শ্মশান পুর গ্রাম………! নামটি শুনলেই অগণিত মানুষের বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে! গ্রামটির আকাশে বাতাসে মিশে আছে মৃত্যুর ঘ্রাণ! সন্ধের পরই গ্রামের লোকজন সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে এক অজানা ভয়ের আশঙ্কায়! সে সময় কোন গ্রামের শিশু যদি ভুল করেও কেঁদে ওঠে তাহলে তার পরিবারকে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় তাজা রক্ত দিয়ে!!!!!!! হ্যাঁ ঠিকই বলছি!!!!!!! তাজা রক্ত! ঘরের দরজা আপনা থেকেই খুলে এক ঘূর্ণি হাওয়া বয়ে যায়!!!!সমস্তকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে বেরিয়ে যায় আপন খেয়ালে! তাণ্ডবলীলা শেষে হুঁশ ফিরে বাড়ির মানুষ প্রত্যক্ষ করে বাড়ির শিশুর মৃতদেহ পথের উপর উল্টো হয়ে পড়ে আছে......ঘাড়ের কাছ থেকে মাথাটা নেই! পুরো উপড়ানো! রক্ত নদী বইছে চারদিকে যেন! শুধু দূর থেকে শোনা যায় কার একটা পায়ের শব্দ দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যেতে থাকে ধীর গতিতে! দেবী তার বলি গ্রহণ করেছেন নৈঃশব্দ্য ভঙ্গের অপরাধে! গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা সুবর্ণরেখা নদীর খরস্রোতা জলের মধ্যে অভিশাপের বলি হওয়া পরিবারের দীর্ঘনিশ্বাস যেন মিশে যায়! দূরে শ্মশানকালীর মন্দির থেকে ভেসে আসে মাদলের আওয়াজ! ছিন্নমস্তাকে সন্তুষ্ট করার যজ্ঞ চলে সারারাত! নাহলে দেবী র আরো রক্ত চাই পিপাসা মেটাবার জন্য! ওহ হ্যা! পাঠকদের জানানোই হয়নি! প্রতি অমাবস্যা তিথিতে জাগ্রত হয়ে ওঠে শ্মশানকালী তথা ছিন্নমস্তা! গ্রামের লোকেরা নাকি দেখে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক পিশাচরূপিনী নারীমূর্তিকে!......ঘাড় থেকে মাথাটাই নেই! সেটি ধরা থাকে বাম হস্তে! হ্যাঁ!......ইনিই ছিন্নমস্তা! বিজ্ঞান যেখানে অধরা সেখানে এর অবাধ বিচরণ! দেবী চায় শুধু নৈঃশব্দ্য..... আর....... রক্ত!!!!প্রচুর রক্ত!!!!
শ্মশানপুর গ্রামের।ইতিহাস কেউ জানেনা! শুধু জানা যায় একদল তান্ত্রিক কোথা থেকে এসে সুবর্ণরেখার তীরে বসতি স্থাপন করেছিল! গ্রামটির দক্ষিণপশ্চিম কোণে একটি মন্দির ও তারা স্থাপন করে! হ্যাঁ! শ্মশানকালীর মন্দির! তাদের আরাধ্যা দেবী ছিন্নমস্তা! তন্ত্রবলে তারা নাকি সেই পাথরের মূর্তির মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গেছিল! প্রথম প্রথম দেবীর পিপাসা নিবারণ হত পশুরক্ত দিয়ে! একদিন তারা আরো ঐশ্বরিক ক্ষমতা লাভের জন্য কোথা থেকে একটা মানব শিশুকে উঠিয়ে এনেছিল কোন মায়ের কোল খালি করে! তাজা রক্তে দেবীর পিপাসা গিয়েছিল বেড়ে! রক্তদানে অসমর্থ দেবী ক্রুদ্ধা হয়ে সকল তান্ত্রিকের মুণ্ডছেদ করে ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তে নিজের পিপাসা মেটায়! কিন্তু সে বহুকাল আগের কথা! কালের টানে সময়ের অগ্রগতিতে সুবর্ণরেখার তীরে এই একচিলতে জনপদটিতে আস্তে আস্তে বসতি বিস্তার হয়! ক্রমে বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় এখানে একটা স্কুল ও স্থাপিত হয়েছে! ভৈরবী বিদ্যাপীঠ! একটা ছোট্ট সিনেমা হল,বাজার, দোকান পাট.... নদীর ওপারে একটি হাসপাতাল ও গড়ে উঠেছে সরকারি বদান্যতায়! এখানে জীবন ছন্দে চলে! ভোর বেলা গাছে গাছে পাখিদের কলকাকলিতে শ্মশানপুরের আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে! জীবনচক্রের অমোঘ গতিতে সেখানকার মানুষ জনের কর্মচাঞ্চল্য গ্রামটির পরিবেশকে সদাহাস্যমুখর করে তোলে! সকাল থেকে শুরু হয়ে যায় মায়ের মন্দিরে ভক্তদের আনাগোনা! আস্তে আস্তে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়! শ্মশানপুরের বাতাসেও ঘনিয়ে আছে এক অচেনা মৃত্যুর ঘ্রাণ! সন্ধের আগেই সেখানকার মানুষ জন গৃহের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরতে চায়! ফেরার সময় যদিবা সন্ধে হয়ে যায় ভয়ার্ত সেই সব মানুষের কানে ভেসে আসে দক্ষিণপশ্চিম কোণ থেকে এক অদ্ভুত পদধ্বনি! মৃত্যুদেবী পথে বেরিয়েছে!! এতকাল ধরে সুপ্ত রক্ততৃষ্ণা জেগে উঠেছে তার.....!!!!
রহস্য কি এই পাথরের দেবীমূর্তির??? মাঝে মাঝে প্রাণ সঞ্চার হয় কোন অলৌকিক ক্ষমতায়? তাহলে কি সেই তান্ত্রিক রা আজো বেঁচে আছে? কেউ কি মুক্তি দিতে পারবে না এই বিভীষিকার হাত থেকে? উত্তর কারুর জানা নেই! শুধু একঝলক উত্তপ্ত বাতাস সুবর্ণরেখার দিক থেকে জেগে উঠে শ্মশানকালীর মন্দিরের দিকে ধেয়ে যায় বুক ভরা ব্যাকুলতা নিয়ে!
কবে আসবে মুক্তি........????
সকাল বেলা একটা নৌকা এসে ভিড়েছে শ্মশানপুর এর ঘাটে! নৌকা থেকে নামল সুদর্শন পেটান চেহারার যুবক ইন্দ্রনাথ অধিকারী। কলকাতা থেকে আগমন এই যুবকের! পোশাক আশাকে নব্যশিক্ষিতের ছাপ স্পষ্ট! একে একে নৌকা থেকে ঘাটে তার সমস্ত মোট ঘাট নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নৌকার দিকে ফিরে হাঁক দিল সে
- কই গো নামবে না? জায়গা এসে গিয়েছে তো! মেয়েকে নিয়ে সাবধানে নামো! প্রকৃতি দর্শন একবার নিজের চোখে করে নিলে ভাল হতনা?
- যুবকের কথা শেষ হতে না হতেই নৌকার ছইয়ের ভিতর থেকে কন্যাকে নিয়ে বেরিয়ে এল এক রূপবতী যুবতী... দেহে যৌবনের লাবণ্য যেন উপছে পড়ছে! .... এই গ্রামের একমাত্র স্কুলের নবনিযুক্ত ইংরাজি শিক্ষক ইন্দ্রনাথের প্রাণপত্নী নীলিমা! গ্রামের মানুষজন হাঁ করে মা ও মেয়েকে দেখে যায়,যেন গ্রহান্তরের জীব দেখছে! একটু অস্বস্তি হয় নীলিমার!স্বামী কে বল
- কি গো! এরা কিরকম তাকিয়ে আছে দেখনা!
- এত সুন্দরি হতে কে বলেছিল তোমায়? বলেই নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে নেয় খানিকটা! বলে
- নাও নেমে পড়! সবার আগে স্কুলে গিয়ে সেক্রেটারি বাবুর সাথে দেখা করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার টা দেখাতে হবে! থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত হবে কি না কে জানে?
- অগত্যা নৌকা থেকে এক কোলে মেয়ে আরেক হাত দিয়ে স্ত্রী কে নামিয়ে পিছনে মোট বওয়া মজুরটিকে নির্দেশ করে স্কুল পর্যন্ত এগিয়ে দিতে!
- স্কুলের গেটে গিয়ে দেখে দারোয়ান বসে আছে! মোট বওয়া লোকটিকে পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে ইন্দ্র দারোয়ান লোকটিকে জিজ্ঞাসা করল
- সেক্রেটারি বাবু আছেন? আমরা কোলকাতা থেকে এসেছি! ওনার সাথে একটু কথা ছিল! দারোয়ান টা শুনে কোন ভাবান্তর দেখাল না! উঠে নির্লিপ্ত ভাবে গেট খুলে দিয়ে বলল চলিয়ে যান! সোজা গিয়ে ডান দিকে হেডমাস্টার এর ঘর পড়বে! ওখানেই আছেন! বলে আপাদমস্তক কিরকম যেন অদ্ভুত ভাবে জরিপ করতে লাগল ইন্দ্রকে! তারপর ইন্দ্রের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা নীলিমা ও মেয়েটির দিকে তাকিয়ে কিরকম যেন ভয় জড়ানো কন্ঠে বলে উঠল
- ফ্যামিলিকে সাথে লিয়ে এসে ভলা নেহি কিয়া বাবু!!
- কার সাথে কথা বলছ হরিবংশ??? আচমকা দারোয়ানের পিছনে স্কুল ঘরের দিক থেকে জলদ গম্ভীর স্বর ভেসে এল!
- ওই সেক্রেটারি সাহাব আ গিয়া! বাবুজি উনকো হমারা ইস বাতচিত কে বারে মে পতা নেহি চলনা চাহিয়ে! বলে কিরকম যেন ভয়ে ভয়ে গেটের সামনে গিয়ে বসল!
ইন্দ্র তাকিয়ে দেখল হেডমাস্টার এর ঘর থেকে এক সৌম্যকান্তি ভদ্রলোক বেরিয়ে এসেছেন! খালি গা, পরনে শ্বেতশুভ্র ধুতি! বলিষ্ঠ পেটানো চেহারা যে কোন রমণীরই মন হরণ করে নিতে পারে! ইন্দ্র কেন জানিনা নিলীমাকে আড়াল করে দাঁড়াল! সামনে এসে দাঁড়াতেই আপাদমস্তক দেখে নিল ইন্দ্র! পরনে রক্তবর্ণ উত্তরীয় সাথে কপালে যে উজ্বল লাল বর্ণের তিলক কাটা সেটা দেখেই ইন্দ্রর মন কিরকম যেন খচ খচ করতে লাগল!তিলক এত টকটকে লাল কেন? মনে হচ্ছে রক্ত দিয়ে তিলক পরেছেন!! শেষ কথাটা মনে হতেই অজানা আশংকায় ছ্যাঁত করে উঠল বুকটা! সেক্রেটারি কাছে আসতেই দুহাত তুলে নমস্কার জানাল ইন্দ্র! প্রতিনমস্কার জানিয়ে জলদ গম্ভীর স্বরে বলল
- আমিই এই ভৈরব বিদ্যাপীঠের সেক্রেটারি কাম হেডমাস্টার, কালীকিঙ্কর চক্রবর্তী! সরকার বাহাদুরকে চিঠি লিখে হয়রান হয়ে গেছি! পাঁচ বছর ধরে এই স্কুল টা প্রধান শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে! অনেক শিক্ষক এখানে অল্প দিন কাজ করেই পাততাড়ি গুটিয়েছে! এখানকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার! তা মশাইয়ের আগমনের হেতু!
- আজ্ঞে পেপারে এই স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখেই এলাম! আমরা সেই সুদূর কোলকাতা থেকে আসছি! দেখলাম এখানে ইংরাজি শিক্ষক নেওয়া হবে! তাই.........
- কথাটা শেষ করতে দিলেন না তিনি! মাঝপথেই থামিয়ে তিনি বলে ওঠেন আপনি সব সাব্জেক্ট পড়াতে পারবেন?
- ইন্দ্র কেমন থতমত খেয়ে যায়! আজ্ঞে....পেপারে তো....
- হ্যা পেপারে যা দেখেছিলেন তা ঠিক তবে এখন পরিস্থিতি পালটে গিয়েছে! বলে একটু থামলেন! তারপর আস্তে গলায় বলেন
- দেখুন মশাই গত এক মাসে অবশিষ্ট যে পাঁচজন শিক্ষক ছিলেন তারা কেউ কাজ করতে রাজি হয়নি! কয়েকদিন কাজ করার পর ইস্তফাপত্র জমা দিয়ে চলে যায়! আপনিই আছেন একমাত্র যিনি স্কুল টাকে বাঁচাতে পারেন! ইন্দ্র লক্ষ করল গেটের কাছে দারোয়ানটার ভয়ার্ত মুখখানি দেখা দিয়েই আড়ালে চলে গেল! বুঝল ব্যাটা ঘাপটি মেরে কথা শুনছে!
- এই দেখেছেন! কখন থেকে আমিই বকে যাচ্ছি! আপনার নাম তো জানাই হল না! সম্বিৎ ফেরে ইন্দ্রর! তৎক্ষণাৎ আবার প্রতিনমস্কার জানিয়ে বলে
- আজ্ঞে আমি ইন্দ্রনাথ অধিকারী! ইনি আমার স্ত্রী নীলিমা আর আমার কন্যা দিশা!
- বেশ বেশ! তা মেয়ের বয়স কত হল? মনে ত হচ্ছে আট পেরিয়ে এসেছে! একে আমাদের স্কুলেই ভর্তি করিয়ে দিন না!
- ইন্দ্র লক্ষ করল কালীবাবুর চোখ দুটো তার মেয়ের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে! চোখের পলক পড়ছে না! কেমন যেন অস্বস্তি হল ইন্দ্রর! বলল
- ধন্যবাদ! আমার মেয়ে অলরেডি কোলকাতার একটা নামী স্কুলে পড়ছে! ওদের স্কুলে সামার ভ্যাকেশন চলছে! ছুটি শেষ হলেই এদের দুজনকে কোলকাতায় রেখে আসব!
- অ! কালীবাবু বোধকরি একটু মনঃক্ষুণ্ণ হলেন! একটু চুপ করে বললেন
- তা মশাইয়ের পূর্ব কর্ম অভিজ্ঞতা কিছু আছে?
- আজ্ঞে হ্যাঁ! এর আগে আমি একটি স্কুলে তিন বছর সহশিক্ষকতা আর কলেজে দুই বছর সহ অধ্যাপনার কাজ দায়িত্বের সাথে সামলিয়েছি! কিন্তু ওখানকার পরিস্থিতি বদলাতেই আমাকে আবার জীবিকার সন্ধানে এখানে আসতে হল!
- বেশ বেশ! ভাল করেছেন!
- তা বেতনের কথা তো পেপারে....
- পঞ্চাশ হাজার করে পাবেন!
- ইন্দ্র আরেকটু হলেই মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল! এত বেশি অংক সে আশাও করেনি কোনদিন! পিছনে স্ত্রী নীলিমাও কেমন বেকুব হয়ে তাকিয়ে রইল!
- আপনার কাগজপত্র গুলো আমার টেবিলে রেখে যাবেন! সময়মত চেক করে ফিরিয়ে দেব!বলেই কালী বাবু হাঁক দিলেন
- এ হরিয়া! বাবু কো বিল্ডিং কে উপর কি ১০ নং কমরা দিখা দো! অউর সামান ভেজ দেনা উপর! বলে ইন্দ্রর দিকে ফিরে বলল- আপনাদের স্কুল বিল্ডিং এরই একটা ঘরে থাকার বন্দোবস্ত করা হল! আশা করি অসুবিধা হবেনা! শুধু একটা কথা মাথায় রাখবেন রাত ৮টার পর আপনি বা আপনার ফ্যামিলির কেউ যেন বাড়ির বাইরে না বের হয়! কারণ টা কয়েকদিন পরেই জেনে যাবেন! আছেন তো এখানে দিনকতক! সব বুঝে যাবেন! বলার পর ইন্দ্র লক্ষ করল কালীবাবুর মুখটা এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসিতে ভরে গেল! বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল! এরকম করে কেন বলছেন তিনি? আর এত মাইনে তিনি দিতে চাইছেন ই বা কেন! একটা দোটানার মধ্যে পড়ে গেল কলকাতার যুবক!
ভৈরবী বিদ্যাপীঠ এর শিক্ষার্থী সংখ্যা ছেলেমেয়ে মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে দেড়শো জন! আগে সংখ্যাটা সাড়ে সাতশোর কাছাকাছি ছিল! কিন্তু গেল দুই বছর আগে কি একটা মড়কের কারণে সংখ্যাটা দেড়শোর কাছে গিয়ে ঠেকেছে! তারপর শিক্ষকএর অভাব! এই অজানা দুর্গম জায়গায় চাকরি করতে আসা মানুষ গুলো ভাল মোটা পারিশ্রমিকের বিনিময়েও কেনযে স্বল্প সময়ে এখান থেকে পাততাড়ি গোটাল তা ইন্দ্রের বোধগম্য হয়না! এবার সে বুঝতে পারে তাকে কেন এত মোটা অংকের পারিশ্রমিক অফার করেছিলেন কালী বাবু! কারণ তাকে ছাড়া এই স্কুলের পঠন পাঠনের আর কোন গতি নেই! প্রথম প্রথম ইন্দ্রের খুব অসুবিধা হত নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে! কিন্তু এখন সব সহ্য হয়ে গেছে! স্কুলের ছেলেমেয়ে গুলোর সাথে দিশার খুব ভাব হয়ে গিয়েছে! টিফিনে স্কুল কম্পাউন্ডের ভিতরে প্রতিদিন নিত্যনতুন খেলায় মেতে ওঠে! স্কুলেও খুব একটা চাপ থাকেনা ইন্দ্রর! দেড়শো শিক্ষার্থী কে নিজের মত করে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে নিয়ে সপ্তাহে বিভিন্ন দিনে ক্লাস নেয়!কিন্তু একটা সন্দেহ দিনেরাতে কাঁটার মত খোঁচাতে থাকে ইন্দ্রকে!! প্রথম দিনটিতে রাত আট টার পর কেন বেরোতে মানা করেছিলেন কালী বাবু? বেরোলে কি হয়? এই প্রশ্নটা সে স্কুলের কয়েকটা ছেলেপিলের কাছেও করেছিল! কিন্তু উত্তর পায়নি!বরং তাদের আতংক ভরা চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে ইন্দ্রের অস্বস্তি বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ!!
শ্মশানপুরের বাজারটা স্কুল থেকে হাঁটাপথে মিনিট তিনেকের পথ।গ্রাম্য দেহাতি রাস্তা যেরকম হয়, অর্ধেক জায়গাতেই মাটি খাবলা হয়ে উঠে ইঁট বেরিয়ে এসেছে! রাস্তাটার শেষ প্রান্তে সমতল জায়গায় বাজারটা বসে! বাজার বলতে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কয়েকজন দেহাতী সব্জী ব্যবসায়ীর ছাউনি দেওয়া ছোট ছোট বাঁশের মাচান, আর একটু পৃথকে একটু নির্জন জায়গায় মাংস কাটার একটা ঢালু জায়গা! ঢালু জায়গাটা সুবর্ণরেখার সাথে মিশে গেছে! মাংস কাটার দিনে ঢালু জায়গাটা বেয়ে তাজা রক্ত প্রতিদিনের বয়ে চলা স্রোতকে অন্যরকম রূপ দেয়! রক্তের ঘোলা জলের মাতন অতি বড় সাহসীর ও বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়!
তার পাশেই.........শ্মশানকালীরমন্দির!!!!
ইন্দ্র বাজারে যাওয়ার জন্য স্কুলের গেট খুলে বেরোতে যাবে এমন সময় স্কুলের দারোয়ান টা এসে হাজির! ইন্দ্র এই লোকটাকে ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারেনা! একটু যেন বিব্রত হল সে! তাড়াতাড়ি বাজার করে এসেই তাকে স্কুলের জন্য তৈরি হতে হবে।এমন সময়ে...
- মাষ্টার জি এক বাত থা আপসে!
- তাড়াতাড়ি বল! বেরোতে হবে।
- বাবু আজ কউন সা দিন হ্যায় আপকো পতা হ্যায় না!
- না তো! আজকে কি আছে? একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম!
- আজ অমাবস কি রাত হ্যায় না? শাম কো বাহর মত নিকলিএ গা!
- মনে পড়ে গেল প্রথম দিন কালী বাবুও এই একই কথা বলেছিলেন! বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল! বললাম অমাবস্যার রাতে কি হয়?
- কিরকম যেন ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল হরিবংশের চোখে মুখে! বলল রাস্তে মে মৌত নিকলতি হ্যায় বাবু! ওটার সামনে যদি কভি পড়ে গেছেন........
- হঠাৎ পিছন থেকে দরজা খোলার আওয়াজে সে ভয়চকিত দৃষ্টিতে সেক্রেটারির ঘরের দিকে তাকাল! দেখল এখানেই আসছে! নিমেষে নিজেকে গা ঢাকা দিয়ে দিল!
- সেক্রেটারি কাছে আসতেই হাত তুলেই প্রতিনমস্কার জানালাম! তিনি একটু হেসে বললেন; বাজার যাচ্ছেন বুঝি? ভাল করে লক্ষ করলাম কালীবাবুর পরণে আজ বেশ একটু অন্যরকম! পরণে রক্তবর্ণ উত্তরীয় তো ছিলই, পরনের ধুতিটিও অস্বাভাবিক টকটকে লাল! আরেকটা আশ্চর্য ব্যাপার সে দেখল কালীবাবুর ডানদিকের ঠোঁটে কি একটা লাল জলীয় পদার্থ লেগে রয়েছে! বুঝে যেতেই সেটিকে জিভ দিয়ে চেটে পরিষ্কার করে নিলেন! গা টা কেমন শিরশির করে উঠল! একটু হেসে বলল
- হ্যা বাজার যাচ্ছিলাম! আপনি??
- আমিও মন্দিরের দিকেই যাব! তোমার ওদিকেই পড়বে! ভালই হল! একসাথে যাওয়া যাক!
- যেতে যেতে কৌতুহল চেপে রাখতে পারে না ইন্দ্র! বলে আচ্ছ আজ অমাবস্যার রাতে বিশেষ কিছু আছে কি?
- কেন বলুন তো? হঠাৎ এই প্রশ্ন? যেতে যেতে থমকে দাঁড়ান তিনি!
- কিছু না! শুনছিলাম আজ রাতে বাইরে বেরনো নাকি বারণ!
- ঠিকই শুনেছেন! আসলে মন্দিরে আজ বলি দেওয়া হয় ত, তাই দুর্বলচেতা মানুষরা এটা সহ্য করতে পারে না! তাই ভয় পেয়ে এটা রটিয়ে বেড়াচ্ছে! বলে কেমন একটা রহস্যের হাসি হাসল কালীবাবু!
- ইন্দ্র লক্ষ করে কালীবাবুর গালের দুইপাশে দুটো গজ দাঁত বেরিয়ে এসেছে! অস্বাভাবিক সাদা আর ঝকঝকিয়ে উঠল দিনের আলোয়! দেখে গা ছমছমিয়ে উঠল ইন্দ্রর ! সেটা বুঝতে পেরেই কালীবাবু হাসি থামিয়ে কিরকম যেন গম্ভীর হয়ে যান! একটু গায়ের কাছে ঘন হয়ে এসে চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে- ইন্দ্র বাবু! আপনারা শহুরে শিক্ষিত মানুষ! জানিনা আমাদের গ্রামকে কি চোখে দেখেন! তবে একটা কথা জেনে রাখুন এই গ্রামে আজো এমন ঘটনা ঘটে আপনাদের বিজ্ঞান ও কিছু সুরাহা করতে পারবেনা! আর হ্যাঁ! যে সাবধান বানী গুলো শুনছেন তা মেনে চললে আমার আপনার সবারই ভাল! বলে আর একমুহুর্ত দাঁড়ালেন না! তার চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে ইন্দ্র কেমন হতবুদ্ধি হয়ে গেল! তারপর আস্তে আস্তে বাজারের পথে পা বাড়াল!
বাজারে গিয়ে ইন্দ্র অবাক হয়ে গেল! প্রচুর লোকের সমাগম হয়েছে আজ বাজারে! দেখে ভাল লাগল! এই নির্জন জনপদে বাস করতে করতে সে হাফিয়ে উঠেছিল! কিন্তু একটা জিনিষ সে লক্ষ করল সবারই খুব তাড়া! তাড়াতাড়ি সে জায়গাটা থেকে সরে পড়তে পারলে বাঁচে!কিছু সবজি কিনে থলেতে ভরে স্কুল মুখো হচ্ছে তখনই বাজারের ঢালু জায়গাটা থেকে একটা ছাগলের প্রাণান্তকর ম্যা ম্যা আওয়াজ ভেসে এল! তাকাতেই ইন্দ্র যা দেখল হতবাক হয়ে গেল! একটা নধরকান্তি পাঁটার ঘাড় চেপে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে কালীবাবু! পাঁঠাটা প্রাণপণ চেষ্টা করছে নিজেকে ছাড়ানোর কিন্তু পারছেনা! কালী পাঁটাটার শরীর থেকে কি একটা ঘ্রাণ নেবার চেষ্টা করছেন! তারপর বিড়বিড় করে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি একটা দুর্বোধ্য মন্ত্র পাঠ করতে লাগল! দেখে কিরকম যেন গা গুলিয়ে উঠল ইন্দ্রর! মন তাকে জানান দিচ্ছে কিছু একটা ঘটতে চলেছে! মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে তার স্ত্রী কন্যাকে এই জায়গায় একদিনও রাখবে না! তাড়াতাড়ি স্কুলের দিকে পা বাড়াল! মনে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল তার মনে!
কি রহস্য এই জায়গাটার? বাজারের কোণে ওই মন্দিরটারই বা ব্যাপার টা কি? কালীবাবুর সাথে ওই মন্দিরের সম্পর্ক আছে কি? হরি বার বার সাবধান করতে গিয়েও কি একটা চেপে যাচ্ছে বারবার!!!
মাথার মধ্যে সন্দেহ আর আশংকার মেঘ নিয়ে স্কুল গেটের কাছে এসে দেখে হরি নেই! তার বসার চেয়ারটা খালি পড়ে আছে! দোনামনা করে দোতলায় উঠে ইন্দ্র দেখে নীলিমা তার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে! ভয়ে দুজনেরই মুখ পাংশু হয়ে গেছে! ইন্দ্র একটু অবাক হয়ে গেল তাদের এভাবে বসে থাকতে দেখে! নীলিমা ইন্দ্রকে দেখতে পেয়েই ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে আরম্ভ করল! সকাল সকাল এইরকম ঘটনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলনা! অনেক কষ্টে নীলিমাকে শান্ত করার পর যে ব্যাপারটা উদ্ধার করল সেটা শুনে ইন্দ্রর শিঁড়দাড়া বেয়ে এক হিম ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল!
সকালবেলা ইন্দ্র বাজার বেরিয়ে যাবার পর নীলিমা ঘর গোছগাছ করছিল! অনেকদিন ঘরটি ব্যবহার না হওয়ার দরুন প্রচুর আবর্জনা জমে গিয়েছিল! ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে ঘরের উপরের তাক থেকে বহুদিনের পুরোনো কয়েকটা সংবাদপত্র খুঁজে পেয়েছে! আর তার সাথে বেশ কতগুলো পাকান চুলের গোছা, একটা শুকিয়ে যাওয়া লেবু আর…………..আর একটা করোটি!! এইসব জিনিষ গুলো থেকে গুম হয়ে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ ইন্দ্র! কিন্তু চমক সেখানেই শেষ ছিল না! নীলিমা কাঁপা কাঁপা গলায় জানাল যে সেক্রেটারির ঘরের জানালার নীচে বাইরের ঝোপের মধ্যে সে দোমড়ান মুরগির পালক আর অনেকটা জায়গা জুড়ে রক্ত পড়ে থাকতে দেখেছে! ইন্দ্র এবার ঘামতে শুরু করেছে! এবার তার আস্তে আস্তে বোধগম্য হতে শুরু করেছে জায়গাটা ভাল নয়! প্রথম থেকেই কি সব অদ্ভুত কান্ড ঘটে চলেছে! চারদিক কিরকম থমথমে হতে শুরু করে দিয়েছে! কালীবাবু লোকটিও খুব একটা সুবিধের নয়! নাঃ! বউ মেয়েকে আর একদণ্ড এখানে রাখা চলেনা! সন্ধের আগেই তাদের এই জায়গা থেকে পাঠিয়ে দিতে হবে! কিন্তু নীলিমা কিছুতেই শুনবে না! মেয়েটিও বাবাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মত কেঁদে চলেছে! অবশেষে ইন্দ্রের জিদের কাছে হার মানতে হয় তাদের! নৌকায় তুলে দিতে আসার সময় ইন্দ্র লক্ষ করল নীলিমার চোখে জল! মুছিয়ে দিতেই সে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুলের মত কেঁদে উঠল! মেয়েকে কোলে তুলে ইন্দ্র বলে উঠল
-ভাল হয়ে থাকবি মা! আমার এখানে একটা ছোট্ট কাজ মিটিয়েই তোদের কাছে ফিরে আসব! মাকে সামলে রাখিস! চিন্তা করবিনা!
দেখতে দেখতে নৌকাটি ইন্দ্রর দৃষ্টির বাইরে মিলিয়ে গেল! এই মৃত্যুপুরীতে ইন্দ্র এখন একা! ইন্দ্র যখন স্কুলে ফিরে এল তখন বেলা প্রায় উতরে এসেছে! আজ স্কুলে কেউই আসেনি! কারণ টা ইন্দ্র বুঝতে পারল না! আজকের দিনটা সত্যি ইন্দ্রের কাছে অন্যরকম লাগছে! তার স্ত্রী যে ব্যাপার গুলো নিজের চোখে দেখেছে তার তাৎপর্যই বা কি? এই কালী বাবু লোকটিকে ইন্দ্রের কেমন যেন লাগে! এই এত বড় স্কুলের সেক্রেটারি কাম হেড মাস্টারের দায়িত্ব একা সামলাচ্ছে! ওদিকে নাকি মন্দিরের পূজোপকরণ যাগযজ্ঞ ইত্যাদির দেখাশোনা ও করেন! হরি কিসের ভয় পাচ্ছে এত? এটাসেটা ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে ঢুকে খাটের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরোনো সংবাদ পত্র গুলো! লাইট জ্বেলে ভাল করে লক্ষ করল দুই বছর আগের তারিখ! আচমকা একটা জায়গায় এসে চোখ আটকে গেল তার! শিরোনাম দেখল- কলকাতা থেকে পাঁচ যুবকের রহস্যময় অন্তর্ধান!! শিরদাঁড়া বেয়ে হিম স্রোত নেমে গেল তার! একটা জায়গায় লেখা দেখল এরা প্রত্যেকেই ভৈরবী বিদ্যাপীঠে চাকুরিরত অবস্থায় নিখোঁজ হয়েছেন!!! পুলিশ এদের কোন সন্ধান পায়নি! তার মানে…….!!!!! তার মানে…….কালী বাবু তাকে মিথ্যা বলেছেন! চাকরী ছেড়ে চলে যাওয়াটা নেহাতই গল্প! কিন্তু কেন মিথ্যা বললেন তাকে! বিছানায় রাখা খুলি আর অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিষ গুলোর দিকে তাকিয়ে সত্যি তার ভয় ভয় করতে লাগল! এগুলো কি কালীবাবু তন্ত্র বিদ্যার কাজে লাগাতেন নাকি? এই সন্দেহ মাথায় আসতেই ইন্দ্রের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল! এই সময় দোতলায় কার পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল! এই নির্জন স্কুল বাড়িতে আবার কে এল? ইন্দ্র দেখে দরজা ঠেলে হরি প্রবেশ করল! তার পোশাকআশাক বিধ্বস্ত! চোখ দুটো জবা ফুলের মত লাল! ইন্দ্র তাড়াতাড়ি না ধরলে হয়ত সে পড়েই যেত! স্পষ্ট শুনতে পেল হরি বলছে -কালী বাবু আপকো মার ডালেঙ্গে! আপ নিকাল যাও য়হাসে!
-তোয়ার এ অবস্থা কিসে হল হরি?
-মেরি ফিকর মত করো বাবু! অভি ইহাসে নিকল জাও! বরনা……!
-নাহলে কি হরি? কি হবে তাহলে??
- কালী বাবু আপকো মার ডালেঙ্গে!
এরকম কিছু একটা হতে চলেছে এটা বোধহয় ইন্দ্র আগে থেকে অনুমান করেছিল! চকিতে সে হরিকে জিজ্ঞাসা করে- আচ্ছা হরি, তুমি তো কিছু বলতে গিয়ে বারবার থেমে যেতে! আজ তোমাকে বলতেই হবে! অমাবস্যার রাতে কি হয় এখানে?
হরির মুখে আবার সেই আতংকের ছায়া ঘনিয়ে আসে! কিন্তু ইন্দ্র এবার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ! না শুনে সে ছাড়বেনা! আবারো জিজ্ঞাসা করে-হরি! এখানে চাকরি করতে আসা মানুষগুলো এখানেই গুম হয়ে যায় সেটা তোমাদের সেক্রেটারি বাবু জানতেন না!
-আপনি…..আপনি কি করে জানলেন? হরি তোতলায়!
-খাটের উপর ছড়িয়ে থাকা কাগজ গুলোর দিকে ইংগিত করে ইন্দ্র! আমার বউ ঘর পরিষ্কার করার সময়ে এগুলো খুঁজে পায়! তার সাথে এই জিনিষ গুলোও! ইন্দ্র চুলের গোছা সমেত করোটি টি হরির মুখের সামনে তুলে ধরে জিজ্ঞাসা করে- এগুলো কি?
হরি এতক্ষণে একটু ধাতস্থ হয়েছে! হিসহিসিয়ে বলে উঠল-ওগুলো কালী বাবুর সামান! হামি কুছু জানে না!
“তুমি সব জান হরি”! গর্জে উঠল ইন্দ্র! এখানে চাকরি করতে আসা পাঁচ জন শিক্ষকের সাথে এতগুলো শিশুর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে তোমার আর সেক্রেটারির নিশ্চই কোন যোগসাজশ আছে! কথাটা বলার পরেই ইন্দ্র খেয়াল করল হরির চোখ দুটো পিশাচের মত জ্বলে উঠল! একটা চাপা হিসহিসে স্বরে বলে উঠল আপনার খুব জানতে ইচ্ছা করছে তাই না সাব? এত করে সাবধান করে দেবার পরেও আপনি শুনলেন না? ঠিক আছে আজকেই জেনে যাবেন! একটু রাতের দিকে মন্দিরের কাছে আসবেন খন! সব জেনে যাবেন! বলে টলতে টলতে বেরিয়ে ঘর থেকে! আর ঠিক তখনই বাইরে বহুদূর থেকে এক অপার্থিব পদধ্বনি ভেসে এল ইন্দ্রর কানে! ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল তার! মন তাকে বার বার জানান দিতে লাগল একটা কিছু খারাপ হতে চলেছে! কিন্তু…. কিন্তু এই পায়ের আওয়াজ বাকি পায়ের আওয়াজের মতন নয়! কেমন যেন ধীরলয়ে এগিয়ে চলেছে! ইন্দ্র আস্তে আস্তে স্কুলের দোতলার ঘর থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে নীচে আসে! পুরো স্কুলচত্বর নিঝুম! শুধু একটি ম্রিয়মাণ বাল্বের আলো গোটা স্কুলবাড়ি টিকে ভৌতিক করে তুলেছে! চারিদিক অমাবস্যাতিথির নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে আছে! দূর আকাশের কোণে অগণিত নক্ষত্রগুলিও অসহায়ের মত তার দিকে তাকিয়ে আছে মনে হল ইন্দ্রর! আচমকা ইন্দ্রের মন কেঁদে উঠল তার বাড়ির জন্য! তার বউ…..মেয়ে…...আজন্মপরিচিত বন্ধুবান্ধব…… কেউ নেই পাশে! এ কোন বিভীষিকার মধ্যে এসে পড়েছে সে! সেই অপার্থিব পদধ্বনি এখনো কানে আসছে! সে আশেপাশে তাকিয়ে হরিকে দেখতে পেলনা! সেইসময়ে নজরে এল স্কুলবাড়ির সদর গেট হাঁ করে খোলা! এত রাতে গেট খোলা থাকতে দেখে সে আশ্চর্য হয়ে যায়! গেট থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠতেই কিরকম যেন গা ছমছমানিতে পেয়ে বসল তাকে! কোথাও জনমানব নেই! স্কুলের সামনে থেকে রাস্তাটা কিছুদূর গিয়ে দুইভাগ হয়ে গিয়েছে। একটা রাস্তা সুবর্ণরেখার দিকে চলে গিয়েছে আরেকটা গেছে গ্রামের দক্ষিণপশ্চিম দিকে…..শ্মশানকালীর মন্দিরে! পায়ের আওয়াজ টা ক্রমশ সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হল ইন্দ্রর! মনটা শক্ত করে নিল সে! এতকাল ধরে চলে আসা কুসংস্কারের অচলায়তনকে সে উন্মোচন করবেই! খানিকদূর এগোতেই সে টের পেল মন্দিরের দিক থেকে একটা ঘূর্ণিঝড় এগিয়ে আসছে! রাস্তার দুই পাশের ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় সে দেখল সেই হাড়হিম করা দৃশ্য! একটা ভয়ংকরী নারীমূর্তি এগিয়ে যাচ্ছে মন্দিরের দিকে ক্রমশ! সারা শরীর তার নগ্ন! নীল মেঘের মত গায়ের মত রং! বাঁহাতে বিশাল খড়গ আর……..হ্যাঁ…..সে ভুল দেখছে না! ডান হাতে ঝুলছে একটি কাটামুন্ডু!! চোখ দুটি স্থির হয়ে দেখছে ইন্দ্রকে!!! দেবী ছিন্নমস্তা! বারবার সে চোখ কচলে নিল! ভুল ও দেখতে পারে! কিন্তু কেন জানিনা শহুরে শিক্ষিত চোখ দুটো এতকাল ধরে যে সকল সংস্কার নিমেষে উড়িয়ে দিয়ে এসেছে সেই চোখ দুটো আজ ভাষাহীন! মাথা কাজ করছেনা তার! ধীরে ধীরে মোহগ্রস্তের মত এগিয়ে চলল সেই অপার্থিব মূর্তির পিছনে…...অবশেষে মন্দিরে প্রবেশ করছে সে…….নাস্তিক যুবকের সামনে একের পর এক ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে বিজ্ঞান মনস্কতার প্রাচীর! চোখের সামনে সে দেখছে তার স্কুলের সেক্রেটারি কে…….তান্ত্রিকের বেশে! কালীবাবু তান্ত্রিক??????!!!! মনে পড়ল স্কুলঘর থেকে খুঁজে পাওয়া সেইসব তন্ত্রবিদ্যার উপকরণ গুলি! কালীবাবুর সামনে বিরাট রক্তচন্দন এর আসনে উপবিষ্টা দেবী ছিন্নমস্তা!! জীবন্ত! হঠাৎ সে দেখল কালী তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে! স্পষ্ট শুনতে পেল বলছে
- আসুন ইন্দ্র বাবু! আগের পাঁচজনের মত আপনিও রক্তদানে সামিল হোন! মা কে তুষ্ট করা তো সন্তানের কর্তব্য! আসুন…….আসুন…..আসুন!!!! দুর্বোধ্য মন্ত্রের মত কথাগুলি মোহাবিষ্ট করে ফেলল ইন্দ্র কে! পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল মৃত্যু বেদীর দিকে……
আচমকা পিছন থেকে একটা শিশুকন্যার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে! গলায় যেন কার স্নেহস্পর্শ অনুভব করল! ধড়মড় করে উঠে বসল সে! ঘোর তখনো কাটে নি! চারদিকে তাকিয়ে দেখল! না সেই বিভীষিকার লেশমাত্র চিহ্নটুকু নেই! উপরে তাকিয়ে দেখে এসি ঠিকই চলছে! তাও তার গোটা শরীর ঘামে ভিজে জব জব করছে! গলায় হাত দিয়ে দেখল সামান্য গা গরম হয়েছে! বিছানার পাশেই বোকার মত দাঁড়িয়ে তার মেয়ে দিশা বড় বড় চোখ নিয়ে বাবাকে দেখে যাচ্ছিল! ইন্দ্রনাথ অধিকারী! একটা নামজাদা বেসরকারি কলেজের ইংরাজি লেকচারার! তাড়াতাড়ি উঠে সে মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেয়! সকাল সকাল বাপবেটির এহেন ভালবাসা দেখে বউ নীলিমা হতবাক হয়ে গেল!
-কি গো! কি হয়েছে তোমার?
কি জবাব দেবে সে নীলিমাকে? বলবে সারারাত ধরে দেখা এই ভয়ানক দুঃস্বপ্নের কথা! সে নিজেও অনেকমাস ধরে অশান্তিতে ভুগছে! তার কলেজে লাগাতার ছাত্র সংঘর্ষে পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে! ভাবছে সে চাকরীটা ছেড়ে দেবে! নতুন কোন জায়গায় জয়েন করবে! কর্মখালি বিজ্ঞাপন দেখে বিভিন্ন জায়গায় তার বায়োডাটা পাঠিয়েও দিয়েছে! নীলিমা কে কিছু না বলে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়! গতরাতের দুঃস্বপ্নকে ঝিরিঝিরি ধারায় ধুয়ে ফেলতে চায় সে! কোথায় এই জায়গা! এমন অদ্ভুত নৈঃসর্গ! বাথরুম থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে চায়ের কাপ নিয়ে বসেছে সবে এমন সময়ে কলিংবেলের আওয়াজ! অনিচ্ছাসত্ত্বে ও দরজা খুলে অবাক হয়ে যায় সে! এত সকালে পিওন চিঠি হাতে দাঁড়িয়ে দোরগোড়ায়!!
-রেজিস্ট্রি চিঠি আছে দাদা! সই করে দিন!
কাঠের হাসি হেসে সই করে দরজা বন্ধ করে চিঠিটি না দেখেই টেবিলের উপর রেখে আবার চেয়ারে এসে বসে! নীলিমা ততক্ষণে চা রেখে গেছে টেবিলে! বসতেই গা ঘেঁসে এল! গলাটা জরিয়ে আদুড়ে গলায় বলে-হ্যাঁগো! শরীর ভাল তো? আজ কলেজ যাবে কি! যা অশান্তি শুরু হল না! ভাল লাগেনা!
ইন্দ্র কথাগুলো শুনেও না শোনার ভান করে খবরের কাগজের পাতা উলটে যায় নিপুণ হাতে! হঠাৎ একজায়গায় চোখ আটকে যায় তার! শিরদাঁড়া বেয়ে আতংকের একটা চোরা স্রোত নেমে যায়! একি দেখছে সে! হেডিংটা সে দেখল বারবার! নাতো! ঠিকই তো দেখছে সে! কিন্তু এও কি করে সম্ভব! আরো একবার দেখল হেডিং টা! শিক্ষকতা করতে গিয়ে নিখোঁজ কলকাতার পাঁচ যুবক!
কাঁপতে কাঁপতে চিঠির দিকে তাকাল ইন্দ্র!
লালকালিতে একটা নাম জ্বলজ্বল করছে
গ্রাম-শ্মশানপুর
পোস্ট -...........কিছু পড়া যাচ্ছে না! ইন্দ্রর চারপাশে ঘনিয়ে আসছে আঁধার!!!!
অভিশাপের অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে সে!


No comments:
Post a Comment