সুন্দর দেখাবে!
- অসভ্য! যাহ! খালি বাজে কথা!
- হ্যা গো সত্যি!
- আচ্ছা, চাকরি টা কি পেয়েছ বললে না তো!
- হ্যাঁ....! ইয়ে...! হ্যাঁ বলছি! আগে স্যুপ টা খেয়ে নাও! ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে! 
অদিতি দেখল তার সোম কিরকম যেন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে! চোখ দুটো তার বাইরের অন্ধকারের দিকে নিবদ্ধ! 
- সোম.....সোম! কি হল! বললে না?
- হ্যাঁ....কি যেন বলছিলে?
- বলছিলাম কিসের চাকরী পেয়েছ? কোথায় সেটা!
- মুম্বাই...বাণিজ্য নগরী অদিতি! সেখানে শুধু টাকার খেলা চলে! টাকা আর টাকা! প্রচুর টাকা! অস্ফুটে কথাগুলো বলে চলে আপন খেয়ালে! 
- ক্কি....কি বলে যাচ্ছ! অদিতির কথাগুলো থমকে যায়! 
- মুম্বাই??!! সেতো অনেকদূর! থাকবে কোথায়?
- সব ব্যাবস্থা করে এসেছি! ওখানে এক বন্ধুর হোটেলে উঠব আমি! 
- কিন্তু কাজ টা কি? প্রশ্নটা করার পরেই অদিতি লক্ষ করল সোমের মুখে একটা অদ্ভুত নিষ্ঠুর হাসি খেলে গেল! পরক্ষণেই মনে হল এটা মনের ভুল ও হতে পারে! আলো আঁধারিতে সোমকে অদ্ভুত লাগছে তার! 
- অদি তুমি আমাকে বিশ্বাস কর তো? 
- এমা? একথা কেন বলছ? 
- আগে বল কর কি না?
- নিজের হৃদপিন্ডের থেকেও বেশি সোম!
- তাহলে এখনই কিছু জানতে চেওনা! সময় এলে নিজেই সব কিছু জানবে! এখন এসো একটু সেলিব্রেট করি! 
মোমের নিভু নিভু আলোয় অদিতি দেখল সোম ওয়াইনের বোতল থেকে গ্লাসে ঢেলে তার দিকে এগিয়ে দিয়েছে! নিজেও ঢালল কিছুটা! তারপর হাসি মুখে বলে - চিয়ার্স জানু!!
বুক টা ছ্যাঁত করে ওঠে অদিতির! এই সোম কে সে চেনে না! কিরকম যেন পরতের পর পরতে মুখোশ খুলে ফেলছে সোম! 
খানিক টা ওয়াইন গলায় ঢেলে অদিতি বুঝল সে অভ্যস্ত নয় এসবে! বুকটা জ্বলছে যেন! গলার কাছে তিতো তিতো ভাব! মাথাটা অল্প অল্প ঘুরছে অদিতির! অন্ধকার টা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে তার চোখে! ঘোরের মধ্যে অদিতি দেখছে আরেকজন ছায়াশরীণি সোমের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে! হাতে হাত রেখে হাসছে তারা! একি! অদিতি উঠতে গিয়েও উঠতে পারল না! মাথা পিছন দিকে টাল খাচ্ছে! পাতলা ঠোঁটের উপর জমছে বিন্দু বিন্দু ঘাম! ভাল করে ছায়াশরীর টাকে দেখার চেষ্টা করল অদিতি! ঝাপসা ঝাপসা চোখে ভাল করে দেখা যায় না! ওই তো! সে আবছা দেখতে পাচ্ছে! এলো চুল! ঠোঁট টা কোথায় যেন দেখেছে! বহু চেনা মুখটা লাগছে তার! পিছনে টাল খেতে খেতে সামলে নিল সে! 
- অদিতি! ভালোবাসো আমাকে? ভালোবাসবে তো??.......হাঃ হাঃ হাঃ! ভালোবাসা মাই ফুট!
কথা গুলো যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে অদিতির কানে!
- কিরে মুখপুড়ি! তোর বান্ধবী কে চিনতে পারছিস না! এত বিশ্বাস তোর সোমকে? কত করে বললাম তোর সোম আমাকে নিয়ে গড়িয়াহাট এ শপিং করল! বাইকে ঘোরাল! আর তুই! প্রেমে অন্ধ! হা হা হা!!!! কত বড় ছাগল রে তুই!
- শ......র্মি.....ষ্ঠা!!! এ যেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না অদিতি! নিজের কানকে দুবার ঝাঁকাল! সে ঠিকই শুনছে! ভাগ্য কেন এরকম বারবার তাকে.....নাঃ! আর কিছু ভাবতে পারছেনা! বুকের বাঁ দিকে কেমন যেন চিনচিনে ব্যাথা হচ্ছে অদিতির! কাঁদতে গিয়েও পারছে না! চোখের জল মরে গিয়েছে! ধারেকাছে কোকিল টা অবিশ্রান্ত ডেকে চলেছে! অজ্ঞান হয়ে যাবার আগের মূহুর্তে কানে এল হাসির আওয়াজ! তার সোম হাসছে! অন্ধকার ফুঁড়ে আরো দুটো বলিষ্ঠ শরীর এগিয়ে এল অদিতির দিকে! অদিতির পড়তে থাকা শরীর টাকে বলের মত লুফে নিল তারা! তারপর সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসে অদিতির চোখে! সোম...ভালোবাসা.... অন্ধকার সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ফুলের মত দুই চোখে! কোকিল টা তখনো ডেকে চলেছে একটানা...!!
কেটে গিয়েছে পাঁচ পাঁচটি বছর! আজো বসন্ত আসে পারফিউমের গন্ধে.....কাঁচের চুড়ির রিনিরিনি শব্দে.....মাঝরাতে কোন যুবতীর শরীরে খেলা করা খরিদ্দার তার বুক ছুঁলেও ছুঁয়ে দেখেনা তার বুকের গভীরে গোপনে সাজিয়ে রাখা প্রেমিক মানুষটার অন্দরমহল! আদিম খেলার শেষে অদিতি ঘর্মাক্ত কলেবরে হাতে কড়কড়ে টাকার নোট নিয়ে দরজা খুলে চেয়ে থাকে কবে তার সোম আসবে! বলবে এসো সোনা! চল সেই মন্দিরে যাই! অগ্নিকে সাক্ষী করি! কিন্তু না কেউ আসেনা! ক্রেতাদের কামনার আগুনে জ্বলতে থাকা এক যুবতী শরীর খুঁজতে থাকে সেই স্বার্থপর পুরুষ টিকে যার চোখে মিথ্যা হলেও সে দেখেছিল অকাল বসন্তের আহ্বান! কোকিল আর ডাকেনা এই মুম্বাইয়ের পতিতা পল্লীতে! দেনার দায়ে বিকিয়ে যাওয়া যুবতী অস্ফুটে বলে ওঠে অকাল বসন্ত.....তুমি আরো একবার এসো আমার জীবনে! হলুদ শাড়িতে আবারো আমাকে জড়িয়ে ধরো! আস্তে আস্তে রাত গভীর হয় বাণিজ্য নগরীতে! ঘুমিয়ে পড়ে সেই যুবতী মুম্বাইয়ের পতিতা পল্লীর এক ঘুপচি ঘরে....চোখে নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে......!!!!!



সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন  প্রত্যাশা মতই ভোটের চিঠি টা হাতে পেয়েই বিরক্তিতে ভুরু দুটো কুঁচকে গেছিলো। জানতাম আসবেই, এ এমন প্রেম! কি...