Monday, 15 January 2018

পথে হল দেরী



পথে হল দেরী
গল্প © অরিন্দম    নবপল্লী

আজ সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার! ১২ বাই ১২ নকুড় দত্ত লেনের শেষ মাথার বড় বাড়িটা অন্ধকারের মধ্যে কিরকম যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে! একবার ঝটিতি জানলার পর্দা তুলে আকাশ টা দেখে নিল অনির্বাণ! অবস্থা ভালো নয়! যে কোন সময় ভাসিয়ে নামবে! ব্যাজার মুখে ল্যাপটপের মাইক্রোবায়োলজির ওয়েবপেজ টা বন্ধ করতেই স্ক্রিনের উপর ভেসে ওঠে এক মায়াবী তন্বীর ফর্সা মুখ! শিউলি! অনির্বাণের মায়ের এক ছোটবেলার বান্ধবী মিলি মাসিমার বড় মেয়ে! অবশ্য ছোট মেয়েটি অত সুন্দরি না হলেও চোখ দুটি যেন ভাসা ভাসা! তিতলির সে চোখের দিকে কতদিন তাকিয়ে থাকতে থাকতে খেই হারিয়ে গিয়েছিল অনির! সম্বিৎ ফিরেছিল শিউলির ধমকে! ঠাট্টা করে বলে ফেলেছিল আমার ছোট বোন টিকে নিয়েই না হয় থাক! আমি চললাম! তিতলি লজ্জায় একদৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল সেবার! আসলে দোষ টা অনির নয়! সুন্দরের প্রতি আকর্ষন পুরুষের স্বতঃপ্রবৃত্ত! আর তাছাড়া শিউলি কোথাও গেলে তিতলিকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে ছাড়েনা!এমনকি অনি দেখেছিল ডেটিং এর প্রথম দিনে দুই বোনে গুটিসুটি মেরে পার্কের এককোণায় বসেছিল! প্রথমদিনে দুই ললনাকে একসাথে দেখে বাবুর নাভিশ্বাস ওঠার যোগাড়! যতক্ষণ অনি শিউলির ভালোবাসার উষ্ণতায় গলতে লাগল ততক্ষণ তিতলির আড়চোখে তাকানোটাও অনির নজর এড়ায়নি! সে
এক অস্বস্তিকর মূহুর্ত! তারপর ব্যাপার টা আস্তে আস্তে ধাতে সয়ে গিয়েছিল অনির! বুঝেছিল দুই বোনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, তাদের ভালোবাসার থেকেও গভীর। ব্যাপার টা ভালো না খারাপ অনি আজো বোঝেনা! শিউলি কে সত্যি অদ্ভুত লাগে অনির! প্রেম একটা ব্যাক্তিগত ব্যাপার! সেখানে ছোট বোনের সাথে সবকিছু শেয়ার করাটা অনির্বাণের বিসদৃশ ঠেকলেও শিউলিকে কিছু বলতে পারেনি সে! মেয়েটাকে সত্যি সে ভালবেসে ফেলেছে এ কয়দিনে! কিন্তু ইদানীং শিউলি অনির্বাণের সাথে ভালো করে কথাও বলছে না! ফোন করে দেখে সুইচ অফ! হোয়াটস অ্যাপেও অফলাইন অনেক দিন ধরে!

অনি কেমন যেন দিশাহারা হয়ে যায়! শিউলিকে ছাড়া সে কিরকম যেন ছন্নছাড়া ফিল করতে থাকে! কি হয়েছে মেয়েটার! এরকম বিহেভ তো কোনোদিন ও সে করেনি! আচমকা রাস্তার দিক থেকে একটা আওয়াজে অনির সম্বিৎ ফেরে! কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছে একটানা! 
জানলার পর্দাটা ঈষৎ সরিয়ে দেখল শুভজিত বাইকের উপর বসে তার নাম ধরে একটানা ডেকে চলেছে! মুশকিল টা হলো তার ডাকে সাড়া না দিলে হতভাগা একটানা বাইকের হর্ণ বাজিয়ে যাবে! সকালের আয়েশি ঘুম ভাঙলে পাড়ার লোকগুলো হয়ত হাতের কাছে যা পাবে তাই ছুঁড়ে মারবে রাস্তার ওই হতভাগাটাকে! আতংকিত হয়ে তাড়াতাড়ি জানলার পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলে ওঠে অনি- কি রে! সারা পাড়া মাথায় করবি না কি? কি হয়েছে কি?? 
- আরে গুরু! এসো আমার বাইকে! এক কুমারী র সাথে তোমার পরিচয় করাব আজ!
-কুমারী পটিয়েছিস? খুব ভাল করেছিস! অভুক্ত রেখেছিস কেন বে? খাইয়ে দে বেচারীকে সাত সকালে বাঁশ! 
- যাহ! ওরকম বলছিস বে? লাজ লাগে!
- শ্লা.......! বাকি টা মুখে আসে না অনির! ও যাচ্ছে নিজের প্রেয়সী র সাথে দেখা করতে আর এই সময়ে হতভাগা টা কোন মাছ জালে তুলেছে সেটা দেখতে চল! কোন মানে হয়? বিরক্ত হয়ে অনি বলে ওঠে
- তুই গা.....যাবি এখান থেকে?
- তুই আসবি না তাহলে?.
- আরে অ্যাপো আছে বে!
- হিপো! আর আমার টা কি হবে? 
- মাথায় তুলে নাচো! এই দেখ সময় নেই! যেতে হবে! তুই এক কাজ কর সোনা! প্লিজ বিকেলে আয়! 
-ধুর বা#$@&! 
খিস্তি টা কানে পৌছায় না অনির! শত হোক! ছোট বেলার বন্ধু তো! সব গোপন কথা শেয়ার করবে তার সাথে! এ যেন একদম তিতলির প্যারালাল ক্যারেক্টার! আজব মাইরি! ভাবতেই হাসি পেল!
- ঠিক আছে বস! বিকেলেই আসিব! যদি না পাই তোমাকে চাঁদু দেখো! ইঞ্জিন স্টার্ট করে দেয় শুভ!
- হ্যা রে বাবা আয়! স্বস্তির শ্বাস ফেলে অনি! 
ঠিক তখনই উত্তর পশ্চিম কোণ বরাবর একদমকা ঠাণ্ডা হাওয়া অনির সর্বাঙ্গে পরশ বুলিয়ে যায়! বৃষ্টি আসছে মনে হল! অনি তাড়াতাড়ি আয়নায় দেখে নিল! গালে চারদিনের না কামানো দাড়ি সারামুখে অবহেলার ছাপ ফেলেছে! মেয়েটা সত্যি বড় খামখেয়ালি! নাহলে আজকের এই বাদল দিনে কেউ দেখা করতে বলে? চার পাঁচ দিন সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে আচমকা ভোররাতে একটা মেসেজে ধরা দিল
- অনি তুমি সিংহী পার্কে এসো ৯টা নাগাদ কথা আছে! প্রথম প্রথম মেসেজ টা দেখে বুকটা ধক করে উঠেছিল বেচারার! তারপর সামলে নিয়ে তৈরি হয়ে নিচ্ছিল যাবার জন্য! তারমধ্যে এই বাগড়া! ঘড়িটা দেখল! এখনো একঘণ্টা হাতে আছে! যাক! নিশ্চিন্ত! স্নান সেরে দাড়ি কামিয়েই সে যাবে! খানিকক্ষণ খাটের উপর বসে ভিতরের উত্তেজনা টাকে একটু থিতিয়ে নেয় অনি! চোখটা একটু বুজে নেয়! মনকে পিছিয়ে নিয়ে যেতে থাকে বছর দুই আগের এক সরস্বতীপূজার দুই দিন আগের বিকেলে....
- এই রঞ্জু বাঁশ গুলো বাঁধছে কিনা ভাল করে দেখ! বাঁশ ঢিলা থাকলে না ওটা আমি তোর পিছনে....
-ও প্রণয় দা রাগ করছ কেন? গত বছর আমার কাজ তো দেখেছিলে..
- উৎপল ফুল গুলো আনতে কিন্তু একদম ভোরবেলা যাবি! আমাদের ক্লাবের পূজো বলে কথা! আমি যাই গিয়ে দেখি ঠাকুরের কি ব্যবস্থা হল! এই অনি কই রে? সকাল থেকে দেখছিনা! শুভ মর্কট টা গেল কই! এই দুটোতে যায় কোথায়? এত বড় সরস্বতীপূজা কে সামলায় অ্যাঁ! এই কটা কথা বলে প্রণয় দা হাঁপাতে থাকেন! বয়স বেড়েছে! চুলে পাক ধরেছে! সরস্বতীপূজা আসে....প্রতিবছর ই দায়িত্ব ছাড়ার কথা ভাবেন! কিন্তু হয়ে ওঠেনা! ক্লাব পাগল এই মানুষ টি বিয়ে থা পর্যন্ত করেন নি! সারাদিন এই ক্লাবটিকে ই সন্তানের মতন আগলে রাখেন! সাধ করে নাম রেখেছিলেন মৃণালিনী ক্লাব! নিজের মায়ের নামে! মা নেই....! ক্লাবে আনাচে কানাচে মায়ের গন্ধ পান যেন! কিছু বললেই বলেন- ছেলেমানুষ সব! মায়ের যত্ন সন্তান ছাড়া কে করবে?! একে একে সদস্য সংখ্যা বাড়তে বাড়তে জনা তিরিশে এসে দাঁড়িয়েছে! তাদের সাথে আছে নকুড় দত্ত লেনের গোটা পাড়া! কিন্তু অনি আর শুভর উপর দায়িত্ব ছিল মূর্তি আনার জন্য! কই গেল সে দুটো? প্রেশার বাড়তে থাকে প্রণয় দার..!!
ঠিক তখনই ক্লাবের সামনে একটা বাইক এসে দাঁড়ায়! মূর্তিমান দুজনকে নামতে দেখে প্রণয়দা চেঁচাতে থাকেন ওরে কে আছিস! আয় রে আয়! রাজা বাদশাহ এয়েচেন! হাওয়া কর! 
- এই দাদা যাঃ! এরকম করে বলছ কেন! আমরা একটু মধুমিতা র বাড়ি গেছিলাম! শুভ ব্যাজার মুখে বলে!
- কি মধু আছে ওখানে? হতচ্ছাড়া গুলো!....কত কাজ পড়ে আছে আর তোরা আমার শ্রাদ্ধ শান্তি....
আর বলতে দেয়না ওরা দুজনে! জানে প্রণয়দাকে কিভাবে ঠান্ডা করতে হবে! শুভ মাটিতে বসে পা দুটোকে জোরে জাপটে ধরে! আর অনি পিছন থেকে প্রণয়দার দুই বগলের নীচে হাত ঢুকিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে
- আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবে বুড়ো? যেতে দেব নাকি?.
তিনজনেই হেসে ওঠে রসিকতায়! অতঃপর ক্লাব সেক্রেটারির কাছ থেকে হিসাবপত্র বুঝে নিয়ে রওনা দিয়ে দেয় তারা মূর্তি আনতে!
মূর্তি কেনার জায়গায় কি ভিড় কি ভিড়! হরেক কিসিমের হরেক কালারের শাড়ি পড়া মা সরস্বতী চারদিকে......! আছে বিভিন্ন সাইজের ও! ভগবানের আকৃতিকে হাতের তেলোর চাপে বিভিন্ন আকৃতির করার সেকি প্রয়াস! এ জায়গা সে জায়গা জুড়ে মনের মত প্রতিমা তারা আর খুঁজে পায়না! যদিও রঙ পছন্দ হয় কিন্তু দাম বাজেটের বাইরে গিয়ে পড়ে, যদি দাম কম বলে দেখা যায় সে প্রতিমার মুখের গড়ন পাশের বাড়ির বৌদির মতন! বিরক্তিতে শুভ ধূলো মাখা মাটির উপরেই বসে পড়ে! অনির্বাণ ও হাল ছেড়ে দিয়ে শুভ র পাশে বিরক্তিতে বসে পড়ে! আজ নেহাত কপালে ঝাড় আছে! আচমকা দুজনেরই চোখ এক সাথে আটকে যায় মাঠের একটা কোণায়! এক ভদ্রমহিলা কারিগরের সাথে রীতিমত দামদর শুরু করে দিয়েছে! অনির মুখ থেকে অস্ফুটে বেরোল ও মাই.....! তারপর আরো কিছু হয়ত বলতে চাইছিল কিন্তু তা তালুতেই আটকে গেল! ভদ্র মহিলার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই অপ্সরী কে দেখে তাদের তখন মাথায় উঠে গিয়েছে! শুভ ফিসফিস করে বলে উঠল- অনি রে প্রতিমার জায়গায় এটাকে ফিট করে দি! দারুণ মানাবে! কি সেক্সি.....
- আবে থাম উল্লুক! আমাদের পাড়ার মিলি মাসিমার মেয়ে ওরা! মা জানতে পারলে কাঁচা খাবে! 
- ওহ তোর চেনা তাহলে...! বদন ব্যাদান করে হাফ ওঠা থেকে পুণরায় ধুলোতে বসে পড়ল শুভ! 
- ও মা! অনি তুই এখানে??! এভাবে ধুলোর মধ্যে বসে আছিস কেন বাবা? শরীর ভাল তো? 
- ইয়ে... হ্যা...মাসিমা....মানে খুঁজছিলাম!
পাশ থেকে খিক খিক শব্দে সম্বিৎ ফিরতেই দেখল মেয়ে দুটি তাদের দেখে হাসছে মুখ টিপে! অপ্রস্তুত হয়ে তারা দুজনেই ধূলোর আসন থেকে উঠে পড়ে! 
- না মাসিমা আসলে আমরা ক্লাবের প্রতিমা বায়না করতে এসেছি তো! একটা প্রতিমাও পছন্দ হচ্ছে না! বলতে বলতে খেয়াল করল ডান দিকের ফর্সা তন্বী তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে! তারপর কাঁচের মত রিনরিনে কন্ঠে বলে উঠল
- আপনি অনির্বাণ না? পাড়ার ফাংশানে আপনার গান দু একবার শুনেছি! কি অসাধারণ গান আপনি! 
অনির মনে হল পা দুটো যেন মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে যাচ্ছে! পাশ থেকে শুভ বলে উঠল - গুরু! ফাকা পোস্ট! গোল দিয়ে দাও!
অনি বজ্র দৃষ্টিতে শুভর দিকে তাকাতে যাবে বাঁ দিকের হরিণী অক্ষি মেয়েটি বলে উঠল- দিদি আমিও অনিদার গান শুনেছি! দারুণ! অনি ঘুরে তার দিকে তাকাতেই দীঘল কালো টানা দুটি চোখের দিকে সম্মোহিতের মত চেয়ে থাকল! চটকা ভাঙল মিলি মাসিমার গলার আওয়াজে! 
- ওহ অনি তোমাকে তো এদের সাথে আলাপ করানোই হয়নি! এ আমার বড়
মেয়ে শিউলি আর এ.....
- তিতলি! মা কে বলতে না দিয়ে কনিষ্ঠাটি নিজেই কলকলিয়ে বলে দেয়! অনি লক্ষ করে শিউলি তার দিকেই চেয়ে আছে একদৃষ্টে! অনির বুকের মধ্যে ড্রাম পিটছে তখন! 
- বাবা এখন আসি! তোমার মাকে বোলো বিকেলে যাব তোমাদের বাড়িতে! 
- আ..আচ্ছা! তাই বলে দেব! 
অনি দেখছে তারা জায়গাটা ছেড়ে চলে যেতে যেতেও শিউলি অনির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেই চলেছে! আচমকা যে ঘটনাটা ঘটল তার জন্য প্রস্তুত সে ছিলনা মোটেই! আচমকা তার ডান দিকের হাতে টান পড়তেই দেখল তিতলি তার হাতে নিজের নরম হাতটি ঢুকিয়ে একটা ছোট চিরকুট দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল- অনি দা আজ রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তুমি দিদিকে ফোন কোরো! 
অনির মনের অবস্থা তখন শোচনীয়! শুভ ফ্যালফ্যাল করে গোটা চিত্রনাট্য বেমালুম হজম করে গেল!
- এই অনি! অনি! কি ভাবছিস তুই! শরীর খারাপ লাগছে নাকি! এই। অনি......
অনি হঠাৎ ধড়মড়িয়ে উঠে বসে! ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে! আচমকা উঠে পড়ায় সে ঠাহর করতে পারছিল না সেই ধুলোর উপরেই বসে আছে নাকি নিজের ঘরে!একটু ধাতস্থ হতে মাথার ভিতর থেকে অন্ধকার টা আস্তে আস্তে কাটতে লাগল! কিন্তু বাইরের মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকার ঘরের ভিতরেও পুরোপুরি ঢুকে পড়েছে!
- কি রে বাবু! অবেলায় অন্ধকারে শুয়ে ঘুমাচ্ছিস কেন? শরীর খারাপ হল নাকি?
- না মা! কিছু না! আমাকে একটু বেরোতে হবে! ফিরে আসব! চিন্তা কোরোনা!
- সে কিরে! এই বৃষ্টি বাদলায় কোথায় যাবি তুই?
- চিন্তা কোরোনা! চলে আসব! 
অনি ঘড়ি দেখল! এখন আর স্নান বা শেভ করার সময় টুকু নেই! সময় টুকু চলে গিয়েছে স্বপ্নের অতীত স্মৃতিচারণায়! দেরী না করে গায়ে গায়ে ডেনিমের ফুল স্লিভ জ্যাকেট টা গলিয়ে একটা ডিপ নেভি ব্লু জিনস পড়ে নেয়! পার্ক অ্যাভিনিউ এর বডি স্প্রে টা ঝটিতি দিয়েই বেরিয়ে পড়ে পার্কের উদ্দেশ্যে! এক অমোঘ আকর্ষণের প্রতি খুব দ্রুত পা চালিয়ে দেয় অনির্বাণ! মেয়েটা কি চাইছে?! আজ ওকে জানতেই হবে! কেন এরকম অ্যাভয়েড করছে অনিকে! যে অনির গান রাতে না শুনলে তার ঘুম হতনা সেই মেয়েটি পাঁচ দিন রাতে বেমালুম সুইচ অফ করে রাখত ফোন? সেকি অনির যন্ত্রণা বোঝেনি একবারো?!
এতসব ভাবতে ভাবতে কখন যে পার্কের কাছে চলে এসেছে সে নিজেও জানেনা! মাথার উপর আকাশ টা কালি ঢেলে রেখেছে যেন! কিন্তু পার্কের সবুজ গালিচায় একজন যুবতীই শুধু বসে আছে! আশেপাশে চেয়ে দেখল গোটা পার্ক টা নির্জন! কেউ কোথাও নেই! একটু আশ্চর্য হল অনি! শিউলি তো এরকম করবার মেয়ে নয়! একা একা এসেছে আজ? পায়ে পায়ে এগোতে লাগল তার দিকে! কাছাকাছি আসতেই দৃশ্যমানতা ক্রমে প্রকট হয়ে উঠল অনির চোখে! যুবতী টি শাড়ি পরে গালিচার উপরে চুপচাপ বসে আছে মৌন হয়ে! অনি আস্তে করে তার কাঁধে হাত রাখল! দিয়েই চমকে উঠল! এ তো শিউলি নয়! এ তো....এ তো তিতলি! শাড়ি পরে তিতলিকে আজ অপূর্ব মোহময়ী লাগছে! প্রত্যেকটি শরীরের খাঁজে খাঁজে পরিণতি যেন কথা বলছে নিঃশব্দে! অনি শুধু অস্ফুটে উচ্চারণ করে
- তি-ত-লি? 
- অনি দা? কাঁপা গলায় তিতলি বলে ওঠে!
- তোমার দিদি কই?
- অনি দা.....দিদি.....আর আসবে না! 
অনেক কষ্টে কান্না চাপতে গিয়ে গলা কেঁপে যায় তার!
- কেন? কেন? কি হয়েছে তার! অনি উদ্ভ্রান্তের মত জিজ্ঞেস করে! 
- দিদি......!দিদি......
- কি হয়েছে শিউলির??! অধৈর্য হয়ে তিতলির মোমরঙের মত নিষ্পাপ মুখখানি দুই হাতের আঁজলায় তুলে নেয় অনি! নিয়েই চমকে ওঠে! তিতলি কাঁদছে! সেই মোমরঙা চোখের জল অনির আঙুলের ফাঁক দিয়ে গালিচার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল! 
- এ কি! তুমি কাঁদছ? কি হয়েছে?
- দিদি এনগেজড অনি দা! আর বলতে পারেনা তিতলি! অনিকে তীব্র ভাবে আঁকড়ে ধরে বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে মেয়েটি! কান্নার দমকে অনির শরীর ও কাঁপতে থাকে থরথর করে! 
- ছেলেটি কে? মূহুর্তে চোয়াল শক্ত করে অনি জিজ্ঞাসা করে তিতলিকে!
- আমি...আমি বলতে পারব না অনিদা! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে! 
- বলতেই হবে তোমাকে! বল ভাগ্যবান টি কে? 
- শুভ দা!!!!!!!!! বলেই তিতলি অনিকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে! এই সময় ধারেকাছে কোথাও প্রবল শব্দে বাজ পড়ে! অনির কানে সে আওয়াজ পৌছায় না! থম মেরে থাকে কিছুক্ষণ! তারপর চিৎকার করে হাসতে থাকে! তিতলি ভয় পেয়ে অনির কানের দুই পাশে জড়িয়ে ধরে! 
- অনিদা প্লিজ প্লিজ শান্ত হও! অনি দা....
অনির কানে তিতলির সে আওয়াজ পৌছায় না! তিতলির বন্ধন থেকে সে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে স্টেশনের দিকে! এতবড় খেলাটা তারা খেললো তার সাথে....তার বিশ্বাসের সাথে! শুভ?!!!!.........ছোট থেকে একথালায় খেয়েও তার মানসিকতা সে বুঝতে পারেনি! কাছে পিঠে কোথাও আবার বাজ পড়ল একটা! দুই একটা বড় ফোঁটা নেমে এল আকাশ থেকে! বৃষ্টি আসছে...! বৃষ্টি আসছে এই নির্জন চরাচরে দুটি প্রাণীর মনেও! স্টেশনের প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াল! দুই একটি লোকের আনাগোনা চোখে এল অনির! ঠিক সেই সময় আপ ট্রেণের সময় ঘোষিত হল যান্ত্রিক কন্ঠে! অনি এক লাফে লাইনের উপর নেমে পড়ে! দূরের সিগনাল টা অনির দিকে রহস্যময় রক্তচক্ষু মেলে তাকিয়ে আছে! দূর থেকে শুনতে পাচ্ছে ট্রেনের হুইসলের শব্দ! অনি সিগনাল লক্ষ করে এগিয়ে যেতে লাগল এক পা এক পা করে! আচমকা পিছনে কে যেন জামার আস্তিন ধরে টান মারল! চমকে ঘুরে তাকিয়ে দেখে তিতলি অবিন্যস্ত পোশাকে অনির পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে! শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটাচ্ছে! নরম বুক দুটো শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে ওঠানামা করছে দ্রুত! অনির শ্বাস আটকে গেল ওকে দেখে! চিৎকার বলে ওঠে- পাগল হয়ে গেলে নাকি! সরে যাও!
- পাগল তুমি হয়েছ অনি দা! একটা মেয়ের ভালোবাসা হারিয়েছ বলে আরেকজনের কাছ থেকে ভালোবাসা ছিনিয়ে নেবার অধিকার তোমায় কে দিয়েছে? 
অনি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল মৃত্যুদূত ক্রমে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে! আর সময় নেই! তাদের দুজনকেই পিষে বেরিয়ে যাবে! তার জন্য এই বাচ্চা মেয়েটি কেন সাফার করবে? 
- তিতলি প্লিজ!
- অনিদা তোমার হাত আমার হাতে! যদি শক্তি থাকে তাহলে ছাড়াও! আমি দিদির মত চিটার নই! আমি তোমাকে ভালবাসি অনিদা! ভালবাসি! বোঝনি আমাকে!
অনির বোধবুদ্ধি সব গুলিয়ে গেল! তিতলির শরীরে আজ অদ্ভুত শক্তি ভর করেছে! হাজার চেষ্টাতেও হাত ছাড়াতে পারলনা অনি! কিন্তু ভাবার অবকাশ খুব কম! ট্রেন আর দশ হাত দূরে! কোন কিছু ভেবে অনি তিতলিকে নিয়ে ডাইভ দিয়ে পড়ল পাশের খোয়ায়! দুটি শরীর মিলেমিশে একাকার হয়ে লাইনের পাশে! পাশ দিয়ে ঝাপটা মেরে বেরিয়ে যায় মৃত্যুদূত! তিতলির নরম বুক দুটি অনির বলিষ্ঠ বুকের তলায় ধকধক করে জীবনের অস্তিত্ব জানান দিতে থাকে! দুজনে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়! তিতলির শরীরে শাড়ি জড়িয়ে দেয় অনি! অনেকক্ষণ মৌন থেকে তিতলিকে কাছে টেনে নিয়ে বলে - বাড়ি ফিরে চল!
তিতলি কোন কথা বলেনা! অনির আরো গা ঘেঁসে আসে! অনি তাকে জড়িয়ে প্লাটফর্মের দিকে পা বাড়ায়! কিছুদূর এগিয়ে অনি অস্ফুটে তিতলিকে শুধায়
- তুমি তো খুব ছোট তিতলি! আমি কি ভাবে....!
মুখের কথা শেষ হতে দেয় না তিতলি! দুই হাতে অনির মুখটা নামিয়ে এনে নিজের ওষ্ঠ অনির অধরের কাছে সমর্পণ করে দেয়! অনি সেই অলৌকিক ভেজা ভালোবাসার আস্বাদ নিতে নিতে বোঝে ভালোবাসা সিগারেটের ছাইয়ের মত! না পুড়লে অস্তিত্ব বোঝা যায় না! আস্তে আস্তে মুখটা নামিয়ে তিতলি অনিকে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে! অনিদা দুই বছর অপেক্ষা করতে পারবে না আমার জন্য!
এই প্রথম অনির চোখ দিয়ে জল চলে এল! কিছু না বলে তিতলির হাতখানি ধরে হাঁটা লাগাল পথ ধরে ধীরগতিতে! কিছু প্রশ্নের উত্তর হয়না......কিছু ভালোবাসার অন্ত হয় না......সারাজীবন পাশে থাকার জন্য তাকে কিছুটা সময় ছেড়ে দিতে হয়! পথচলাতে পথে যেতে দেরী হলেও বিশ্বাসের মজবুত বাঁধন সে পথের গন্তব্যে নিয়ে যাবে!........ নিয়ে যাবেই!!
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন  প্রত্যাশা মতই ভোটের চিঠি টা হাতে পেয়েই বিরক্তিতে ভুরু দুটো কুঁচকে গেছিলো। জানতাম আসবেই, এ এমন প্রেম! কি...