Monday, 1 January 2018

খেয়া

খেয়া
খালেক মাঝি এই সময়টা বেথেনি নদীর পাশের শানবাঁধানো জায়গা টায় চুপ করে এসে বসে থাকে! ট্যাঁক থেকে দোমড়ান বিড়িটা বের করে ধরায় সে! ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে অস্পষ্ট দেখা যায় সুন্দর বনের সবুজ বনানীর রেখা! সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে! বেথেনির ঘোলা জলের মধ্যে সে দীর্ঘশ্বাস হারিয়ে যায়! এ নদী তার বড় ভাল লাগে! এই কুলু কুলু ধনি, সামনে অজানার দিকে এগিয়ে চলা সমস্ত টা মিশিয়ে খালেকের বড় কাছের জন এই নদী! গেল বার বন্যায় এই নদীর জলেই তার বিবি জান কে ভেসে যেতে দেখেছিল এগার মাসের শিশুকন্যা সমেত! কিচ্ছু করতে পারেনি সে! ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছিল তার বিবিজানের মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রতি! নদীর বাঁকটায় যখন অদৃশ্য হয়ে গেল তারা তখন একটা কথাই অস্ফুটে বলেছিল সে এরকম ভাবে নিলি কেনে? কেনে নিলি? বেথেনি নদীর খরস্রোতা জল সেদিনও কোন উত্তর দেয়নি মাঝিকে!
আজও দেয় না! মাঝি বসে থাকে নদীর ধারে! শুধায়
কেমন আছে তারা? বল না নদী! এমন ভাবে নিলি কেনে? নদী তার কুলু কুলু ধ্বনিতে আপন গতিতে বয়ে চলে! খালেক শান্তি পায়না! উঠে আসে সেখান থেকে! খেয়া পারের নৌকা কে বাঁধন মুক্ত করে অপেক্ষা করতে থাকে সওয়ারি র জন্য! আকাশে ফুটে ওঠে দুটি একটি সন্ধ্যাতারা! ঝিঝি র ডাক চারপাশের অসহনীয় নিঃস্তব্ধতাকে আরো ভারী করে তোলে...নৌকা কে ঘাটের সাথে বেধে মন্দিরের চাতালেই শুয়ে পড়ে! আধ ঘুম জাগরণে সে দেখে তার শিশুকন্যা তার কোলে খেলছে! বলে ওঠে আমি জানতাম নদি তুই এত খারাপ নাই আছিস! তুই আমার দুঃখ বুঝিস বটে! আচমকা ঘুম টা ভেঙে যেতে নদীর জোয়ার গর্জন আপন অস্তিত্ব জানান দেয় খালেককে! স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়! সে শুনতে পায় নদী তাকে বলছে আমি এরকম ই! আমি এরকম ই! প্রবল দুঃখ ক্ষোভে মন্দির ছেড়ে বেরিয়ে আসে সে! কিন্তু ওকি! নদীর ধারের ওই ঝোপ টা এত নড়ছে কেন? দুটো কুকুরের আনাগোনা ও খালেকের চোখে পড়ল! ঝোপের দিকে এগিয়ে যেতেই খালেকের চোখে পড়ল
ন্যাকড়া জড়ান একটা কিছু নড়ছে! ন্যাকড়া টা খুলতেই ভিতরে একটা অসহায় প্রাণের অস্তিত্ব জানান দিল অস্ফুট আওয়াজে! হে আল্লা! তুমি কি দেখনা! তাড়াতাড়ি সেটিকে পরম মমতায় বুকে তুলে নেয় খালেক! মন্দিরের চাতালে ফিরে এসে কাপড়ের মুখটা একটু ফাক করে দেখে সে! ঠিক যেন পদ্ম ফুটে আছে! কোন হতভাগ্য জীবনের সুখ মেটাতে গিয়ে এই আপদ কে ঘাড় থেকে নামাতে চেয়েছে! খালেক তাদের কে শাপশাপান্ত করতে থাকে!আচমকা খালেক তার শিরা ওঠা শীর্ণ আংগুলে একটা নরম স্পর্শ পায়! শিশুটি তার আংগুল ধরে অস্ফুট হাসি হাসে! খালেকের বুক ফেটে কান্না আসে! হে আল্লা! এ অভাগারে মাইরা ফ্যালাও নাই ক্যান! নদীর তখন দুই ধার কানায় কানায় জলে পরিপূর্ণ! সেই ঘোলাজলের নৃত্যের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে মাঝি! না নদী তাকে সর্বস্বান্ত করেনি! তার বেচে থাকার পাথেয় তার বুকে খেলা করে! খালেকএর দু চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়! নদী যেন তাকে ব্যঙ্গ করে ওঠে!......খালেক আপন মনেই বলে ওঠে...... না নদী! তুই খারাপ নাই আছিস বটে! যে জানোয়ার গুলান বলে তুই খারাব... তাদের আজ দেইখ্যে দেব তুই আমার বাঁচার আলো দিয়েছিস বটে! যা নদী যা! তুই সাগরে যা! আমার বিবিজান আর কন্যাকে বলে দিবি তাদের খালেক আজ ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখবে! দূর থেকে আজানের আওয়াজ ভেসে আসে....নদী হাসে....শুধু হাসে!
© অরিন্দম
নবপল্লী

No comments:

Post a Comment

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন  প্রত্যাশা মতই ভোটের চিঠি টা হাতে পেয়েই বিরক্তিতে ভুরু দুটো কুঁচকে গেছিলো। জানতাম আসবেই, এ এমন প্রেম! কি...