
বউ এর জেদাজিদি তে বাধ্য হয়ে লোন তুলে বাড়িটা কিনেই ফেললাম একপ্রকার!মিথ্যে বলব না! শহরের যান্ত্রিক জীবনে নিজেও ক্রমশ হাঁফিয়ে উঠেছিলাম! বসবাস করছিলাম ফ্ল্যাটে! জীবনের স্বাদ সেখানে কেমন সেটা বলাই বাহুল্য! এতটুকু স্বাধীনতা বলে কিছু নেই! জোরে গান শোনা যাবে না! বউএর সাথে উঁচু গলায় কথা বলা যাবেনা! পাশের ফ্ল্যাটের দত্ত বাবু আবার হার্টের পেশেন্ট!!! সেদিন
ফ্ল্যাটে সদ্য কেনা বুম বক্স টায় উচ্চ মার্গে রবি ঠাকুরকে স্মরণ করছি আচমকা পাশের বাড়ি থেকে কাজের মেয়েটি বলে গেল - দাদা আস্তে শুনুন! দাদাবাবুর ঘাম হতিছে!
আরে ঘাম হোক! চুলকানি হোক! ফোঁড়া হোক! তাই বলে এভাবে....??? নাঃ! এভাবে আর চলেনা!
সেদিন রাতে প্রিয়তমার সাথে একটু দুষ্টুমি চলছিল অমনি কলিং বেল! খুলে দেখি দত্ত গিন্নী! হাসি লাজুক মুখ করে বলল - কিছু মনে করবেন না! আমার কত্তা আবার হার্টের পেশেন্ট তো! কোনরকম উত্তেজনাই ওনার পক্ষে সহ্য হয় না! কাজেই....!!! উনি চলে গেলে খানিকক্ষণ গুম মেরে দাঁড়িয়ে রইলাম! বিছানায় এসে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম! ঘুম আর প্রেম দুই ই গেল! বউ ও বোধ করি ব্যাপারটা বুঝেছিল!! পরদিন সকালে উঠেই বেয়ারা আব্দার বউ এর
- শোনো! এই ফ্ল্যাটে আর থাকব না! অন্য কোথাও নিরিবিলিতে বাড়ি নাও! দুজনেই সার্ভিস করি! লোন পেতে অসুবিধা হবে না!
- আবার এত গুলো টাকার ধাক্কা! কি করে......কথা শেষ করতে দেয় না আমার মেয়ে! পাশে শুয়ে আদুরে হাতে আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে বলে - ও বাপি! প্লিজ মায়ের কথা মেনে নাও না! আমারো এখানে কেমন যেন দম আটকে আসে! প্লিজ বাপি প্লিজ....!!
- একদিকে মেয়ের আবদার আরেকদিকে গিন্নীর মান রাখতে অগত্যা লোন তুলে বন্ধু অখিল কে বললাম ভাই একটা জমি সহ বাড়ি দেখ! নেব!
- এহেন প্রস্তাবের জন্য বন্ধুবর বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না! শুনে আকাশ থেকে পড়ল! সেকিরে ভাই! ফ্ল্যাট ছেড়ে দিবি?
- না ফ্ল্যাট থাকুক! তুই যেটা দেখতে বললাম সেটা দেখ! আজকেই দেখ! খবর না নিয়ে আসলে ডিভোর্স তোতে আমাতে!
- এ ত খুব সিরিয়াস কেস রে ভাই! দাঁড়া একটা ব্যাবস্থা করছি! বলে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গেল!
- চুল খাড়া করে ফিরল ঘন্টা দুয়েক পর! এসে বলল বৌদি জল দাও! মরে যাব আজ! যা গরম পড়েছে! বাড়ি খোঁজা কি মুখের কথা?
- যাত্রা বন্ধ করে আসল কথা বল! পেলি? আমার কথায় অখিল যেন একটু আহত হল মনে হল! বলে
- হ্যাঁ পেলাম বলে আমাকে পাত্তাই দিল না! বৌয়ের দিকে ফিরে শুরু করল
- হ্যা বোউদি যা বলছিলাম! দোতলা বাড়ি, সামনে বেশ কয়েকটা ফাঁকা জায়গা জুড়ে বাগান আর প্রচুর গাছ গাছালিতে ভর্তি! তুমি যেমন চেয়েছিলে তেমনটিই!
- বউ ভক্তিতে গদগদ হয়ে বলে উঠল সত্যি ঠাকুরপো তোমার এই বন্ধুটি একটা ঢ্যাঁড়শ! একটা বাড়ি বদলাবার কথা বলে আসছি এত কাল ধরে বাবু পাত্তাই দিল না!
- অখিল গ্যাস পেয়ে আমার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে দেখল অবস্থা ভাল নয়! যেকোনো সময়ে পিঠে প্রহার আছড়ে পড়তে পারে! তাই তাড়াতাড়ি বলে উঠল নাহ! বোউদি আমি আসছি!ওদিকে আমার বউটাও পথ চেয়ে বসে আছে! বলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমাকে বলল আজ ই দেখা করে বুক করে আয়! পরে হাতবদল হয়ে যেতে পারে! আমি হাতের কিছু পাওয়া যায় কিনা খুঁজছিলাম! ও সেটা বুঝতে পেরেই দে দৌড়! বউ এর হাসিতে চটকা ভাংল! সত্যি তোমরা পার বটে দুই বন্ধুতে!
- অতঃপর বিকেলে তিনজনে সেজেগুজে বাড়ি দেখতে গেলাম! কাঁঠালিয়া বাসস্টপ এ যখন নামলাম সন্ধের আঁধার ঘনিয়ে এসেছে! আশেপাশের গাছগাছালির ফাঁক থেকে পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজ ভেসে আসছে! আমাদের বন্ধুবরের বলে দেওয়া ঠিকানায় যেতে যেতেই আরো ত্রিশ মিনিট লেগে গেল! যেরকম প্রত্যাশা করেছিলাম জায়গাটা তার থেকে বেশীই নির্জন! আচমকা ডান হাতে টান পড়তেই দেখি মেয়েও ভয়েতে আমার বগলের তলায় সেঁধিয়ে যাচ্ছে! বউ এর দিকে তাকিয়েও সাহস পাওয়ার মত কিছু দেখলাম না! দেখলাম প্রিয়তমা র চোখদুটো ভয়ে বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠেছে! যাই হোক! মনে মনে বললাম নিরিবিলি চেয়েছিলে না! বেশ হয়েছে!! কিন্তু সাথে আমিও তো ফাঁসলাম! আধভাঙা গেট টাকে সরাতেই বিশ্রী ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ করে পুরোটাই খুলে গেল! ভিতরটা বেশ পরিষ্কার......বেশ বাগান বাগান লাগল! অনেক গাছ গাছালিতে ভর্তি! ভিতর দিয়ে অল্প উঁচু করে মোরাম বিছানো রাস্তা! একটু দূরেই গোলাপি রঙের দোতলা বাড়িটা ভূতের মত দাঁড়িয়ে আছে! আর তার ঢালু বারান্দায় হ্যারিকেন হাতে আর অমায়িক হাসি মুখে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে! আমাদের দেখেই অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এল! নমস্কার প্রতি নমস্কারের পালা শেষ হবার পর জানতে পারলাম মালিকের নাম অঘোর চন্দ্র রাউত! তার তেজারতি র কারবার ছাড়াও আরো দুই জায়গায় বাড়ী আছে! থাকেন ত্রিবেণী তে! এই বাড়ী কেন ছেড়ে দিলেন বিক্রি র জন্য সে কথা শুধাতেই ভদ্রলোক কিরকম যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন! গোমড়ামুখে বললেন "আসুন ভিতরে ঘরগুলো দেখাই, আমাকে আবার তাড়াতাড়ি এই জায়গা থেকে বেরোতে হবে"! শেষ কথাটায় কিরকম যেন একটা খটকা লাগল! যাই হোক সপরিবারে ভিতরে ঢুকে দেখি বেশ সাজানো গুছানো ছিমছাম! স্ত্রী র যেটা সবথেকে ভাল লাগল বাড়ির পিছন দিকে দরজাটা খুললেই শান বাঁধানো বড় কলতলা! পাশেই একটা মজে যাওয়া কুয়ো! ব্যাবহার হয় না বলে অঘোর বাবু জানালেন ওটা পাত দিয়ে ঢাকা দেওয়া আছে! আর যেটা সবথেকে অবাক লাগল কুয়োর পাশেই উঠে গেছে এক বিশাল পাকুড় গাছ! উপরে সেটা শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে গোটা বাড়িটিকে প্রহরীর মত ঘিরে রেখেছে!
- হেঁহে! বুঝলেন দাদা! এই বাড়িটার এইটাই বিশেষত্ব! অত্যাধিক গরমেও বাড়ির ভেতর টা খুব ঠাণ্ডা! আমি খেয়াল করলাম উনি বলার মাঝে মাঝেই পাকুড় গাছের উপরের ডালপালার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টি মেলে দেখছেন! আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার! বাকি গাছ গুলো থেকে অজস্র পাখির কিচিরমিচির ভেসে এলেও এই গাছটি অদ্ভুতরকম শান্ত! সব দেখেটেখে গিন্নী কে বললাম কই গো কিছু বল! পছন্দ হল কিনা কিছুই তো বললে না! হঠাৎ খেয়াল হল মেয়ে কই!!! আবিষ্কার করলাম মেয়ে কলতলায় দাঁড়িয়ে পাকুড় গাছটার দিকে চেয়ে একমনে কি দেখছে!চোখ দুটি যেন বিস্ফারিত হয়ে গেছে তার!! আমি হাঁক দিলাম- কিরে! কি দেখছিস! এদিকে আয়! আড় চোখে দেখলাম অঘোর বাবুর মুখেও একটা চাপা আতংক ফুটে উঠেছে আর বিড়বিড় করে কি যেন বলছে! একটু কান পেতে শুনলাম ভদ্রলোক হনুমান চালিশা বলে চলেছে! শুনে বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল! মেয়ে দৌড়ে আমার কাছে এসে বলল - জান বাপি আমি না গাছে স্পষ্ট দেখলাম কে যেন বসে আছে! অঘোরবাবু শোনামাত্র প্রসংগ ঘুরিয়ে বলল- তা এই বাড়ি পছন্দ হয়েছে তো? এগ্রিমেন্ট টা সেরে ফেলি বলুন! আমি বললাম কতটে ফিক্সড হলেন বলুন?
- আজ্ঞে পনেরো তে পাকা কথা! আমি যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! এত কম দাম! লোন তো তার চেয়েও বেশি! আমি আর গিন্নী মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম! অঘোরবাবু আমাদের ইতস্তত অবস্থা দেখে বলেন- দাম একটু বেশি হয়ে গেল না? আচ্ছা বার ই দেবেন! হলপ করে বলছি এত কম দামে এত বড় বাগান বাড়ি আর কোথাও পাবেন না! বলার মাঝে লক্ষ করলাম তিনি আবারো কলতলার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন! অবশেষে এগ্রিমেন্টে সই সাবুদ করে যখন বাগানের ভিতর দিয়ে মোরাম বিছানো রাস্তায় হাঁটছি তখনই ঘটল ঘটনাটা! কলতলা থেকে এক অদ্ভুত ঝপাং করে একটা আওয়াজ ভেসে এল! সাথে একটা বাচ্চার আর্ত কান্না! থমকে দাঁড়ালাম! কি হল ব্যাপারটা! অঘোরবাবু পিছনেই আসছিলেন! তিনিও আওয়াজ টা শুনেছিলেন বোধকরি! তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললেন শকুনের বাচ্চা কাঁদছে মশাই! এরকম আওয়াজ শুনলে রাতবিরেতে হামেশাই মানুষের বাচ্চার কান্নার আওয়াজ বলে ভ্রম হয়!
- আর ওই জলের আওয়াজ টা! মজা কুয়ো থেকে এল মনে হয়!
- না না ও কিছু নয়! ভুল হতে পারে! চলুন এগিয়ে দিয়ে আসি!
অতঃপর সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পর গিন্নীর প্রথম কথা শুনলাম - ওগো! বাড়িটা যেন কিরকম! সবকিছু ঠিক! কিন্তু কলতলাটা......!
- দেখো! যা পেয়েছ এর চেয়ে কম দামে কিছু পেতে না! বলে হঠাৎ মনে পড়ল মেয়ের সেই অদ্ভুত কথা! মেয়েকে তৎক্ষণাৎ ডেকে শুধালাম-হ্যারে! কি দেখেছিলি তুই গাছে?
- বাপি! আমি স্পষ্ট দেখলাম গাছে কেউ বসে আমাকে দেখছিল! বলার সময় লক্ষ করলাম মেয়ের গলার স্বরটা একটু কেঁপে গেল!
- যাঃ! হনুমান হবে হয়ত!
- না বাপি! লম্বা চুল ছিল! উড়ছিল হাওয়ায়!!
- কি যে বলিস না! ঘুমাতে যা! মেয়েকে তো পাঠিয়ে দিলাম! কিন্তু মনের কোথাও একটা কু ডাক ডাকছিল! জানিনা এর পরিণতি কি হবে!
- অবশেষে একটা শুভদিন দেখে জিনিষপত্র লোড করে নতুন বাড়িতে এলাম! সামনের বড় বাগানটাকে পরিষ্কার করতেই দু দিন লেগে গেল!! সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার বাগান পরিষ্কার করানোর লোক পেয়েও তাকে দিয়ে কিছুতেই কলতলা পরিষ্কার করাতে পারলাম না! চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট!!! এই ভয়ই দেখেছিলাম অঘোরবাবুর চোখে! মনটা কেন জানিনা কু ডেকে উঠল! ভয়ে ভয়ে কলতলাটার দিকে তাকালাম, দিনের উজ্বল আলোতে ও পাকুড় গাছের ছায়ায় কলতলাটা খাঁ খাঁ করছে! গিন্নী রান্নাঘরে কি একটা বসিয়েছে! মেয়েটা কোথায় জানি কি করছে! আমি লোকটিকে তার পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে আসছি আচমকা নজরে এল কলতলায় পাকুড় গাছটার নীচে কি একটা পড়ে আছে লাল মতন! গিয়ে হাতে নিয়ে দেখলাম একটা পুরোনো পুতুল! সুতো বেরিয়ে গেছে, একটা চোখ নেই! পায়ের অর্ধেক টাই ছেঁড়া! একটু অবাক হলাম! মেয়ের পুতুল খেলার বয়স।তো নেই! তাহলে কি গিন্নী??? যাহ্!!! তা কি করে হয়??? আমি রান্নাঘরে ঢুকে দেখি গিন্নী পিছন ফিরে কি একটা রান্না করছে! আমি শুধালাম কি গো? এই পুতুল টা এল কি করে এখানে? মস্করা করে বললাম তুমি খেল না কি? গিন্নীর কোন ভাবান্তর দেখা গেলনা! আমি রেগেমেগে ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে উঠতেই চিলেকোঠার দরজা ঠেলে গিন্নী নেমে এল! আমার শিঁড়দাড়া বেয়ে একটা হিম স্রোত নেমে গেল! তাহলে রান্নাঘরে কে! আমাকে ভূতের মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গিন্নী মারল ঠেলা!
- হাঁ করে কি দেখছ!
- তুমি ছাদে ছিলে?
- হ্যাঁ
- তাহলে রান্নাঘরে কে?
- আমি ছাড়া এখানে কে থাকবে! কি সব ভুলভাল বকছ?
- বুঝতে পারলাম কিছু একটা অমঙ্গল হতে চলেছে! তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম মেয়ে কোথায়???
- মেয়ে তো বাগানে! দোলনায় দোল খাচ্ছে!
আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখলাম বাগানের উত্তর পশ্চিম কোণে একটা দোলনায় মেয়ে আপন মনে বসে আছে! আরেকটা ব্যাপার লক্ষ করে শিড়দাঁড়া বেয়ে হিমেল স্রোত নেমে গেল! দোলনাটা আপনমনে দুলছে! মনে হচ্ছে পিছন থেকে কেউ যেন ঠেলে দিচ্ছে তাকে!! আতংকে চিৎকার করে উঠলাম! তিতলি উঠে আয় বলছি! অমনি দোলনাটা থেমে গিয়ে মাথার উপরে যত গাছ গাছালি ছিল আলোড়ন হতে লাগল! আচমকা ঘরের ভিতর থেকে বউ এর আর্ত চিৎকার ভেসে আসল! মরণ আর্তনাদ যেন! আমি মেয়েকে কোলে করে নিয়েই ছুট ঘরের দিকে! গিয়ে দেখি বউ কলতলার দিকে স্তম্ভিতের মত আঙুল তুলে দাঁড়িয়ে আছে! যেন কিছু দেখাতে চাইছে! আমি চারদিকে চেয়ে কিছু দেখতে পেলাম না! দুই ঘন্টা পর বউ একটু ধাতস্থ হবার যা জানা গেল তা সত্যি ভয়াবহ! বউ রান্নাঘরে খুন্তি নাড়তে নাড়তে টের পাচ্ছিল চিলেকোঠা থেকে কে যেন ধীর পদে নেমে যাচ্ছে সিঁড়ি দিয়ে! ভাল করে তাকিয়ে দেখল একটা মাঝ বয়সী মেয়েছেলে গায়ে ছেঁড়া কাপড় মুখটা নীচের দিকে নামানো আর সারামুখ অবিন্যস্ত চুলে ঢাকা! বাঁ হাতে একটা সাত আট বছরের মেয়ে হাত ধরে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে কলতলায় কুয়োটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! বাচ্চাটার নাক দিয়ে ক্রমাগত টুপ টাপ করে ঝরে পড়ছে! রক্তের ফোঁটা!!
আমার কাছে ধীরে ধীরে গোটা ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল! কেন অঘোরবাবুর চোখ মুখ ভয়ে পাংশু হয়ে গেছিল,কেনই বা তিনি এত দাম কমালেন,আর কেনই বা লোকটা কলতলা পরিষ্কার করতে চায়নি! আর এক মূহুর্ত এখানে থাকা চলেনা! বউকে বললাম তাড়াতাড়ি জিনিষ গুছিয়ে নাও বেরিয়ে চল এখান থেকে!
জিনিষ পত্র গুছাতে লাগলাম চাপা আতংকের সাথে! মনে থেকে থেকে একটা প্রশ্ন কেবলই ধাক্কা দিতে লাগল অঘোর বাবু কি এসব কিছুই জানতেন না? নাকি জানতেন বলেই এত কম দামে বাগান বাড়ি টা বিক্রি করে দিলেন? ওই মহিলার সাথে বাচ্চাটার রহস্য কি? কেন তারা বার বার দেখা দিচ্ছে? শেষ কথাটি মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল!!
ওরা যে কায়াহীন সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই! কিন্তু ওরা এখন পর্যন্ত আমার বা পরিবারের কারুর অনিষ্ট করেনি বা করতে চায়নি! তাহলে বারবার তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে কেন? কুয়োটার সাথে এসবের কি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়ে গেছে কোথাও! এসব ভাবছি আচমকা বউ এর আর্তনাদ ভেসে এল ডাইনিং রুম থেকে! তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখি মেয়ে আর গিন্নী দোতলার সিঁড়ির দিকে পান্ডুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! আমি কথা বলতে গেলেই গিন্নী আমার হাত চেপে ধরে চুপ করার ইশারা করল! আর উপরের ঘরের দিকে আঙুল তুলে কি একটা দেখাতে চাইছে! মুখ তুলে যা দেখলাম রক্ত হিম হয়ে গেল!!
দেখলাম দোতলার করিডোর এর লাইট টা জ্বলছে আর নিভছে! আর দোতলা থেকে মেয়ের খেলার ফুটবল টা আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নামছে! গড়িয়ে নামা নয়! রীতিমত লাফিয়ে লাফিয়ে! মনে হয় কেউ বলটাকে ভলিবলের মত ড্রপ খাওয়াতে খাওয়াতে নামিয়ে আনছে! মেয়েকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরলাম! বলটা ঠিক এসে আমাদের পায়ের কাছে থেমে গেল! পাশে গিন্নী রীতিমত থকথক করে কাঁপছে! আমি আস্তে করে বলটাকে হাতে তুলে নিলাম! বুকটা ঢিপঢিপ করছে! আচমকা আমার মনে কি একটা বুদ্ধি খেলে গেল! মেয়েকে বলটা দিয়ে বললাম তুই ছুঁড়ে মার দেখি বলটা দোতলায়! মেয়ে দেখি ভয়ে বড় বড় চোখ করে বলল কি বলছ বাপি?
- আরে ছোঁড় না!
- মেয়ে বলটা ছুঁড়তেই অবাক কান্ড! সেটি আবার আগের মতন সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে নামতে লাগল! আমার মুখে একটা হাসির ঝিলিক খেলে গেল! গিন্নী কে বললাম জিনিষপত্র যা বের করেছিলে গুছিয়ে রাখ! এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দরকার নেই! গিন্নীর অবস্থা তথৈবচ! আমি অবস্থাটা সামলে বললাম আমাকে বিশ্বাস রাখ! কারুর কিছু হবেনা! বলে দোতলার দিকে মুখ করে বলে উঠলাম
- দিদি! ভাইয়ের মত বলছি আমরা তোমার কোন ক্ষতি চাইনা! কিন্তু প্লিজ আমাদের কোন ক্ষতি কোরনা!! একটা জিনিষ বুঝতে পারছি কিছু একটা বলতে চাইছ! প্লিজ সামনে এসে বল! ভাই হয়ে যদি কিছু করতে পারি!
- বলার সাথে লক্ষ করলাম দোতলার লাইট টার জ্বলা নেভা কমে গিয়ে কলতলার পাকুড় গাছটায় প্রচন্ড আলোড়ন শুরু হল! রান্নাঘরের দরজা দুমদাম শব্দে একবার খুলতে আরেকবার বন্ধ হতে লাগল! কানে এল সেই পরিচিত পায়ের আওয়াজ! দেখলাম এক অস্পষ্ট নারীমূর্তি হাতে একটি বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে প্রবেশ করল ঘরে! ঠিক সেই সময়ে ঘরের ভোল্টেজ টাও ডাউন হয়ে এক অদ্ভুত আলো আধারির খেলা চলছিল! স্পষ্ট দেখলাম নারীমূর্তি টি আমার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে! একটা অদ্ভুত ফ্যাঁসফেসে গলায় বলল- ভয় পেয়োনা গো! আমার খুব কষ্ট! আমার মেয়েটাকে ও নির্মম ভাবে মেরে ফেলেছে! আমি শুধু অসহায়ের মত চেয়ে দেখেছি! কিছু করতে পারিনি!
- আমি বোবা গলায় বলতে চেষ্টা করলাম তোমার মেয়েকে কে মেরেছে দিদি?
- একটা ফ্যাঁসফেঁসে গলায় যে নামটা ভেসে এল সেটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমি! নামটা পরিষ্কার শুনলাম
- অ--ঘো---র!!!!!! আমার সামনে গোটা দুনিয়া টা দুলে উঠল! অঘোর বাবু!!! জমির মালিক??????
- ছায়ামূর্তি টি তার মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে শুরু করল তার দুঃখ ভরা জীবনের ইতিহাস! সে জন্মসূত্রে ওপার বাংলার মেয়ে! পেটের টানে তার এখানে আসা! ঘটনাসূত্রে তার অঘোরের সাথে আলাপ! লোকটা তার শরীরে উপর প্রথম থেকেই আসক্ত ছিল! নানা ছলে বলে কৌশলে তার কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করত! কিন্তু সে তার এই বাগান বাড়িতে দেখাশোনার কাজে নিযুক্ত হয়েছিল! সেটা ছেড়ে অন্য কাজ দেখাও ছিল দুষ্কর! একদিন সুযোগ পেয়ে অঘোর তার সাথে জোর করে মিলিত হয়!
- কথাগুলো বলার মাঝখানে লক্ষ করলাম তার গলার স্বর একটু কেঁপে গেল!আমি জিজ্ঞাসা করলাম তারপর??
- একটু থেমে আবার শুরু করল
- শয়তান টা আমার গর্ভে সন্তানের জন্ম দিয়েও একদিনের জন্যও তার পাশবিক অত্যাচার বন্ধ রাখেনি! অনেক কষ্টে মেয়েকে ওর মারের হাত থেকে বাঁচাতাম! মেয়েটা আমার দুধ খেতে চাইলে দিতনা! জোর করে ঘরে বন্ধ করে রাখত! কতবার মেয়ে খিদেতে কেঁদে উঠত! বলত মা খাব খিদে লেগেছে! ওই শয়তানের মন গলেনি! লাথি মারত ওর নরম শরীর টাকে! একদিন এরকম ই খিদের চোটে খুব কাঁদছিল! অঘোর শয়তান টা এসে সবার আগে কলতলায় মেয়ের ছোট্ট শরীর টাকে টানতে টানতে নিয়ে যায়! তারপর নরম ছোট্ট তলপেটে এক লাথি কষিয়ে দেয়!
- অসহায়ের মত দেখলাম আমার সোনার ছোট্ট শরীর মা-আ-আ ডাক ছেড়েই নেতিয়ে পড়ে! নাক দিয়ে বেয়ে পড়ছে আমার ই রক্ত! রক্ত বের করে দিয়েছে! মেরে দিল আমার কলজেটা কে! কিছু করতে পারলাম না! কিছু না! ছায়ামূর্তিটি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল!
- অসম্ভব নীরবতায় ছেয়ে গেল চারদিকে! আমি টের পেলাম আমার চোখ দুটো দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে! আস্তে আস্তে বাচ্চাটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলাম! উস্কোখুস্কো চুল টা যেন স্পর্শ করতে পারছি মনে হল! আস্তে করে চুল গুলো মুখের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে মুখটা দু হাতের মধ্যে নিয়ে একটু উঁচু করে আলো আঁধারিতে দেখলাম কি কচি মুখটা! কি নরম! আর নাকের পাশ দিয়ে টাটকা গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা! আমার বুকটা ফেটে গেল যেন! বললাম
- খাবি মা? খিদে পেয়েছে?
- বাচ্চাটি কিছু না বলে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল! আমি তাড়াতাড়ি ফিরে গিন্নী কে কিছু বলতে যাব দেখি গিন্নী ফ্রিজ থেকে যত খাবার ছিল সব সাজিয়ে রাখছে মাটিতে! চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল মাটি ভিজিয়ে দিচ্ছে! আমার বউ কাঁদছে! বুঝলাম ছায়া থেকে কায়া এই পরিসিরে মাতৃহৃদয়ের বিবর্তন হয় না! মা মা-ই থাকে! অদৃশ্য ভোজ বাজির মত মাটিতে রাখা খাবার গুলো নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যায়! তারপরেই শোনা যায় কলতলায় জলের আওয়াজ! নিমেষে সব বাসন কোসন ঝক ঝকে রূপ নিয়ে রান্নাঘরের সঠিক জায়গায় সজ্জিত হয়ে যায়! ছায়ামূর্তিটি বলে আমি তোমাদের প্রথম দিন দেখেই বুঝেছিলাম তোমরা মানুষ খারাপ না! প্রতিশোধ নেবার জন্য দিন গুনছি! জানোয়ার টা আমার মেয়েকে মেরে ছোট্ট শরীরটা ওই কুয়োতে ফেলে দিয়েছে! ওখান থেকে উদ্ধার না করতে পারলে আমার মুক্তি নেই!
- শুনে আমার কিরকম যেন ঘোর লেগে গেল! বললাম দিদি ওই জানোয়ার কে আমি নিয়ে আসব! তোমার মেয়ের অন্তিম সৎকার আমি করব! এরকম জানোয়ারের বেঁচে থাকার অধিকার নেই! মূর্তিটি একটু হাসল! তারপর মেয়েকে নিয়ে আস্তে আস্তে পাকুড় গাছটার দিকে এগোতে এগোতে বলল- ও হ্যাঁ! এই অভাগিনীর নাম সরলা! নাম বলবে! চিনতে পেরে যাবে! বলার সাথে সাথে অদৃশ্য হয়ে যায় দুটি শরীর! আর কুয়োর ভিতর থেকে ভেসে আসে ঝপাং করে এক শব্দ! কায়াহীনের আবাস স্থল!!!!!
- পরের দিন সকালেই ফোন করলাম অঘোর বাবুকে! জানোয়ার টার গলার আওয়াজ শুনেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে গেল! কিন্তু বুঝতে দেওয়া চলবে না! যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে বললাম এগ্রিমেন্টের একটা ব্যাপার নিয়ে কিছু বলার ছিল! আপনি সন্ধের দিকে আসুন না!
- শুনে কিরকম যেন থতমত গেয়ে গেল অঘোর চন্দ্র রাউত! বলল ইয়ে মানে সকালে গেলে হয় না?
- কেন কোন সমস্যা আছে নাকি?
- হ্যা মানে....না.....মানে ইয়ে....সকালে করা যায় না?
- না যায়না! কঠোর বাক্যে জানিয়ে দিলাম! আসতে হলে সন্ধে বেলাতেই আসতে হবে! আমার কাজ আছে এখন!তাই সকালে হবে না!
- আচ্ছা ঠিক আছে! আসবখন! কিন্তু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে হবে! এতটা রাস্তা যেতে হবে ত!
- আচ্ছা আপনি এত তাড়ায় থাকেন কেন বলুন তো? সেদিন ও তাড়ায় ছিলেন! আজো এত তাড়া আপনার!
- না কিছুনা! আচ্ছা আপনাদের ওদিকে সব ঠিক তো! কোন অসুবিধা নেই ত?
- এবার একটু সাবধান হয়ে গেলাম! হারামী টা খেলছে বুঝলাম! বললাম না না কোন সমস্যা নেই! এত সুন্দর পরিবেশ ভাবাই যায় না!
- বলার সাথে সাথে পাকুড় গাছটার থেকে একটা চাপা খিল খিল হাসির আওয়াজ ভেসে এল!
- আচ্ছা কে হাসছে বলুন তো?হাসির আওয়াজ শুনলাম! অঘোরের কন্ঠে ভয়!
- ও কেউ না! আপনি আসুন! আমার কাজ আছে! সন্ধেবেলা দেখা হচ্ছে! বলে লাইন টা কেটে দিলাম!
- আড় চোখে বাগানের কোনায় চেয়ে মেয়ে দোলনায় বসে আছে! আর দোলনাটা আপনা আপনি হাওয়ায় দোল খাচ্ছে! বুঝলাম ছায়া আর কায়ায় খেলায় মেতেছে! এই খেলাই মরণ খেলায় বদলে যাবে আজ রাতে! পাকুড় গাছটার দিকে তাকালাম! দেখলাম কি একটা সড়াৎ করে উপরে উঠে গেল! কুয়োর কাছে গিয়ে দেখি ঢাকনিটা তালা দিয়ে বন্ধ করা আছে! রাগে আমার সর্ব শরীর কাঁপতে লাগল! আর কাল বিলম্ব না করে থানায় গিয়ে বড় বাবুকে সবিস্তারে সব বর্ণনা করলাম! শুনতে শুনতে বড় বাবুর চোখ বিস্ময়ে ঠিকড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিল! ঠিক হল আসামীকে বেঁধে থানায় ফোন করলেই পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দলবল নিয়ে হাজির হবেন! ফিরে গিন্নীকে বললাম ব্যাবস্থা হয়ে গিয়েছে! সবাই যেন তৈরি থাকে! বলার সাথে সাথে টের পেলাম রান্নাঘরের দরজা টা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল! বুঝলাম দিদি ও যা বোঝার বুঝে নিয়েছে! আজ রাতেই নাটকের যবনিকা পতন হবে!
সময় যত এগিয়ে আসতে লাগল ততই একটা চাপা টেনশন বাড়িটা কে আস্তে আস্তে গ্রাস করছিল! দূরের ঝোপঝাড়ের মধ্যে কি একটা চাপা আতংক থম মেরে আছে! গাছের পাতাগুলো ও আজ অদ্ভুত রকম ভাবে নির্বাক নিশ্চুপ!
অবশেষে বিকেল গড়িয়ে সন্ধের আঁধার ঘনিয়ে এল ভুতুড়ে বাড়িটাকে ঘিরে! বউ মেয়েকে আগে থেকে বলে দেওয়া ছিল তারা যেন বাইরের ঘরে থাকে! কোনরকম কিছু হলে দ্রুত বাইরে বেরোতে পারে! ভুলেও কলতলার ছায়া যেন না মাড়ায়!
আড়চোখে পাকুড় গাছ টার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বড় বড় ডালপালা নিয়ে ঘন পাতার অরণ্যে বিভীষিকাময় চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! আশেপাশে তাকিয়ে সরলাকে কোথাও দেখতে পেলাম না!
আচমকা কানে এল গেট খোলার আওয়াজ! মনটা অশান্ত হয়ে উঠল আচমকা! জানোয়ারের আবির্ভাব ঘটেছে! আচমকা পাকুড় গাছটায় ঠান্ডা হাওয়া খেলে গেল! বুঝলাম শিকারি বুঝেছে শিকার আসছে! স্বাভাবিক হয়ে বেরিয়ে দেখি অঘোর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে! কিন্তু তার হাঁটার মধ্যে কেমন যেন সন্ত্রস্ত ভাব!
- আরে অঘোর বাবু যে! আসুন আসুন কথা আছে!
- বাগান টা তো অন্ধকার করে রেখেছেন মশাই! আলো লাগাননি কেন?
- সেকি মশাই! আপনি তো এতকাল এখানে ছিলেন! আজ অন্ধকার এত গায়ে লাগছে কেন?
- অঘোরের চোখ দুটো দেখলাম অন্ধকারেও হিংস্র জন্তুর মত জ্বলে উঠল!
- কি বলবেন তাড়াতাড়ি বলুন! আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে!
- কোথায়?
- এই প্রশ্নের উত্তরে অঘোর চমকে উঠল! বলল মানে? বাড়ি যাব!
- কেন? এটা বাড়ি নয়? আমি বলতে বলতে শয়তানটার উপর আরো ঝুঁকে এলাম! আজ যেন কি হয়েছে আমার? কথা গুলো আমি নয় অন্য কেউ আমাকে দিয়ে বলাচ্ছে!
- একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে অঘোর বলে কি বলবেন কাজের কথা বলুন?
- এগ্রিমেন্টে আপনি একটা বিষয় এড়িয়ে গেছেন!
- কথাটা শুনে এত অবাক হয়ে গেল শয়তান টা যে কথা বলতে বলতে কখন যে কলতলায় পৌঁছে গেছি খেয়াল করতে পারল না!
- কোন বিষয় টা বলুন তো?
- আচ্ছা সরলা কে?
- এই প্রশ্ন টার জন্য মনে হয় প্রস্তুত ছিল না তেজারতি কারবার করা মানুষ টা! হাঁ করে আমার দিকে চেয়ে রইল! চারদিকে অসম্ভব নিঃস্তব্ধতা! পাকুড় গাছটায় হাওয়া বাতাস লেগেছে মনে হল! স্পষ্ট দেখলাম অঘোর এর পিছন থেকে উঠে যাওয়া পাকুড় গাছটা থেকে আস্তে আস্তে এক জোড়া পা শুন্যে ভাসতে ভাসতে নামছে! অঘোর ভয়ার্ত কন্ঠে এক চিৎকার করে পালাতে গেল ঘরের দিকে! আমি এই সুযোগ টারই অপেক্ষায় ছিলাম, জানোয়ার টাকে মারলাম এক ধাক্কা! মাটিতে পড়ে যেতেই রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে দিলাম! শুনলাম কুয়োর পাতটা ঝন ঝন করে খোলার আওয়াজ! বউ আর মেয়েকে বললাম - চল! কাজ শেষ! রহস্যে ঘেরা বাড়িটা ছেড়ে যখন বেরিয়ে আসছি পিছন থেকে অমানুষিক যন্ত্রণাকাতর মানুষের মরণ আর্তনাদ ভেসে আসছে! পকেট থেকে মোবাইল বের করে থানায় ফোন করতে গিয়েও হাত টা থেমে গেল! গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সেই বাচ্চা মেয়েটি! আশ্চর্য এখন আর ভয় করছে না! হাঁটু গেড়ে বসে ছায়ামূর্তিটিকে বুকে জড়িয়ে নিলাম! ছায়া কায়া আজ এই পিতৃ হৃদয়ে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে! মেয়েটি আস্তে আস্তে আমার বুকে মিলিয়ে গেল আমার চোখের জলে ভেজা গাল টা ছুঁয়ে!! পিছনে তখন আর্তনাদ থেমে গেছে! গোটা বাড়িটাকে আস্তে আস্তে গ্রাস করছে মৃত্যু নৈঃশব্দ্য! আচমকা দমকে আমার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এল! মেয়ের বুকে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠলাম
- বিশ্বাস কর মা! তোর ব্যাথা লাগলে আমারো লাগে! ছায়া কায়া বুঝি না! আমি তো বাপ! তোকে আর কখনো বকবো না!.......কখনো না........!!!!!!!
অরিন্দম © নবপল্লী
No comments:
Post a Comment