Wednesday, 17 January 2018

জীবন মরণ


ডঃ দিবাকর সোম ক্লান্ত পায়ে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালেন! দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দিলেন দূরে....বহুদূরে! তখন তিলোত্তমার বুকে সন্ধে নামছে! মহানগরীর কর্মব্যস্ততা চারদিকে মুখর করে তুলেছে! ১৩ তলা থেকে দিবাকর একবার নীচের দিকে তাকালেন! নিওন আলোর ল্যাম্পপোস্ট গুলো মনে হয় তার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করছে! চশমা টা খুলে একবার ভাল করে মুছে নিলেন! হয়ত এ তার মনেরই ভুল! পরিশ্রম তো আজ কম হলনা! কিন্তু বুকের ভিতরে অব্যক্ত যন্ত্রণার অনুভূতিটা আজ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে ডাক্তারকে! পিছন দিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিলেন পেশেন্ট কে! বছর পঁচিশ এর যুবকের অপারেশন করলেন আজ! সিরিয়াস অ্যাকসিডেন্ট! বুকের বাঁ দিকটা রড ঢুকে ফালাফালা হয়ে গেছিল! ঘন্টা পাঁচেকের অমানুষিক পরিশ্রমে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন যুবককে! এককথায় অপারেশন সাকসেসফুল! কিন্তু তাও বুকের ভিতরে চিনচিনে যন্ত্রণাটা যাচ্ছেনা! জানলার কাছ থেকে সরে এলেন! টের পেলেন মোবাইলটা ভাইব্রেট হচ্ছে! বউ এর ফোন! সকাল থেকে ত্রিশ বার ফোন এসেছে! একবারও রিসিভ করেন নি! বুকের ব্যাথাটা বাড়ছে! কানে এখনো বাজছে পেশেন্ট পার্টির খিস্তি সংকীর্তন!
- শালা ডাক্তার না কসাই! দে মালটাকে যমের বাড়ি পাঠিয়ে!
- শুয়োর খালি টাকা নেবে! আজ বাবুলে র কিছু হলে এই নার্সিংহোম থাকবেনা! 
স্যর! চা দেব? আচমকা সম্বিৎ ফিরে তাকিয়ে দেখেন ওয়ার্ড বয় প্লেট নিয়ে এসেছে! ইশারায় নামিয়ে রাখতে বললেন! ম্যাজেন্টা কালারের ফোটোফ্রেম টার দিকে ডাক্তারের দৃষ্টি আটকে গেল আচমকা! প্রভাকরের ওই মায়াবী চোখ দুটির দিকে ডাক্তারবাবুর দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল! স্কুলে ছেলেকে ড্রপ করে বেরিয়ে যাওয়ার মূহুর্তেও পিছন থেকে ছেলের ডাকে সুইফট টা বন্ধ করে পিছনে তাকিয়েছিলেন তিনি! 
- বাপি আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো! আমার বার্থডে তে মা আর আমাকে ট্রিট দেওয়া চাই! ডাক্তার পিতা স্মিত হেসে সম্মতি জানিয়েছিল! কয়েক ঘন্টা পরেই আসে দুঃসংবাদ টা! প্রভাকর.....

স্যর! আপনার স্যুট রেডি! নার্সের ডাকে সম্বিৎ ফেরে দিবাকরের! দিবাকর কিছু না বলে উঠে রেডি হয় বাড়ি যাওয়ার জন্য! বেরোবার সময় পেশেন্ট এর পরিবারের মুখোমুখি পড়ে যান! কোনমতে ধরা গলায় বলে ওঠেন Operation successful.... he is now out from danger! বলে আর একমূহুর্ত ও দাঁড়ান না! লম্বা করিডোর এর দিকে পা বাড়ান! পা টা একটু কেপে গেল মনে হল! তখুনি ফোনটা বেজে ওঠায় নিজেকে সামলে ফোন টা কানে দেন- হ্যা মিনতি আমি আসছি! আর এক মুহুর্ত দাঁড়ান না সেখানে! লম্বা পদক্ষেপে বেরিয়ে যান! বড় বেয়াদপ লোক! এ যাত্রা বেচে গেল! এক নার্স পেশেন্ট পার্টির সেই লোকটির দিকে এগিয়ে বলে কাকে বেয়াদপ বলছেন মশাই! আজ সকালে ওনার ছেলে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে স্কুলএর পাঁচতলা ব্যালকনি থেকে পড়ে মারা গিয়েছে! পুত্রশোক বুকে নিয়ে উনি আপনার ছেলেকে পাঁচ ঘন্টার অপারেশনে যমের মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন! নার্সের শেষ কথা গুলি নির্জন নার্সিংহোমের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিধ্বনি হয়ে! তাদের মুখে আর শব্দ নেই! শুধু দূরে একটা ভারি বুটের শব্দ একরাশ অভিমান নিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে ব্যথার অন্ধকারে....নার্সিংহোমের প্রতিটি ইঁটে!!!!
© 
অরিন্দম  নবপল্লি

No comments:

Post a Comment

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন  প্রত্যাশা মতই ভোটের চিঠি টা হাতে পেয়েই বিরক্তিতে ভুরু দুটো কুঁচকে গেছিলো। জানতাম আসবেই, এ এমন প্রেম! কি...