মায়ের শবটা যতক্ষণ ইলেক্ট্রিক চুল্লীতে না ঢুকছে ততক্ষণ মায়ের শান্ত নিমীলিত দুটি চোখের দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিল রঞ্জন! গতরাতেও মায়ের মাথায় সে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল! নাকের অক্সিজেন মাস্কটা কাঁপা কাঁপা হাতে খুলতে চেয়েছিল মা! পারেনি! রঞ্জনই তাড়াতাড়ি কাছে এসে মায়ের অক্সিজেন মাস্কটা খুলে দিয়েছিল! ঘাড়ের কাছে হাতটা নিয়ে মুখটা কানের কাছে নিয়ে যেতেই শুনতে পেল মা ফিসফিস করে বলছে- বাবু! খালি পেটে থাকবি না! খাবার খেয়ে নিস! নিজের প্রতি যত্ন নিস! দিদির সাথে মারামারি করবি না! আমি তোর পাশেই থাকব! চিন্তা করবি না বাবু! আর তোদের বাবাকে বলে দিবি মা কিন্তু সব নজরে রাখছে! সে যেন নিজের যত্ন নেয়……! একসঙ্গে এত গুলো কথা বলে মা যেন হাঁফাতে লাগল! রঞ্জন উঠে বাবাকে ডাকতে যাচ্ছিল মা তার হাত চেপে ধরে থামিয়ে দেয়! রঞ্জন আস্তে আস্তে মায়ের পাশে বসে পড়ে! তার বুক ফেটে এক অব্যক্ত কান্না বেরিয়ে পড়তে চাইছিল কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছিল! দেখতে দেখতে মায়ের শীর্ণ শরীর টা অন্তিম হেঁচকি দিয়েই চিরকালের মত নিথর হয়ে গেছিল!সেই নিথর শরীরটা আস্তে আস্তে চুল্লীর প্লেটে ঢুকে যাচ্ছে হিট চেম্বারে! এরপর থেকে এই নশ্বর শরীরটাকে সে আর কোথাও কোনোদিনো দেখবে না! একটা রিক্ত শূন্য যন্ত্রণা রঞ্জন কে কুড়ে কুড়ে খেতে শুরু করল! তার মনে পড়ে যাচ্ছে আজ থেকে একবছর আগের একদিন…...রেজাল্ট আউট হয়েছে রঞ্জন আর দীপার! রঞ্জন দীপার থেকে এক ক্লাস নীচে পড়ে! দীপা ফার্স্ট হয়েছে আর রঞ্জনের রেজাল্টে লাল কালিতে জ্বল জ্বল করছে F-A-I-L-E-D লেখাটি! মনে আছে রেজাল্ট নিয়ে সে সটান মায়ের ঘরে ঢুকে মায়ের বুকে আছড়ে পড়েছিল! মনে আছে মা তার মাথায় অনেক ক্ষণ হাত বুলিয়ে দিয়েছিল! তারপর নরম স্বরে জলে ভেজা মুখখানি দুইহাতের তালুবন্দী করে বলেছিল- রঞ্জু তুই কাগজের পরীক্ষায় আজ ফেল করেছিস বলে কাঁদছিস! জীবনের পরীক্ষায় কখনো হেরে যাসনা বাবু! খুব কষ্ট সেদিন আমি পাব! কথা দে তুই পরের বার ভাল ফল করবি!.....কথা রেখেছিল রঞ্জু! না! বার্ষিক পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়নি! তবে সব বিষয়ে প্রশংসনীয় নম্বর পেয়ে চতুর্থ স্থান দখল করে রেজাল্ট নিয়ে ফেরার সময়ে তার মনটা এক ভরপুর খুশিতে ভরে গিয়েছিল! ভেবেছিল বাড়ি ফিরে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাকে বলবে - এই দেখো মা! আমি পেড়েছি! কিন্তু গলির মুখে বহু মানুষের ভিড় তার দ্রুত আনন্দিত পায়ে চলার গতিকে কেমন যেন মন্থর করে দিয়েছিল! রঞ্জুর মনের মধ্যে একটা আশংকা দানা বাঁধছিল। তার মা ঠিক আছে তো? মায়ের শরীর টা ইদানীং খুব একটা ভাল যাচ্ছিল না! কিন্তু যখন সে তার মায়ের সংজ্ঞাহীন শরীর টাকে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে নিয়ে যেতে দেখেছিল তখন তার স্খলিত হাত থেকে রেজাল্ট টি মাটিতে পড়ে গিয়েছিল! মা তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে এই ব্যাপারটি সে সত্যি মেনে নিতে পারেনি!
- রঞ্জন! বাড়ি চল বাবা! আচমকা বাবার কন্ঠস্বরে ভাবনায় ছেদ পড়ে সদ্য মা হারা ছেলেটির! চোখ মুছে তাকিয়ে দেখে ইলেকট্রিক চুল্লীর প্লেট টি একরাশ শূন্যতা নিয়ে পড়ে রয়েছে! একটু আগে যেখান দিয়ে তার মা চিরকালের মত ঢুকে গেছে অগ্নি গর্ভে.....পঞ্চভুতে বিলীন হয়ে গেছে নশ্বর শরীর টা! তার। বুকের ভিতর টা ফাটিয়ে যেন শুন্য বাতাস বেরিয়ে গেল একটা! বোবা ধরা গলায় শুধু অস্ফুটে বলে উঠল
- বাপি! মা......!
বাবা কিছু না বলে ডান হাত দিয়ে ধরা একটি সরা বাঁধা কলসি দেখিয়ে দেয় রঞ্জন কে! রঞ্জন পাগলের মত সেই কলসিটি বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে! কলসের গনগনে আঁচ সে টের পায় বুকের পাঁজরে! মা বেঁচে আছে তার এই আঁচের মধ্যে! এই আঁচ সে ঠান্ডায় কুঁকড়ে গিয়েও কতবার অনুভব করেছে মায়ের আঁচলে! আজ যেন তার মা যেতে যেতেও ভালবাসার শেষ চিহ্ন টুকু দিয়ে যাচ্ছে তার প্রতি! চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল সে! আড়চোখে দেখল তার দিদি দীপা একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে গঙ্গার ঘোলা জলের মাতনের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে! ভাইকে এদিকে আসতে দেখে সে আড়ালে চোখের জল ওড়না দিয়ে মুছে নেয়! তারপর মুখে কৃত্রিম হাসি এনে ভাইকে বলে
- চল ভাই! এখানকার কাজ তো সব শেষ! বলতে বলতে তার চোখ যায় ভাইয়ের হাতে ধরা কলসিটির দিকে! শুধু অস্ফুটে বলে ওঠে...... মা!
নদীর কুলু কুলু ধ্বনি যেন অট্টহাস্য করে ওঠে.......আমি আছি!......
দুই ভাই বোনে মিলে কলসটিকে উপুড় করে দেয় গঙ্গায়! মায়ের অস্থির ভস্মের সাথে নাভিকুন্ডটিও চিরকালের মত বিলীন হয়ে যায় নদীর জলে! দীপা শুধু অস্ফুটভাবে বলে ওঠে আবার এসো মা!...........আচমকা সে যেন কানের পাশে কার কণ্ঠস্বর শুনতে পায়! পরিষ্কার শোনে কে যেন বলে ওঠে.........আসব!!
আজ কেটে গেছে প্রায় তিন বছর! রঞ্জন আজো প্রতিক্ষণে অনুভব করে এক অশরীরী সত্তা সবসময় তাকে নজরে রাখছে! সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় কি করে জানি জুতোর ফিতেটা খুলে যায় রঞ্জনের! রাস্তার মধ্যেই উবু হয়ে বসে জুতোর ফিতেটা বাঁধছিল! পিছনে সে খেয়াল ও করেনি ছুটে আসছে চার চাকার এক মৃত্যুদূত! জীবন মৃত্যুর মাঝের ফারাক যখন চারফুট তখন সে আচমকা অনুভব করল মাটি থেকে তার শরীর টা দুই ফুট শুন্যে উঠেই ছিটকে পড়ল রাস্তার পাশের নরম ঘাসের জমিতে! সেই সঙ্গেই সে নাকে পেল তার আজন্ম পরিচিত সেই ঘ্রাণ...তার মায়ের!! রাস্তার লোকগুলো যখন ড্রাইভার কে টেনে নামাতে ব্যস্ত তখন রঞ্জন চুপিসারে জায়গাটা ত্যাগ করে চলে আসে! বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু না বলে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়! তারপর দেওয়ালে ঝোলান মায়ের ফোটোর দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে! কি সুন্দর দেখতে ছিল তার মা কে! টিকোলো নাক আর চেরা দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে সে সমস্ত ব্যাথা বেদনা ভুলে যেত! আজো সে ভুলে যাচ্ছে! মৃত্যু এতকাছে এসেও তাকে ছুঁতে পারলনা তার মায়ের জন্য! ভাবতে ভাবতে কখন তন্ময় হয়ে গেছে নিজেরো খেয়াল নেই.......আচমকা খেয়াল করল মায়ের ফোটোতে মায়ের মুখের পাশে আবছা কার মুখ নাড়াচাড়া করছে! ভাল করে তাকিয়ে সে কিছুই দেখতে পায়না! চিৎকার করে বলে ওঠে...... মা! কাছে এস মা! তোমাকে একটিবারের মত দেখব! বড় বাড়িটার আনাচেকানাচে তার চিৎকার প্রতিধ্বনি হয়ে মিলিয়ে যায়! সে ঠিক করল মা কে সে ডাকবেই! সুক্ষ্ম জগৎ থেকে পার্থিব জগতে বিদেহী আত্মার সাথে যোগাযোগের একটিই মাধ্যম! প্ল্যানচেট!!!! মনে মনে ঠিক করে নেয় দিদিকে সে আজই জানাবে! দিদির ঘরের দিকে যেতেই একটা জিনিষ দেখে থমকে যায়! দেখে দিদি ডাইনিং রুমে কাঁধ থেকে ব্যাগ টা মেঝেতে ফেলে দিয়ে থর থর করে কাঁপছে! ব্যাপারটা কিছু বুঝতে না পেরে দিদির কাঁধে হাত রাখে! দিদি চমকে উঠে রঞ্জনের দিকে তাকাতেই সে লক্ষ করল দিদির সালোয়ারের
পিছন দিকটা অনেকটা ছেঁড়া! বুকটা ধক করে উঠল তার! দিদি কাঁপতে কাঁপতে তাকে আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা খুলে বলল! আজ কলেজে দীপার ক্লাস করে ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেছিল! বড় চৌ রাস্তার মোড়ে তাকে যখন বাস টা নামিয়ে দিয়ে যায় তখন সন্ধের আঁধার ঘনিয়ে এসেছে! আচমকা দীপা লক্ষ করল কয়েকটা বখাটে ছোকরা তার পিছু নিয়েছে! ছেলেগুলিকে কয়েকদিন ধরেই তার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখত! আজ শিকার নাগালে পেয়েছে তারা! ভাবতেই দীপার রক্ত হিম হয়ে যায়! তাড়াতাড়ি পা চালাতেই অতর্কিতে তারা দীপাকে ঘিরে ধরে! একজন আচমকা পিছন থেকে দীপাকে জড়িয়ে ধরে সালোয়ার টা এক হেঁচকায় বেশ খানিক টা ছিঁড়ে দেয়! লজ্জায় অপমানিত আতংকিত মা মরা মেয়েটি থরথর করে কাঁপতে থাকে! শুধু অস্ফুটে বলে ওঠে-..... মাগো!
সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে একটা দমকা বাতাস এসে পিছনের শয়তান টাকে ছিটকে ফেলে দেয়! বাকিরা হতভম্ব হয়ে একটু দূরে সরে যায়! হতবাক হয়ে দেখে ছেলেটার শরীর টা একটা পরিত্যক্ত দোকানঘরের পাশে জমিয়ে রাখা কাঁচের স্তুপের উপর পড়েছে! সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত! দীপার নাকে এল সেই ঘ্রাণ! সে আচমকা অনুভব করল কপালের অবিন্যস্ত চুল গুলো কে যেন সরিয়ে ঠিক করে দিচ্ছে! সারা শরীর এক অদ্ভুত মোহে আচ্ছন্ন হয়ে গেল দীপার! কি করে যে বাড়ি পৌছালো তার মনে নেই! এই ঘটনা শুনে রঞ্জন থম মেরে যায়! কি বলবে সে দিদি কে?! সে নিজেই তো মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে! আর সেটা সম্ভব হয়েছে পরোলোক গতা মায়ের জন্যই! মা কে একবার নিজের চোখে সে দেখবেই! বুকে অনেক অভিমান জমে আছে তার! সবাই স্কুলে তাদের মায়ের হাতের টিফিন খায়! কিন্তু সে কি দোষ করেছিল? সেও তো মায়ের হাতের রান্নার কাঙাল ছিল! ভগবান এভাবে কেড়ে নিল তার মা কে???? রঞ্জন আজও মনে মনে ভাবে তার মা তাকে ছেড়ে কোথাও যায় নি! কাছেই আছে! মা কে আরেক বার সে দেখবেই!
- ভাই! মা থাকলে এরকম হত না তাই না রে!
- কি ভরসা দেবে রঞ্জন তার দিদিকে! এই একরত্তি ছেলেটি সংসারের অভিঘাতে যেন অনেক বুড়ো হয়ে গেছে! বলল
- হ্যারে দিদি! মা থাকলে আজ অন্যরকম হত!
- মা তোকে খুব ভালবাসত ভাই!
- তোকেও তো রে দিদি! জানিস তুই যেদিন রেজাল্ট ভাল করলি সেদিন মা নিজের হাতে করে পায়েস রেঁধে খাইয়েছিল সবাইকে!
- জানিরে ভাই জানি! মা আমাদের সবাইকে নিয়ে জড়িয়ে বাঁচতে চেয়েছিল......
- দিদি একটা কাজ করি চল! বাপিকে বলে প্ল্যানচেটের ব্যাবস্থা করি!
- তুই প্ল্যানচেটে মা কে ডাকবি? রঞ্জনের গলায় অবিশ্বাস আর ভয়!
- ভয় পাস না রে! মা তো! কোন ক্ষতি হবে না আমাদের দেখে নিস!
- চল তাহলে! বাপিকে জানাই!
দুই ভাইবোন অতঃপর বাবাকে আনূপূর্বিক সমস্ত ঘটনা খুলে বলে! শুনতে শুনতে সমরেশের চোয়াল কঠিন হয়ে ওঠে! পরমূহুর্তেই তার চোখের কোণ জলে ভরে ওঠে! কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ায় স্ত্রীর ফোটোর সামনে! চিৎকার করে বলে ওঠে
- একি দিন দেখালে আমায় মিনতি? অসহায় ছেলে মেয়ে গুলোর সামনে আমার মজা দেখছ তুমি? ফিরে এস! প্লিজ! দোহাই তোমার!.....
কেউ এল না! দেখা দিল না! শুধু পরদাগুলো কোন এক অশরীরী হাওয়ায় উড়তে লাগল ঘরময়!!
সমরেশ কাঁপতে কাঁপতে পুনরায় সোফায় এসে বসে পড়ে! দুই ছেলেমেয়ের অসহায় চোখের দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নেন! মায়ের ভালবাসার কাঙাল ছিল এই দুই সন্তান! সেটা সমরেশ ভাল ভাবেই জানতেন! তাও স্ত্রীর চিকিৎসা তিনি ভাল কোন নার্সিংহোম এ করাতে চান নি! সেই অপরাধ এখন তাঁকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে! তাদের মা কে তারা দেখতে চাইছে! কাছে পেতে চাইছে! তিনি একসময় বহু প্ল্যানচেট করেছিলেন কলেজ লাইফে বন্ধুদের সাথে! কিন্তু আজ তাঁর রক্ত সময়ের সাথে সাথে শীতল হয়ে এসেছে! তিনি কি ভাবে এই গুরু দায়িত্ব সামলাবেন ভেবে পান না!
- বাপি! মা আসবে তো! তুমি ডাকলে মা না করবেনা দেখো!
- আচমকা বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এল সমরেশের! অবোধ এই দুই সন্তানের কাতর প্রার্থনা কোন যুক্তি বুদ্ধির ধার ধারেনা! ছায়া ও কায়া জগতের ব্যবধান ভালোবাসার কাছে তুচ্ছ! সমরেশ আস্তে করে ছেলের চোখের জলে ভেজা মুখখানি দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বলেন
- খুব মা কে দেখতে ইচ্ছা করছে না রে?
- হ্যাঁ বাপি খুব! তুমি ডাকলে মা না এসে পারবে না!
- আচ্ছা! তাই হবে খন! তবে একটা শর্ত! তোদের দুজনার কাউকে মিডিয়াম হতে হবে! ছায়াশরীর সুক্ষ্ম জগত থেকে এসে স্থূল শরীরে আশ্রয় গ্রহণ না করলে উল্টো দিকের টানে পড়ে যাবে!
- আমি মিডিয়াম হব বাপি! সবাইকে হতবাক করে দিয়ে দীপা সশব্দে বলে ওঠে! আমি মায়ের শরীর ধারণ করব!
- বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান সমরেশ! বলে ওঠেন তুই পারবি মা?
- হ্যা বাপি খুব পারব! দীপার চোখে মুখে তখন উৎসাহ! অন্ততপক্ষে মায়ের গন্ধ টা তো অনুভব করব আবার!
- ভিতরের আবহাওয়া মূহুর্তে আবার বিষণ্ণ হয়ে ওঠে! সমরেশ ঠিক করেন মিনতিকে তিনি আবার ডাকবেন! ছেলে মেয়ে দুটোর আকুতি তিনি ফেরাবেন না! তিনি দুই ভাইবোন কে নিজের ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে চুপ করে সোফায় এসে বসলেন! মনোনিবেশ দরকার! এপার ওপার দুই জগতকে তিনি বাড়ির সীমার মধ্যে ডেকে আনতে চলেছেন! তার মনের উপর কি ঝড় বইবে তিনি আন্দাজ করে শিউরে উঠেন!
সমরেশের মনে পড়ে যাচ্ছে আজ থেকে অনেক বছর আগের একটা দিন! একটা ঘরের মধ্যে তারা কলেজের কয়েকজন বন্ধু! একজন বান্ধবী ও আছে তাদের মাঝে! নামটা আবছা মনে পড়ছে সমরেশের! শিল্পী!! হ্যাঁ.....শিল্পীই তো! প্ল্যানচেটের উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছিল তারা এক বন্ধুর মেসে! শিল্পী বারবার সমরেশের হাত ধরে অনুরোধ করেছিল এইসব কাজ না করতে! সমরেশ তা শোনেনি! শিল্পীও অনড় ছিল সমরেশকে কিছুতেই একা ছাড়বেনা সে! অতঃপর মেসবাড়িতে তারা বসেছিল প্ল্যানচেটে! সামনের টেবিলে একটা অর্ধবৃত্তাকার বোর্ডের মধ্যে বসান মোমের আলো সেই ঘরটিকে ভৌতিক করে তুলেছিল! মোমটিকে ঘিরে চার জনে পরস্পরের হাত ধরে নীরবে ধ্যান করে যাচ্ছিল অশরীরী আগমনের অপেক্ষায়! সমরেশ অনুভব করেছিল শিল্পীর ভয়কম্পিত নরম হাতখানি আস্তে আস্তে চেপে ধরছিল সমরেশের পেশিবহুল হাতটিকে! সেইদিন থেকে মেয়েটির উপর কেমন যেন ভাল লাগা ছুঁয়ে গেছিল সমরেশকে! এরপর থেকে কলেজে রাস্তায় সিনেমাহলে দুইজনকে পাশাপাশি দেখা যেত! এই নিয়ে বন্ধুরা কম ঠাট্টা ইয়ার্কি মারেনি! কিন্তু বিধাতা মনে হয় দুজনের প্রেম পরিণতি এক পথে এসে মেলান নি! সমরেশের বাবার প্রবল আপত্তি ছিল এই ভালবাসায়! মনে আছে সমরেশের সেদিন বাবার রাগে ফুঁসে শাসিয়েছিলেন যে তিনি যদি এই সম্পর্ক মেনে না নেন তবে তিনি গৃহত্যাগী হবেন! বলা রঞ্জনের দাদু তা ভালভাবে মেনে নিতে পারেন নি! ছেলের এহেন উন্নাসিকতায় আচমকা তাঁর হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যায়! মনে পড়ে বাবা তাঁর হাত ধরে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছিল সে যেন শিল্পী কে ছেড়ে তাঁর বাল্যবন্ধুর মেয়ে মিনতিকেই বিবাহ করে! ছেলের উত্তরের অপেক্ষা রাখেনি মানুষ টা! আস্তে আস্তে দীর্ঘ শরীরটা একটা মোচড় দিয়েই নিথর হয়ে যায়! জনকশূন্য এই পৃথিবীতে সত্যিই খুব অসহায় পড়েছিল সেদিন সমরেশ! পরে সে জেনেছিল শিল্পীর বাড়িতেও ছেলে দেখাশোনার কাজ এগোচ্ছে কিন্তু মেয়ে নাছোড়! সে সমরেশকেই চায়! সমরেশ তাঁর বাবাকে দেওয়া কথা রেখেছিল! মিনতিকে জীবন সঙ্গিনী হিসেবে বেছে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি সে! জীবনচর্যায় প্রেমে ভালবাসায় স্বামীত্বে পিতৃত্বে সে মিনতি কে উজাড় করে দিয়েছিল! দীপার পরে রঞ্জন যখন মিনতির গর্ভে এসেছিল সমরেশের মনে হয়েছিল সারা পৃথিবীর এবার সে অধীশ্বর হয়ে যাবে! কিন্তু বিধাতা তার ভাগ্যজাল বুনে রেখেছিল নিপুণ হাতে! মিনতি যখন সেরিব্রালে আক্রান্ত হল তখন সমরেশের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল! এই অসহায় দুই ছেলেমেয়েকে সে কিভাবে মানুষ করবে? এদের সবকিছুই তো মিনতি দেখভাল করত! সেদিন হয়ত দেবীর মত আবির্ভাব হয়েছিল শিল্পীর! সমরেশ তার চোখে দেখেছিল অভিমানের জল! কিন্তু এত কিছু ভাবার অবকাশ কোথায় তখন? পরে সে জেনেছিল শিল্পী আনন্দলোক নার্সিংহোম এ নার্সের কাজ করে! বিয়ে থা সে করেনি! বলা বাহুল্য শিল্পীই হাসপাতালে ভর্তি থেকে সমস্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছিল! কিন্তু........ কিন্তু কি একটা অপরাধবোধ সমরেশকে ধীরে ধীরে কুঁড়ে খাচ্ছিল!
.........বাবা! ও বাবা! খাবে এস! অনেক রাত হয়ে গেল! আচমকা একটা মেয়েলি কন্ঠস্বরে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয় সমরেশের! দেখে দীপা খেতে ডাকছে!
- রঞ্জু খেয়েছে?
- হ্যা বাবা! তোমার আমার খাবারটা ডাইনিং রুমে টেবিলে রাখা আছে!
- আমার খাবার টা এখানেই রেখে যা! তুই খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়!
দীপা একটু অবাক হল! মা মারা যাবার পর থেকে বাবা একরাত ও তাদের ছাড়া খায়নি! আজ কি হল আচমকা! বাবার দিকে তাকিয়ে লক্ষ করল সমরেশ মিনতি র ফোটোর দিকে তাকিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে আছে! একটু অন্যরকম লাগছে আজ তাদের বাবাকে! দীপা কিছু না বলে জায়গাটা থেকে চলে এল! মা মারা যাবার পর বাবার মনের উপর দিয়ে যে কি ঝড় বয়ে গেছে তা সে সহজেই অনুমান করতে পারে!
ডাইনিং এ ফিরে একা খেতে বসতে যাবে আচমকা চোখ গেল বড় দরজার পাশের উইন্ডস্ক্রিনটার দিকে! একটা ছায়ামূর্তি হাওয়ার স্রোতের সাথে দুলছে! তখনই ঝপ করে লোডশেডিং হয়ে গোটা বাড়িটা নৈঃশব্দ্যর অন্ধকারে ডুবে গেল! শুধু দেওয়াল ঘড়ির চলমান কাঁটাটি টিক টিক শব্দে তার উপস্থিতি জানান দিতে লাগল! দীপা আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে বাবার ঘরের দিকে এগোতে লাগল টর্চ আনতে! জমাট অন্ধকার যেন তাকে গিলে ফেলতে আসছে! তার খুব ভয় ভয় করতে লাগল! মনে পড়ে যায় লোডশেডিং হলে দীপা সোজা অন্ধকারে হাতড়ে চলে যেত তার মায়ের ঘরে। দেখত মা ভাইকে জড়িয়ে শুয়ে আছে। কিন্তু মায়ের ঘরে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত গন্ধে দীপার মন আচ্ছন্ন হয়ে যেত! অবাক হয়ে দেখত মা আরেক হাতে ইশারা করছে মেয়েকে পাশে শোবার! দীপা সন্তর্পণে মায়ের হাতটা জড়িয়ে শুয়ে পড়ত। মায়ের শরীর থেকে বেরোনো এক অদ্ভুত স্নেহ মেশানো গন্ধে দীপা কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ত!
বাবার ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দীপা কেমন যেন থমকে দাঁড়াল! বন্ধ দরজার ভিতর থেকে মৃদুকন্ঠে বাবার ফোনালাপ শুনতে পেল-
"হ্যাঁ হ্যাঁ......! সে সব নিয়ে তুমি কিছু ভেবনা!হ্যাঁ! ব্যাবস্থা করে রেখেছি! না! ওদের কিছু অসুবিধা হবেনা! ওদের জীবনে আরেকজন মায়ের খুব দরকার! তোমাকে ছাড়া আজকাল আর ভাল লাগে না! রাখছি! লভ ইয়ু সোনা!!"
- দীপা পাথরের মত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল! নিজের কানকেও সে বিশ্বাস করতে পারছিল না! বাপির জীবনে তার মা ছাড়াও আরো একজন ছিল?!!!! মায়ের ভালবাসা অন্তঃপ্রাণ মানুষটি কি সত্যি এতকাল ধরে মুখোশের অভিনয় করে এসেছে? দীপার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে! কোনমতে সে রেলিং ধরে নিজেকে সামলে নেয়। দরজা খুলে মেয়েকে দেখেই স্তম্ভিত হয়ে যায় সমরেশ! দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে বলে ওঠে
- তুই!.......তুই এই অন্ধকারে কি করছিস?
- ফোনে কে ছিল বাপি? মেয়ের ইস্পাত কঠিন কন্ঠে চমকে যান সমরেশ! আবছা আলো আঁধারে মেয়ের মুখের দিকে তাকাতেই রক্ত হিম হয়ে যায় তাঁর! দেখেন দীপার মাথার উপরে মিনতি এসে দাঁড়িয়েছে! চোখ দুটি তার দিকেই স্থির ভাবে নিবদ্ধ! আতংকের একটা চোরা স্রোত তার শিঁরদাড়া বেয়ে নেমে যেতেই আচমকা সারা বাড়ি আলোয় ভরে উঠল! কারেন্ট চলে এসেছে! সেই আলোতে ভাল করে তাকিয়ে দেখল মেয়ে দাঁড়িয়ে তার সামনে প্রশ্নভরা দৃষ্টি নিয়ে! আশেপাশে সে কাউকে দেখল না! থতমত হয়ে মেয়েকে জবাব দিয়ে বসে- কই! কেউ না তো! তুই ভুল শুনেছিস! চল আমার খাবারটা ডাইনিং এই নিয়ে যাচ্ছি! একসাথে খাব!
- ডাইনিং টেবিলে খাওয়ার সময়ে দীপা একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করল সমরেশ একবার ও তার চোখের দিকে তাকায় নি! সারাটাক্ষণ দীপার মনটা খচখচ করতে লাগল! লোডশেডিং এর সময় বাবা কার সাথে কথা বলছিলেন এত অন্তরঙ্গভাবে? দরজার পাশে দেখা ছায়াটাই বা কার ছিল? দীপার কপাল ঘেমে উঠতে লাগল! কি হচ্ছে আজ বাড়িতে? কিছু কি ঘটতে চলেছে বাড়িতে? কি হবে দুই ভাইবোনের ভবিষ্যৎ? আচমকা কোন গাছের ডালে বসে থাকা রাত পেঁচার চিৎকারে নিঃস্তব্ধতা খানখান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে! একসময়ে দুজনের খাওয়া শেষ হয়! সমরেশ খাবার টেবিলেই হাতমুখ ধুয়ে নিজের ঘরে চলে যায়! যাওয়ার সময়ে দীপাকে কিছু বলেও গেলনা! দীপা একবুক অভিমান নিয়ে এঁটো বাসন কোসন গুলো কিচেনে নিয়ে এনে ধুয়ে ফেলে! এই বাবাকে কেন জানিনা দীপা আজ চিনতে পারছে না! কাল যে করেই হোক দীপাকে প্ল্যানচেটে বসতেই হবে! দীপার মনটা আচমকা কু ডেকে ওঠে! তার মায়ের মৃত্যুটা স্বাভাবিক ছিল তো? এই কথাটা মাথায় আসতেই দীপার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে! ভাইয়ের ঘরে এসে দেখে রঞ্জন কখন ঘুমিয়ে পড়েছে! ঘুমন্ত ভাইয়ের নিষ্পাপ মুখ খানি দেখে মায়া দীপার! আস্তে আস্তে রঞ্জনের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেয় সে! দেওয়াল ঘড়িটা টিক টিক শব্দে জানান দিতে থাকে রাত কেটে ভোর হয়ে আসছে অবশেষে! ভোর রাতের দিকে কিসের একটা আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে যায় দীপার! আওয়াজ টা আসছে বাপির ঘরের দিক থেকে! এই সময়ে বাপি জেগে কি করছে? অবাক হয়ে যায় দীপা! আস্তে আস্তে খাট থেকে নেমে যায়! গোটা বাড়িটা নিঝুম অন্ধকারে ডুবে আছে! আবার দীপার কানে এল সেই আওয়াজ টা! এবার আরো পরিষ্কার! দীপার মেয়েলি কর্ণকুহর সেই আওয়াজের প্রকৃতি নির্ণয়ে ব্যর্থ হলনা! এ আওয়াজ তো রমণী কন্ঠের শীৎকার ধ্বনি! বাপি কার সাথে শরীরের আদিম খেলায় মেতেছে? দীপার মাথা ঘুরে যায়! আরো কিছুক্ষণ দম চেপে দাঁড়িয়ে থাকে সে! শীৎকার আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে! সেই সাথে বাড়তে থাকে দীপার মনে জমে থাকা পুঞ্জীভূত আক্রোশ আর ঘৃণা! তাদের মা কে বাবা ভাল বাসেই নি! নাটক করে এসেছে লোকটা! শুধু ওই মেয়েটাকে পাওয়ার জন্য!!!
দীপা মনে মনে ঠিক করে নেয় তাদের দুজনকেই এই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে! দিয়ে দুই ভাই বোন মিলে অনেক দূরে চলে যাবে! মায়ের বড় ফটোটার নীচে এসে দাঁড়ায় সে! মায়ের চোখ দুটো কি জীবন্ত লাগছে! কি অসম্ভব মায়াবী লাগছে! আস্তে আস্তে পিছন ফিরেই চমকে ওঠে সে! রঞ্জন কখন এসে দাঁড়িয়েছে তার পিছনে টেরই পায় নি সে! রঞ্জনের দুই চোখে তখন জল!
- দিদি! বাপি আমাদের চায় না রে!
- চুপ কর ভাই! আমাদের চোখের জলের দাম কেউ দেবে না! আমাদের নিজেদেরকেই যা করার করতে হবে!
- কি করবি রে দিদি?
- তুই বাইরে ওয়েট কর! আমি আসছি!
- রঞ্জন আর কথা বাড়ায় না! ধীর পদে সে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে!
দীপা আস্তে আস্তে কিচেনের দিকে পা বাড়ায়! ততক্ষণে ঘরের ভিতরের অস্বস্তিকর আওয়াজ থেমে গিয়ে নারীকন্ঠের খিলখিল হাসির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে! ঝাপসা চোখে গ্যাসের রেগুলেটর অন করে দেয় সে!
আস্তে আস্তে শোঁ শোঁ শব্দে ভরে যায় কিচেন! একটা নিষ্ঠুর হাসি খেলে যায় দীপার মুখে! মা তাদের কাছে ছিল একটা গোটা পৃথিবী! সেই পৃথিবী কে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে আজ এই কসাই অন্য নারীসুখে মগ্ন!! তার ক্ষমা নেই! আস্তে আস্তে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে ভাইয়ের হাত শক্ত করে ধরে দীপা! সাথে সাথে একটা অদৃশ্য অনুভূতি দীপাকে পেয়ে বসে! দীপার হাত খানি যেন কোন অদৃশ্য স্পর্শ এসে ধরেছে! তার সাথে সেই চির চেনা গন্ধের সুতীব্র ঘ্রাণ! আর কোন ভয় নেই তার! মায়ের ফোটো খানি সাথে নিয়ে সে হাঁটা লাগায় অজানার দিকে! ততক্ষণে তাদের পাশ কাটিয়ে তীব্রবেগে ছুটে যাচ্ছে দুখানি দমকলের গাড়ি আর একখানি অ্যাম্বুলেন্স! পূবের আকাশ তখন সুতীব্র আগুনের লেলিহান শিখা আর ভোরের আলোয় মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে....!

No comments:
Post a Comment