রাতে আমার ঘুম এমনিতেই হয় না! বিশেষ করে একটা বাজার আওয়াজ টা দূর গির্জাঘরের ঘড়িটা থেকে কানে আসতেই ঘুম ভেঙে যায়! চোখ মেলে দেখি পাশে বউ মেয়ে পরস্পরকে গভীর নিশ্চিন্তে জড়িয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাবধানে খাট থেকে নেমে আসি! রিমোট দিয়ে এসির টেম্পারেচার টা আরো এক ধাপ বাড়িয়ে দিই!
যাতে মেয়ের ঠান্ডাটা না লাগে! গোটা ফ্ল্যাট টা ঘুমে মগ্ন! কোথা থেকে এক অলস টিকটিকি একমনে টিক টিক আওয়াজ করে যাচ্ছে! আস্তে আস্তে ব্যালকনির দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম! গোটা মহানগরী পরম নিশ্চিন্তে কেমন ঘুমাচ্ছে! যেন ঘুমন্ত দানবী! প্রথম সূর্যের কিরণের জন্য যেন নিঃশব্দে অপেক্ষারত! নিচে নিয়ন আলো গুলো একা একা নিঃসঙ্গ জ্বলছে! এক পথঘোরা ভবঘুরে সারমেয় লেজ পাকিয়ে বালির ঢিপিটার উপর নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে! ঘুম নেই কেবল আমার চোখে! চোখটা জ্বালা জ্বালা করছে! চারমিনার টা ধরিয়ে চেয়ারে বসে গা টা এলিয়ে দিতেই ব্যাপারটা নজরে এল! বড় রাস্তার ও ধারে একটা নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটের পাশে এক বিশাল গয়নার বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং বসেছে! একটা পরমাসুন্দরী রমণী গায়ে বিভিন্ন অলংকার পরে কামনামদির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে! আসলে হোর্ডিং টার পোজিশন টাই এমনই যে যেদিক থেকেই দেখি মেয়েটির চোখ দুটি যে দেখছে তার চোখেই নিবদ্ধ হবে! আমি গভীর ভাবে চোখ দুটো নিরীক্ষণ করতে লাগলাম! কি সুন্দর টানা দুটো চোখ! সিঁথির মাঝ বরাবর সোনার টিকলি আর কপালটা বেষ্টন করে থাকা টায়রায় মেয়েটিকে অদ্ভুত মোহময়ী লাগছে! অদ্ভুত সুন্দর মরাল গ্রীবা আর হাসিটিকে আরো কামনামদির করে তুলেছে পাতলা ঠোটের কোণে বেরিয়ে থাকা গজদন্ত টি!! হোর্ডিং টার নীচে লাগানো নিয়নের আলো গুলো জ্বলছে আর নিভছে! সাথে মেয়েটিও থেকে থেকে চোখের সামনে থেকে হারিয়ে গিয়েও আবার ধরা দিচ্ছে! রাত্রির এক নিঃসীম সৌন্দর্যের মধ্যে এই রহস্যময়ীর অপার্থিব লুকোচুরি আমাকে ক্রমশ চুম্বকের মতন টানতে লাগল! প্যাকেট খুলে দুই নম্বর সিগারেট টা ধরাতে গিয়ে আচমকা একটা দৃশ্য দেখে ঠোঁট থেকে সিগারেট টা মাটিতে পড়ে গেল! আলো জ্বলা নেভার মধ্যেই লক্ষ করলাম হোর্ডিংটার কৃষ্ণকলি একেবারে সিধা আমার দিকে তাকিয়ে আছে!! চোখে যেন তার কত না বলতে চাওয়া কথা! কামনামদিরতা আরো বেড়েছে যেন! হাসিটাও যেন একটু চওড়া হয়েছে আগে থেকে! সারা শরীর দিয়ে ঘাম বেরোতে লাগল আমার! কে এই রহস্যময়ী?? মুখটা দেখে মনে হচ্ছে তাকে যেন দেখেছি
আগে! কোথায় কি ভাবে? কিছুই মনে পড়ছে না! পরক্ষণেই হোর্ডিংটার দিকে তাকিয়েই চিৎকার করে উঠলাম! কৃষ্ণকলি আমার দিকেই সরু তর্জনী তুলে কি দেখাতে চাইছে! আতংকের একটা চোরা স্রোত বয়ে গেল মেরুদণ্ড বেয়ে! হোর্ডিং এর মেয়েটি জীবন্ত??! আতংকে চিৎকার করে উঠলাম! রাত্রির নিঃস্তব্ধতাকে খান খান করে আমার সে চিৎকার অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল নির্মম ভাবে! বউ দিশাহারা হয়ে দৌড়ে আমাকে জাপটে ধরে! নাহলে পড়েই যেতাম! তখনো ঠকঠক করে কেঁপে চলেছি!
- কি গো! কি হল??! কি হল?? এরকম করছ কেন??
কোন উত্তর দিতে পারলাম না! শুধু বউ এর বুকের ঢিপঢিপানির সাথে পাল্লা দিয়ে কাঁপুনিও বেড়ে চলল! এরকম করে কাটল মিনিট পাঁচ সাত! অবশেষে একটু ধাতস্থ হতে মুখটা তুলে আড় চোখে অভিশপ্ত হোর্ডিংটার দিকে তাকিয়ে অঙ্গুলি নির্দেশ করলাম! বউ অবাক হয়ে শুধাল-
- কি দেখাচ্ছ আমাকে? ওখানে কি?
- আরে সামনে দেখ! একটু রাগ হল যেন আমার! কি রে বাবা দেখতে পাচ্ছেনা? এতক্ষণ আমি কি ঘাস ছিঁড়ছিলাম নাকি?
- কোথায়? কি দেখব? বউ তো হতবাক! বুঝতে পারছে না!
- আরে কানা নাকি? এবার সত্যি রেগে চেঁচিয়ে উঠলাম! সামনে......বলতে বলতে থম মেরে গেলাম! চোখ ততক্ষণে চলে গিয়েছে হোর্ডিং এর উপর! আরে! এ কি করে সম্ভব! মেয়েটি কোথায়? এ তো সেই মেয়ে নয়! এ তো......এ তো ঐশ্বর্য রাইয়ের বিশাল পোস্টার! আমার সেই কৃষ্ণকলি গেল কোথায়?? সেই কামার্ত চাহনি..!! আমার মাথার ভিতর টা মূহুর্তে ফাঁকা হয়ে গেল! মাথা ঘোরা আরম্ভ হল! বউ আরেকটু ঘন হয়ে এল আমার কাছে!
- কি হল? রাত দুপুরে অভিনেত্রী র প্রেমে পড়েছ বুঝি?
- কি যাতা বলছ? অভিনেত্রী কই? এ ত সেই মেয়ে নয়!!
- কোন মেয়ের কথা বলছ তুমি? এখানে তো আর কেউ নেই!
- এবার সত্যি সারা শরীর হিম হতে থাকে আমার! কাকে দেখলাম আমি? সারারাত ধরে ওতে আমাতে এক অপার্থিব লুকোচুরি খেলা! সবই কি ভুল! মোহ??!
বউ একরকম জোর করেই আমাকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে আসে!
- স্লিপিং পিল টা মনে করে খেয়েছিলে?
- না! অপরাধী র মত বললাম!
- এই হয়েছে জ্বালা! আমি খাইয়ে দেব তবে বাবু খাবেন! দাঁড়াও এনে দিচ্ছি! বউ পাশের ঘরে চলে গেল ওষুধ আনতে! আমার মাথায় একগাদা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তখন! এই কৃষ্ণকলি কে? আমি যেন তাকে কোথায় দেখেছি? অফিসে? রাস্তায়? হোটেলে? শপিং মলে? কোথায়......কোথায়??? রাত্রির নির্জনতার মধ্যে সেই ভাবনাতরঙ্গ গুলো মিলিয়ে যেতে থাকল! আমি ভুলতে চাই ওকে! কিন্তু কি করে??! নেশার মতন আমার রক্তে মিশে যাচ্ছে সে!!
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম বলতে পারব না! ঘুম ভাঙতে দেখলাম গোটা ঘরে সূর্যের আলো খেলে বেড়াচ্ছে! খাটে আমার মেয়ে স্কুল ড্রেসে তৈরি হচ্ছে! বাস আসবে সাতটায়! বউ একটু ম্লান হেসে বলল
- এখন কেমন বোধ করছ? যেতে পারবে আজ অফিসে!?
- যেতে হবেই মুনিয়া! না হলে বস ফায়ার হয়ে যাবে!
আইটি সেক্টরের অফিসগুলোতে এমনিতেই ছুটি কম দেয়! খুব কাজের চাপ! আমাদের কোম্পানি র নেক্সট ফোর্থকামিং ইনভেস্টমেন্ট এর ব্লুপ্রিন্ট আমার কাছে! আজ অফিসে গিয়ে পেনড্রাইভ থেকে কম্পিউটারে লোড করে তবে শান্তি! তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম! আজ আর গাড়ি নিলাম না! ড্রাইভ করতে পারব না! মাথাটা ভার হয়ে আছে! কিন্তু সে কথা বউকে বলা যাবে না! গোপনে পলাশ কে ফোন করে বলে দিলাম বাইক নিয়ে আসতে! পলাশ স্কুল মাস্টারি করে! শুনে অবাক হলনা! আমাদের দুই বন্ধুর মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া! জানিয়ে দিল পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে আসছে!
সারাটা রাস্তা বেশ গম্ভীর ছিলাম! পলাশ দু একবার আমাকে ডেকে সাড়া না পেয়ে নিজেও চুপ করে যায়! একটা ডিভাইডারের কাছে আসতেই বাইকের স্পিড টা একটু কমে যায়! আচমকা পিছনের সওয়ারির আসন থেকে পলাশ কে জিজ্ঞাসা করি- আচ্ছা! তুই প্রেম করিস?? করেছিস কখনো??!
আচমকা এহেন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলনা আমার বন্ধুবর! বাইক টা আচমকা ঝাঁকুনি মেরেই থেমে যায় রাস্তার পাশে! আর ঠিক তখনই পাশ দিয়ে বেগে বেরিয়ে যায় ড্রাইভারের খিস্তি সমেত! আরেকটু হলেই দুজনেরই ভবলীলা সাঙ্গ হচ্ছিল! পলাশ আমার দিকে বারুদের স্তুপের মত মুখ নিয়ে তাকাল! আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম না আসলে তোকে প্রেম করতে দেখিনি তো তাই!.....
- সেটা কি তোকে এখানেই জিজ্ঞাসা করতে হল অরি?? তোর কি হয়েছে বলত?
- কি হবে কিছু না!! বল না প্রেম করেছিস??
- পরে সময় করে বলব খন! এখন তোর অফিস আর আমার স্কুল দুজনেরই কামাই হয়ে যাবে!
- চল তাহলে!
কথা না বাড়িয়ে পলাশ বাইকটা স্টার্ট দিল! কিন্তু মনের কোণে একটা সন্দেহের কাঁটা খচখচ করতেই লাগল! কিছু কি লুকাল পলাশ???!.......কি লুকাচ্ছে আমার কাছে!
সেদিন অফিসে খুব ব্যাস্ততার মধ্যে কাটল!
অফিসের মেইন কম্পিউটারে ডাটা আপলোড করে বসকে সমস্ত প্রজেক্ট টা বুঝিয়ে দিতেই তাঁর চোখ মুখ উৎসাহে উজ্বল হয়ে উঠল! উৎসাহে আমার পিঠ চাপড়ে বলেই দিলেন ওয়েল ডান মাই বয়! এতে সবাই যে খুশি হয়েছিল এমন নয়! কয়েকজন আবার বদন ব্যাদান করে দাঁড়িয়েছিল! ভাবছিল হয়ত এই মাকাল টা কিভাবে বসের বিশ্বাস্য হয়ে উঠল এ কদিনে!! কিন্তু আমার শরীর আর চলছেনা! টলতে টলতে ক্যান্টিনের দিকে পা বাড়ালাম! আজ সারাদিনে মনের কোণায় বেশ কয়েকবার আগের রাতে দেখা ওই রহস্যময়ী উঁকি মেরে গেছে! তার থেকে অবাক লাগছিল পলাশের ওই অদ্ভুত আচরণ! কি লুকাল আমার কাছ থেকে?? এইসব আকাশপাতাল ভাবছি এমন সময় চিন্তার জাল কেটে যায় তু মেরি প্রেম কি ভাষা গানের টোনে! আমার মোবাইলের রিংটোন! জব্বর একখানা গানই না গেয়েছিলেন শানু দা!! নম্বর টা দেখলাম মুনিয়া পাগলি নাম দেখাচ্ছে! ভালবেসে নাম সেভ করে রেখেছি! এ কেমন ভালবাসা কে জানে? ফোন টা তুলতেই ওপাশ থেকে খিস্তি সমেত পুরুষ কন্ঠ ভেসে এল- উল্লুক! আসবি কখন! বোউদির সাথে গল্প করে করে হেজিয়ে গেলাম! সেই কোন সকালে এসেছি তোর ফ্ল্যাটে!
সর্বনাশ! রমেন আর সঞ্জু হাজির হয়েছে! আমার বিখ্যাত বন্ধু গুলোর মধ্যে অন্যতম! মদ গাঁজা সিগারেট সবেতেই সিদ্ধহস্ত! কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! আমার বউকে অসম্ভব নিজের দিদির মত শ্রদ্ধা করে! প্রতিবছর আমার এখানে এসে ভাইফোঁটা ও নিয়ে যায়! খেয়াল করি ফোঁটা দেওয়ার সময় বউ এর চোখের কোণে জল চিকচিক করে! বুঝি শালার জন্য ওর মন কেমন করে! শালা এত ব্যস্ত যে সময় ই পায়না দিদির কাছে আসার! শালা আর বলে কাকে!
- কি রে বো@##% মেয়ে দেখছিস নাকি? ফোন হাতে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব? আসব নাকি তোকে তুলে নিয়ে যাব?
- আচমকা সম্বিৎ ফিরেই তোতলাতে থাকি
- না....হ্যা.....ইয়ে আসছি!
- এ মাল সিওর জালে পড়েছে! মেয়ে দেখছে বোউদি গো! পাশ থেকে সঞ্জুর গলা পেলাম! পিত্তি জ্বলে গেল! বললাম
- রমু ওই রামছাগল টা কে বল চুপ করতে! ও কি বোঝেরে আমাদের অফিসের চাপ কত?
- আহা! রাগ করিস কেন ভাই! আয়! দরকারি কথা আছে!
- রমেনের নরম গলাতেই হোক আর মনটাকে রিল্যাক্সড দেবার জন্যই হোক বাড়ির একটা টান অনুভব করলাম! তড়িঘড়ি বসকে সেকথা বলতেই বস পারমিশন দিয়ে দিলেন! ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে অফিসের সামনে থেকে বাসে উঠেই জানলার ধারে সিট পেয়ে গেলাম! আজ ভাগ্যদেবতা খুব প্রসন্ন মনে হচ্ছে! মনে পড়ল পলাশকে একটা ফোন করে দিই! আমি পলাশ রমেন সঞ্জু এরা হরিহর বন্ধু! ছোট থেকে একসাথে বেড়ে উঠেছি! পলাশ ওরা এসেছে জানলে খুব খুশি হবে! ফোনটা বেজেই যাচ্ছে! ধরে আর না! দ্বিতীয় বার চেষ্টা লাগালাম! চোখদুটি বাইরের প্রকৃতির দিকে মেলে দিয়ে দেখেছিলাম! আচমকা ঘটল সেই ঘটনাটি যেটার জন্য কোনমতেই প্রস্তুত ছিলাম না আমি! বাসটা একটা স্টপেজে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ! রাস্তার ধারে ইতিউতি তাকাতেই নজরে এল বিশাল হোর্ডিং আর তাতে গত রাতের সেই গয়না পড়া মোহিনী একদৃষ্টে লোলুপ ভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে! ঠোঁটের বাঁদিকের কষ বেয়ে রক্তের একটা ক্ষীণ রক্তের ধারা! আমার সামনে গোটা পৃথিবী যেন দুলে উঠল! আবছা দেখতে পেলাম কন্ডাকটর তাড়াতাড়ি ছুটে আসছে আমাকে ধরার জন্য! ফোনটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে বাসের সিটের তলায় ঢুকে যাওয়ার আগে অস্পষ্ট পলাশের হ্যালো হ্যালো আওয়াজ শুনতে পেলাম! ব্যাস! তারপর আরকিছু মনে নেই!!........
কতক্ষণ এভাবে ছিলাম বলতে পারব না! জ্ঞান হতেই দেখি নিজের চিরচেনা দুধসাদা নরম বিছানার উপর শুয়ে আছি! আর আমাকে ঘিরে কয়েকজোড়া উৎসুক চোখের মেলা! তার মধ্যে একজোড়া চোখ আবার কেঁদে লাল করে ফেলেছে! উঠে বসতেই টের পেলাম মাথার পিছনে অসহ্য যন্ত্রণা! পলাশ হাঁ হাঁ করে উঠেই আমাকে ধরে আবার শুইয়ে দিল....!
- উঠিস না! শুয়ে থাক! কন্ডাকটর ছেলেটি খুব ভাল মানুষ! আমাকে তোর ফোন থেকে বাসের প্রপার লোকেশন জানাতেই আমি দশ মিনটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাজির হয়ে যাই!
- কি হয়েছিল তোমার গুরু??! বাসে কোন মেয়ে টেয়ে দেখে কি......
- থামবি সঞ্জু!! পলাশ গর্জন করে ওঠে! এই বিপদের দিনেও ছ্যাবলামো অন্তত বন্ধ রাখ!
সঞ্জুও কি একটা বলতে যাচ্ছিল রমেনের চাঁটি খেয়ে কেমন যেন ভেপসে গেল!
- মেয়ে??!......হ্যাঁ.....ওই মেয়েটাই..... সবসময় আমাকে টানছে??!
- তিনজনে আরেকটু ঘন হয়ে এল আমার কাছে! পলাশ কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল - কোন মেয়েটা অরি? খুলে বল আমাদের! বুঝতে পারছি তোর খুব বিপদ আসছে!
- আমি চমকে তাকালাম পলাশের মুখের দিকে! উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট!
- কি গো! এখন কেমন বোধ করছ?? তোমার কি হয়েছে বলোতো? বলতে বলতে মুনিয়ার গলাটা একটু ধরে এল!
রমেন মাঝখান থেকে আচমকা ফোড়ন কাটল- এই যে মিয়া বিবির প্রেমটেম এখন চলবেনা! তেলেভাজা গুলো নিয়ে এসেছি কখন! জুড়িয়ে গেল ওগুলো! বউদি ওগুলো একটু গরম করে নিয়ে এসোনা! খুব খিদে পেয়েছে! অরি টা মাঝে মাঝে এমন কান্ড বাধায় খিদে তেষ্টা সব ভুলে যেতে হয় মাইরি!
- এ বাবা! তোমরা বসো আমি এখুনি খাবার গরম করে আনছি! বউটা মনে হল একটু লজ্জা পেয়ে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে! তা ভাল! মেয়ে মানুষের একটু লজ্জা শরম থাকা ভাল! আচমকা কোথা থেকে একটা রহস্যময়ী এসে আমার জীবন ছারখার করে দিচ্ছে! হ্যালুসিনেশন কিনা তাও বুঝতে পারছিনা!
- কিরে কি ভাবছিস অরি? পলাশ জানলার দিক থেকে প্রশ্ন টা ছুঁড়ে দিল! একটা কথা বলব?
- হ্যা বল না?
- সকালের আচরণে কিছু মনে করিস না! আসলে মেন্টালি একটু আপসেট ছিলাম! ভাবছি কদিন একটু ছুটি নেব! যাবি এ কদিনের জন্য?? ঘুরে আসবি কোথাও??
তোর উপরেও যা প্রেসার পড়ছে! রিল্যাক্স পাবি! যাবি??
- কোথায়??
- আরে তোরা আউটিং এর প্ল্যান আমার উপর ছেড়ে দে! একটা খাসা জায়গা আছে তোদের জন্য! সঞ্জু কথা শেষ করতে দেয় না!
পলাশ আর রমেন চুপ করে থাকে! কারণ এই ব্যাপারে তাদের থেকে সঞ্জুর এলেম অনেক বেশি!
অগত্যা আমি জিজ্ঞাসা করলাম সঞ্জুকে
- জায়গাটা কোথায়?
-বাঁকিপুট! নাম শুনেছিস??
নামটা শুনে আমি আর রমেন একটু নাক কুঁচকালাম! নামটা কিরকম যেন!! শুধু পলাশই একটু মিটি মিটি হাসতে লাগল! আমি আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম- কিরে পলাশ তুই চিনিস নাকি??
- না চেনার কি আছে? গেল বারই তো জুনপুট ঘুরে আসলাম! ওর কাছেই! দীঘাতে!
- হতভাগা! আমায় না নিয়ে চলে গেলি??
- আরে দূর! বউ আর শালি ছিল সাথে!
- ওহ তাই বল! বউ শালি নিয়ে একাএকা স্ফূর্তি করতে গিয়ে আমাদের কথা কেন মাথায় থাকবে তোর?? এতক্ষণ পরে রমেন মুখ খোলে!
এরই মধ্যে খাবার দাবার আর চায়ের রেকাবিটা নিয়ে বউ খাটের পাশের টেবিলে রেখে আমার পাশে বসে পড়ে! মাথায় আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে বলে -যাওনা! ঘুরে আসো!! ভাল লাগবে! আমিও এ কদিন একটু মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি ঘুরে আসি! কতদিন তো যাওয়াই হয়নি!
- হ্যাঁ বৌদি! যাও যাও ঘুরে আস! একে আমরাই ম্যানেজ করে নেব! সঞ্জুর গলায় তখন উৎসাহ ঝরে পড়ছে! যাইহোক এপক্ষ ওপক্ষ আলোচনা শেষে একটা শনিবার দেখে যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করা হল! আগের দিনই বউ মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছে! মেয়ে আবদার করে বলে গেছে সমুদ্র থেকে অনেক ঝিনুক নিয়ে আসতে!
অগত্যা চারমূর্তিতে পিঠে বিশাল ব্যাগ নিয়ে কোলকাতা থেকে কাঁথিগামী বাসে চেপে বসলাম! সঞ্জু আগে থেকে ফোন করে সব ঠিকঠাক করে রেখেছে! কাঁথি বাসস্টপেজ এ নেমে ওখান গাড়িভাড়া করে জুনপুট বাঘাপুট হয়ে তবে বাঁকিপুট পৌঁছানো যাবে! তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টার ব্যাপার!ওখানে ঝিনুক রেসিডেন্সি হোটেলের মালিক আবার সঞ্জুর বাবার বন্ধু!! অল্প টাকায় দুটো বড় এসি রুম ভদ্রলোক বিনাদ্বিধায় বুক করে দিয়েছেন! এসি বাসে বসে আছি! সবে মাত্র ঝিমুনি টা এসেছে এমন সময় পলাশই প্রথম প্রশ্নটা করে বসল
- অরি! কি দেখেছিলি আমাকে একটু পরিষ্কার করে বলত? আমরা শুনব সবাই!
আমি পলাশ কে আনুপূর্বিক সব কথা খুলে বললাম! শুনে পলাশ একটু গুম হয়ে গেল! বাকিদের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব একটা ভরসা পেলাম না! রমেন আর সঞ্জুর মুখেও কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনার আঁচ টের পেলাম! তাহলে তারা কি ওই মেয়েটিকে চেনে নাকি?? মনে হতেই বুকটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠল!
অনেকক্ষণ কেটে গিয়েছে! বাস ততক্ষণে পূর্ব মেদিনীপুর সীমানায় প্রবেশ করেছে!
- কি ব্যাপার পলাশ?? মেয়েটাকে তোরা চিনিস নাকি??
- কোন মেয়েটা?? ওহ ওই টা!! নাহ! তোর যত আজগুবি মনের কল্পনা!
- কিন্তু কিন্তু আমি তো.....সঞ্জু কথা শেষ করতে পারেনা! রমেন সঞ্জুর ঘাড় সমেত মাথা টা বগলের তলায় চেপে ধরে এক ধমক লাগাল!
- চুপ! খালি বক বক!
- এই রমেন সঞ্জুকে ছাড়! সঞ্জু তুই বল!
- না.....মানে.....আগে কখনো দেখিনি তো!
- আরে ছাড় না সঞ্জুকে! খালি ইয়ার্কি মারে! দেখ বাস আর কতদূর এলো! পলাশ বলে উঠল!
অবশেষে কাঁথি বাস স্টপেজে বাস যখন এসে থামল ঘড়ির কাঁটা তিনটে ছুঁই ছুঁই! একটু দূরে একটা বোলেরো দাঁড়িয়েছিল! কিন্তু পেটে তখন আগুন জ্বলছে! ওদের সেকথা জানাতেই ওরা একবাক্যে রাজি হয়ে গেল! স্থানীয় একটা হোটেলে ঢুকে একটা টেবিল দখল করে মাংস ভাতের অর্ডার করলাম! খেতে খেতে লক্ষ্য করলাম তিনজনের মুখই বেশ গম্ভীর! এবং সেটা বাসে ওই রহস্যময়ীর প্রসংগ ওঠানোর পর থেকেই খেয়াল করছি! তাহলে কি ওরা সেই মেয়েটিকে চেনে??? তাহলে মেয়েটি আমাকেই শুধু বারবার দেখা দিচ্ছে কেন??ওদের কাছেই বা দেখা দিচ্ছেনা কেন?
যাইহোক খাওয়া দাওয়া শেষে বিলটা মেটাতে যাচ্ছি পলাশ আমার হাতটা চেপে ধরল! বলে
- গাড়িতে গিয়ে বোস! লাগেজের দিকে নজর রাখ! আমরা একটু আসছি!
- কোথায় যাবি?
- আসছি একটু! গাড়িতে গিয়ে বোসনা!!
অগত্যা গাড়িতে গিয়ে তুম্বো মুখে ড্রাইভারের পাশের সিট টায় বসলাম! ড্রাইভার ছেলেটি বয়েসে তরুণ! হিন্দীতে কথা বলে! জিজ্ঞাসা করে- ভাইয়া আপ কলকাত্তা সে আয়ে হো?
- হাঁ ভাই কিউ? একটু অবাক হলাম!
- ইয়ে দাদাবাবু লোগো কে সাথ হমারা বহোত জানা পেহেচানা হ্যায়!!
- কেয়সে? কিছু বুঝতে না পেরে বোকার মত জিজ্ঞাসা করলাম!
- পিছলে সাল তো বোহি লোগো নে আয়া থা ইহা মেরে গাড়ি পে!!
- গত বছর এসেছিল! ওরা???! কই আমি তো কিছু জানিনা??
- শায়দ আপকো বতায়া নেহি হোগা??
- পতা নেহি! বলে অস্বস্তিকর আবহাওয়া থেকে মুক্তি পাবার জন্য গাড়ির উইন্ডো টা নামিয়ে দিলাম! ছোকরাটাকে বললাম এসি টা বন্ধ করে দিতে! অনেকক্ষণ হয়ে গেল ওরা এখনো এলনা! কি করছে ওরা এতক্ষণ হোটেলে?? ইতিউতি চাইতেই হাইওয়ের ধারে একটা বিশাল অ্যাড ব্যানারে চোখ পড়ল! আর সাথে সাথে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল! এই বুঝি মেয়েটার মুখোমুখি হলাম! কিন্তু না! বাইকের উপর বসে ধোনির স্মিত হাসিটা আমার অর্ধেক টেনশন কমিয়ে দিল! আস্তে আস্তে ব্যানার থেকে চোখ টা সরিয়ে নিয়ে হোর্ডিংটা র নীচে বুনো আগাছাটা র দিকে তাকাতেই রক্ত হিম হয়ে গেল! সেই মেয়েটি!! পরনে কালো শাড়ি! অনেক জায়গায় ছেঁড়া! মেয়েটির সর্বাঙ্গে ক্ষত! দুই চোখে কেমন যেন জিঘাংসার চাউনি! একটা তর্জনী সিধা তুলে দাঁড়িয়ে আছে হোটেলের দিকে যেখানে একটু আগে খাওয়া দাওয়া ছাড়লাম! মনে পড়ল ওরা তিনজন তো ওখানেই আছে! হিম হয়ে গেল শরীর! একটা অজানা বিপদের আশংকা করে দৌড়ালাম হোটেলের দিকে! ম্যানেজারের ঘরের দিকে এগোতেই একটা ফিসফিসে কণ্ঠস্বর ভেসে এল-
- ওই কথাই রইল তাহলে পুরো কুড়ি হাজার আছে! বাকি চল্লিশ কাজের পরে পেয়ে যাবে!
- হেঁ হেঁ....কি যে বলেন না! আপনারা আরাম সে এখানে যতদিন খুশি কাটিয়ে যান! কেউ কিছু জানবে না!
দরজা খুলে ওরা তিনজন বেরোতেই আমাকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠল! পলাশ জিজ্ঞাসা করল- কি রে! তুই এখানে?
- ওই মেয়েটা!! আবার....!!! রাস্তার পাশে!!....সারা শরীরে রক্ত!
রমেন বলে উঠল - তাড়াতাড়ি চল! দেখি কি ব্যাপার! চারজনে উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়ে আগের জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম! কোথাও কিছু পেলাম না! মেয়েটা যেন কর্পূরের মত উবে গিয়েছে বাতাসে! ড্রাইভার ছোকরাটাও কিছু জানান দিতে পারল না! দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে আমরা চারজনেই গাড়িতেই উঠলাম! জুনপুট বাঘাপুট হয়ে গাড়িটা বাঁকিপুট পৌছাবে! যত গন্তব্যস্থলের কাছাকাছি যেতে লাগলাম সমুদ্রের নয়নাভিরাম দৃশ্য সাথে বালির ও সবুজ গুল্মের মাখামাখি মন থেকে দুঃস্বপ্ন গুলোকে আস্তে আস্তে মুছে দিতে লাগল! বাঘাপুট পেরিয়ে ডানদিকের রাস্তা টা ধরতেই বাঁকিপুটের সীমানা শুরু হল! এখানেও প্রসারিত সমুদ্র! একটা জায়গায় দেখলাম সমুদ্র সংলগ্ন বালির বেশ কিছুটা অংশ লাল হয়ে আছে! ড্রাইভার জানাল ওগুলো লাল কাঁকড়া! দূর থেকে লাল কার্পেটের মত দেখতে লাগছে! প্রকৃতির কি অপরূপ সৃষ্টি!
যখন ঝিনুক রেসিডেন্সি পৌছালাম বিকেল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে! একটু দূরেই সমুদ্র গর্জন ভেসে আসছে! একটা অদম্য আকর্ষণ অনুভব করলাম! সেটা পলাশ কে জানাতেই সে বলল- এখন নয়! একটু পরে যাব! এখন নয়! একটু শরীরটা কে রেস্ট দে অরি! পরে যাব খন!
হোটেল মালিক কে আগে থেকেই বলা ছিল! উনি আমাদের জন্য আগে থেকেই বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন! ভদ্রলোক খুব অমায়িক! গল্পে গল্পে কখন যে সময় কেটে গেল টেরই পেলাম না!আচমকা মনে পড়ল সমুদ্রটা তো কাছ থেকে দেখাই হলো না! হোটেল মালিককে সে কথা বলতেই তিনি স্মিত হেসে সায় দিলেন....বলেন- যান না! ঘুরে আসুন! ভাল লাগবে! আপনাদের রাতের খাবারের বন্দোবস্ত টাও করে রাখি! ফিরে এলে গল্প গুজব করা যাবে খন!
আমি আড় চোখে একবার পলাশ আরেকবার রমেন সঞ্জুর দিকে তাকিয়ে বললাম কিরে যাবি তো?
- পলাশ সম্মতি জানাল! বলল চল ঘুরেই আসি!
চারজনে মিলে বালিয়াড়ি তে ঘুরতে বেরোলাম! সামনে দিগন্ত প্রসারিত সমুদ্র যেন হাত বাড়িয়ে আমাদের ডাকছে! ঢেউ গুলো জ্বলন্ত নীলাভ আলো মাথায় নিয়ে পাড়ে এসে মিলিয়ে যাচ্ছে! দূরে ভাসমান নৌকাগুলোর টিমটিম আলোগুলোকে অলৌকিক বিন্দুর মত মনে হচ্ছে! এই নক্ষত্রখচিত আকাশের নীচে প্রাকৃতিক লীলা দেখতে দেখতে কেমন যেন কান্না পেয়ে গেল! বুক ফেটে যেন কান্না বেরোতে চাইল! এ তুমি কিসের সাজা দিচ্ছ ভগবান! আমার শান্তির ঘুম তুমি কেড়ে নিয়েছ! মনের শান্তি কেড়েছ! আর কি বাকি রেখেছ?? আমাকে নিয়ে নাও তুমি! পরক্ষণেই মনে পড়ল সমুদ্র কিছু নেয়না! সবই ফিরিয়ে দেয়.....! ধপ করে বালির উপর বসে পড়ি! একটু তফাতে ওরা তিনজন ও বসে পড়ে! তিনজনেরই চোখ স্থির সমুদ্রের দিকে! কেউ কোন কথা বলছেনা! অনেকক্ষণ পরে আমিই নীরবতা ভাঙি!
- মেয়েটাকে পলাশ! বারবার আমাকে দেখা দিচ্ছে.....তোরা কেউ দেখছিস না.....আমি......বার বার আমি....কেন???কেন...????
- ও তোর মনের ভুল অরি! রমেন বলে উঠতেই হঠাৎ আমার মধ্যে কি ভর করল যেন! নিমেষে উঠে গিয়েই রমেন কে বালির মধ্যে ফেলে দিয়ে বুকে হাঁটু দিয়ে চেপে কলার চেপে হিস হিস করে বলে উঠলাম- চুপ শুয়োরের বাচ্চা! একদম চুপ! কিছু বুঝি না আমি তাই না!জানোয়ারের দল! ওই হোটেলের মালিক কে টাকা খাওয়ালি কেন?? বল??
- অরি রমেন কে ছেড়ে দে! আমার পাশে এসে বস! পলাশ শান্ত গলায় কথাগুলো বলে সমুদ্রের দিকে ফিরে বসল! আমি টলতে টলতে পলাশের পাশে এসে বসে পড়লাম! ওদিকে রমেন গলায় হাত দিয়ে খক খক করে কেশেই যাচ্ছে! সঞ্জু এক সাইডে ভয়ে গুটিসুটি মেরে গেছে! আমার এ রূপ সে কোনোদিন দেখেনি! আচমকা টের পেলাম মাথার পিছনে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে! কিরকম যেন গা গুলাচ্ছে! তার মধ্যেই যেন পলাশের মন্ত্রধ্বনির মত গলা শুনলাম
- অরি আমরা তোর খুব ভাল বন্ধু বিশ্বাস কর! এই পাপের মধ্যে তোকে জড়াতে চাইনি! কিন্তু আজ তোকে বলে দিয়ে যাব! আমাদের হাতে একদম সময় নেই! তোকে একটা মিথ্যা কথা বলে ফেলেছি আমরা অরি! আমরা গত বছর এখানেই ঘুরতে এসেছিলাম! তবে এখানে এই হোটেলে ঠিক নয়! সঞ্জুর মাসতুতো দাদার বাগানবাড়িতে উঠেছিলাম!
আড় চোখে তাকিয়ে দেখি সঞ্জু দুই পায়ের হাঁটুর মধ্যে মাথাটা ঢুকিয়ে একদম চুপ হয়ে গেছে! রমেন ও সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থম মেরে গেছে! সমুদ্র গর্জনে চারদিক খানখান হয়ে যাচ্ছে! পলাশ বলে চলল-
সেদিন রাতে আমরা তিনজনেই মদে চুর হয়েছিলাম! মদ আমি খেতাম না বিশ্বাস কর অরি! এদের পাল্লায় পড়ে এত বড় ভুল আমি করে ফেলব ধারণাতেও আনিনি! এরকমই ছিল সেদিনের সমুদ্র! নক্ষত্রখচিত আকাশ! আমরা বালির চড়ায় বসে একের পর এক বোতল সমাধা করে চলেছি হুঁশ নেই আমার! আচমকা রমেন আমাকে ঠেলা মারে! প্রথমটা বুঝিনি! দ্বিতীয় বার ঠেলা মারতেই নজরে এল ব্যাপারটা! একটু দূরে বালিয়াড়ি র যেখানে ঝাউবনের শুরু হয়েছে সেখানে একটা মেয়ে চুপচাপ বসে আছে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে! উন্নত গ্রীবা! সুডৌল শরীর... উজ্জ্বল চাপা গায়ের রঙ! আমি চোখ সরিয়ে নিলাম! পাপবোধ লাগল মনে! মাথা ঝিম ঝিম করছে! সঞ্জু.....হ্যা এই সঞ্জুই পাশ থেকে বলেছিল হয়ে যাক বস!....এই সুযোগ আর পাবি না! আমি জোরে একটা থাপ্পড় লাগিয়েছিলাম তার গালে! এই রমেন টা আমার মাথার পিছনে বোতল দিয়ে মারে!........হ্যাঁ রমেন! বেহুঁশ হয়ে যাই কিছুক্ষণের জন্য! জ্ঞান ফিরলে দেখি বালির মধ্যে জানোয়ার দুটো মেয়েটাকে চেপে ধরে ভোগ করে চলেছে! মেয়েটার আর্তচিৎকার আমার কান ফাটিয়ে দিচ্ছে! পাগলের মত দৌড়ালাম! দুজনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলাম! দেখলাম কৃষ্ণকলি চিরকালের মত নিথর হয়ে গিয়েছে! ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটা ক্ষীণ রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ছে! নিম্নাঙ্গ পুরো......উহ! মাগো.....
পলাশ আর বলতে পারে না! বমি করতে শুরু করে পাশের ঝোপে! আমার মাথা আস্তে আস্তে শূন্য হতে শুরু করে দিয়েছে! আচমকা দপ করে মাথাটা জ্বলে ওঠে! প্রতি ভাইফোঁটায় জানোয়ার দুটোকে আমার বউ ফোঁটা দিয়ে এসেছে নিজের ভাই মনে করে! চোখ দিয়ে আগুন ঝরতে লাগল! পশুর মত সর্ব শক্তি দিয়ে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমি! কি যেন ভর করেছে আমার উপর! তারা সর্বশক্তি দিয়েও আমাকে প্রতিরোধ করতে পারছেনা! পলাশ পিছন থেকে বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর - অরি ছেড়ে দে ওদের ছেড়ে দে! তোর পায়ে পড়ি! হাতের বাঁধন কিকরে জানি আলগা হয়ে গেল! ওরা ছাড়া পেয়েই উন্মুক্ত সমুদ্রের দিকে ধাবমান হল! কিন্তু কিছুদূর গিয়েই থমকে দাঁড়াল তারা! সমুদ্রর মাঝখান থেকে উঠে আসছে এক নারীশরীর! আমি স্পষ্ট দেখলুম তাকে! হোর্ডিং এ দেখা সেই কৃষ্ণকলি! চোখে সেই কামনামদিরতার কোন ছাপ নেই! শিকার খুঁজে চলেছে পৈশাচিক ভঙ্গিতে! সম্বিৎ ফিরে পেলাম! ওদের পুলিশে শাস্তি দিক! এভাবে ভ্রাতৃসম বন্ধু দুটোকে চোখের সামনে বিসর্জন হতে দেখব? পলাশের বাহুপাশ থেকে নিজেকে আপ্রাণ সারানোর চেষ্টা করলাম! পারলাম না!! চোখের সামনে দেখলাম সেই নারীমূর্তি দুজনের গলা ধরে জলের অতলে তলিয়ে গেল!
- লাশটা কে গুম করার জন্য আমিই কাঁথির হোটেল মালিক কে টাকা দিই! ভাল থাকিস অরি! তুই ই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আছিস...ছিলি....থাকবিও!
পলাশের কথাগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম সে উদভ্রান্তের মত দৌড়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল! নির্জন বালিয়াড়িতে আমি একা! অসহায়ের মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম সমুদ্রের দিকে! ঢেউগুলো একের পর এক আমার বুকের পাঁজরের মত তীরে এসে ভেঙে পড়তে লাগল!
সমুদ্র কিছুই নেয় না! যা গ্রহণ করে তাই ফিরিয়ে দেয়! পরদিন সকালে বাঁকিপুটের প্রাতঃভ্রমণ কারীরা তিনটে মৃতদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয় থানায় খবর দেয়! আর আমি অ্যাসাইলামে ভর্তি আছি! মাঝে মাঝে স্মৃতি কাজ করে.....বেশিরভাগ সময়েই অন্ধকারে ডুবে থাকি!......যেখানে টেবিলের মুখোমুখি দুটি মুখ.....আমি আর কৃষ্ণকলি!!
সমাপ্ত
যাতে মেয়ের ঠান্ডাটা না লাগে! গোটা ফ্ল্যাট টা ঘুমে মগ্ন! কোথা থেকে এক অলস টিকটিকি একমনে টিক টিক আওয়াজ করে যাচ্ছে! আস্তে আস্তে ব্যালকনির দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম! গোটা মহানগরী পরম নিশ্চিন্তে কেমন ঘুমাচ্ছে! যেন ঘুমন্ত দানবী! প্রথম সূর্যের কিরণের জন্য যেন নিঃশব্দে অপেক্ষারত! নিচে নিয়ন আলো গুলো একা একা নিঃসঙ্গ জ্বলছে! এক পথঘোরা ভবঘুরে সারমেয় লেজ পাকিয়ে বালির ঢিপিটার উপর নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে! ঘুম নেই কেবল আমার চোখে! চোখটা জ্বালা জ্বালা করছে! চারমিনার টা ধরিয়ে চেয়ারে বসে গা টা এলিয়ে দিতেই ব্যাপারটা নজরে এল! বড় রাস্তার ও ধারে একটা নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটের পাশে এক বিশাল গয়নার বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং বসেছে! একটা পরমাসুন্দরী রমণী গায়ে বিভিন্ন অলংকার পরে কামনামদির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে! আসলে হোর্ডিং টার পোজিশন টাই এমনই যে যেদিক থেকেই দেখি মেয়েটির চোখ দুটি যে দেখছে তার চোখেই নিবদ্ধ হবে! আমি গভীর ভাবে চোখ দুটো নিরীক্ষণ করতে লাগলাম! কি সুন্দর টানা দুটো চোখ! সিঁথির মাঝ বরাবর সোনার টিকলি আর কপালটা বেষ্টন করে থাকা টায়রায় মেয়েটিকে অদ্ভুত মোহময়ী লাগছে! অদ্ভুত সুন্দর মরাল গ্রীবা আর হাসিটিকে আরো কামনামদির করে তুলেছে পাতলা ঠোটের কোণে বেরিয়ে থাকা গজদন্ত টি!! হোর্ডিং টার নীচে লাগানো নিয়নের আলো গুলো জ্বলছে আর নিভছে! সাথে মেয়েটিও থেকে থেকে চোখের সামনে থেকে হারিয়ে গিয়েও আবার ধরা দিচ্ছে! রাত্রির এক নিঃসীম সৌন্দর্যের মধ্যে এই রহস্যময়ীর অপার্থিব লুকোচুরি আমাকে ক্রমশ চুম্বকের মতন টানতে লাগল! প্যাকেট খুলে দুই নম্বর সিগারেট টা ধরাতে গিয়ে আচমকা একটা দৃশ্য দেখে ঠোঁট থেকে সিগারেট টা মাটিতে পড়ে গেল! আলো জ্বলা নেভার মধ্যেই লক্ষ করলাম হোর্ডিংটার কৃষ্ণকলি একেবারে সিধা আমার দিকে তাকিয়ে আছে!! চোখে যেন তার কত না বলতে চাওয়া কথা! কামনামদিরতা আরো বেড়েছে যেন! হাসিটাও যেন একটু চওড়া হয়েছে আগে থেকে! সারা শরীর দিয়ে ঘাম বেরোতে লাগল আমার! কে এই রহস্যময়ী?? মুখটা দেখে মনে হচ্ছে তাকে যেন দেখেছি
আগে! কোথায় কি ভাবে? কিছুই মনে পড়ছে না! পরক্ষণেই হোর্ডিংটার দিকে তাকিয়েই চিৎকার করে উঠলাম! কৃষ্ণকলি আমার দিকেই সরু তর্জনী তুলে কি দেখাতে চাইছে! আতংকের একটা চোরা স্রোত বয়ে গেল মেরুদণ্ড বেয়ে! হোর্ডিং এর মেয়েটি জীবন্ত??! আতংকে চিৎকার করে উঠলাম! রাত্রির নিঃস্তব্ধতাকে খান খান করে আমার সে চিৎকার অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল নির্মম ভাবে! বউ দিশাহারা হয়ে দৌড়ে আমাকে জাপটে ধরে! নাহলে পড়েই যেতাম! তখনো ঠকঠক করে কেঁপে চলেছি!
- কি গো! কি হল??! কি হল?? এরকম করছ কেন??
কোন উত্তর দিতে পারলাম না! শুধু বউ এর বুকের ঢিপঢিপানির সাথে পাল্লা দিয়ে কাঁপুনিও বেড়ে চলল! এরকম করে কাটল মিনিট পাঁচ সাত! অবশেষে একটু ধাতস্থ হতে মুখটা তুলে আড় চোখে অভিশপ্ত হোর্ডিংটার দিকে তাকিয়ে অঙ্গুলি নির্দেশ করলাম! বউ অবাক হয়ে শুধাল-
- কি দেখাচ্ছ আমাকে? ওখানে কি?
- আরে সামনে দেখ! একটু রাগ হল যেন আমার! কি রে বাবা দেখতে পাচ্ছেনা? এতক্ষণ আমি কি ঘাস ছিঁড়ছিলাম নাকি?
- কোথায়? কি দেখব? বউ তো হতবাক! বুঝতে পারছে না!
- আরে কানা নাকি? এবার সত্যি রেগে চেঁচিয়ে উঠলাম! সামনে......বলতে বলতে থম মেরে গেলাম! চোখ ততক্ষণে চলে গিয়েছে হোর্ডিং এর উপর! আরে! এ কি করে সম্ভব! মেয়েটি কোথায়? এ তো সেই মেয়ে নয়! এ তো......এ তো ঐশ্বর্য রাইয়ের বিশাল পোস্টার! আমার সেই কৃষ্ণকলি গেল কোথায়?? সেই কামার্ত চাহনি..!! আমার মাথার ভিতর টা মূহুর্তে ফাঁকা হয়ে গেল! মাথা ঘোরা আরম্ভ হল! বউ আরেকটু ঘন হয়ে এল আমার কাছে!
- কি হল? রাত দুপুরে অভিনেত্রী র প্রেমে পড়েছ বুঝি?
- কি যাতা বলছ? অভিনেত্রী কই? এ ত সেই মেয়ে নয়!!
- কোন মেয়ের কথা বলছ তুমি? এখানে তো আর কেউ নেই!
- এবার সত্যি সারা শরীর হিম হতে থাকে আমার! কাকে দেখলাম আমি? সারারাত ধরে ওতে আমাতে এক অপার্থিব লুকোচুরি খেলা! সবই কি ভুল! মোহ??!
বউ একরকম জোর করেই আমাকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে আসে!
- স্লিপিং পিল টা মনে করে খেয়েছিলে?
- না! অপরাধী র মত বললাম!
- এই হয়েছে জ্বালা! আমি খাইয়ে দেব তবে বাবু খাবেন! দাঁড়াও এনে দিচ্ছি! বউ পাশের ঘরে চলে গেল ওষুধ আনতে! আমার মাথায় একগাদা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তখন! এই কৃষ্ণকলি কে? আমি যেন তাকে কোথায় দেখেছি? অফিসে? রাস্তায়? হোটেলে? শপিং মলে? কোথায়......কোথায়??? রাত্রির নির্জনতার মধ্যে সেই ভাবনাতরঙ্গ গুলো মিলিয়ে যেতে থাকল! আমি ভুলতে চাই ওকে! কিন্তু কি করে??! নেশার মতন আমার রক্তে মিশে যাচ্ছে সে!!
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম বলতে পারব না! ঘুম ভাঙতে দেখলাম গোটা ঘরে সূর্যের আলো খেলে বেড়াচ্ছে! খাটে আমার মেয়ে স্কুল ড্রেসে তৈরি হচ্ছে! বাস আসবে সাতটায়! বউ একটু ম্লান হেসে বলল
- এখন কেমন বোধ করছ? যেতে পারবে আজ অফিসে!?
- যেতে হবেই মুনিয়া! না হলে বস ফায়ার হয়ে যাবে!
আইটি সেক্টরের অফিসগুলোতে এমনিতেই ছুটি কম দেয়! খুব কাজের চাপ! আমাদের কোম্পানি র নেক্সট ফোর্থকামিং ইনভেস্টমেন্ট এর ব্লুপ্রিন্ট আমার কাছে! আজ অফিসে গিয়ে পেনড্রাইভ থেকে কম্পিউটারে লোড করে তবে শান্তি! তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম! আজ আর গাড়ি নিলাম না! ড্রাইভ করতে পারব না! মাথাটা ভার হয়ে আছে! কিন্তু সে কথা বউকে বলা যাবে না! গোপনে পলাশ কে ফোন করে বলে দিলাম বাইক নিয়ে আসতে! পলাশ স্কুল মাস্টারি করে! শুনে অবাক হলনা! আমাদের দুই বন্ধুর মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া! জানিয়ে দিল পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে আসছে!
সারাটা রাস্তা বেশ গম্ভীর ছিলাম! পলাশ দু একবার আমাকে ডেকে সাড়া না পেয়ে নিজেও চুপ করে যায়! একটা ডিভাইডারের কাছে আসতেই বাইকের স্পিড টা একটু কমে যায়! আচমকা পিছনের সওয়ারির আসন থেকে পলাশ কে জিজ্ঞাসা করি- আচ্ছা! তুই প্রেম করিস?? করেছিস কখনো??!
আচমকা এহেন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলনা আমার বন্ধুবর! বাইক টা আচমকা ঝাঁকুনি মেরেই থেমে যায় রাস্তার পাশে! আর ঠিক তখনই পাশ দিয়ে বেগে বেরিয়ে যায় ড্রাইভারের খিস্তি সমেত! আরেকটু হলেই দুজনেরই ভবলীলা সাঙ্গ হচ্ছিল! পলাশ আমার দিকে বারুদের স্তুপের মত মুখ নিয়ে তাকাল! আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম না আসলে তোকে প্রেম করতে দেখিনি তো তাই!.....
- সেটা কি তোকে এখানেই জিজ্ঞাসা করতে হল অরি?? তোর কি হয়েছে বলত?
- কি হবে কিছু না!! বল না প্রেম করেছিস??
- পরে সময় করে বলব খন! এখন তোর অফিস আর আমার স্কুল দুজনেরই কামাই হয়ে যাবে!
- চল তাহলে!
কথা না বাড়িয়ে পলাশ বাইকটা স্টার্ট দিল! কিন্তু মনের কোণে একটা সন্দেহের কাঁটা খচখচ করতেই লাগল! কিছু কি লুকাল পলাশ???!.......কি লুকাচ্ছে আমার কাছে!
সেদিন অফিসে খুব ব্যাস্ততার মধ্যে কাটল!
অফিসের মেইন কম্পিউটারে ডাটা আপলোড করে বসকে সমস্ত প্রজেক্ট টা বুঝিয়ে দিতেই তাঁর চোখ মুখ উৎসাহে উজ্বল হয়ে উঠল! উৎসাহে আমার পিঠ চাপড়ে বলেই দিলেন ওয়েল ডান মাই বয়! এতে সবাই যে খুশি হয়েছিল এমন নয়! কয়েকজন আবার বদন ব্যাদান করে দাঁড়িয়েছিল! ভাবছিল হয়ত এই মাকাল টা কিভাবে বসের বিশ্বাস্য হয়ে উঠল এ কদিনে!! কিন্তু আমার শরীর আর চলছেনা! টলতে টলতে ক্যান্টিনের দিকে পা বাড়ালাম! আজ সারাদিনে মনের কোণায় বেশ কয়েকবার আগের রাতে দেখা ওই রহস্যময়ী উঁকি মেরে গেছে! তার থেকে অবাক লাগছিল পলাশের ওই অদ্ভুত আচরণ! কি লুকাল আমার কাছ থেকে?? এইসব আকাশপাতাল ভাবছি এমন সময় চিন্তার জাল কেটে যায় তু মেরি প্রেম কি ভাষা গানের টোনে! আমার মোবাইলের রিংটোন! জব্বর একখানা গানই না গেয়েছিলেন শানু দা!! নম্বর টা দেখলাম মুনিয়া পাগলি নাম দেখাচ্ছে! ভালবেসে নাম সেভ করে রেখেছি! এ কেমন ভালবাসা কে জানে? ফোন টা তুলতেই ওপাশ থেকে খিস্তি সমেত পুরুষ কন্ঠ ভেসে এল- উল্লুক! আসবি কখন! বোউদির সাথে গল্প করে করে হেজিয়ে গেলাম! সেই কোন সকালে এসেছি তোর ফ্ল্যাটে!
সর্বনাশ! রমেন আর সঞ্জু হাজির হয়েছে! আমার বিখ্যাত বন্ধু গুলোর মধ্যে অন্যতম! মদ গাঁজা সিগারেট সবেতেই সিদ্ধহস্ত! কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! আমার বউকে অসম্ভব নিজের দিদির মত শ্রদ্ধা করে! প্রতিবছর আমার এখানে এসে ভাইফোঁটা ও নিয়ে যায়! খেয়াল করি ফোঁটা দেওয়ার সময় বউ এর চোখের কোণে জল চিকচিক করে! বুঝি শালার জন্য ওর মন কেমন করে! শালা এত ব্যস্ত যে সময় ই পায়না দিদির কাছে আসার! শালা আর বলে কাকে!
- কি রে বো@##% মেয়ে দেখছিস নাকি? ফোন হাতে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব? আসব নাকি তোকে তুলে নিয়ে যাব?
- আচমকা সম্বিৎ ফিরেই তোতলাতে থাকি
- না....হ্যা.....ইয়ে আসছি!
- এ মাল সিওর জালে পড়েছে! মেয়ে দেখছে বোউদি গো! পাশ থেকে সঞ্জুর গলা পেলাম! পিত্তি জ্বলে গেল! বললাম
- রমু ওই রামছাগল টা কে বল চুপ করতে! ও কি বোঝেরে আমাদের অফিসের চাপ কত?
- আহা! রাগ করিস কেন ভাই! আয়! দরকারি কথা আছে!
- রমেনের নরম গলাতেই হোক আর মনটাকে রিল্যাক্সড দেবার জন্যই হোক বাড়ির একটা টান অনুভব করলাম! তড়িঘড়ি বসকে সেকথা বলতেই বস পারমিশন দিয়ে দিলেন! ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে অফিসের সামনে থেকে বাসে উঠেই জানলার ধারে সিট পেয়ে গেলাম! আজ ভাগ্যদেবতা খুব প্রসন্ন মনে হচ্ছে! মনে পড়ল পলাশকে একটা ফোন করে দিই! আমি পলাশ রমেন সঞ্জু এরা হরিহর বন্ধু! ছোট থেকে একসাথে বেড়ে উঠেছি! পলাশ ওরা এসেছে জানলে খুব খুশি হবে! ফোনটা বেজেই যাচ্ছে! ধরে আর না! দ্বিতীয় বার চেষ্টা লাগালাম! চোখদুটি বাইরের প্রকৃতির দিকে মেলে দিয়ে দেখেছিলাম! আচমকা ঘটল সেই ঘটনাটি যেটার জন্য কোনমতেই প্রস্তুত ছিলাম না আমি! বাসটা একটা স্টপেজে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ! রাস্তার ধারে ইতিউতি তাকাতেই নজরে এল বিশাল হোর্ডিং আর তাতে গত রাতের সেই গয়না পড়া মোহিনী একদৃষ্টে লোলুপ ভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে! ঠোঁটের বাঁদিকের কষ বেয়ে রক্তের একটা ক্ষীণ রক্তের ধারা! আমার সামনে গোটা পৃথিবী যেন দুলে উঠল! আবছা দেখতে পেলাম কন্ডাকটর তাড়াতাড়ি ছুটে আসছে আমাকে ধরার জন্য! ফোনটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে বাসের সিটের তলায় ঢুকে যাওয়ার আগে অস্পষ্ট পলাশের হ্যালো হ্যালো আওয়াজ শুনতে পেলাম! ব্যাস! তারপর আরকিছু মনে নেই!!........
কতক্ষণ এভাবে ছিলাম বলতে পারব না! জ্ঞান হতেই দেখি নিজের চিরচেনা দুধসাদা নরম বিছানার উপর শুয়ে আছি! আর আমাকে ঘিরে কয়েকজোড়া উৎসুক চোখের মেলা! তার মধ্যে একজোড়া চোখ আবার কেঁদে লাল করে ফেলেছে! উঠে বসতেই টের পেলাম মাথার পিছনে অসহ্য যন্ত্রণা! পলাশ হাঁ হাঁ করে উঠেই আমাকে ধরে আবার শুইয়ে দিল....!
- উঠিস না! শুয়ে থাক! কন্ডাকটর ছেলেটি খুব ভাল মানুষ! আমাকে তোর ফোন থেকে বাসের প্রপার লোকেশন জানাতেই আমি দশ মিনটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাজির হয়ে যাই!
- কি হয়েছিল তোমার গুরু??! বাসে কোন মেয়ে টেয়ে দেখে কি......
- থামবি সঞ্জু!! পলাশ গর্জন করে ওঠে! এই বিপদের দিনেও ছ্যাবলামো অন্তত বন্ধ রাখ!
সঞ্জুও কি একটা বলতে যাচ্ছিল রমেনের চাঁটি খেয়ে কেমন যেন ভেপসে গেল!
- মেয়ে??!......হ্যাঁ.....ওই মেয়েটাই..... সবসময় আমাকে টানছে??!
- তিনজনে আরেকটু ঘন হয়ে এল আমার কাছে! পলাশ কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল - কোন মেয়েটা অরি? খুলে বল আমাদের! বুঝতে পারছি তোর খুব বিপদ আসছে!
- আমি চমকে তাকালাম পলাশের মুখের দিকে! উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট!
- কি গো! এখন কেমন বোধ করছ?? তোমার কি হয়েছে বলোতো? বলতে বলতে মুনিয়ার গলাটা একটু ধরে এল!
রমেন মাঝখান থেকে আচমকা ফোড়ন কাটল- এই যে মিয়া বিবির প্রেমটেম এখন চলবেনা! তেলেভাজা গুলো নিয়ে এসেছি কখন! জুড়িয়ে গেল ওগুলো! বউদি ওগুলো একটু গরম করে নিয়ে এসোনা! খুব খিদে পেয়েছে! অরি টা মাঝে মাঝে এমন কান্ড বাধায় খিদে তেষ্টা সব ভুলে যেতে হয় মাইরি!
- এ বাবা! তোমরা বসো আমি এখুনি খাবার গরম করে আনছি! বউটা মনে হল একটু লজ্জা পেয়ে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে! তা ভাল! মেয়ে মানুষের একটু লজ্জা শরম থাকা ভাল! আচমকা কোথা থেকে একটা রহস্যময়ী এসে আমার জীবন ছারখার করে দিচ্ছে! হ্যালুসিনেশন কিনা তাও বুঝতে পারছিনা!
- কিরে কি ভাবছিস অরি? পলাশ জানলার দিক থেকে প্রশ্ন টা ছুঁড়ে দিল! একটা কথা বলব?
- হ্যা বল না?
- সকালের আচরণে কিছু মনে করিস না! আসলে মেন্টালি একটু আপসেট ছিলাম! ভাবছি কদিন একটু ছুটি নেব! যাবি এ কদিনের জন্য?? ঘুরে আসবি কোথাও??
তোর উপরেও যা প্রেসার পড়ছে! রিল্যাক্স পাবি! যাবি??
- কোথায়??
- আরে তোরা আউটিং এর প্ল্যান আমার উপর ছেড়ে দে! একটা খাসা জায়গা আছে তোদের জন্য! সঞ্জু কথা শেষ করতে দেয় না!
পলাশ আর রমেন চুপ করে থাকে! কারণ এই ব্যাপারে তাদের থেকে সঞ্জুর এলেম অনেক বেশি!
অগত্যা আমি জিজ্ঞাসা করলাম সঞ্জুকে
- জায়গাটা কোথায়?
-বাঁকিপুট! নাম শুনেছিস??
নামটা শুনে আমি আর রমেন একটু নাক কুঁচকালাম! নামটা কিরকম যেন!! শুধু পলাশই একটু মিটি মিটি হাসতে লাগল! আমি আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম- কিরে পলাশ তুই চিনিস নাকি??
- না চেনার কি আছে? গেল বারই তো জুনপুট ঘুরে আসলাম! ওর কাছেই! দীঘাতে!
- হতভাগা! আমায় না নিয়ে চলে গেলি??
- আরে দূর! বউ আর শালি ছিল সাথে!
- ওহ তাই বল! বউ শালি নিয়ে একাএকা স্ফূর্তি করতে গিয়ে আমাদের কথা কেন মাথায় থাকবে তোর?? এতক্ষণ পরে রমেন মুখ খোলে!
এরই মধ্যে খাবার দাবার আর চায়ের রেকাবিটা নিয়ে বউ খাটের পাশের টেবিলে রেখে আমার পাশে বসে পড়ে! মাথায় আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে বলে -যাওনা! ঘুরে আসো!! ভাল লাগবে! আমিও এ কদিন একটু মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি ঘুরে আসি! কতদিন তো যাওয়াই হয়নি!
- হ্যাঁ বৌদি! যাও যাও ঘুরে আস! একে আমরাই ম্যানেজ করে নেব! সঞ্জুর গলায় তখন উৎসাহ ঝরে পড়ছে! যাইহোক এপক্ষ ওপক্ষ আলোচনা শেষে একটা শনিবার দেখে যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করা হল! আগের দিনই বউ মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছে! মেয়ে আবদার করে বলে গেছে সমুদ্র থেকে অনেক ঝিনুক নিয়ে আসতে!
অগত্যা চারমূর্তিতে পিঠে বিশাল ব্যাগ নিয়ে কোলকাতা থেকে কাঁথিগামী বাসে চেপে বসলাম! সঞ্জু আগে থেকে ফোন করে সব ঠিকঠাক করে রেখেছে! কাঁথি বাসস্টপেজ এ নেমে ওখান গাড়িভাড়া করে জুনপুট বাঘাপুট হয়ে তবে বাঁকিপুট পৌঁছানো যাবে! তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টার ব্যাপার!ওখানে ঝিনুক রেসিডেন্সি হোটেলের মালিক আবার সঞ্জুর বাবার বন্ধু!! অল্প টাকায় দুটো বড় এসি রুম ভদ্রলোক বিনাদ্বিধায় বুক করে দিয়েছেন! এসি বাসে বসে আছি! সবে মাত্র ঝিমুনি টা এসেছে এমন সময় পলাশই প্রথম প্রশ্নটা করে বসল
- অরি! কি দেখেছিলি আমাকে একটু পরিষ্কার করে বলত? আমরা শুনব সবাই!
আমি পলাশ কে আনুপূর্বিক সব কথা খুলে বললাম! শুনে পলাশ একটু গুম হয়ে গেল! বাকিদের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব একটা ভরসা পেলাম না! রমেন আর সঞ্জুর মুখেও কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনার আঁচ টের পেলাম! তাহলে তারা কি ওই মেয়েটিকে চেনে নাকি?? মনে হতেই বুকটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠল!
অনেকক্ষণ কেটে গিয়েছে! বাস ততক্ষণে পূর্ব মেদিনীপুর সীমানায় প্রবেশ করেছে!
- কি ব্যাপার পলাশ?? মেয়েটাকে তোরা চিনিস নাকি??
- কোন মেয়েটা?? ওহ ওই টা!! নাহ! তোর যত আজগুবি মনের কল্পনা!
- কিন্তু কিন্তু আমি তো.....সঞ্জু কথা শেষ করতে পারেনা! রমেন সঞ্জুর ঘাড় সমেত মাথা টা বগলের তলায় চেপে ধরে এক ধমক লাগাল!
- চুপ! খালি বক বক!
- এই রমেন সঞ্জুকে ছাড়! সঞ্জু তুই বল!
- না.....মানে.....আগে কখনো দেখিনি তো!
- আরে ছাড় না সঞ্জুকে! খালি ইয়ার্কি মারে! দেখ বাস আর কতদূর এলো! পলাশ বলে উঠল!
অবশেষে কাঁথি বাস স্টপেজে বাস যখন এসে থামল ঘড়ির কাঁটা তিনটে ছুঁই ছুঁই! একটু দূরে একটা বোলেরো দাঁড়িয়েছিল! কিন্তু পেটে তখন আগুন জ্বলছে! ওদের সেকথা জানাতেই ওরা একবাক্যে রাজি হয়ে গেল! স্থানীয় একটা হোটেলে ঢুকে একটা টেবিল দখল করে মাংস ভাতের অর্ডার করলাম! খেতে খেতে লক্ষ্য করলাম তিনজনের মুখই বেশ গম্ভীর! এবং সেটা বাসে ওই রহস্যময়ীর প্রসংগ ওঠানোর পর থেকেই খেয়াল করছি! তাহলে কি ওরা সেই মেয়েটিকে চেনে??? তাহলে মেয়েটি আমাকেই শুধু বারবার দেখা দিচ্ছে কেন??ওদের কাছেই বা দেখা দিচ্ছেনা কেন?
যাইহোক খাওয়া দাওয়া শেষে বিলটা মেটাতে যাচ্ছি পলাশ আমার হাতটা চেপে ধরল! বলে
- গাড়িতে গিয়ে বোস! লাগেজের দিকে নজর রাখ! আমরা একটু আসছি!
- কোথায় যাবি?
- আসছি একটু! গাড়িতে গিয়ে বোসনা!!
অগত্যা গাড়িতে গিয়ে তুম্বো মুখে ড্রাইভারের পাশের সিট টায় বসলাম! ড্রাইভার ছেলেটি বয়েসে তরুণ! হিন্দীতে কথা বলে! জিজ্ঞাসা করে- ভাইয়া আপ কলকাত্তা সে আয়ে হো?
- হাঁ ভাই কিউ? একটু অবাক হলাম!
- ইয়ে দাদাবাবু লোগো কে সাথ হমারা বহোত জানা পেহেচানা হ্যায়!!
- কেয়সে? কিছু বুঝতে না পেরে বোকার মত জিজ্ঞাসা করলাম!
- পিছলে সাল তো বোহি লোগো নে আয়া থা ইহা মেরে গাড়ি পে!!
- গত বছর এসেছিল! ওরা???! কই আমি তো কিছু জানিনা??
- শায়দ আপকো বতায়া নেহি হোগা??
- পতা নেহি! বলে অস্বস্তিকর আবহাওয়া থেকে মুক্তি পাবার জন্য গাড়ির উইন্ডো টা নামিয়ে দিলাম! ছোকরাটাকে বললাম এসি টা বন্ধ করে দিতে! অনেকক্ষণ হয়ে গেল ওরা এখনো এলনা! কি করছে ওরা এতক্ষণ হোটেলে?? ইতিউতি চাইতেই হাইওয়ের ধারে একটা বিশাল অ্যাড ব্যানারে চোখ পড়ল! আর সাথে সাথে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল! এই বুঝি মেয়েটার মুখোমুখি হলাম! কিন্তু না! বাইকের উপর বসে ধোনির স্মিত হাসিটা আমার অর্ধেক টেনশন কমিয়ে দিল! আস্তে আস্তে ব্যানার থেকে চোখ টা সরিয়ে নিয়ে হোর্ডিংটা র নীচে বুনো আগাছাটা র দিকে তাকাতেই রক্ত হিম হয়ে গেল! সেই মেয়েটি!! পরনে কালো শাড়ি! অনেক জায়গায় ছেঁড়া! মেয়েটির সর্বাঙ্গে ক্ষত! দুই চোখে কেমন যেন জিঘাংসার চাউনি! একটা তর্জনী সিধা তুলে দাঁড়িয়ে আছে হোটেলের দিকে যেখানে একটু আগে খাওয়া দাওয়া ছাড়লাম! মনে পড়ল ওরা তিনজন তো ওখানেই আছে! হিম হয়ে গেল শরীর! একটা অজানা বিপদের আশংকা করে দৌড়ালাম হোটেলের দিকে! ম্যানেজারের ঘরের দিকে এগোতেই একটা ফিসফিসে কণ্ঠস্বর ভেসে এল-
- ওই কথাই রইল তাহলে পুরো কুড়ি হাজার আছে! বাকি চল্লিশ কাজের পরে পেয়ে যাবে!
- হেঁ হেঁ....কি যে বলেন না! আপনারা আরাম সে এখানে যতদিন খুশি কাটিয়ে যান! কেউ কিছু জানবে না!
দরজা খুলে ওরা তিনজন বেরোতেই আমাকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠল! পলাশ জিজ্ঞাসা করল- কি রে! তুই এখানে?
- ওই মেয়েটা!! আবার....!!! রাস্তার পাশে!!....সারা শরীরে রক্ত!
রমেন বলে উঠল - তাড়াতাড়ি চল! দেখি কি ব্যাপার! চারজনে উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়ে আগের জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম! কোথাও কিছু পেলাম না! মেয়েটা যেন কর্পূরের মত উবে গিয়েছে বাতাসে! ড্রাইভার ছোকরাটাও কিছু জানান দিতে পারল না! দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে আমরা চারজনেই গাড়িতেই উঠলাম! জুনপুট বাঘাপুট হয়ে গাড়িটা বাঁকিপুট পৌছাবে! যত গন্তব্যস্থলের কাছাকাছি যেতে লাগলাম সমুদ্রের নয়নাভিরাম দৃশ্য সাথে বালির ও সবুজ গুল্মের মাখামাখি মন থেকে দুঃস্বপ্ন গুলোকে আস্তে আস্তে মুছে দিতে লাগল! বাঘাপুট পেরিয়ে ডানদিকের রাস্তা টা ধরতেই বাঁকিপুটের সীমানা শুরু হল! এখানেও প্রসারিত সমুদ্র! একটা জায়গায় দেখলাম সমুদ্র সংলগ্ন বালির বেশ কিছুটা অংশ লাল হয়ে আছে! ড্রাইভার জানাল ওগুলো লাল কাঁকড়া! দূর থেকে লাল কার্পেটের মত দেখতে লাগছে! প্রকৃতির কি অপরূপ সৃষ্টি!
যখন ঝিনুক রেসিডেন্সি পৌছালাম বিকেল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে! একটু দূরেই সমুদ্র গর্জন ভেসে আসছে! একটা অদম্য আকর্ষণ অনুভব করলাম! সেটা পলাশ কে জানাতেই সে বলল- এখন নয়! একটু পরে যাব! এখন নয়! একটু শরীরটা কে রেস্ট দে অরি! পরে যাব খন!
হোটেল মালিক কে আগে থেকেই বলা ছিল! উনি আমাদের জন্য আগে থেকেই বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন! ভদ্রলোক খুব অমায়িক! গল্পে গল্পে কখন যে সময় কেটে গেল টেরই পেলাম না!আচমকা মনে পড়ল সমুদ্রটা তো কাছ থেকে দেখাই হলো না! হোটেল মালিককে সে কথা বলতেই তিনি স্মিত হেসে সায় দিলেন....বলেন- যান না! ঘুরে আসুন! ভাল লাগবে! আপনাদের রাতের খাবারের বন্দোবস্ত টাও করে রাখি! ফিরে এলে গল্প গুজব করা যাবে খন!
আমি আড় চোখে একবার পলাশ আরেকবার রমেন সঞ্জুর দিকে তাকিয়ে বললাম কিরে যাবি তো?
- পলাশ সম্মতি জানাল! বলল চল ঘুরেই আসি!
চারজনে মিলে বালিয়াড়ি তে ঘুরতে বেরোলাম! সামনে দিগন্ত প্রসারিত সমুদ্র যেন হাত বাড়িয়ে আমাদের ডাকছে! ঢেউ গুলো জ্বলন্ত নীলাভ আলো মাথায় নিয়ে পাড়ে এসে মিলিয়ে যাচ্ছে! দূরে ভাসমান নৌকাগুলোর টিমটিম আলোগুলোকে অলৌকিক বিন্দুর মত মনে হচ্ছে! এই নক্ষত্রখচিত আকাশের নীচে প্রাকৃতিক লীলা দেখতে দেখতে কেমন যেন কান্না পেয়ে গেল! বুক ফেটে যেন কান্না বেরোতে চাইল! এ তুমি কিসের সাজা দিচ্ছ ভগবান! আমার শান্তির ঘুম তুমি কেড়ে নিয়েছ! মনের শান্তি কেড়েছ! আর কি বাকি রেখেছ?? আমাকে নিয়ে নাও তুমি! পরক্ষণেই মনে পড়ল সমুদ্র কিছু নেয়না! সবই ফিরিয়ে দেয়.....! ধপ করে বালির উপর বসে পড়ি! একটু তফাতে ওরা তিনজন ও বসে পড়ে! তিনজনেরই চোখ স্থির সমুদ্রের দিকে! কেউ কোন কথা বলছেনা! অনেকক্ষণ পরে আমিই নীরবতা ভাঙি!
- মেয়েটাকে পলাশ! বারবার আমাকে দেখা দিচ্ছে.....তোরা কেউ দেখছিস না.....আমি......বার বার আমি....কেন???কেন...????
- ও তোর মনের ভুল অরি! রমেন বলে উঠতেই হঠাৎ আমার মধ্যে কি ভর করল যেন! নিমেষে উঠে গিয়েই রমেন কে বালির মধ্যে ফেলে দিয়ে বুকে হাঁটু দিয়ে চেপে কলার চেপে হিস হিস করে বলে উঠলাম- চুপ শুয়োরের বাচ্চা! একদম চুপ! কিছু বুঝি না আমি তাই না!জানোয়ারের দল! ওই হোটেলের মালিক কে টাকা খাওয়ালি কেন?? বল??
- অরি রমেন কে ছেড়ে দে! আমার পাশে এসে বস! পলাশ শান্ত গলায় কথাগুলো বলে সমুদ্রের দিকে ফিরে বসল! আমি টলতে টলতে পলাশের পাশে এসে বসে পড়লাম! ওদিকে রমেন গলায় হাত দিয়ে খক খক করে কেশেই যাচ্ছে! সঞ্জু এক সাইডে ভয়ে গুটিসুটি মেরে গেছে! আমার এ রূপ সে কোনোদিন দেখেনি! আচমকা টের পেলাম মাথার পিছনে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে! কিরকম যেন গা গুলাচ্ছে! তার মধ্যেই যেন পলাশের মন্ত্রধ্বনির মত গলা শুনলাম
- অরি আমরা তোর খুব ভাল বন্ধু বিশ্বাস কর! এই পাপের মধ্যে তোকে জড়াতে চাইনি! কিন্তু আজ তোকে বলে দিয়ে যাব! আমাদের হাতে একদম সময় নেই! তোকে একটা মিথ্যা কথা বলে ফেলেছি আমরা অরি! আমরা গত বছর এখানেই ঘুরতে এসেছিলাম! তবে এখানে এই হোটেলে ঠিক নয়! সঞ্জুর মাসতুতো দাদার বাগানবাড়িতে উঠেছিলাম!
আড় চোখে তাকিয়ে দেখি সঞ্জু দুই পায়ের হাঁটুর মধ্যে মাথাটা ঢুকিয়ে একদম চুপ হয়ে গেছে! রমেন ও সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থম মেরে গেছে! সমুদ্র গর্জনে চারদিক খানখান হয়ে যাচ্ছে! পলাশ বলে চলল-
সেদিন রাতে আমরা তিনজনেই মদে চুর হয়েছিলাম! মদ আমি খেতাম না বিশ্বাস কর অরি! এদের পাল্লায় পড়ে এত বড় ভুল আমি করে ফেলব ধারণাতেও আনিনি! এরকমই ছিল সেদিনের সমুদ্র! নক্ষত্রখচিত আকাশ! আমরা বালির চড়ায় বসে একের পর এক বোতল সমাধা করে চলেছি হুঁশ নেই আমার! আচমকা রমেন আমাকে ঠেলা মারে! প্রথমটা বুঝিনি! দ্বিতীয় বার ঠেলা মারতেই নজরে এল ব্যাপারটা! একটু দূরে বালিয়াড়ি র যেখানে ঝাউবনের শুরু হয়েছে সেখানে একটা মেয়ে চুপচাপ বসে আছে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে! উন্নত গ্রীবা! সুডৌল শরীর... উজ্জ্বল চাপা গায়ের রঙ! আমি চোখ সরিয়ে নিলাম! পাপবোধ লাগল মনে! মাথা ঝিম ঝিম করছে! সঞ্জু.....হ্যা এই সঞ্জুই পাশ থেকে বলেছিল হয়ে যাক বস!....এই সুযোগ আর পাবি না! আমি জোরে একটা থাপ্পড় লাগিয়েছিলাম তার গালে! এই রমেন টা আমার মাথার পিছনে বোতল দিয়ে মারে!........হ্যাঁ রমেন! বেহুঁশ হয়ে যাই কিছুক্ষণের জন্য! জ্ঞান ফিরলে দেখি বালির মধ্যে জানোয়ার দুটো মেয়েটাকে চেপে ধরে ভোগ করে চলেছে! মেয়েটার আর্তচিৎকার আমার কান ফাটিয়ে দিচ্ছে! পাগলের মত দৌড়ালাম! দুজনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলাম! দেখলাম কৃষ্ণকলি চিরকালের মত নিথর হয়ে গিয়েছে! ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটা ক্ষীণ রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ছে! নিম্নাঙ্গ পুরো......উহ! মাগো.....
পলাশ আর বলতে পারে না! বমি করতে শুরু করে পাশের ঝোপে! আমার মাথা আস্তে আস্তে শূন্য হতে শুরু করে দিয়েছে! আচমকা দপ করে মাথাটা জ্বলে ওঠে! প্রতি ভাইফোঁটায় জানোয়ার দুটোকে আমার বউ ফোঁটা দিয়ে এসেছে নিজের ভাই মনে করে! চোখ দিয়ে আগুন ঝরতে লাগল! পশুর মত সর্ব শক্তি দিয়ে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমি! কি যেন ভর করেছে আমার উপর! তারা সর্বশক্তি দিয়েও আমাকে প্রতিরোধ করতে পারছেনা! পলাশ পিছন থেকে বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর - অরি ছেড়ে দে ওদের ছেড়ে দে! তোর পায়ে পড়ি! হাতের বাঁধন কিকরে জানি আলগা হয়ে গেল! ওরা ছাড়া পেয়েই উন্মুক্ত সমুদ্রের দিকে ধাবমান হল! কিন্তু কিছুদূর গিয়েই থমকে দাঁড়াল তারা! সমুদ্রর মাঝখান থেকে উঠে আসছে এক নারীশরীর! আমি স্পষ্ট দেখলুম তাকে! হোর্ডিং এ দেখা সেই কৃষ্ণকলি! চোখে সেই কামনামদিরতার কোন ছাপ নেই! শিকার খুঁজে চলেছে পৈশাচিক ভঙ্গিতে! সম্বিৎ ফিরে পেলাম! ওদের পুলিশে শাস্তি দিক! এভাবে ভ্রাতৃসম বন্ধু দুটোকে চোখের সামনে বিসর্জন হতে দেখব? পলাশের বাহুপাশ থেকে নিজেকে আপ্রাণ সারানোর চেষ্টা করলাম! পারলাম না!! চোখের সামনে দেখলাম সেই নারীমূর্তি দুজনের গলা ধরে জলের অতলে তলিয়ে গেল!
- লাশটা কে গুম করার জন্য আমিই কাঁথির হোটেল মালিক কে টাকা দিই! ভাল থাকিস অরি! তুই ই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আছিস...ছিলি....থাকবিও!
পলাশের কথাগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম সে উদভ্রান্তের মত দৌড়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল! নির্জন বালিয়াড়িতে আমি একা! অসহায়ের মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম সমুদ্রের দিকে! ঢেউগুলো একের পর এক আমার বুকের পাঁজরের মত তীরে এসে ভেঙে পড়তে লাগল!
সমুদ্র কিছুই নেয় না! যা গ্রহণ করে তাই ফিরিয়ে দেয়! পরদিন সকালে বাঁকিপুটের প্রাতঃভ্রমণ কারীরা তিনটে মৃতদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয় থানায় খবর দেয়! আর আমি অ্যাসাইলামে ভর্তি আছি! মাঝে মাঝে স্মৃতি কাজ করে.....বেশিরভাগ সময়েই অন্ধকারে ডুবে থাকি!......যেখানে টেবিলের মুখোমুখি দুটি মুখ.....আমি আর কৃষ্ণকলি!!
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment