Wednesday, 3 January 2018

শোধ

শোধ

দূরের রাস্তার বাঁকের ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটির দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইল পলাশ। এখনো তিতলি কে সে দেখতে পাচ্ছে গাছের নীচ দিয়ে দূরে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে শরীর টা! একসময় সে তিতলির ওই শরীর আঁকড়ে বাঁচার অবলম্বন খুঁজেছিল! কিন্তু আজ কি দিন দেখাল ওই মেয়েটা? হাতে তার বিয়ের কার্ডটা এখনো জ্বলছে ধুনির মতন! তিতলি ওয়েডস প্রান্তিক! অন্য পুরুষ!!! পলাশ এর মাথাটা দপ করে জ্বলে ওঠে অপমানে! মনে পড়ে যায় স্কুল লাইফ থেকে একসাথে বাড়ি ফেরার দিন গুলি! সেদিন গুলিরও সাক্ষী ছিল ওই কৃষ্ণচূড়া! কতদিন গেছে জ্বরে সারারাত পলাশের মাথার কাছে জেগে ছিল তিতলি! সেবায় সারিয়ে তুলেছে কত রাত! আর আজ তার নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার দিন! কানে এখনো রিন রিন করে বাজছে তার অদ্ভুত শান্ত কণ্ঠ - আমায় ভুলে যাও পলাশ সুখী হবে! হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল মৃত্যু ফরমান! সেই কার্ড খানি জ্বলছে যেন পলাশের হাতে!

পলাশ আর বিন্দুমাত্র দেরি করল না। এর শোধ সে তুলবে! তার ভালবাসা বিক্রি করে দিল এত সহজে! কেঁদে ফেলল সে! বাড়িতে দুরারোগ্য ব্যাধিতে শয্যাশায়ী মা! অবিবাহিত বোন! একমাত্র সে প্রাইভেট টিউশনি করে দিন চালাত! স্বপ্ন দেখেছিল তিতলিকে নিয়ে ঘর বাঁধার! কিন্তু......... নাঃ! অনেক দেরী হয়ে যাচ্ছে! পাগলের মত সাইকেলে প্যাডেল মারল সে! বাড়ি ফিরে পাগলের মত নিজের ঘরে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল সে! তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল জিনিষ টি! অবশেষে গদির তলা থেকে সযত্নে বার করল সিডি টি!! তার আর তিতলির অন্তরঙ্গ মুহুর্তের কয়েকটি দৃশ্য সে ধরে রাখতে চেয়েছিল তার সেলুলয়েডের পরদায়! আজ সে তার সংসার জ্বালিয়ে দেবে! ছারখার করে দেবে তার ভবিষ্যৎ! ধীরে ধীরে সে নিজের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে! পাশের ঘরে মা ঘুমাচ্ছে! সন্তর্পণে সে মায়ের পায়ের কাছে এসে বসে পড়ে! কান্নার একটা অব্যক্ত দলা গলা থেকে উঠে আসছে কিন্তু চোখ বেয়ে নামছে না কষ্ট! ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে মন্থর গতিতে হাঁটতে থাকে রাস্তার পাশ দিয়ে! তিতলি কতদিন বাড়ি এসে রান্না পর্যন্ত করে দিয়েছে! আজ সেই মেয়ে.....রাস্তার নিওন আলোয় সবার অলক্ষে চোখ দুটি জামার হাতা দিয়ে মুছে ফেলে! জীবনের ভুল পথে সাইনবোর্ড পোঁতা হয়ে গিয়েছে পলাশের! পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা গঙ্গা! পলাশ সিডিটি পকেটে ঢুকিয়ে নেয়! রেলিং পেরিয়ে কালভার্টের উপর উঠে পড়ে! নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে মৃত্যদূত! না! সে তার জীবন নষ্ট করবে না! তিতলি তো পলাশ কে তার জীবনে সামান্য জায়গা টুকুও দেয়নি! কার জীবন নষ্ট করবে সে? যে তাকে ভালোই বাসেনি! শুধু নাটক করে এসেছে! ঠকিয়েছে তার মৃত্যুশয্যাশায়িনী মা কে ও! বাঁ পা টা বাইরে বাড়িয়ে দিল সে! আচমকা পিছন থেকে কার আহ্বানে থমকে দাঁড়াল সে মৃত্যুর ঠিক দুই ফুট দূরত্বে!

একটা কাঁচের মত রিনরিনে কন্ঠস্বর ভেসে এল

আচ্ছা পলাশ মিত্র বলে কেউ থাকেন এখানে! আসলে আমার ভাইয়ের ম্যাথ টিউটর খোঁজ করছিলাম! নিজেকে সামলে কালভার্টের উপর থেকে নেমে এল পলাশ! আমিই পলাশ! বলুন! ততক্ষনে মেয়েটি স্কুটি থেকে নেমে হেলমেট খুলে ফেলেছে! টানা দুটি চোখের উপর অবিন্যস্ত কেশরাশি নিওনের আলোয় স্নিগ্ধ মুখটিকে আরো নমনীয় করে তুলেছে!

আপনি আমার ভাই কে পড়াবেন? আমি শুনেছি আপনার কাছে যারা পড়ে তাদের রেজাল্ট খুব ভাল হয়! পলাশ হাতের চেটো দিয়ে ঘাম মুছে নিল! দেখুন আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব! বাকি টা আপনার ভাইয়ের ব্যাপারমেয়েটির ঠোঁটের কোণায় একচিলতে হাসি দেখা দিল! পলাশ অবাক হয়ে গালের টোল পড়া অংশটির দিকে চেয়ে রইল! মেয়েটি পলাশের গায়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল কি হল বললেন না ফিস কত নেবেন? চলুন আপনার বাড়িতে গিয়ে বসা যাক! খুব তেষ্টা পেয়েছে! সেই কখন থেকে পাগলের মত আপনার বাড়িটাকে খুঁজে চলেছি! পলাশের সম্বিৎ ফেরে! লজ্জা পেয়ে যায়! বলে দাঁড়ান একটা ছোট্ট কাজ মিটিয়ে আসছি! আবার সে কালভার্টের উপর উঠে পকেটের সিডিটি কালো জলের দিকে নিক্ষেপ করে! ঘোলা জলের মাতনে সেটি হারিয়ে যায় নিমেষে! নেমে এসে বলে নিন আপনি পিছনে বসুন! আমি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি! অনেক ক্লান্ত আপনি! এটুকু কষ্ট নাই বা করলেন! মেয়েটি রহস্যময় হাসি হেসে বলে বাবা! কত খেয়াল রাখেন আপনি! চলুন! নদীর মৃদু গর্জন পলাশের বুকে যেন ঢেউ তোলে! দূরে কোন এক পান দোকান থেকে গান ভেসে আসে- প্যায়ার দিওয়ানা হোতা হ্যায় মস্তানা হোতা হ্যায়............

অরিন্দম © নবপল্লি

No comments:

Post a Comment

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন  প্রত্যাশা মতই ভোটের চিঠি টা হাতে পেয়েই বিরক্তিতে ভুরু দুটো কুঁচকে গেছিলো। জানতাম আসবেই, এ এমন প্রেম! কি...