Sunday, 28 January 2018

তাহার নামটি রঞ্জনা

Image may contain: one or more people and text


গল্পঃ তাহার নামটি রঞ্জনা
গল্পকারঃ অরিন্দম© নবপল্লী

পাতাপত্তর ডিঙিয়ে বাগানের ইউক্যালিপটাস গাছটা একা একা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে! রঞ্জনা জানলার পর্দা সরিয়ে তাই প্রায় একঘণ্টা ধরে দেখে চলেছে! সকাল থেকেই আকাশের মত তারও মুখ ভার! বাড়ির লোকেরা বুঝে উঠতে পারছেনা বাড়ির এই একরত্তি ফুটফুটে মেয়েটির মন ভার কেন?! পরিচারিকা দুই দুই বার রঞ্জনার ঘরের সামনে থেকে এসে ঘুরে গেছে খাবার নিয়ে!! দরজা সে খোলেনি! কখন যে তার চোখ থেকে বেরিয়ে আসা জলে বুকের কাছে জামাটা ভিজে গিয়েছে রঞ্জনার মালুম হয়না! আচমকা ডুকরে কেঁদে ওঠে মেয়েটি- - তুই আমাকে বুঝবি কবে? কবে বুঝবি? না হয় তোকে একটা থাপ্পড় ই মেরেছি শুধু! ওটা যে আমারো বুকে লেগেছে জানিস না হতভাগা? আমার চোখের দিকে একদিন তাকা রে ছাগল.....শেষ কটা কথা নিজের মনেই কাঁদতে কাঁদতে বলে চলে! বালিশ ভিজে যায় সে অনুরাগের কান্নায়!
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥

-এই অঞ্জন প্রাইভেটে পড়া আছে না তোর? কি করছিস তখন থেকে বাথরুমে?

- যাই মা! আরেকটু! হয়ে এসেছে! কথা কটা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে তার! এতক্ষণ শাওয়ার টা খুলে নীচে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল! কানের নীচে এখনো জ্বলছে নরম পাঁচ আঙ্গুলের দাগ! কি দোষ ছিল তার......? নাহ আর সে ভাবতে পারে না! তাড়াতাড়ি গায়ে একটা তোয়ালে চাপিয়ে বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাড়ে নটা বেজে গেছে! প্রতাপ স্যরের বাংলা প্রাইভেট কোচিনে দশটার মধ্যে ঢুকতেই হবে! আজ কতগুলো সাজেশন দেবেন স্যর! না পেলে চিত্তির! টেবিলে ঢাকা দেওয়া খাবার একটু নাকে মুখে গুঁজেই ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সাইকেল টা সিড়ির তলা দিয়ে ঝটিতি বের করে নেয়! যাওয়ার সময় আড় চোখে বাবাকে দেখল সে! ল্যাপটপে কি একটা কাজ করছেন যেন! ভাগ্যিস ছেলের গালটা লক্ষ্য করেননি! না হলে ওই ফর্সা গালে আরো কয়েকটা রঙের পোঁচ লেগে যেত!

যাওয়ার আগে শুধু বলে গেল- মা......আমি আসছি! দেরী হলে চিন্তা কোরোনা! ফোন করে দেব!

- দুগগা, দুগগা!! রান্নাঘর থেকে একটা নারীকন্ঠ ঘোষণা করলেন!

অঞ্জন সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে দেখে শুভ কৃষ্ণচূড়া গাছ টার নীচে অনেক আগেই সাইকেলে তার জন্য অপেক্ষা করছে! তার ক্লাসমেট!

কিরে! কখন এলি?

অনেকক্ষণ! শালা বাথরুমে কি এতক্ষণ তানসেনের চর্চা করছিলেন বাবু? কোন মানে হয় এত দেরী করার??!

যাহ খালি বাজে বকিস! নে চল এবার! দেরী হয়ে যাবে!

এই শোন না! বলছি কি বাড়িতে কিছু বলেছিস নাকি?

তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?....বলে কিছু গুম মেরে যায় অঞ্জন! আর কিই বা করার ছিল তার? মৌনিকা কে কয়েকটা প্রশ্নর উত্তর যোগান দেওয়ার এত বড় মূল্য তাকে চোকাতে হবে স্বপ্নেও ভাবেনি সে! 

(প্রথম কিস্তি সমাপ্য)
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
প্রতাপ সাহার মত রাশভারী মানুষ এই তল্লাটে দুটো দেখা যায় না! মানুষ টা সারাজীবন একাই কাটিয়ে দিল শুধু পাড়ার ছেলেমেয়েগুলোকে মানুষের মত মানুষ করবে বলে! শিক্ষকতা যে তিনি ভালই করেন বোঝা যায় দুই বেলা তার ঘরে ছাত্রছাত্রী দের ভিড় দেখে! গরীব অথচ মেধাবী ছাত্রছাত্রী দের কাছ থেকে বেতন হিসাবে একটা জিনিষই দাবী করেন ভাল রেজাল্ট আর আর পূর্ণ মানবিকতা! এই দুয়ের খামতি ঘটলে তাঁর মেজাজ সামলে রাখা দায়! তাঁর একটি আরো অভূতপূর্ব গুণ আছে....সেটা খানিকটা অলৌকিক ও বটে! এযাবতকাল তিনি যতগুলি সাজেশন ছেলেমেয়েদের দিয়েছেন তার ৯০ শতাংশই কমন পড়ে গেছে পরীক্ষায়! ওহ বলা হয়নি! তিনি বাংলা পড়ান! সাহিত্যের স্বচ্ছ সলিলা ফল্গুধারার মতন তার কলম চলে! দশম শ্রেণীর গোটা ব্যাচটা তার শোওয়ার ঘরের মেঝে দখল করে রেখেছে! সবেমাত্র পূর্বরাগের সংজ্ঞা টা তিনি বোঝাতে শুরু করেছেন এমন সময়ে দরজার দিক থেকে আওয়াজ এল- আ...আসব স্যর?
- কে? পড়া থামিয়ে ভারিক্কি গলায় জিজ্ঞাসা করেন তিনি!
- আমি! শুভ আর অঞ্জন স্যর! শুভর গলাটা কেঁপে গেল! সারা ব্যাচ জুড়ে একটা চাপা খিক খিক হাসির আওয়াজ উঠতে লাগল!
- চোপ! এত আওয়াজ কেন!.... গোটা ঘরে আবার শ্মশানের নিঃস্তব্ধতা!
- এত দেরী হল কেন তোমাদের? জলদগম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন স্যর?
- ইয়ে স্যর.... ঘুম ভাঙতে একটু দেরী....আর হবেনা স্যর! প্রমিজ!
স্যরের মেজাজ বোধহয় একটু নরম হল! চশমা নামিয়ে মৃদু গলায় বলে ওঠেন
- যাও কোণায় মৌনিকার পাশে গিয়ে বসো!
স্যারের মুখ দিয়ে বেরোনো শেষ কথা কটি যেন বিস্ফোরণ ঘটাল অঞ্জনের কানে! আবার মৌনিকা?? কানের লতির নীচটা একটু যেন জ্বালা জ্বালা করে উঠল! ভয়ে ভয়ে গোটা ব্যাচটার উপর চোখ বুলিয়ে নিল সে! না! রঞ্জনা আসেনি! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মৌনিকার পাশে জায়গা করে বসে পড়ল তারা দুজনে! গোটা ব্যাচ আবার ডুবে গেল বৈষ্ণব পদাবলীর সমুদ্রে!
- অঞ্জু! এই অঞ্জু!!......
আওয়াজ টা ফিসফিসানির মত......অঞ্জনের পাশ থেকেই আসছে! খাতা থেকে মুখ টা একটু তুলে দেখে মৌনিকা ডাগর দুটি চোখ মেলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে! চোখ দুটি ঈষৎ লাল মনে হল অঞ্জনের! কাঁদছিল নাকি....????
- কি হয়েছে?
- সরি রে! আমার জন্যই....
- মাই ফুট.....কথা শেষ করতে দেয় না অঞ্জন! চোখ দুটি যেন অপমানের আগুনে জ্বলছে! 
- প্লিজ এরকম করিস নারে!
- এই! এই মৌনি! কথা হচ্ছে কেনরে? বাঁজখাই গলায় চেঁচিয়ে ওঠেন প্রতাপ স্যর! গগনভেদী সেই গলার আওয়াজে পিলে চমকে যায় সবার! অতঃপর আবার নীরবতা! পদাবলীর রাধা তখন ঝড় জল তুফান উপেক্ষা করে সমাজের বিপরীতে কানুর জন্য প্রতীক্ষারতা! বুকের মধ্যে তার জমছে অভিমানের বাষ্প! সেই অশ্রুরুদ্ধ বাষ্প অলক্ষ্যে আঘাত মৌনিকার বুকে! চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে তার! 
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
- এই অঞ্জন যাসনে! দাঁড়া! দাঁড়া বলছি! 
মৌনিকা পিছন থেকে পরিত্রাহি চেঁচিয়ে যাচ্ছে! কিন্তু অঞ্জনের থামার লক্ষণ নেই! তাড়াতাড়ি সাইকেল টা বের করে সিটে চেপে বসল! আজকের মত ব্যাচ শেষ! বাড়ি ফিরে প্রত্যেকে পড়াটুকু ঝালিয়ে নিয়ে আবার পরের দিনের জন্য প্রস্তুত হবে! অঞ্জন ও মনে মনে প্রস্তুত নিজের সাথে নিজের লড়াই করতে! না! সে মৌনিকার সাথে কিছুতেই কথা বলবে না! কিছুতেই না! প্যাডেলে চাপ মারতেই পিছন থেকে নরম দুটি হাত শক্ত করে অঞ্জনের জামার পিছন দিকটা খামচে ধরল! 
- কি রে? এত তাড়া তোর? আমার সাথে কথাও বলতে ইচ্ছা করেনা তোর, না রে?
অঞ্জন লক্ষ করল কথা টা বলতে গিয়ে মৌনিকার পাতলা ঠোঁট দুটো কেঁপে গেল অবরূদ্ধ আবেগে! অঞ্জন কোন কথা না বলে মাটির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল! চোয়াল দুটো ক্রমে শক্ত হচ্ছে তার! একটা আগুন শিরদাঁড়া বেয়ে মস্তিষ্কে উঠে আসছে আস্তে আস্তে! এক ঝটকায় সে হাত টা সরিয়ে নিল মৌনিকার!
- রাস্তা ছাড়! 
- এরকম কেন করছিস তুই? প্লিজ আমার কথা টা শোন!
- কি শুনব?? হ্যাঁ...? কি শুনব? তুই থাপ্পড় এর আওয়াজ গুলো শুনিসনি? গোটা ব্যাচের সামনে আমাকে ইনসাল্ট করল রঞ্জনা.....আর তুই কিছু বলতে পারলি না?? কেন বলবি বল?? আমি কে তোর?? কথা গুলো এক নিঃশ্বাসে বলে গেল রঞ্জন! শরীর টা থরথর করে কাঁপছে!
- তুই......এভাবে বলতে পারলি? গলা দিয়ে একডলা কষ্ট উঠে আসে মৌনিকার! 
- অঞ্জন আমি ভাবতেও পারিনি রঞ্জনা এরকম রি অ্যাক্ট করবে! বিশ্বাস কর! স্টানড হয়ে গিয়েছিলাম! যখন ধাতস্থ হলাম দেখি সব শেষ হয়ে গিয়েছে.....
- এই তোমরা এখনো বাড়ি যাওনি? আচমকা পিছন থেকে আসা একটা কন্ঠস্বরে দুজনেই পিছনে তাকিয়ে ভুত দেখার মত চমকে উঠল! স্যর এসে দাঁড়িয়েছেন কখন তারা তা বুঝতেও পারেনি! 
- ইয়ে...মম...মানে হ্যা...স্যর! এই যাচ্ছি! মৌনিকা তোতলাতে থাকে! 
- আর তুমি! অঞ্জন.....তোমাকে প্রায়ই আজকাল একটু অন্যমনস্ক দেখি ক্লাসে! কি ব্যাপার তোমার?
- ক..কই..না তো স্যর! অঞ্জনের তখন গলদঘর্ম অবস্থা!
- যাও! তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও! কাল টাইম মত চলে আসবে! আকাশের অবস্থাও ভাল নয়! 
- হ্যা স্যর এখুনি যাচ্ছি! জায়গাটা পেরোতে পারলে যেন বাঁচে সে! মৌনিকা কে বলল নে! সামনে বস! তাড়াতাড়ি কর! বৃষ্টি আসছে!
মৌনিকাকে সামনে বসিয়ে প্যাডেলে চাপ মারতেই আবার পিছন থেকে আবার একটা জলদগম্ভীর স্বর ভেসে এল
- মাই সন! একটা কথা অলওয়েজ মাথায় রেখো! অল ইজ ফেয়ার ইন লাভ ইন ওয়ার! 
বলেই মুচকি হেসে চশমার ফাঁক দিয়ে দুই জনকে দেখে ঘরের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন অকৃতদার মানুষ টি! 
সাইকেলে বসে মৌনিকাকে নিয়ে কুলকুল করে ঘামতে লাগল অঞ্জন! মাথার ভিতর তোলপাড়! স্যর কি বলে গেলেন শেষে.....?? তাহলে কি??? 
ঠিক তখনই নাড়ুদার তেলেভাজার দোকানের দিক থেকে এক দমকা ঠান্ডা বাতাস মৌনিকা নরম পাতলা ঠোঁট দুটিকে ছুঁয়ে অঞ্জনের মাথার চুলে বিলি কেটে পিছনের কৃষ্ণচূড়া গাছের ফাঁকে প্রবেশ করল! বৃষ্টি আসছে.......!
(দ্বিতীয় কিস্তি সমাপ্য)
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
বাড়ি ফিরেই তড়িঘড়ি অঞ্জন সাইকেল টা সিঁড়ির নীচে স্ট্যান্ড করতে গিয়ে সেই অতি পরিচিত জুঁই ফুলের গন্ধটি পেল! রঞ্জনার পারফিউমের গন্ধ!..............তার মানে......তার মানে রঞ্জনা তার বাড়ি এসেছে??! ক্রোধে তার মাথাটা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল! এত কান্ডর পরেও মেয়েটি তার বাড়িতে? সিঁড়ি দিয়ে এক এক ধাপ ওঠার সময়ে সে টের পেল বুকের ধুকপুকানি ও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে!
বাড়িতে কি মেয়েটি সবাইকে বলে দিয়েছে তার কীর্তির কথা? নিজের উপরেই তার খুব রাগ হতে থাকে এবার! কেন সে একাজ করতে গেল? 
- কিরে অঞ্জু নাকি? কখন এলি? 
আচমকা পিছন থেকে আসা মহিলা কন্ঠে অঞ্জনের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায়! চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখে মা হাতে একটা হাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! ফোঁটা ফোঁটা গরম তেল তা থেকে নীচের পাপোষে পড়ছে! সেই দৃশ্য দেখে অঞ্জনের বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়! মা বোধকরি সব জেনে গেছেন! এবার ওই গরম হাতা তার পিঠে পড়তে চলেছে! কিন্তু মা মিটিমিটি হাসছে কেন?
- যা! তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে নিজের ঘরে বোস! আমি লুচি বেগুন ভাজা আলুরদম নিয়ে আসছি! মেয়েটা এতদিন পর এসেই সোজা রান্নাঘরে আমার কাছে আবদার করছে আমার হাতে লুচি খাবে! আহা! বেচারির মুখটা শুকিয়ে এইটুকুন হয়ে গিয়েছিল! তোর ঘরে বসে আছে কখন থেকে! যা তাড়াতাড়ি যা! খাবার পাঠাচ্ছি! 
কথা গুলো বলে তিনি আর দাঁড়ান না! অঞ্জনের সবকিছু গুলিয়ে যেতে লাগল! এতকান্ড ঘটার পরেও রঞ্জনা তাদের বাড়ি এসে তার জন্য বসে আছে! রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের কাছে ফরমাশ করছে.....কি ব্যাপার? চায় কি মেয়েটা?
আস্তে আস্তে নিজের ঘরের দরজা টা খুলল অঞ্জন।দেখল রঞ্জনা তার শোওয়ার খাটের উপর এক কোণায় চুপ করে বসে পড়ার টেবিলে অঞ্জনের ফোটোটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে! পরনের হলুদ সালোয়ার কামিজে তাকে একদম হলুদ প্রজাপতির মত লাগছে আজ! প্রতিমার মত কাটা মুখখানি! পিঠ ছাপানো এলোচুলে মুখটা ঈষৎ আড়াল করা! কিন্তু একটা দৃশ্য দেখে সে থমকে দাঁড়াল! ফোঁটা ফোঁটা চোখের জল মসৃণ গাল বেয়ে তার খাটের বিছানার চাদর ভিজিয়ে দিচ্ছে! রঞ্জনা কাঁদছে.....!!!
গতকাল দেখা সেই মেয়েটার সাথে এই মেয়েটিকে কিছুতেই মেলাতে পারছেনা! আস্তে আস্তে অঞ্জন রঞ্জনার পিছনে এসে দাঁড়াল! কি মনে করে মাথায় আলতো হাতখানি রাখতেই রঞ্জনা চমকে অঞ্জনের দিকে চেয়ে রইল! বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ! রঞ্জনাই প্রথম নীরবতা ভাঙে
- আজ গেছিলি স্যরের কাছে?
- হুম! একটা ছোট্ট জবাব দেয় অঞ্জন!
- আর ও গিয়েছিল?
- হুম! অঞ্জন বুঝতে পারে কার কথা বলতে চাইছে মেয়েটি! 
- কিছু করেছিস ওর সাথে আজো?
- কি করব? কি বলতে চাইছিস? ঘরের মধ্যে যেন বোমা পড়ে! 
- অঞ্জন! আমার চোখের দিকে তাকা! আমার দিকে তাকিয়ে বল!
অঞ্জন রঞ্জনার চোখের দিকে তাকায়! দীঘির মত কালো সে দুই চোখে যেন কতকালের আর্তি মেশানো! বাঁধ ভাঙা জল নামবে এবার! 
- তুই মৌনিকাকে স্যরের ঘরের পিছনে ডেকে নিয়ে চুমু খেলি আর আমি কিছু জানব না নারে?
- রঞ্জু প্লিজ.....অঞ্জনের তখন গলদঘর্ম অবস্থা!
রঞ্জনা এবার উঠে দাঁড়ায় বিছানা থেকে! দরজার দিকে এগিয়ে যায় আস্তে আস্তে! তারপর আস্তে করে লক করে দেয় ভিতর দিয়ে!
- কি করছিস? কি চাইছিস তুই? এরকম করিস না প্লিজ মা এসে যাবে! অঞ্জন ছটফট করে উঠল! 
- আমাকে তুই একটা কথা আজ বলবি অঞ্জন! সাপের মত হিসহিসিয়ে উঠল রঞ্জনা! 
-কি জানতে চাইছিস?
- তুই ওর মধ্যে কি এমন দেখেছিস যা আমার মধ্যে নেই! আজ তোকে বলতেই হবে! বল....বল! অঞ্জন লক্ষ করল রঞ্জনা তার পায়ের উপর চেপে পুরো শরীরটা অঞ্জনের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে! নরম দুটি বুকের ওঠানামা স্পষ্ট অনুভব করছে অঞ্জন! 
- নে! আমাকেও কিস কর!
- রঞ্জনা!! প্লিজ! পাগলামি করিস না! আমরা ভাল বন্ধু রে! পাগলি এরকম করিস না! তুই আমাকে থাপ্পড় মেরেছিস! আমি কিছু মনে করিনি! তুই শান্ত হ! 
- চুপ! চুপ! একদম চুপ! তোদের দুজনকেই সরিয়ে দেব! তুই আমার না তো কারুর না! সাপিনীর মত হিসহিসিয়ে কথা গুলো বলে হাঁপাতে থাকে রঞ্জনা! 
অঞ্জন ধপ করে বিছানায় উপর বসে পড়ে! দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে! এ কি শুনছে সে! বাল্য বান্ধবীর একি রূপ দেখছে সে আজ! একসাথে থাকতে থাকতে কখন তাদের মধ্যেকার বন্ধুত্বের সম্পর্ক টা অনুরাগে বদলে গিয়েছে সে নিজেও টের পায়নি?! দশ বছর আগের একটা দিন অঞ্জনের আজো মনে আছে! প্রতিদিন নিয়ম মত প্রথম শ্রেণীতে অঞ্জন সুতীর্থ র কাছে ক্যালানি খেত! মারকুটে স্বভাব আর কি! স্পষ্ট মনে আছে একটি বাচ্চা মেয়ে তার হাত ধরে বলেছিল তুই এত মার খাস কেন? ঘুসি মেরে দিবি! এমনি করে! বলে তার ছোট্ট হাতটি দিয়ে কিভাবে মারতে হয় সেটাও দেখাচ্ছিল মেয়েটি! টিফিনে বলাবাহুল্য সেই বিদ্যা কাজে লাগাতে পারেনি অঞ্জন! সুতীর্থর এলোপাথাড়ি মারের মধ্যেই সে দেখছিল মেয়েটি পিছন থেকে ঘুসি পাকিয়ে এগিয়ে আসছে! প্রথমে একটা পড়েছিল সুতীর্থ র মুখে! দাঁত ভেঙে রক্ত বেরিয়ে এসেছিল! তার সাথে এলোপাথাড়ি চড়! অঞ্জন ভয়ে সিঁটিয়ে গেছিল! উত্তমমধ্যম দেওয়ার পর যখন মিস এসে দুজনকে ছাড়িয়ে নিচ্ছে তখন অঞ্জনকে ধুলো থেকে হাত ধরে টেনে উঠিয়ে ডান হাতটি বাড়িয়ে চিকন গলায় বলেছিল- ফ্রেন্ডস?
হাতটি ধরে ফেলেছিল বাচ্চা ছেলেটি! ভরসা পেয়েছিল বলেই! ছেলেটি মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করেছিল তোমার নাম কি? মেয়েটি অস্ফুটে জবাব দিয়েছিল - রঞ্জনা...!!!
- বল অঞ্জু! কি হল কি ভাবছিস? কিস কর আমায়!!
আচমকা একটা মেয়েলি কন্ঠে অঞ্জনের স্মৃতিমেদুরতা কেটে গিয়ে একটা যন্ত্রণা তার গলা ঠেলে উপরের দিকে উঠে আসতে চায়! আচমকা অঞ্জন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে পেটের মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে! রঞ্জনা অবাক হয়ে তার মাথার চুল গুলো জড়িয়ে ধরে
- এই অঞ্জু কাঁদিস কেন পাগল? আরে কি হল তোর?
- আমি জানি না রে? কিছু জানি না! তুই আমাকে মাফ কর! তুই যা চাইছিস আমি তা দিতে পারব না! কিন্তু তোকে ছাড়া আমি থাকতেও পারব না রে! মরে যাব দেখিস! 
- অঞ্জন??! মরার কথা বলবি না আমার সামনে একদম! আর তাছাড়া আমার সময় ও খুব কম...!
রঞ্জনার শেষ কথাটায় কিরকম যেন চমকে উঠল অঞ্জন! কি বলল? বলল কি মেয়েটা? সময় কম মানে?! তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল
- এই কি বললি? সময় কম মানে? কি এর মানে?
- আরে কি বললাম! বলছি দরজাটা খুলছি! মাসিমা এসে যাবে! একটা কিস দেনা! ওরকম না! ভালবেসে দে!
হেসে ফেলে অঞ্জন! মেয়েটা সত্যি পাগলি! বলল
- কাছে আয়! রঞ্জনা কাছে আসতেই অঞ্জন ওর কপালে একটা চকাস করে চুমু খেয়ে বলে - হয়েছে?
- ইসস! চুল ঘেঁটে দিল আমার! এত করে বাঁধলাম! 
- তাই! বলে আরো বেশি করে রঞ্জনার চুল গুলো ঘেঁটে দিল অঞ্জন! ঠিক সেসময়েই বাইরের দরজায় টোকা মারার আওয়াজ পাওয়া গেল! মা খাবার নিয়ে এসেছে! অঞ্জন তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খুলে দিতেই মা খাবার নিয়ে ঢুকেই বলে উঠল দুই বন্ধুতে কি গল্প হচ্ছিল শুনি? ইস তোদের চুলের কি হাল রে! মারপিট করছিলি নাকি?! 
আচমকা দুজনেই সশব্দে হেসে মা কে জড়িয়ে ধরে ! জুঁই ফুলের একটা গন্ধের সাথে বৃষ্টিভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়! 
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
- এই দীপু খাতা দেখা! হয়েছে তোর!
- এই আরেকটু স্যর! হয়ে এসেছে প্রায়! 
- তাড়াতাড়ি কর! আর তোদের কি খবর? প্রতাপ স্যর চশমার ফাঁক দিয়ে ঘরের কোণের দিকে গুটিসুটি মেরে থাকা চারজনের দিকে প্রশ্ন টা ছুঁড়ে দেয়! 
চারজন বলতে রঞ্জনা,শুভ, মৌনিকা আর অঞ্জন! শুভই বলে ওঠে
- এই জাস্ট আর চার লাইন বাকি! হয়ে এসেছে স্যর!
- কি ব্যাপার তোমাদের রাধার প্রেমের স্বরূপ লিখতে এত সময় লাগাচ্ছ কেন! 
- এইটা কি বললেন স্যর! মেয়েদের প্রেম বুঝতে ছেলেদের সারাজীবন কেটে যায় আর আপনি রাধা প্রেমের স্বরূপ চাইছেন মাত্র একঘন্টায়??
বলার সাথেই সাথেই গোটা ব্যাচ জুড়ে একটা চাপা হাসির রোল উঠল আর সাথেই শুভর মাথায় পড়ল এক চাঁটি! রঞ্জনা হাত চালিয়ে দিয়েছে! 
- ছাগল! তোর মত ছেলের জন্য না কোন ধোপানীই ঠিক মানানসই! দিনেরাতে তোকে কাচবে!
- ওহ সত্যি কথা বললে বুঝি...
- আহ তোরা থামবি! লেখ লেখ! অঞ্জন একটু বিরক্ত হয়!
- কি লিখছিস দেখি! রঞ্জনা উঁকি মারে!
- নো টুকলি! নিজে লেখ! অঞ্জন হাসি চেপে বলে ওঠে! 
- আচ্ছা আচ্ছা! শেষ হোক তারপর তোকে......কথাটা শেষ করতে পারেনা রঞ্জনা! আচমকা চোখ মুখ লাল করে কাশতে থাকে! কাশি কিছুতেই থামতে চায়না! অঞ্জন তাড়াতাড়ি বোতল খুলে জল দিতে যায় রঞ্জনাকে! মেয়েটি বোতল ধরে এক নিঃশ্বাসে জল খেতে থাকে! আর নির্দেশ করতে থাকে ব্যাগের চেন টা খোলার জন্য! আর দেরী করেনা অঞ্জন! ব্যাগের সামনের চেন টানতেই বেরিয়ে পড়ে ইনহেলারের একটা বাক্স! অঞ্জনের বিস্ফারিত দুটি চোখের সামনে ইনহেলার টি ছোঁ মেরে নিয়ে নেয় রঞ্জনা! তারপর মুখে নিয়ে বারতিনেক টেনে হাপড়ের মত হাঁপাতে থাকে! অঞ্জনের একটা জিনিষ দেখে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়! রঞ্জনার ঠোঁটে লেগে রয়েছে পাতলা রক্তের ছাপ! কাশির দমকে বেরিয়ে এসেছে! রঞ্জনা সেটা বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি মুছে নিয়ে কাষ্ঠ হাসি হেসে বলে
- ও কিছু না! এটা মাঝে মাঝেই হয়! একটু ঠাণ্ডা লেগেছে এই যা! সেরে যাবে! ভাবিস না!
- তোর ইনহেলার কবে থেকে! অঞ্জনের ঘোর কাটতে চায় না! 
- উফ! মার খাবি! এত আগ্রহ কেন তোর মেয়েদের ব্যাপারে? ডাক্তার দিয়েছে! কেন? কি বৃত্তান্ত! জ্বালিয়ে খেলে! 
অঞ্জন একবার মৌনিকার দিকে তাকাল! একটা তীব্র বুকফাটা যন্ত্রণা চোখ দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করছে যেন মেয়েটি! কি লুকাচ্ছে তারা অঞ্জনের কাছ থেকে! বুকটা হিম হয়ে আসে তার! 
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
ব্যাচ থেকে ফিরে সেই রাতেই খুব ধুম জ্বর আসে রঞ্জনার! সাথে প্রবল শ্বাসকষ্ট আর প্রবল কাশি! কাশির দমকে গলা দিয়ে উঠে আসে কাঁচা রক্ত!! বেসিন টা রক্ত আল্পনায় ভরে যায়! বাবা একবার ডাক্তার নিয়ে এসেছিল! ডাক্তারের মুখ দেখে সে খুব একটা ভরসা পেলনা! পরিষ্কার সে দেখতে পেল ডাক্তার কাকুর চোখের কোণে জল চিক চিক করছে! খুব হাসি পেল রঞ্জনার! কিন্তু দমকে উঠে আসার বেগকে চাপতে আর হাসা হয় না তার! 

গভীর রাতে ফেসবুকের পাঁচিলের ওপারে এপারে ল্যাপটপের নিভু নিভু আলোয় কত মান অভিমানের লেনদেন হয় অঞ্জন আর মৌনিকার মধ্যে! দুটি কিশোর প্রাণ প্রেমের আবেগে থর থর কাঁপতে থাকে! অনেক দূরে ধ্রুবতারার নীচে কোন এক গৃহস্থ বাড়ির প্রত্যেক মানুষের জাগ্রত থাকে অনাগত বিভীষিকাময় মূহুর্তের প্রতীক্ষায়! একটি মেয়ে সমস্ত শরীরের যন্ত্রণা নিয়েও শৈশবের সেই হারানো ছেলেটির চোখে প্রেমের সন্ধান করে বেড়ায় যে একদিন তার হাত ধরে বলেছিল তোমার নাম কি?
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
আজ পাঁচ দিন হয়ে গেল প্রতাপ স্যরের কোচিনে রঞ্জনা অনুপস্থিত! অঞ্জনের কিরকম যেন পাগল পাগল লাগে আজকাল! রঞ্জনার বাড়ি গিয়েও দেখে এসেছে গেটে তালা! মৌনিকাকে অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছে রঞ্জনার কথা! মৌনিকা ততবারই অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে গেছে অঞ্জনকে! আর দুই দিন বাদে দোল! সারা পৃথিবী রঙের উৎসবে মাতবে! স্যর বলেন রঙের মধ্যে দিয়ে নাকি হৃদয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয়! প্রিয় মানুষ কে রঙ মাখালে তারা নাকি জন্মজন্মান্তরের ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা পড়ে! কিন্তু আজ অঞ্জনের হৃৎপিন্ডের প্রকোষ্ঠের একটা বড় অংশ আটকে রঞ্জনার সাথে! এত মারামারি, চুলোচুলি, পিকনিক, গানবাজনা, ঘুরে বেড়ানো যে মেয়েটিকে নিয়ে সেই বন্ধুটিই আজ অঞ্জনের সাথে লুকোচুরি খেলছে! দোলের দিন অঞ্জনের কি বর্ণহীন হয়ে কাটবে? একদিনে মৌনিকার ভালোবাসাও যেন তার কাছে তিক্ত হয়ে উঠেছে! মাঝ রাতে ফেসবুক খুলে রঞ্জনার চ্যাটবক্সের দিকে অতন্দ্র তাকিয়ে থাকে কখন সিগন্যাল সবুজ হয়ে অনলাইনে আসবে! বুকের সমস্ত অভিমান টুকু ঢেলে দেবে অঞ্জন তার উপর! কিন্তু সে অনলাইনে আসেনা! বিনিদ্র রজনী শেষে অঞ্জনের দু চোখে জড়িয়ে আসে ক্লান্তির ঘুম! কখন যেন অনুভব করে রঞ্জনা তার শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে! মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে পাগল! আমার জন্য ভাবিস না! আমি আসব! তোকে ছেড়ে যাওয়ার জায়গা কোথায় আমার? গেলেই তো একা একা মার খেয়ে মরবি! খিল খিল করে হেসে ওঠে অপার্থিব কন্ঠে! 
- এই অঞ্জন ওঠ! জলদি! আমাদের যেতে হবে! ওঠ!
আধো ঘুম জাগরনে কার ধাক্কায় ঘুম ভেঙে যায় অঞ্জনের! ধড়মড় করে উঠে বসে দেখে ঘরে রোদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক! হঠাৎ মনে পড়ে আজ তো দোল! তাছাড়াও আজ এই দিন টা অঞ্জনের কাছে আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ! আজ রঞ্জনার জন্মদিন! 
- ওঠ অঞ্জন আমাদের যেতে হবে! 
আবারো নারীকন্ঠের আওয়াজে চটকা ভাঙে তার! এ আওয়াজ তো তার মায়ের নয়! তাকিয়ে দেখে মৌনিকা দাঁড়িয়ে আছে বিধ্বস্ত হয়ে! মাথার চুল অবিন্যস্ত! ভেবে পেলনা এত সকালে মৌনিকা কোথা থেকে-
- তাড়াতাড়ি চল! দেরী করিস না! 
ভাবনায় আবার বাধা পড়ে তার! বলে
- কোথায় যাব?
- রঞ্জনা....
- কোথায়? কোথায় সে? ডাক? কি পেয়েছে সে? আজ মুন্ডু ফাটাব ওর!
- অঞ্জু প্লিজ! বলতে বলতে কেঁদে ফেলে মৌনিকা হাপুস নয়নে!
অবাক হয়ে যায় অঞ্জন। বোঝে সিরিয়াস কিছু হয়েছে! নরম গলায় বলে
- কাঁদিস না! কি হয়েছে বল! 
- রঞ্জনা! বেলেভিউ তে.....
মৌনিকার কথাগুলো শেষ হতে পারেনা! অঞ্জনের শোনার ক্ষমতা কমতে থাকে আস্তে আস্তে! মাথা ঘুরছে.......কি শুনছে সে! রঞ্জনা নার্সিং হোমে আজ ছয় দিন ধরে???! একটু ধাতস্থ হয়ে বলল
- বাইরে ওয়েট কর! আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি! 
অঞ্জন পাঁচ মিনিটে তৈরি হয়ে মৌনিকাকে নিয়ে ট্যাক্সি ধরল বেলেভিউ এর উদ্দেশ্যে! সারারাস্তা আজ রঙের খেলায় মেতেছে! অঞ্জনের সেদিক তাকিয়ে থাকতে থাকতে জলের ধারা নামল দু চোখ থেকে! দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে শুধু বলল অস্ফুটে
- ঠাকুর ভাল করে দাও আমার পাগলিকে! 
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥

বেলেভিউ নার্সিংহোম এর আইসি ইউ কেবিনের সামনে কয়েকটি উদ্বিগ্ন মুখের ভিড়! তাদের মধ্যে দুই জনকে চিনতে পারল অঞ্জন! রঞ্জনার মা- বাবা! অঞ্জন আস্তে করে রঞ্জনার বাবার পাশে বসে পিঠে হাত দিতেই ভদ্রলোক অঞ্জনকে বুকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন! মা ও আঁচলে কান্না লুকালেন! এসব অঞ্জনের ক্রমে অসহ্য মনে হতে লাগল! চিৎকার করে বলে ওঠে- প্লিজ এসব বন্ধ করুন! কি হয়েছে রঞ্জনার বলুন প্লিজ! আমি আর পারছিনা! আমি আমার বন্ধুর কাছে যাব! নিজের চোখে দেখতে চাই তাকে! 
জলভরা চোখে ভদ্রলোক একটা নার্সিংহোম এর লোগো দেওয়া কাগজ অঞ্জনের হাতে ধরিয়ে দেয়! অনেক হাবিজাবি ডাক্তারি দুর্বোধ্যতার মধ্যে একটা জায়গায় অঞ্জনের চোখ আটকে যায়! মোটা অক্ষরে লেখা আছে সেখানে
- স্কোয়ামসেল কার্সিনোমা ফাউন্ড! স্টেজ থ্রি!!
আর পড়তে পারছেনা অঞ্জন! চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে তার! লেখাটার মানে সে বুঝুক না বুঝুক! তার বন্ধু ভাল নেই! 
আচমকা আইসি ইউ কেবিন থেকে একটা নার্স বেরিয়ে এসে ঘোষণা করে যায় - আপনাদের মধ্যে অঞ্জন কে আছেন? পেশেন্ট ডাকছেন!
হত বিহ্বলের মত দরজা ঠেলে অঞ্জন ভিতরে ঢুকল! বাতানুকুল ঘর!.......চারদিকে কত বিশাল মেশিন বসানো...... আর সামনের একটা দুধ সাদা বিছানায় নাকে নল ঢোকানো একটা কিশোরী শরীর! তার রঞ্জনা! দেখে বিশ্বাস হচ্ছেনা অঞ্জনের! শরীর টা একদিনে শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেছে! কন্ঠের হার বেরিয়ে গেছে! রঞ্জনা শুধু একবার অনেক কষ্টে অঞ্জনকে দেখল! তারপর চোখের কোণা দিয়ে জল বেরিয়ে এল! কাঁপতে কাঁপতে অঞ্জন তার চোখের জল মুছিয়ে দেয়!
- তোর কি হয়েছে?
- ছাগল। কি হবে! হাঁপ ধরা গলায় বলে ওঠে মেয়েটি!
- কার্সিনোমা কি সব দেখলাম!
- আরে বাদ দে! ওসব! 
- কেন? কি হয়েছে তোর!
- ছাড়! রঙ এনেছিস! না রে?
- তুই কি করে বুঝলি?
- পাগল আজ দোল না? আমি জানি তুই রঙ না দিয়ে থাকতে পারবিনা! 
অঞ্জন লক্ষ্য করল একটা তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে রঞ্জনার শরীরে! মনিটরে দেখল লাইফলাইন টাও খুব স্লো চলছে! বুকটা হিম হয়ে গেল তার! 
- তোর খুব কষ্ট হচ্ছে নারে? ডাক্তার ডাকছি দাঁড়া! 
অঞ্জন উঠতেই রঞ্জনা তার হাতটা চেপে ধরে! 
- প্লিজ যাসনা ! আমার সময় খুব কম! দে আমায় রঙ দে! জলদি! সময় খুব কম! 
অঞ্জন দেখল রঞ্জনা কিরকম যেন ভুল বকছে ঘোরে! সে তাড়াতাড়ি আবীরের ছোট প্যাকেটটা খুলে খানিকটা রঙ গালে ছুঁইয়ে দেয়! 
- আর আমাকে ওই জিনিস টা দিবি?.প্লিজ
- চুমু? ঝাপসা চোখে জিজ্ঞাসা করে অঞ্জন!
- উঁ! আর কিছু বলতে পারেনা রঞ্জনা! সারা শরীরটা একটা অব্যক্ত যন্ত্রণায় মুচড়ে ওঠে! অঞ্জন তাড়াতাড়ি তার শুকনো ওষ্ঠে নিজের লবণাক্ত অধর সমর্পণ করে! রঞ্জনার দুই চোখ বেয়ে বেরিয়ে আসে অশ্রু! পালস রিডার মনিটরিং ইউনিট থেকে পিঁইইই করে একটানা আওয়াজে মুখরিত হতে থাকে কেবিন ঘরটি! অঞ্জন মুখ তুলে দেখে সামনে এক ফুটফুটে কিশোরী শুয়ে পরম নিশ্চিন্তের ঘুম ঘুমাচ্ছে! যন্ত্রণার আর কোন চিহ্ন নেই সারা মুখে! গালে অঞ্জনের ভালবাসার চিহ্ন! অঞ্জন ভাল করে চেয়ে দেখে এই মুখ সে যেন কোথায় দেখেছে! ছোটবেলায় দেখা সেই বাচ্চা মেয়েটি...... শীর্ণ নীলাভ শিরা ওঠা হাতটি সে তুলে নেয় নিজের হাতে! পাগলের মত চিৎকার করে বলে-
- ওই কোথায় গেলি! ওই দেখ! আমাকে মারতে আসছে! রঞ্জু আমাকে বাঁচা!
ঝাপসা হয়ে আসা চোখে অঞ্জন সেই শরীরে কোন ছন্দ খুঁজে পায়না! কেবিনের বাইরে কান্নার রোল ওঠে! রাস্তার দিক থেকেও একটা রোল শোনা যায়! তবে সেটা আনন্দের! সারা রাস্তায় আজ রঙের আলপনা!
( সমাপ্ত)

♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥

Monday, 22 January 2018

যন্ত্রণা


Image may contain: night

সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারিনি! পারিনি তার কারণ টা না বললে আমার সাধের পাঠককূল ভালবেসে বিরিয়ানি খেতে ডাকবে এ আশা আমি দুঃস্বপ্নেও করিনে! আসলে দন্তশূল ব্যাপারটা আমার জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে! দিনে দুইবার দন্ত মর্দন করার পরেও দন্ত গুলি এভাবে মালিকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে তা বোধকরি পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ ও এতটা প্রত্যাশা করেন নি! তার উপর গিন্নীর নাসিকা গর্জন!সমুদ্র গর্জনের উপর আরেক কাঠি! এত গর্জন তর্জনে অতিষ্ঠ হয়ে নিভৃতে পদচারণা করতে থাকি অন্দর মহলে! রাত আরো নিঝুম হয়! সাথে বেদনাও সগর্বে জানান দেয় তার আমার প্রতি ভালবাসা!! চুপ করে মায়ের বিছানার দিকে এগিয়ে যাই! আমার নিঃশব্দ পদসঞ্চারে এক দেওয়াল টিকটিকি পলায়ন করে সশব্দে!
ঘুমন্ত মায়ের মাথায় আলতো হাত ছোঁয়াতেই মায়ের ঘুম ভেঙে যায়! আমি অবাক হয়ে যাই- কি গো! ঘুমাও নি??
মা তার প্রতিদিনকার বাসনমাজা খরখরে হাতটি মাথায় দিয়ে বলে -দাঁতের ব্যাথা আবার বেড়েছে নারে! তখনই বলেছিলাম ডাক্তার দেখিয়ে নে! কথা বলার ফাঁকে লক্ষ করলাম মায়ের মুখটা অব্যক্ত এক যন্ত্রণায় বেঁকে গেল! আমি তাড়াতাড়ি মায়ের মাথায় হাত দিয়ে শুধালাম - মা তোমার কোথাও কি কষ্ট হচ্ছে খুব? মা আমল না দিয়ে শুধু একটু মলিন হাসল! বলে- পা টা একটু ধরেছে!
আমি পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি পা ফুলে ঢোল! আশ্চর্য! তুমি এই পা নিয়ে সারা সকাল দাঁড়িয়ে রান্না করেছ? ঘরে এতগুলো লোক আছে কি করতে? মা শশব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে ওরে ছাগল! আস্তে বল! মেয়ে উঠে যাবে! আবার খানিক নীরবতা! মা আচমকা বলে ওঠে তোর বাপে তো আমার হাতের রান্না ছাড়া খাবেনা! সেই কোন ছোটবেলায় তাঁর হাত ধরে এ বাড়িতে এসেছিলাম! কত জ্বর শরীর খারাপ কিছুকে পাত্তা দিই নি! মানুষটাকে আমার নিজের কষ্ট বুঝতে দিইনি! মেয়েমানুষের জান কই মাছের প্রাণ! বুঝলি বাবু! শরীরের নাম মহাশয় যা সওয়াবে তাই সয়! এখন আর এসব কিছু আর মনে হয় না!
আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম! আজ দন্তবেদনায় বিনিদ্র রজনী যাপন করতে গিয়ে আমার জন্মদাত্রী মায়ের প্রতিরাতের বিনিদ্র কষ্টকর জীবনচর্যার ছবিটি ফুটে উঠল! মাকে ধরে ধীরে ধীরে শুইয়ে পায়ে আলতো হাত ছুঁয়ে বেরিয়ে আসছি পিছন থেকে মা বলে ওঠে বউমাকে জাগাস নে বাবু! তোর টিফিন করতে গিয়ে তার হাত ফালাফালা হয়ে গেছে! বেচারিকে ঘুমাতে দিস! আমি হতবাক! আমাকে তো বউ কিছু বলেনি! ওই অবস্থায় রাতের খাবার পর্যন্ত করে দিয়েছে!
চুপচাপ চলে এলাম! আশ্চর্য দাঁতের ব্যাথাটা আর নেই! ঝিমঝিম করছে চোয়াল দুটো! বউ এর পাশে এসে চুপ করে বসলাম! ডানহাতটা আড়াল করে ঘুমাচ্ছে বেচারি!
আশ্চর্য! কোনোদিন তো ছুটি চায়নি কাজ থেকে! একটা অলিখিত দায়িত্বভার সবার অলক্ষে পালন করে চলেছে! বউ এর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই বউ জেগে ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে! বলে- কি গো! ঘুমাও নি? ব্যাথা কমেনি? হাতটা তুলে বললাম তরকারি কাটতে গিয়ে হাত কেটে বসে আছ জানাওনি কেন? বউ মুখ বেঁকিয়ে বলে ওঠে -মরণ!
তখন পূব আকাশে রঙের খেলা..........যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে নতুন ভোর আসছে!

অরিন্দম © নবপল্লী

Thursday, 18 January 2018

ফেরা



ফেরা
*****************************************
প্রবাসী দীপঙ্কর সান্যাল নিজের আজন্ম পরিচিত স্টেশনের চৌহদ্দি তে পা রেখেই বুঝতে পারল প্রবাস শুধু তার জীবন থেকে অমূল্য কতগুলি বছর বিস্মৃতির অতলে নিয়ে যায় নি, নিজের নাড়ির টান এর বিপরীতেও এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়ে তুলেছিল! সরু ফ্রেমের চশমাটা দামী রুমালে আলতো করে মুছে কোটের সামনের পকেটে ঢুকিয়ে রাখে! চোখ বুজে বুক ভরে এক লম্বা শ্বাস নেয়! বুকের ভেতরটা আভিজাত্যের হাওয়া যেন বিদ্রুপ করে ওঠে! মুকুন্দপুর স্টেশনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেই দীর্ঘশ্বাস রণিত হয়ে ওঠে! কানে ভাসে রামদাস কাকার তেলেভাজার দোকান থেকে সেই হাঁক!
- গরম সিংগারা গরম! ১ টাকা পিস! খাবেন আর খাবেন! হেই সিংগারা গরম........
- কোথায় যাবেন বাবু?...... আচমকা কন্ঠস্বরে অন্যমনস্কতায় ছেদ পড়ে! এক টোটো গাড়ি ডাকছে তাকে!
- কোথায় যাবেন? আবারো শুধায়!
- আচ্ছা স্টেশন টা এত পরিবর্তন হল কবে থেকে??? প্রশ্ন টা আনমনে জিজ্ঞাসা করেই বুঝতে পারল ভুল জায়গায় প্রশ্ন নিক্ষেপ করেছেন! পরমূহুর্তেই নিজেকে সামলে বলেন সান্যাল বাড়ী যাব!
- কোথায় যাবেন বললেন?
- সান্যাল বাড়ী? ওমপ্রকাশ আর জয়প্রকাশ সান্যালের বাড়ী! কেন? চেননা?
- কথাটা বলতে বলতে একটা জিনিষ দীপঙ্কর লক্ষ করলেন কোনো এক অজানা আতংকে টোটো ড্রাইভারের মুখ পাংশু হয়ে উঠেছে! ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল আপনি কে মশাই? কোথা থেকে আসছেন? প্রশ্নটা করেই উত্তরের অপেক্ষা না করে টোটো নিয়ে নিমেষে হাওয়া হয়ে যায়! কিংকর্তব্যবিমূঢ় দীপঙ্কর দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ হতভম্বের মত!
- যাহ বাবা হল কি? এরকমভাবে পালাল কেন? এদিক ওদিক তাকাতে নজর এল স্টেশনমাস্টার একজনের সংগে কথা বলতে বলতে আসছেন। দীপঙ্কর তার কাছে সটান গিয়ে শুধায় আচ্ছা দাদা এখানে কি কোন গাড়ি ঘোড়া পাওয়া যাবে না? এখন তো সবে বিকেল পাঁচটা! কিছুই তো দেখছি না!
- মশাই তো দেখছি রীতিমত সাহেব! তা কোথা থেকে আসা হচ্ছে শুনি?
- আমেরিকা!
- ঢোক গিলতে বিষম খেলেন স্টেশনমাস্টার! বলেন অ! তা যাবেন কোথায়?
- সান্যাল বাড়ী!
- যেটা প্রত্যাশাও করেননি দীপঙ্কর সান্যাল সেটাই হল! স্টেশনমাস্টার আতংকে হনুমান চালিশা বের করে দিলেন ছুট!
- দীপঙ্কর এই শীতেও ঘামতে লাগলেন! কি ব্যাপার? সান্যাল বাড়ীর নাম শুনলেই সবাই এরকম ভয়ে পালাচ্ছে কেন? একসময় এই বাড়ীর যথেষ্ট নামডাক ছিল মুকুন্দপুরে! হবে না কেন? ওমপ্রকাশ তার কাকা ছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর আর বাবা জয়প্রকাশ ছিলেন পুলিশের বড় কর্তা! এহেন প্রভাবশালী পরিবেশে বেড়ে ওঠা তার! ছোট বেলা থেকে দেখে এসেছে বড় বড় শিল্পপতি, অভিনেতা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী দের! বাড়ীতে একটা ছোটখাটো ভিড় লেগেই থাকত! মা রঞ্জনা সান্যাল ছিলেন অসাধারণ সংগীত শিল্পী! সুরে মাতোয়ারা করে তুলতে পারতেন! পরিবারে দুই ভাইয়ের ভালবাসা ছিল দেখার মত! ওমপ্রকাশ রঞ্জনাকে মাতৃ জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন! আর দীপঙ্কর কাকা বলতে অজ্ঞান ছিল! কত জায়গায় কাকা তাকে নিয়ে ঘুরতে যেত! কিন্তু পরবর্তী সময়ে দুই ভাইয়ের সম্পর্কটা তলানিতে এসে ঠেকেছিল! কারণ টা দীপঙ্কর আজো ঠাহর করতে পারেনা! প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে সে দেখত মা কাকার ঘরে দরজা বন্ধ করে কি সব কথা বলত! তারপরেই সে তার মাকে হাপুস নয়নে কাঁদতে দেখত! ছোট্ট বালক কিছু বুঝতে না পেরে থম মেরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিজের ক্লান্ত শরীর টাকে নিজের ঘরের দিকে টেনে নিয়ে যেত! বিশাল অট্টালিকার কোণায় কোণায় দীর্ঘশ্বাস এর বিষবাষ্প বয়ে যেত! কতদিন হয়েছে ছোট্ট দীপু না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে! তারপর মাঝরাতে কপালে কার একটা নরম স্পর্শ পেয়ে ঘুম ভেঙে দেখে মা খাবারের থালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে! চোখে জল! অবোধ বালক কিছু না বুঝে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলত মা বড় হলে তোমাকে আর কষ্ট করতে দেবনা দেখো! মা তাকে আরো বেশি করে বুকের ওমে জড়িয়ে ধরে কাঁদত! বাবা অনেক রাতে বাড়ি ফিরত! মাঝে মাঝে সে শুনতে পেত কাকার সাথে উন্মত্ত কন্ঠে কথা কাটাকাটি! জিনিষপত্র ভাংচুরের আওয়াজ! একদিন সে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছিল মা বাবার কথাবার্তা
- খোকাকে আর এখানে রাখব না! আমেরিকার স্কুলে ভর্তি করে দেব ঠিক করেছি!
- সেকি! খোকাকে ছেড়ে আমি বাঁচব কি করে? আমি মরে যাব!
- রঞ্জু! প্লিজ পাগলামি কোরোনা! খোকার ভবিষ্যৎ চিন্তা কর! এখানে এই পরিবেশে আর কতদিন ভাল থাকবে ও! বাবা হয়ে সন্তানকে এই পরিবেশে মরতে দিতে পারি না!
- ওগো প্লিজ!.............
- না!! জয়প্রকাশ কথা রাখেননি! একসপ্তাহের মাথাতেই ছোট্ট দীপুকে নিয়ে বিমান উড়ে গিয়েছিল গন্তব্যে!
-....... কোথায় যাবেন দাদা???? সম্বিৎ ফেরে দীপঙ্কর এর! দেখে এক ভ্যানওয়ালা তার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে! আবারো শুধায় যাবেন কোথায়?
- সান্যাল ভিলা! শোনার পরেই একটা চাপা আতংক তাকে গ্রাস করল!
- একশো দেব! মরিয়া হয়ে দীপঙ্কর বলল! নিয়ে চল!
- পনেরো মিনিটের পাথেয় একশো!!! গরীবের কাছে অনেক বেশি! নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেও রাজি হয়ে যায় সে! কিন্তু শর্ত রাখে গন্তব্যের একটু আগেই সে নামিয়ে দেবে!
- একটু অবাক হল দীপঙ্কর! কি ব্যাপার বল তো? তোমরা সবাই সান্যাল বাড়ির নাম শুনে এত ভয় পাচ্ছ কেন? কি হয়েছে কি?
- আমি জানি না বাবু! ভ্যানে উঠুন! সন্ধের আগে পৌঁছাতে হবে! আমার অন্য জায়গায় ভাড়া আছে!
- ভ্যানে ওঠার সাথে ভ্যান দ্রুত গতিতে স্টেশনের পাকা রাস্তা ছেড়ে কাঁচা রাস্তা ধরল! সেই আজন্ম পরিচিত পথ ধরে যেতে যেতে কত ঘুমানো স্মৃতি মনের কোনায় ভিড় করে এল! রামদুলালের আম বাগানে বন্ধুদের সাথে আম চুরি করা,দত্তদের পুকুরে মাছ ধরা এই ত সেদিনের কথা বলে মনে হয় তার! কতদিন তার মায়ের হাতের চিংড়ি পোস্ত খায়নি সে!
- এসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন ভ্যান থেমে গেছে টের পায়নি সে!
- নামুন বাবু! আর এগোতে পারব না! ভ্যানওয়ালার কন্ঠে একটা চাপা আতংক! তড়িঘড়ি দীপঙ্কর ওকে ১০০ টাকার নোট দিয়ে ভ্যান থেকে নেমে পড়ল! ইতিমধ্যেই চারদিক বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে! ভালো করে চেয়ে দেখল জায়গাটা বেশ জংলা হয়ে গেছে! একটু দূরে অন্ধকারের মধ্যেই সে স্পষ্ট দেখল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সান্যাল ভিলা! সেই পুরনো গেট! সেই পুরনো আভিজাত্যে! ভ্যানচালক চলে যেতে যেতে আবারো একটি বার ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করল- আপনি কি সত্যি আজ রাত কাটাবেন ওখানে? দীপঙ্কর জবাব না দিয়ে এগিয়ে গেল পায়ে পায়ে সান্যাল ভিলার দিকে! চারদিকের বড় বড় গাছ থেকে পাখিদের অজস্র কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে! অজানা ফুলের গন্ধে চারদিক মাতোয়ারা! একটানা ঝিঁঝিঁ ডেকে চলেছে কোথাও! স্মৃতি ভারাক্রান্ত মনে বিশাল মেইন গেটের সামনে এসে দাঁড়াল সান্যাল ভিলার একমাত্র উত্তরসূরি!! তখনই ঘটল অভাবনীয় কান্ডটি! গেট টি আচমকা সশব্দে খুলে গেল আপনা থেকেই! একটু অবাক হল সে! হরিদাকেও তো দেখছে না আশেপাশে! গেট টা খুলল কে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে চৌহদ্দির ভিতরে প্রবেশ করতেই মেন গেট সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল আগের মতই! নিজের জন্মভিটেতে দাঁড়িয়েও এই শীতে ঘামতে লাগল সে! কি হচ্ছে এসব?
- মা! ও মা! মা গো! কোথায় তুমি??? আলো টা একটু জ্বালো! আমি এসেছি!
- দীপঙ্কর সান্যালের কণ্ঠস্বর যেন বিদ্রুপের প্রতিধ্বনি হয়ে বিশাল অট্টালিকার কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়ল! কেউ এলনা!
- বাবা! বাবা! কাকুমণি! কোথায় তোমরা??? আমি এসেছি!!! তোমাদের দীপু! আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব!
- কেউ এগিয়ে এলনা! নির্জন অট্টালিকা র প্রবেশদ্বারে একা দীপুর বুক ফেটে কান্না এল! তাহলে কি কেউ নেই এখানে? কেউ কি থাকেনা এখানে? দরজার কাছে এগোতেই অবাক কান্ড! আপনা থেকেই খুলে গেল দ্বার!! মাকড়শারজাল এ ঢাকা পাকদণ্ডী সিঁড়ি উঠে গেছে মাঝখান থেকে! মনে পড়ে শৈশবে কতবার মা এই সিঁড়িতে বসে ভাত খাইয়ে দিয়েছে! আজ আর কিছু নেই! আচমকা চোখ গেল পাশের টেবিলের উপর সাজানো প্লেটের উপর! রেকাবি তে ঢাকা দেওয়া জলের গ্লাসের পাশে কয়েকটি সন্দেশ রাখা আছে! ক্ষিদে তৃষ্ণায় তাই খেয়ে নিল! মা রাখত ঠিক এই ভাবে! স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিন এই অভ্যাস দীপুর মজ্জাগত হয়ে পড়েছিল! কিন্তু মা বাবা কাকুমণিকে দেখতে পাচ্ছে না কেন সে? ধুলোয় ভরা সিঁড়িতে পা রেখে তার মনটা কেঁপে উঠল অজানা আশংকায়! বাড়ির মানুষ গুলোর কিছু হয়নি তো? ধীরে ধীরে উঠে নিজের সেই আবাল্য পরিচিত ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল দীপু! সামনের লম্বা করিডরের দুই প্রান্ত খাঁখাঁ করছে নির্জনতা!
- মা! মা! কোথায় তুমি? তোমরা কোথায়??? দেখতে পাচ্ছি না কেন তোমাদের?
- দীপঙ্কর এর কথা গুলো এই নিঝুম পুরীতে ব্যর্থ পরিহাসের মত শোনায়! কেউ এগিয়ে এলনা এতকাল বাদে ফেরা ঘরের ছেলেকে আপন করে নিতে!
- বাইরে কি সুন্দর পূর্ণিমা র চাঁদ উঠেছে! আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক! ক্লান্ত অবসন্ন শরীর টাকে টেনে হিঁচড়ে শোবার ঘরের দিকে নিয়ে যায় দীপঙ্কর সান্যাল! কিন্তু ঢুকবার মুখে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে স্থির হয়ে যায় সে! দোতলা থেকে নীচে ডাইনিং টেবলের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে যায় সে! থরে থরে খাবার সাজান! আর খাবারের একটা ডিশের দিকে তার চোখের তারা একদম স্থির হয়ে যায়! তার আজন্মের প্রিয় খাবার চিংড়ি পোস্ত! খুশিতে দীপু চিৎকার করে ওঠে - মা! মাগো! আমি তোমার হাতে খাব! এস না প্লিজ! খুব খিদে পেয়েছে!
- কেউ আসল না! এই শুন্য পুরীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা দীপুকে গ্রাস করল! অগত্যা সে নিজেই সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগল! কয়েকটা ধাপ সে নেমেছে, আচমকা সে অনুভব করল তার ঘাড়ের কাছে কার যেন নরম কোমল মমতাস্পর্শ!!! এই স্পর্শ আগেও সে অনেক বার অনুভব করেছে! তার সত্তার সাথে মিশে গেছে এই ঘ্রাণ! সে তার ক্ষুধার্ত শরীর টাকে নিয়ে একটা চেয়ারে বসল! এত বড় ডাইনিং টেবলে সে একা! অতীতে কত ভালবাসা, কত মান অভিমানের ঝড় বয়ে গেছে এখানে! দীপুর বুক ফেটে কান্না এল! আচমকা সে অনুভব করল তার চুল গুলো কে যেন নরম আঙুল দিয়ে বিলি কেটে দিচ্ছে! নাকে মুখে কিসের যেন নরম স্নিগ্ধ একটা স্পর্শ অনুভব করল! আচমকা তার শরীরে একটা শিহরণ বয়ে গেল! এত তার মায়ের বুকের গন্ধ! মা-ই তো তার মাথায় বিলি কেটে দিত এভাবে! সে দেখল আপনা থেকেই চিংড়ি পোস্তর রেকাবিটা তার দিকে একটু এগিয়ে আসছে! দীপু অভিমানে রাগে দুঃখে শোকে তাপে মা-আ-আ-আ বলে চিৎকার করে উঠল! একটা অদৃশ্য সত্তা যেন আরো বেশি করে তাকে জড়িয়ে ধরেছে! চাঁদের আলোতে যেন ভেসে যাচ্ছে গোটা অন্দরমহল! চোখের জল ফেলতে ফেলতেই খাওয়া কোনরকমে শেষ করে উঠতে যাবে আচমকা রান্নাঘরের দিক থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল
- খোকা! হাত ধুয়ে নে!
- নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না সে! এত তার মায়ের গলা! তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গিয়ে দেখে কল থেকে আপনা আপনি জল পড়ে যাচ্ছে! হাত ধুয়ে সে নিজের ঘরে এসে বিছানায় চুপ করে বসে রইল! সারারাত সে চুপ করে বসেই থাকবে!!! তার মা আরো একবার তাকে বুকে জড়িয়ে ধরুক! দেখা নাই বা দিল! অশরীরী দেখা যায় না যে! তার একটুও ভয় করছে না এখন! তার বাবা র সাথে অনেক কথা বাকি রয়ে গেছে যে! কাকুমণির সাথে গল্প কে করবে সে ছাড়া! এই ফেরা তো তার ঘরে ফেরা! আস্তে আস্তে সে চন্দ্রালোকিত শুন্য ন্যাড়া ব্যালকনির দিকে পা বাড়াল! পিছনে সেই ঘাড়ের কাছে অমোঘ স্নেহস্পর্শ! বাগানে নির্জন রজনীগন্ধা গাছটির উপর মাতাল বাতাস খেলা করে বেড়াচ্ছে আপনমনে! দীপুকে তার মায়ের স্নেহ মেশানো আঁচলেই ফিরে যেতে হবে! আস্তে আস্তে সে বাঁ পা টা বাড়িয়ে দিল শূন্যে!!!! একটা রাত পেঁচা অন্ধকারের বুক চিরে উড়ে গেল রহস্যে ঘেরা সান্যাল ভিলার উপর দিয়ে! তাকেও বোধ করি নিজের গন্তব্যে ফিরে যেতে হবে সময় শেষ হবার আগেই..........!!!!
***************************************************
অরিন্দম @ নবপল্লী
(গল্পের ত্রুটি বিচ্যুতি মার্জনীয়)

Wednesday, 17 January 2018

বুধিয়া


বুধিয়া.....আরে অ বুধিয়া....কোথায় গেলি বাপ! একটু জল দিয়ে যা বাপ! বলতে বলতেই দমকে কাশি...প্রায় দম বন্ধ হয়ে যায় প্রকাশের! যক্ষায় ভুগছে বহুদিন হল! স্ত্রী গত হওয়ার পর থেকেই শরীর টা ক্রমে ঝিমিয়ে আসছে প্রকাশের! কিন্তু এই মা মরা ছেলেটাকে কার ভরসাতেই বা রেখে যাবে সে! জ্ঞাতিরা তাকে একঘরে করে দিয়েছে.....খোজ খবর ও নেয়না! ভরসা ওই বছর তেরোর মা হারা ছেলেটি! বউটা বেচে থাকলে প্রকাশ নিশ্চিন্তে চোখ বুজত! চোখ বুজলে আজও ভেসে ওঠে সেই সব সোনা ঝরা দিনগুলো।.....খ্যাঁক খ্যাঁক খ্যাঁক..... আবার সেই বেয়াক্কেল কাশিটা!! এবার তাজা রক্ত বেরিয়ে এল প্রকাশের মুখ দিয়ে! বাপু! বাপু! উঠে বস! জল টা নাও! কোথা থেকে ধুলা মাখা শরীরে দৌড়ে এসে বাবার মাথাটা কোলে তুলে নেয়! বড় মায়াবী তার দুটি চোখ....অনেক কথা বলে দেয় সে দুটি! রক্ত টা পরম মমতায় মুছিয়ে সে বলে ডাকছিলে বাবা? আজ ইস্কুল যাবিনে বাপ? তোকে তো অনেক বড় হতে হবে বাপ! তোর মা এর অনেক আশা ছিল তোকে নিয়ে! যাবি না বাপ?
না বাপু! অনেক পেপার বিক্রি করতে হবে! টাকা না আসলে তোমার চিকিচ্ছে হবেনা বাপু! এ দুনিয়াতে তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই বাপু! প্রকাশ হতভম্বের মত বসে থাকে! কিই বা বলবে সে! ওই টুকু একরত্তি ছেলেটার কাধে ভড় করে এই সংসার চলে! এ ত তার লজ্জা! কিন্তু অসহায় সে! ছেলেটাকে একটা ভাল জামা দিতে পারেনি সে! বই খাতাও চেয়ে চিন্তে আনতে হয় অনেক গঞ্জনা সহ্য করে! কিছু না বলে প্রকাশ ঢক ঢক করে ঘটির জলটা নিঃশেষ করে!
বলে যা ভাল বুঝিস কর বাপ! আমার তো হয়ে এল! বুধিয়া বাপকে জড়িয়ে ধরে! না বাপু তুমি কোথাও যাবেনা!
একবালপুর হাইস্কুল! স্কুলের তিনতলা ক্লাস সেভেনের ক্লাস বসে! নিবারণ স্যর প্রতিদিনকার অভ্যাস মত ক্লাস এ ঢোকবার আগে মাথার পিছনদিকটা একবার হাথ বুলিয়ে নেয়! ক্লাসে ঢুকবার সাথে সাথে পিনড্রপ সাইলেন্স! অংকের ক্লাস প্রথমেই! সবাই নিবারণ স্যর কে একটু ভয়ই করে....খুব বদরাগী! রেজিস্টার খুলে রোল কল করতে গিয়ে হোচট খান তিনি! বুধিয়া সিং রোল ১ অ্যাবসেন্ট আজ তিনদিন! হল কি ছেলেটার?
ক্লাসে বাকিদের জিজ্ঞাসা করেও কোন সুদুত্তর পান না তিনি। আসলে ছেলেটার সাথে তার একটা অদৃশ্য অংকের লড়াই চলে সারা পিরিয়ড ধরে! ইচ্ছে করে অংক ভুল করে মজা দেখেন নিবারণ স্যর! বুধিয়া কখন তার ভুলটা ধরাবে! তারপর সবার সামনে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলা তুই আমাদের গর্ব রে পাগল! স্যর আসব? আচমকা মনঃ সংযোগ ছিন্ন হয়! দেখেন বুধিয়া দাঁড়িয়ে চৌকাঠে! রাগ হয় তার খুব! এদিকে আয় হতভাগা! কোথায় ছিলি তুই? স্যর! বাপুর শরীর টা আবার খারাপ করেছে! তাই ডাক্তার ডাকতে গেছিলাম! পথে দেরী হয়ে গেল! আহা বেচারা! নিবারণ এর খুব মায়া হয় এই মেধাবী ছেলেটির উপর!
যা বস! কাল থেকে টাইমে আসবি!
অংকে ডুবে যায় গোটা ক্লাস! আর কয়েক মাস বাদেই সারাভারত গণিত মেধা অন্বেষা পরীক্ষা হতে চলেছে! প্রথম তিনজন এর একজন হতে পারলে সারাজীবন এর স্কলারশিপ হাতের মুথায়! নিবারণ স্যর এর খুব চিন্তা এই মা হারা ছেলেটাকে নিয়ে! নিজে বিয়ে করেনি! নিঃসন্তান, তাও কি একটা অদ্ভুত অপত্য টান তিনি অনুভব করেন বুধিয়ার উপর! কিন্তু ওর পরিবারের যা অবস্থা তাতে পরীক্ষা দেওয়া নিয়েই সংশয়! ক্রমে এগিয়ে আসে পরীক্ষার দিন! এ দিন নিবারণ স্যরের ও অগ্নিপরীক্ষা! কত টিটকিরি হজম করতে হয়েছে তাকে বুধিয়াকে অংক শেখান নিয়ে! অসহ্য! আজ তিনি তার জবাব দেবেন! ফালাকাটা মেমোরিয়াল হল! কত হাজার পরীক্ষার্থীর অগুনতি মাথা! যেন জনসমুদ্র! চশমার ভিতর থেকে জহুরীর চোখ খুঁজে বেড়ায় হীরে কে! বুধিয়া কোথায়? ঘাম জমতে থাকে কপালে! আসবে না নাকি? ওই ত ওয়ার্নিং ও পড়ল! হারামজাদা গেল কোথায়? চশমা খুলে ভাল করে মুছে নেন নিবারণ স্যর! এই লোকটি জীবনে কোথাও হার মানেন নি! আজ বুধিয়ার কাছে হেরে যাবেন? এ হতে পারেনা! ওই ত দূরে সাদা ধুতি খালি পায়ে কে যেন এগিয়ে আসছে গেটের কাছে! চশমাটা ভাল করে লাগিয়ে নেন অংকের মাস্টার! এ ত বুধিয়া! কিন্তু একি সাজ? পিতৃহারা অশৌচের ছাপ সর্বাংগে! চোখের কোণায় ছলছল করছে! বাকরূদ্ধ নিবারণ স্যর! তার বাপুও তাকে চিরদিনের লুকোচুরি খেলায় ফাঁকি দিয়ে চলে গিয়েছে! মাথা নিচু করে স্যর এর পায়ে হাথ দিতেই নিবারণ স্যর এর সমস্ত গাম্ভীর্য গেল ভেঙ্গে.....বুকে জড়িয়ে ধরলেন ওই একরত্তি ছেলেকে! বুধিয়া বলে ওঠে স্যর আমি খুব একা হয়ে গেলাম! নিবারণ তাকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে বলে নারে পাগল আমি আছি তোর সাথে....ওই দেখ সামনে তোর পথ! আমি জানি তুই জিতবিই! তুই আমাকে নিরাশ করবিনা এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস! যা পাগল যা! তোর বাপুও আজ ওপর থেকে আশীর্বাদ করছেন! যা! বুধিয়া ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে যায় একের পর এক সোপান অতিক্রম করে.....আচমকা থমকে দাঁড়ায় স্যর পশ্চাদ আহ্বানে! বুধি আজ থেকে আমি তোর বাপু! তোর বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন আমি পূরণ করব! তুই আমার গর্ব! সারা স্কুলের অহংকার! তোকে এভাবে একা করে দেব? বুধিয়া দৌড়ে এসে স্যর কে জড়িয়ে ধরে। দুজনের চোখই আজ ঝাপসা! পিছনে বিশাল মেমোরিয়াল হলটা প্রাগৈতিহাসিক যুগের সাক্ষীর মত দাঁড়িয়ে থাকে। দূরে কোথাও একটানা বৈদিক মন্ত্র র মত উচ্চারিত হতে থাকে "অসতো মা সদগময়ঃ...তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ"
লেখনীঃ অরিন্দম
নবপল্লী


জীবন মরণ


ডঃ দিবাকর সোম ক্লান্ত পায়ে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালেন! দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দিলেন দূরে....বহুদূরে! তখন তিলোত্তমার বুকে সন্ধে নামছে! মহানগরীর কর্মব্যস্ততা চারদিকে মুখর করে তুলেছে! ১৩ তলা থেকে দিবাকর একবার নীচের দিকে তাকালেন! নিওন আলোর ল্যাম্পপোস্ট গুলো মনে হয় তার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করছে! চশমা টা খুলে একবার ভাল করে মুছে নিলেন! হয়ত এ তার মনেরই ভুল! পরিশ্রম তো আজ কম হলনা! কিন্তু বুকের ভিতরে অব্যক্ত যন্ত্রণার অনুভূতিটা আজ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে ডাক্তারকে! পিছন দিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিলেন পেশেন্ট কে! বছর পঁচিশ এর যুবকের অপারেশন করলেন আজ! সিরিয়াস অ্যাকসিডেন্ট! বুকের বাঁ দিকটা রড ঢুকে ফালাফালা হয়ে গেছিল! ঘন্টা পাঁচেকের অমানুষিক পরিশ্রমে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন যুবককে! এককথায় অপারেশন সাকসেসফুল! কিন্তু তাও বুকের ভিতরে চিনচিনে যন্ত্রণাটা যাচ্ছেনা! জানলার কাছ থেকে সরে এলেন! টের পেলেন মোবাইলটা ভাইব্রেট হচ্ছে! বউ এর ফোন! সকাল থেকে ত্রিশ বার ফোন এসেছে! একবারও রিসিভ করেন নি! বুকের ব্যাথাটা বাড়ছে! কানে এখনো বাজছে পেশেন্ট পার্টির খিস্তি সংকীর্তন!
- শালা ডাক্তার না কসাই! দে মালটাকে যমের বাড়ি পাঠিয়ে!
- শুয়োর খালি টাকা নেবে! আজ বাবুলে র কিছু হলে এই নার্সিংহোম থাকবেনা! 
স্যর! চা দেব? আচমকা সম্বিৎ ফিরে তাকিয়ে দেখেন ওয়ার্ড বয় প্লেট নিয়ে এসেছে! ইশারায় নামিয়ে রাখতে বললেন! ম্যাজেন্টা কালারের ফোটোফ্রেম টার দিকে ডাক্তারের দৃষ্টি আটকে গেল আচমকা! প্রভাকরের ওই মায়াবী চোখ দুটির দিকে ডাক্তারবাবুর দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল! স্কুলে ছেলেকে ড্রপ করে বেরিয়ে যাওয়ার মূহুর্তেও পিছন থেকে ছেলের ডাকে সুইফট টা বন্ধ করে পিছনে তাকিয়েছিলেন তিনি! 
- বাপি আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো! আমার বার্থডে তে মা আর আমাকে ট্রিট দেওয়া চাই! ডাক্তার পিতা স্মিত হেসে সম্মতি জানিয়েছিল! কয়েক ঘন্টা পরেই আসে দুঃসংবাদ টা! প্রভাকর.....

স্যর! আপনার স্যুট রেডি! নার্সের ডাকে সম্বিৎ ফেরে দিবাকরের! দিবাকর কিছু না বলে উঠে রেডি হয় বাড়ি যাওয়ার জন্য! বেরোবার সময় পেশেন্ট এর পরিবারের মুখোমুখি পড়ে যান! কোনমতে ধরা গলায় বলে ওঠেন Operation successful.... he is now out from danger! বলে আর একমূহুর্ত ও দাঁড়ান না! লম্বা করিডোর এর দিকে পা বাড়ান! পা টা একটু কেপে গেল মনে হল! তখুনি ফোনটা বেজে ওঠায় নিজেকে সামলে ফোন টা কানে দেন- হ্যা মিনতি আমি আসছি! আর এক মুহুর্ত দাঁড়ান না সেখানে! লম্বা পদক্ষেপে বেরিয়ে যান! বড় বেয়াদপ লোক! এ যাত্রা বেচে গেল! এক নার্স পেশেন্ট পার্টির সেই লোকটির দিকে এগিয়ে বলে কাকে বেয়াদপ বলছেন মশাই! আজ সকালে ওনার ছেলে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে স্কুলএর পাঁচতলা ব্যালকনি থেকে পড়ে মারা গিয়েছে! পুত্রশোক বুকে নিয়ে উনি আপনার ছেলেকে পাঁচ ঘন্টার অপারেশনে যমের মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন! নার্সের শেষ কথা গুলি নির্জন নার্সিংহোমের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিধ্বনি হয়ে! তাদের মুখে আর শব্দ নেই! শুধু দূরে একটা ভারি বুটের শব্দ একরাশ অভিমান নিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে ব্যথার অন্ধকারে....নার্সিংহোমের প্রতিটি ইঁটে!!!!
© 
অরিন্দম  নবপল্লি

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন  প্রত্যাশা মতই ভোটের চিঠি টা হাতে পেয়েই বিরক্তিতে ভুরু দুটো কুঁচকে গেছিলো। জানতাম আসবেই, এ এমন প্রেম! কি...