কাছে পিঠেই কোথাও বোমাটা ফাটল! আধো ঘুম জাগরণে আওয়াজ টা শুনেই পিলে চমকে উঠেছিল আমার! তাড়াতাড়ি বাবান কে বুকের কাছে টানতে গিয়ে দেখি সে চোখ খুলে একদৃষ্টে আমার স্ত্রী র বাঁধানো ফোটাখানির দিকে চেয়ে আছে! স্নেহ মেশানো গলায় বললাম- " কি রে ঘুমাসনি এখনো? "
- না বাবা! ঘুম আসছেনা!
- কেন রে? বোমের আওয়াজে ভয় পেলি?
- নাহ! আচ্ছা বাবা আজ তো ভুত চতুর্দশী তাই না?
- হুম!
- আজকের দিনে কি হয়?
- বাবান! ঘুমা না! রাত কত হল খেয়াল আছে তোর?
- জানতাম তুমি বলবেনা বাপি! মা থাকলে সব বলতো আমাকে!
ঠিক এই সময়ে আলমারির উপর থেকে খিলখিল করে একটা হাসির আওয়াজ ভেসে এল! আগে এই আওয়াজ শুনলে গায়ে কাঁটা দিত! এখন আর দেয় না! বরং মনে কিরকম একটা নিশ্চিন্তি ভাব আসে!
অবোধ প্রাণীটি কে বুকের কাছে টেনে নিয়ে শুধালাম - কেন রে? তোকে শুধু মা ই ভালবাসতো? আমি বাসি না?
- বাপি তুমি ই তো আমার সব!.....ছোট্ট হাতে গলা জড়িয়ে ধরে বাবান! সাথে মা যদি....
- আজকের দিনে তেনারা নেমে আসেন পৃথিবী তে!
- কারা বাপি?
- মৃত মানুষের আত্মা রা!
- কেন?
- দেখতে তাদের প্রিয় মানুষ রা কেমন আছে?
- বাপি! তারা এভাবে চলে যায় কেন? সারাজীবন কাছে থাকলেই তো জানতে পারে তাদের প্রিয় মানুষের কথা!
আমি কোন উত্তর দিলাম না! জীবনে এটাই দেখে এসেছি যে কিছু কিছু প্রশ্নের সত্যি কোন জবাব হয়না! এই একরত্তি ছেলের প্রশ্ন যদি বিধাতা শুনত তাহলে এত তাড়াতাড়ি বউ টাকে তুলে নিত না! অনু আজ বছর দুই হল আমাদের ছেড়ে চলে গেছে! ভাল নাম অনামিকা! আমিই ভালবেসে ডাকতাম অনু বলে! আজকের এই অভিশপ্ত দিনে শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবান অনুকে নিয়ে ফিরছিলাম বাসে করে! গন্তব্য আসতে ছেলেকে নিয়ে নেমে যেতেই খেয়াল হল বৌ তো বাসেই রয়ে গেছে! দুই পা এগোতেই ঘটে গেল সেই হাড়হিম ঘটনাটি! দেখলাম অনু তড়িঘড়ি চলন্ত বাস থেকে নামতে যাচ্ছে! পিছনে শাড়ির আঁচল টা আরেকজনের পায়ের তলায়! ব্যাপার টা বোঝার আগেই বাসের বাইরে এগিয়ে দেওয়া অনুর শরীর টা নিমেষে বাসের দুই চাকার মধ্যে ঢুকে গেল! একটা মৃদু ফট করে আওয়াজ হল! ঝাপসা চোখের সামনে দেখলাম ৩৪ নং জাতীয় সড়ক আমার ভালবাসার রঙে মাখামাখি হয়ে গেল! একটা শাঁখা পড়া হাত আমাদের দিকে মুষ্টিবদ্ধ হয়েই চিরকালের মত নিথর হয়ে গেল! তারপর আর কিছু মনে নেই আমার!
কতক্ষণ পর জ্ঞান ফিরেছিল মনে নেই! তবে হাসপাতালের বেডে শুয়ে বাবানের বিহ্বল চোখ দুখানি দেখে মনটাকে শক্ত করে নিয়েছিলাম! জীবনের এখনো অনেকটা পথ বাকি! ছেলেটাকে মানুষ করতে হবে তো!
- বাব্বাহ! বাবু তো দেখছি চিন্তার সাগরে ডুব দিলেন!
আচমকা একটা মেয়েলি কন্ঠে চিন্তাজাল ছিঁড়ে যায়! পরক্ষণেই মুচকি হেসে বলি
- এসেছ? তোমার কথাই ভাবছিলাম গো!
- সেদিন যদি আমার কথা ভাবতে! কথাটা কিরকম দীর্ঘশ্বাস এর মতন শোনায়!
- এরকমভাবে বলোনা অনু! নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়!
- থাক! খুব হয়েছে! কেমন আছ?
- সত্যি বললে কি বিশ্বাস করবে?
- ছাড়ো! এখন সবই বুঝতে পারি! আগে কি এত বুঝতাম ছাই?
আধো আলো অন্ধকারে অস্পষ্ট ঠাহর করলাম আলমারির মাথায় একটা অস্পষ্ট নারীশরীর বসে বসে পা দোলাচ্ছে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গি তে!
বাবানের কান বাঁচিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বললাম
- একটু পাশে এসে বসো না! কতদিন তোমার গায়ের গন্ধ নিইনি! আচ্ছা সেই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি টা এখনো মাখো!
- ঢং! আর পারি না বাপু! সরো সরো! একটু ছেলের পাশে শুতে দাও! বেচারা সারাদিন মা মা করে মরে যায়!
অগত্যা সেই ছায়া শরীরীণি কে পাশ দিলাম! আড় চোখে দেখলাম বাবানের মাথার চুল গুলো একটা অদৃশ্য স্নেহস্পর্শে নড়ে উঠল! বাবানের চোখ বেয়ে কখন নিজের অজান্তে বেরিয়ে এল দু ফোঁটা চোখের জল! বাইরে ঝোলান টুনির আলোয় তা চকমক করে উঠল!
ছায়া কায়া প্রেম বাৎসল্য সব মিথ্যে বলে মনে হয় মাঝে মাঝে! ঘরের বিষণ্ণ নিঃস্তব্ধতা আস্তে আস্তে গ্রাস করতে থাকে বাইরে ঝোলানো টুনির মড়া আলো! অনেক্ষণ পর নিস্তব্ধতা ভেঙে আমার মৃতা সঙ্গিনী কে শুধালাম- অনু? তুমি কি ভাল আছ ওপারে গিয়ে?
- তোমার কি মনে হয়?
- মনে হয় ভালই আছ!
- তোমার মাথা! সেই ঢেঁকিই রয়ে গেলে!
- কেন?
- না গো! তোমাদের ঘিরে একটা অদৃশ্য টানে পড়ে রয়েছি! যেতে পারিনা কোথাও!
প্রতিদিন আসি,দেখি ভুলে ভরা সংসার! বাবান অংকে ভুল করলে তুমি মেড ইজি টা পাশে নিয়ে বস! হাসিও পায় কষ্ট ও লাগে!
- তুমি প্রতিদিন আমাদের দেখো? কই কিছু টের তো পাই না!
- আমি ধরা দিই না! এই জানো তোমার মা বাবাকে দেখলাম! দিব্যি সুখে আছেন ওনারা! আমাকে প্রথম দিন দেখেই তো তোমার মা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন! আমি বাধা দিই নি! কাঁদলে নাকি মন হালকা হয়!
- অনু!
- উঁ!
- আমাকে নিয়ে যাওনা নিজের কাছে! আর একাএকা এভাবে পারছি না!
- অরি!! এত স্বার্থপরের মত কথাটা বলতে পারলে? আমাদের বাবান কি দোষ করল? আমার সঙ্গ লাভের জন্য ছেলেটাকে অনাথ করে দিচ্ছ! আমি আর আসব না! যাও! কথা বন্ধ!
- অনু যেও না! যেও না প্লিজ! অন্ধকার ঘরে পাগলের মত হাতড়ে বেড়াই অদৃশ্য ভালোবাসাকে ধরার জন্য! হাতের মধ্যে শুধু একরাশ ঠাণ্ডা নিঃসীম অন্ধকার খেলে যায়! বুকের ভেতরটা কান্নায় ফেটে যায় আমার! আস্তে আস্তে বাবানের ঘাড়ের চুলগুলো সরিয়ে ঘাড়ের কাছে আলতো মুখ রেখে শুয়ে পড়লাম! ছেলের গায়ের এই গন্ধটা আমার বড্ড বেশি করে অনুর কথা মনে পড়িয়ে দেয়! সত্যি তো! আমিও দুনিয়া থেকে চলে গেলে বাবান তো অসহায় হয়ে পড়বে!বউ তো ঠিকই বলছিল! আমার বউটা বড্ড বেশি অভিমানী! না হয় বলেই ফেলেছি! আরেকটু সময় থাকলে কি হত?
- কি গো ঘুমালে? আচমকা ঘাড়ের কাছে একটা ফ্যাঁস ফেঁসে কন্ঠ শোনা গেল!
- না! একটু অভিমানেই জবাব দিলাম!
- রাগ কোরোনা গো! আমার অভিমান টা বেঁচে থাকতেও বোঝোনি! যাক ছাড়ো!
- অনু! তুমি যদি চলেই যাবে তাহলে কেন এসেছিলে আমার জীবনে? কেন ফুলের মত সাজিয়ে শেষে শ্মশান করে দিয়ে চলে গেলে?
- হয়ত ভালোবাসা আরো বেশি করে জীইয়ে রাখার জন্য!
- পাগলি তুমি অনু! নশ্বর শরীর টা ইলেক্ট্রিক চুল্লী তে ঢুকে যেতে দেখেছি আমি! ছাই হয়ে গেলে দেখতে দেখতে! এরপরেও ভালবাসা জীইয়ে রাখার কথা বল?
- তুমি তো আজও আমাকে ভালবাসো! খেয়াল করলাম মুখের সামনে অস্পষ্ট একটা নারীমুখ প্রকট হচ্ছে ধীরে ধীরে!
- হ্যা বাসি তো?
- বেঁচে থাকলে এত বাসতে আমায়? আবার খিলখিল হাসির আওয়াজ টা পাওয়া গেল!
- বাসিনি? বাসিনি তোমাকে? মাথায় আগুন ধরে গেল!
- এই আস্তে কি করছ? বাবানের ঘুম ভেঙে গেল যে!
- আগে বল এই ভাবে আমাকে একা ফেলে কেন গেলে?
- অরি! নিয়তি ছিল সেদিনের ঘটনা! শরীরটা খোলস! সাপের শীতঘুমের মতন! খোলস পালটায়! টান নয়!
- বাবা! এত দার্শনিক কবে থেকে হলে?
- মরেছি বলেই জেনেছি! আমি যাই! আবার আসব! আর হ্যাঁ! বাবান কে নিয়ে একটু বেরিয়ে আসবে! ছেলে আমার একটু কালীপূজার আলোকসজ্জা দেখুক!
- তুমিও চল না!
- মরণ! আমাদের আলো সহ্য হয় না জানোনা! সরো! ছেলেটাকে একটু চুমু খাই! বাপ হয়েছ! ছেলেটার পিঠে একটু সাবান দিয়ে দিতে পারনা! নরম পিঠটার কি অবস্থা হয়েছে!
- আচ্ছা দিয়ে দেব খন!
- চলি!
- আবার আসবে তো!
- যদি না আসি!
- আসবেই জানি!
- ইঃ! কত জানে! হি হি! অরি! আরেকটা বিয়ে করে নাও! আমিও সতীনের সংসার দেখি!
- না আমি আর বিয়ের কথা ভাবব না!
দুউউউমমম!!!!.......আচমকা বোমের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল আমার! বাইরের ঝোলান টুনিগুলো মৃদুমন্দ বাতাসে দুলছে! তার অস্পষ্ট আলোয় ঘরের ভিতরটাও মোহময় করে তুলেছে! শুধু দেখলাম সদর দরজাটা হাট করে খুলে গেছে! শুন্য আলমারির মাথায় তাকালাম! একটা টিকটিকি ধীরস্থির ভাবে কি একটা পর্যবেক্ষণ করে চলেছে!
- বাবা! কি করছ?
- বাবান! ঘুম ভাঙল?
- হ্যাঁ! তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছ?
- তোর মায়ের সাথে কথা বলছিলাম!
- মা এসেছিল? কই আমাকে তো ডাকলে না! কোথায় মা?
- দেখবি?
- হ্যাঁ!
- আয় আমার সাথে!
ছেলেকে সাথে করে নিয়ে আস্তে আস্তে ব্যালকনিতে দাঁড়ালাম! গোটা পাড়াটা ঘুমাচ্ছে তখনো! পশ্চিম আকাশে জ্বলজ্বল করছে একটা নিঃসঙ্গ শুকতারা! সেই সূদুরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম - ওই দেখ বাবান! মা ওইখানে আছে! ওখান থেকে প্রতিদিন আমাদের নজর রাখে!
বাবানের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম হালকা একটা অভিমানের বাষ্প জমেছে! ঠিক তখনই খেয়াল করলাম বাবানের কপালে একটা অস্পষ্ট হালকা লিপস্টিক এর দাগ! ডানহাতের তালু দিয়ে সস্নেহে মুছে দিতে দিতে শূন্য ঘরটার দিকে তাকালাম! সত্যিই তো খোলস! এই খোলস ছাড়িয়ে মাথার উপর এত বড় ভালবাসার আকাশ! ঋতু আসে ঋতু যায়! ভালোবাসার সীমানা তো কমেনি! শুকতারাটা জ্বলজ্বল করে উঠল আকাশপটে! দূরের প্যান্ডেল থেকে ভেসে আসতে লাগল মায়ের আরাধনার মন্ত্রোচ্চারণ! আঁধার দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল ক্রমশ........!
সমাপ্ত
- না বাবা! ঘুম আসছেনা!
- কেন রে? বোমের আওয়াজে ভয় পেলি?
- নাহ! আচ্ছা বাবা আজ তো ভুত চতুর্দশী তাই না?
- হুম!
- আজকের দিনে কি হয়?
- বাবান! ঘুমা না! রাত কত হল খেয়াল আছে তোর?
- জানতাম তুমি বলবেনা বাপি! মা থাকলে সব বলতো আমাকে!
ঠিক এই সময়ে আলমারির উপর থেকে খিলখিল করে একটা হাসির আওয়াজ ভেসে এল! আগে এই আওয়াজ শুনলে গায়ে কাঁটা দিত! এখন আর দেয় না! বরং মনে কিরকম একটা নিশ্চিন্তি ভাব আসে!
অবোধ প্রাণীটি কে বুকের কাছে টেনে নিয়ে শুধালাম - কেন রে? তোকে শুধু মা ই ভালবাসতো? আমি বাসি না?
- বাপি তুমি ই তো আমার সব!.....ছোট্ট হাতে গলা জড়িয়ে ধরে বাবান! সাথে মা যদি....
- আজকের দিনে তেনারা নেমে আসেন পৃথিবী তে!
- কারা বাপি?
- মৃত মানুষের আত্মা রা!
- কেন?
- দেখতে তাদের প্রিয় মানুষ রা কেমন আছে?
- বাপি! তারা এভাবে চলে যায় কেন? সারাজীবন কাছে থাকলেই তো জানতে পারে তাদের প্রিয় মানুষের কথা!
আমি কোন উত্তর দিলাম না! জীবনে এটাই দেখে এসেছি যে কিছু কিছু প্রশ্নের সত্যি কোন জবাব হয়না! এই একরত্তি ছেলের প্রশ্ন যদি বিধাতা শুনত তাহলে এত তাড়াতাড়ি বউ টাকে তুলে নিত না! অনু আজ বছর দুই হল আমাদের ছেড়ে চলে গেছে! ভাল নাম অনামিকা! আমিই ভালবেসে ডাকতাম অনু বলে! আজকের এই অভিশপ্ত দিনে শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবান অনুকে নিয়ে ফিরছিলাম বাসে করে! গন্তব্য আসতে ছেলেকে নিয়ে নেমে যেতেই খেয়াল হল বৌ তো বাসেই রয়ে গেছে! দুই পা এগোতেই ঘটে গেল সেই হাড়হিম ঘটনাটি! দেখলাম অনু তড়িঘড়ি চলন্ত বাস থেকে নামতে যাচ্ছে! পিছনে শাড়ির আঁচল টা আরেকজনের পায়ের তলায়! ব্যাপার টা বোঝার আগেই বাসের বাইরে এগিয়ে দেওয়া অনুর শরীর টা নিমেষে বাসের দুই চাকার মধ্যে ঢুকে গেল! একটা মৃদু ফট করে আওয়াজ হল! ঝাপসা চোখের সামনে দেখলাম ৩৪ নং জাতীয় সড়ক আমার ভালবাসার রঙে মাখামাখি হয়ে গেল! একটা শাঁখা পড়া হাত আমাদের দিকে মুষ্টিবদ্ধ হয়েই চিরকালের মত নিথর হয়ে গেল! তারপর আর কিছু মনে নেই আমার!
কতক্ষণ পর জ্ঞান ফিরেছিল মনে নেই! তবে হাসপাতালের বেডে শুয়ে বাবানের বিহ্বল চোখ দুখানি দেখে মনটাকে শক্ত করে নিয়েছিলাম! জীবনের এখনো অনেকটা পথ বাকি! ছেলেটাকে মানুষ করতে হবে তো!
- বাব্বাহ! বাবু তো দেখছি চিন্তার সাগরে ডুব দিলেন!
আচমকা একটা মেয়েলি কন্ঠে চিন্তাজাল ছিঁড়ে যায়! পরক্ষণেই মুচকি হেসে বলি
- এসেছ? তোমার কথাই ভাবছিলাম গো!
- সেদিন যদি আমার কথা ভাবতে! কথাটা কিরকম দীর্ঘশ্বাস এর মতন শোনায়!
- এরকমভাবে বলোনা অনু! নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়!
- থাক! খুব হয়েছে! কেমন আছ?
- সত্যি বললে কি বিশ্বাস করবে?
- ছাড়ো! এখন সবই বুঝতে পারি! আগে কি এত বুঝতাম ছাই?
আধো আলো অন্ধকারে অস্পষ্ট ঠাহর করলাম আলমারির মাথায় একটা অস্পষ্ট নারীশরীর বসে বসে পা দোলাচ্ছে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গি তে!
বাবানের কান বাঁচিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বললাম
- একটু পাশে এসে বসো না! কতদিন তোমার গায়ের গন্ধ নিইনি! আচ্ছা সেই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি টা এখনো মাখো!
- ঢং! আর পারি না বাপু! সরো সরো! একটু ছেলের পাশে শুতে দাও! বেচারা সারাদিন মা মা করে মরে যায়!
অগত্যা সেই ছায়া শরীরীণি কে পাশ দিলাম! আড় চোখে দেখলাম বাবানের মাথার চুল গুলো একটা অদৃশ্য স্নেহস্পর্শে নড়ে উঠল! বাবানের চোখ বেয়ে কখন নিজের অজান্তে বেরিয়ে এল দু ফোঁটা চোখের জল! বাইরে ঝোলান টুনির আলোয় তা চকমক করে উঠল!
ছায়া কায়া প্রেম বাৎসল্য সব মিথ্যে বলে মনে হয় মাঝে মাঝে! ঘরের বিষণ্ণ নিঃস্তব্ধতা আস্তে আস্তে গ্রাস করতে থাকে বাইরে ঝোলানো টুনির মড়া আলো! অনেক্ষণ পর নিস্তব্ধতা ভেঙে আমার মৃতা সঙ্গিনী কে শুধালাম- অনু? তুমি কি ভাল আছ ওপারে গিয়ে?
- তোমার কি মনে হয়?
- মনে হয় ভালই আছ!
- তোমার মাথা! সেই ঢেঁকিই রয়ে গেলে!
- কেন?
- না গো! তোমাদের ঘিরে একটা অদৃশ্য টানে পড়ে রয়েছি! যেতে পারিনা কোথাও!
প্রতিদিন আসি,দেখি ভুলে ভরা সংসার! বাবান অংকে ভুল করলে তুমি মেড ইজি টা পাশে নিয়ে বস! হাসিও পায় কষ্ট ও লাগে!
- তুমি প্রতিদিন আমাদের দেখো? কই কিছু টের তো পাই না!
- আমি ধরা দিই না! এই জানো তোমার মা বাবাকে দেখলাম! দিব্যি সুখে আছেন ওনারা! আমাকে প্রথম দিন দেখেই তো তোমার মা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন! আমি বাধা দিই নি! কাঁদলে নাকি মন হালকা হয়!
- অনু!
- উঁ!
- আমাকে নিয়ে যাওনা নিজের কাছে! আর একাএকা এভাবে পারছি না!
- অরি!! এত স্বার্থপরের মত কথাটা বলতে পারলে? আমাদের বাবান কি দোষ করল? আমার সঙ্গ লাভের জন্য ছেলেটাকে অনাথ করে দিচ্ছ! আমি আর আসব না! যাও! কথা বন্ধ!
- অনু যেও না! যেও না প্লিজ! অন্ধকার ঘরে পাগলের মত হাতড়ে বেড়াই অদৃশ্য ভালোবাসাকে ধরার জন্য! হাতের মধ্যে শুধু একরাশ ঠাণ্ডা নিঃসীম অন্ধকার খেলে যায়! বুকের ভেতরটা কান্নায় ফেটে যায় আমার! আস্তে আস্তে বাবানের ঘাড়ের চুলগুলো সরিয়ে ঘাড়ের কাছে আলতো মুখ রেখে শুয়ে পড়লাম! ছেলের গায়ের এই গন্ধটা আমার বড্ড বেশি করে অনুর কথা মনে পড়িয়ে দেয়! সত্যি তো! আমিও দুনিয়া থেকে চলে গেলে বাবান তো অসহায় হয়ে পড়বে!বউ তো ঠিকই বলছিল! আমার বউটা বড্ড বেশি অভিমানী! না হয় বলেই ফেলেছি! আরেকটু সময় থাকলে কি হত?
- কি গো ঘুমালে? আচমকা ঘাড়ের কাছে একটা ফ্যাঁস ফেঁসে কন্ঠ শোনা গেল!
- না! একটু অভিমানেই জবাব দিলাম!
- রাগ কোরোনা গো! আমার অভিমান টা বেঁচে থাকতেও বোঝোনি! যাক ছাড়ো!
- অনু! তুমি যদি চলেই যাবে তাহলে কেন এসেছিলে আমার জীবনে? কেন ফুলের মত সাজিয়ে শেষে শ্মশান করে দিয়ে চলে গেলে?
- হয়ত ভালোবাসা আরো বেশি করে জীইয়ে রাখার জন্য!
- পাগলি তুমি অনু! নশ্বর শরীর টা ইলেক্ট্রিক চুল্লী তে ঢুকে যেতে দেখেছি আমি! ছাই হয়ে গেলে দেখতে দেখতে! এরপরেও ভালবাসা জীইয়ে রাখার কথা বল?
- তুমি তো আজও আমাকে ভালবাসো! খেয়াল করলাম মুখের সামনে অস্পষ্ট একটা নারীমুখ প্রকট হচ্ছে ধীরে ধীরে!
- হ্যা বাসি তো?
- বেঁচে থাকলে এত বাসতে আমায়? আবার খিলখিল হাসির আওয়াজ টা পাওয়া গেল!
- বাসিনি? বাসিনি তোমাকে? মাথায় আগুন ধরে গেল!
- এই আস্তে কি করছ? বাবানের ঘুম ভেঙে গেল যে!
- আগে বল এই ভাবে আমাকে একা ফেলে কেন গেলে?
- অরি! নিয়তি ছিল সেদিনের ঘটনা! শরীরটা খোলস! সাপের শীতঘুমের মতন! খোলস পালটায়! টান নয়!
- বাবা! এত দার্শনিক কবে থেকে হলে?
- মরেছি বলেই জেনেছি! আমি যাই! আবার আসব! আর হ্যাঁ! বাবান কে নিয়ে একটু বেরিয়ে আসবে! ছেলে আমার একটু কালীপূজার আলোকসজ্জা দেখুক!
- তুমিও চল না!
- মরণ! আমাদের আলো সহ্য হয় না জানোনা! সরো! ছেলেটাকে একটু চুমু খাই! বাপ হয়েছ! ছেলেটার পিঠে একটু সাবান দিয়ে দিতে পারনা! নরম পিঠটার কি অবস্থা হয়েছে!
- আচ্ছা দিয়ে দেব খন!
- চলি!
- আবার আসবে তো!
- যদি না আসি!
- আসবেই জানি!
- ইঃ! কত জানে! হি হি! অরি! আরেকটা বিয়ে করে নাও! আমিও সতীনের সংসার দেখি!
- না আমি আর বিয়ের কথা ভাবব না!
দুউউউমমম!!!!.......আচমকা বোমের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল আমার! বাইরের ঝোলান টুনিগুলো মৃদুমন্দ বাতাসে দুলছে! তার অস্পষ্ট আলোয় ঘরের ভিতরটাও মোহময় করে তুলেছে! শুধু দেখলাম সদর দরজাটা হাট করে খুলে গেছে! শুন্য আলমারির মাথায় তাকালাম! একটা টিকটিকি ধীরস্থির ভাবে কি একটা পর্যবেক্ষণ করে চলেছে!
- বাবা! কি করছ?
- বাবান! ঘুম ভাঙল?
- হ্যাঁ! তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছ?
- তোর মায়ের সাথে কথা বলছিলাম!
- মা এসেছিল? কই আমাকে তো ডাকলে না! কোথায় মা?
- দেখবি?
- হ্যাঁ!
- আয় আমার সাথে!
ছেলেকে সাথে করে নিয়ে আস্তে আস্তে ব্যালকনিতে দাঁড়ালাম! গোটা পাড়াটা ঘুমাচ্ছে তখনো! পশ্চিম আকাশে জ্বলজ্বল করছে একটা নিঃসঙ্গ শুকতারা! সেই সূদুরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম - ওই দেখ বাবান! মা ওইখানে আছে! ওখান থেকে প্রতিদিন আমাদের নজর রাখে!
বাবানের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম হালকা একটা অভিমানের বাষ্প জমেছে! ঠিক তখনই খেয়াল করলাম বাবানের কপালে একটা অস্পষ্ট হালকা লিপস্টিক এর দাগ! ডানহাতের তালু দিয়ে সস্নেহে মুছে দিতে দিতে শূন্য ঘরটার দিকে তাকালাম! সত্যিই তো খোলস! এই খোলস ছাড়িয়ে মাথার উপর এত বড় ভালবাসার আকাশ! ঋতু আসে ঋতু যায়! ভালোবাসার সীমানা তো কমেনি! শুকতারাটা জ্বলজ্বল করে উঠল আকাশপটে! দূরের প্যান্ডেল থেকে ভেসে আসতে লাগল মায়ের আরাধনার মন্ত্রোচ্চারণ! আঁধার দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল ক্রমশ........!
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment