ঊর্ণনাভ
গল্প: অরিন্দম
নবপল্লী বারাসাত
প্রত্যেক সকালে ঘুম থেকে উঠেই আকাশের একটা বদ দোষ আছে! ঘুম জড়ানো চোখে সায়নীর নামটা উচ্চস্বরে ডাকা তার বিবাহিত পাঁচ পাঁচ টা বছরের জীবন চর্যায় মজ্জাগত হয়ে গিয়েছে! বউটাও ঘরের যে কোণায় কাজে ব্যস্ত থাকুক কোমরে আঁচল টা জড়িয়েই ছুটে আসবে.....আসবেই!..... কারণ জানে ছেলেটি কি চাইছে! সায়নী কাছে আসতেই আকাশ শাহরুখের মতন দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দেয়! সায়নী মুচকি হেসে ভেজা হাতেই আকাশের মাথার পিছনের কোঁকড়া চুল গুলোকে জড়িয়ে ধরে! আঁচলটা ঈষৎ আলগা করে দেয় এদিক ওদিক তাকিয়ে!......আকাশ সেই সুযোগে নরম দুটি বুকের ভালোবাসার ওমে হারিয়ে যায়! ভালোবাসা ছাড়া তাদের সকাল শুরু হয়নি কোনদিন ও! আজও সকালে উঠে অভ্যাসবশে সায়নীর নামটা শুকনো ভাঙা কন্ঠে দুই এক বার ডেকেই খানিক গুম মেরে যায়!
মেয়েটির সাড়া পাওয়া যায় না! গত ছয় মাস ধরেই এই ধারাবাহিক চলছে! অথচ আকাশ দিনের এই সময় টা আসলেই কেমন যেন বেবাক সব কিছু ভুলে যায়! ভালো করে চোখ কচলে মোবাইল অন করে দেখে আজ ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, চমকে উঠল সে! শিরদাঁড়া টানটান হয়ে গেল আকাশের। কাল কোর্টে শুনানির দিন!......... ডিভোর্সের.....! সায়নী বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে আজ ছয়মাস হতে চলল! কিন্তু তাও যেন প্রতিদিন আকাশের ফোনটায় নিয়ম করে স্ক্রিন অন করলেই উপস্থিতি জানান দিয়ে যায় ডাগর দুটি চোখ মেলে, যেন এখুনি বলে উঠবে "কি দোষ ছিল আমার"? আকাশের বুকটা যেন হাহাকার করে ওঠে-"তোমার কোন দোষ ছিল না গো! আমিই তোমাকে রাখতে পারলাম না কাছে!" স্বগতোক্তি র মতন বিড় বিড় করে ওঠে আকাশ!
(প্রথম কিস্তি সমাপ্য)
(দ্বিতীয় কিস্তি)
- এই খোকা! ওরকম করে বসে আছিস কেন? শরীর খারাপ?
আচমকা এক মহিলাকন্ঠে আকাশের চিন্তাজাল সমস্ত কিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়! তার মা যে কখন তার শোওয়ার ঘরে সকালের প্রসাদী ফুল দিতে চলে এসেছে তা সে খেয়াল ই করতে পারেনি!
- না মা! এই একটু বসে আছি। এখনি ঘুম ভাঙল!
- নে এবার উঠে পড়। সন্ধেবেলা দত্তবাবুর বাড়ি থেকে তোকে দেখতে আসবে!
- মানে? কে? কখন? কেন?.......কিছু যেন বোধগম্য হয় না আকাশের! থতমত খেয়ে বলে ওঠে!
- তোর ফোটো দেখিয়েছি! মেয়ের খুব পছন্দ হয়েছে তোকে! বাড়ির লোকের ও অমত নেই! আজ বাড়ি দেখতে আসছে! সাথে মেয়েও আসছে! তৈরি হয়ে নে!
- ভদ্রমহিলা কথাগুলো বলে আকাশের মাথায় প্রসাদী ফুল ছুঁইয়ে দিয়ে কি একটা দুর্বোধ্য স্বরে বিড়বিড় করতে লাগল! আকাশ স্পষ্ট শুনতে পায় তার মা বলছে- ঠাকুর! আমার ছেলেটিকে দেখো! ওই ডাইনির পাল্লায় না পড়ে যেন!
আকাশের মনপ্রাণ বিরক্তি আর ঘৃণায় ভরে ওঠে!
- ধুত্তোর! নিকুচি করেছে ঠাকুরের!
বলে একঝটকায় ফুল সমেত মায়ের হাতটি মাথা থেকে সরিয়ে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায়! মা অঞ্জনা অবাক চোখে বাথরুমের বন্ধ দরজার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে!
( দ্বিতীয় কিস্তি সমাপ্য)
(তৃতীয় কিস্তি)
স্নান সেরে বেরোতে বেরোতেই পাক্কা একটি ঘন্টা লেগে গেল আকাশের! আসলে শাওয়ার খুলে দিয়ে নীচে চুপ করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল চন্দ্রাহতের মতন! পুরোনো দিনের কত না কথা... সায়নীকে ঘিরে একের পর এক ফ্ল্যাশব্যাক এর মতন মনে পড়ে যাচ্ছিল!
ছাদনাতলায় মালাবদলের ঠিক আগের মূহুর্তে যখন চার চোখ এক হয়েছিল নববধূটি তখন সমাজরীতির তোয়াক্কা না করে সামনে মালা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে কেন জানি না হঠাৎ একচোখ মেরে দিয়েছিল! আকাশের তখন প্রাণ যায়যায় অবস্থা!হেঁচেকেশে অস্থির! অনেক কষ্টে জল খেয়ে সামলে নিয়ে মাল্যদান পর্বটা সমাধা করেছিল! তারপর বাসর রাতে অনেক গভীরে, যখন সবাই রাত জেগে ক্লান্ত, ঢুলছে তখন আকাশ সায়নীকে চোখ মারার কথাটি করতে ঘুমন্ত প্রতিমার মত মুখটি দেখে খুব মায়া হয়েছিল! আহা বেচারি! সারাদিনের ক্লান্তিশেষে ঘুমিয়ে পড়েছে! ঠিক যখনই পাশ ফিরতে যাবে একটা মেয়েলি আদুরে হাত আকাশের গলা জড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল- কি গো ঘুমাও নি? সেও তক্কে তক্কে ছিল! সায়নীকে চোখ মারার ব্যাপার টা জিজ্ঞেস করতেই রিনরিনে উচ্ছল হাসিতে ভেঙে পড়েছিল!
- এই জানো! তোমাকে না হেবি দেখাচ্ছিল! তাই চোখ মারার লোভ সামলাতে পারিনি! খারাপ লাগলে সরি!
আর করব না! বলে আলতো করে নিজের কানটা ছুঁতেই আকাশের বুকে সেদিন কেন জানিনা প্রেমের এক অপূর্ব হিল্লোল খেলে গিয়েছিল! শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে ভিজতে ভিজতে আকাশের আজো সেই সকাল টার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে! রান্নাঘরে তখন তুমুল বাসনকোসন ফেলার শব্দে মুখরিত হচ্ছে চারদিক! সায়নী একের পর এক বাসন ছুঁড়ে চলেছে আকাশের গায়ে! সাথে পরিত্রাহি কান্না মেশানো চিৎকার!
- আমি থাকব না এখানে! আর কতদিন তোমার মায়ের অত্যাচার সহ্য করব আমি আকাশ? কতদিন? সন্তান ধারণ না করতে পারার অপরাধ আমার মা বাবাকে কেন শুনতে হচ্ছে? আমাকে যা খুশি বলুক! কিন্তু আমার পরিবার কেন?
ততক্ষণে পিছনে আরেক ছোটখাটো ভূমিকম্প শুরু হয়েছে! আকাশের মা অনিতা পরিত্রাহি চিৎকার করছে
- বাবু! ঐ মুখপুড়িকে তুই এখুনি বাপের বাড়ি রেখে আয়! তখনই সন্দেহ হয়েছিল আমার! মেয়ের বাপের বাড়ি পুরো জোচ্চোর! জেনেবুঝে একটা খুঁত মেয়ে গছিয়ে দিয়েছে আমাদের!!......
কথাটা শুনে বেশ কয়েক মুহুর্ত পাথরের মত নিস্তব্ধ হয়ে গেছিল সায়নীর প্রতিমার মত শরীর টা! তার সেই রক্ত শিরা ওঠা চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে রীতিমত ভয়ই পেয়েছিল আকাশ!
- কি বলে চলেছে তোমার মা? আর তুমি তার প্রতিবাদ করলেনা? আমি আর একমুহুর্ত এ বাড়িতে থাকব না! বলে দরজার দিকে কয়েক পা এগোতেই সায়নীর মাথাটা ঘুরে যায়! চোখে অন্ধকার নামার আগের মুহুর্তে সে দেখতে পেয়েছিল আকাশ তার পড়ে যাওয়া শরীর টা ধরবার জন্য ছুটে আসছে!......আস্তে আস্তে সায়নীর চোখ থেকে গোটা পৃথিবী মুছে যেতে থাকে!
( তৃতীয় কিস্তি সমাপ্য)
(চতুর্থ কিস্তি)
তাড়াতাড়ি বাথরুম থেকে বেরিয়েই আকাশ তড়িঘড়ি তার জুডিশিয়াল সেপারেশান এর বিভিন্ন কাগজপত্র, সায়নীর লইয়ারের পাঠানো আইনি নোটিশ, আরো হাবিজাবি কিসব নিজের অ্যাটাচি ফাইলটায় ভরে নিল! কিন্তু মনটা তার ক্রমে অশান্ত হয়ে উঠছে,
- "সায়নী! তুমি কি এখনো বোঝনা কি করতে যাচ্ছ? এরা তোমাকে আমাকে থাকতে দেবেনা গো! প্লিজ চলে এস!"
মনের সে ব্যাকুল আহ্বান কেউ শোনেনা! আকাশ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নেয় সদর দরজার পরদাটা ফ্যানের হাওয়ায় একাই একাই উড়ে যাচ্ছে,সেটা সরিয়ে সে আসেনা একবারের জন্যও! হতাশ ভাবে কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে আকাশের চোখ জোড়া আচমকা আটকে যায় আলমারির নীচে এককোণায়! বিশৃঙ্খলায় সে জায়গাটা ঝাঁট পড়েনি দেখেই বোঝা যায়। অবহেলার ধুলো জমেছে সেখানে! একটা সাদা কাগজ মতন কী আটকে আছে সেখানে! কাগজ টা টান মারতেই আকাশের বুকে যেন শেল বিঁধল! এই সেই কাগজ যা সে খুঁজছিল! কোর্টে মুভ করতে এই কাগজ টিই হাতিয়ার হয়ে উঠবে তার! সায়নীর ইনফার্টিলিটি নার্সিংহোম রিপোর্ট! কাগজের একটা জায়গায় আকাশের চোখ আটকে গেল! দেখল কালো মোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে "প্রবলেমস ফাউন্ড ইন ইউটেরাস!" আকাশের চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল যেন! ঠিক সে সময়েই পাশে রাখা মোবাইল টা বেজে ওঠে ভাইব্রেট মোডে! ফোনটা তুলে দেখে এক অজানা নম্বর থেকে কল এসেছে! একটু আশ্চর্য হল সে! এই অবেলায় আবার কেরে বাবা! অনিচ্ছা স্বত্বেও ফোন টা তুলে হ্যালো বলতেই চমকে যায় আকাশ! ওপারে জমাট বাঁধা নিঃস্তব্ধতা! কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না! দুই দুই বার হ্যালো হ্যালো করেও আকাশের মস্তিষ্ক ক্রমে শূন্য হতে থাকে নির্জনতার প্রত্যুত্তরে!
( চতুর্থ কিস্তি সমাপ্য)
(পঞ্চম কিস্তি)
নির্জনতার নিরেট প্রাচীর ভেদ করে ক্রমে একটা অস্পষ্ট ফুঁপিয়ে ওঠা নারীকন্ঠ আকাশের কানে প্রবেশ করে! আকাশের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে! টের পায় বুকের ওঠানামা অনেক অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে! কম্পিত গলা থেকে শুধু অস্ফুটে একটিই আওয়াজ বের হয় আকাশের
- কে........?
- তোমার পায়ে শতকোটি প্রণাম গো! একটা কাঁচের মত রিনরিনে কণ্ঠস্বর এসে আকাশের বুক যেন এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল! শুধু অস্ফুটে একটা নাম বেরিয়ে এল আকাশের গলা দিয়ে
- সায়নী......???!!!!!
- বাহ! মনে আছে এই অভাগী কে তাহলে! ব্যাঙ্গের এক তীব্র ধাক্কা আকাশকে ধাক্কা মারে!
- প্লিজ এরকম করে বোলোনা গো!
- তোমার এটা কি করে প্রবৃত্তি হল আমাকে শুধু এটাই বল!
- ক্কি....ক্কি করলাম আবার?
- চুপ! চুপ একদম! কিছু বুঝিনা তাই না? আমি যেতে না যেতেই অন্য মেয়েকে বিছানায় তোলার প্ল্যান করছ?
- মুখের ভাষা ঠিক করো! আকাশের ক্রোধ যেন ঝলকে বেরোল একরাশ!
- কি করবে? কি করবে না হলে? মারবে? আর কত মারবে আকাশ? মেরে মেরে তো আমার বুক ফোঁপরা করে দিয়েছ তোমরা দুজনে!
- সোনা! প্লিজ এরকম করে বোলো না! আমি তোমাকে আজো ভালবাসি! একটি বার দেখা করো!
- আমি ও বিয়ে করব আকাশ! আচমকা সায়নী ফোনে গম্ভীর হয়ে যায়!
আকাশের মুখে একটা বিষণ্ণ হাসি খেলে যায়! বলে
- আর যাই কোরো মাল্যদানের সময় চোখ মেরোনা অন্তত তাকে! ওটা না হয় আমার জন্যই তোলা থাক সারাজীবন!
আচমকা ফোনের ওপার থেকে একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদের মত কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় আকাশ! তারপরই ফোন কেটে যায়! আকাশ বোঝে তার পাগলি টা কাঁদছে! কখন অজান্তে তার নিজের চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ে! ভালোবাসা যেন কেমন! নিজেও কাঁদবে অন্যকে কাঁদাবে! পরদা তুলে বাইরের বাগানের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে থাকে আকাশ! তার আর কিছু ভাল লাগছে না! কিছুক্ষণ পরেই বাগানের একটা কোণায় এক দৃশ্য দেখে আকাশের বিষণ্ণ মুখে এক আলোর ঝলকানি খেলে! একটা মাকড়সা আপন মনে নিজের জাল বুনে চলেছে! নাভি নিঃসৃত সুক্ষ্ম তন্তুর মত জিনিষ গুলোকে নিপুণ দাঁড়ের সাহায্যে বুনে চলেছে নিজের ঘর! আকাশের মন তোলপাড় করে ওঠে! ইস! সেও যদি ওই ঊর্ণনাভের মত জাল বুনতে পারত তাহলে কিছুতেই সায়নীকে যেতে দিত না! আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখত নিজের সাথে! তবে আশা বোধ হয় এখনো আছে!
(পঞ্চম কিস্তি সমাপ্য)
(ষষ্ঠ কিস্তি)
সন্ধেবেলা মায়ের ইচ্ছাটা এত পাষাণের মত চেপে বসবে আকাশের উপর ধারণা ছিলনা তার! আকাশ চুপ করে ছাদের এককোণায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল! অস্তগামী সূর্যের লাল আভায় তার কয়েকদিনের না কাটা দাড়ি সহ বিষণ্ণ মুখটিকে আরো অসহায় করে তুলেছে! সিগারেটের ধোঁয়াটা কুণ্ডলী পাকিয়ে ছেড়ে দিয়েই সে একবার নীচের দিকে তাকাল! বুকের বাঁদিকটা কিরকম যেন অদ্ভুত চিনচিনে ব্যাথা হচ্ছে! ইচ্ছে করছিল সায়নীকে ফোন করতে! কিন্তু সায়নীর নাম্বারটা আজ ছয়মাস অকেজো হয়ে আছে! ফোন করলেই বলে আউট অফ রিচ! হঠাৎ মনে হল আজ সকালে যে অজানা নাম্বার টা থেকে সায়নী ফোন করেছিল ওখানে একবার ফোন করলে কেমন হয়? আকাশ মোবাইল টা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতেই নাম্বার টা বেরিয়ে পড়ল! কল করতেই ওপারের রিং এর শব্দ আকাশের বুকের স্পন্দন কেও বাড়িয়ে দিল! অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর একটা ভারী পুরুষ কন্ঠ হ্যালো বলতেই কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল আকাশ! বলে ওঠে- সায়নী আছে?
- আপনি কে? ভারী কন্ঠ একটু বিব্রত!
- আমি ওর....বলতে গিয়ে সামলে নেয় আকাশ! একটু ডেকে দিন না প্লিজ! দরকার আছে খুব!
আকাশের কাতর আহ্বানেই হোক আর অন্য কোন কারণেই হোক, গম্ভীর কন্ঠ একটু নরম হল যেন! বলল- ধরুন! দিচ্ছি!
আকাশের বুকের গতি তীব্রতর হল! আকাশের পশ্চিম প্রান্ত এত লাল হয়ে উঠেছে কেন? হৃদয়ের সমস্ত ক্ষত যেন আকাশের ওই সীমানায় গিয়ে জড়ো হয়েছে! ফোনের ওপার থেকে একটা রিনরিনে কন্ঠস্বরে চটকা ভাঙে আকাশের!
- হ্যালো কাকে চাই?
- সায়নী?
-আকাশ??.....তুমি??? কোথায়???
সায়নী যেন খেই হারিয়ে ফেলছে আস্তে আস্তে!
- একটু আগে ফোনটা কে ধরেছিলেন?
- তোমার শ্বশুর! গলাটা একটু রুক্ষ শোনাল যেন আকাশের কানে!
- এ হে! চিনতে পারলাম না বেবাক.....
- আমাকে চিনেছ কোনদিন ও? যে আমার বাপের বাড়ি চিনবে?
- প্লিজ....এভাবে....আর কিছু বলতে পারেনা আকাশ! গুম হয়ে যায়! বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে যায় ফোনের দুই প্রান্ত! অনেকক্ষণ পর সায়নীই নিস্তব্ধতা ভাঙে!
- আচ্ছা আকাশ আমাকে একটা সত্যি কথা বলবে?
- হু! বল!
- তুমি কি সত্যি কি আরেকটা বিয়ে করবে? পারবে করতে??
আকাশ কিছু বলতে যাচ্ছে ঠিক তখনই বাড়ির গেটের সামনে একটা দুধসাদা অস্টিন এসে দাঁড়াল! একটা গেট খোলার আওয়াজ আকাশকে দিশাহারা করে দিল!
( ষষ্ঠ কিস্তি সমাপ্য)
(সপ্তম কিস্তি)
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আকাশ শুনতে পায় ড্রইংরুম থেকে মৃদু কন্ঠে হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে! এই হাসির সাথে অনেক দূরে একাকিনী এক অসহায় মেয়ের কান্নাকে আকাশ দাঁড়িপাল্লার কোন নিক্তিতেই মাপতে পারে না! মনে মনে খুব রাগ হয় আকাশের নিজের উপর! কেন যে সে মা কে মানা করল না সকালেই! এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে সিঁড়ির দুই তিনটে ধাপ ওভারস্টেপিং হয়ে গেছে খেয়াল করল না আকাশ! আচমকা বুঝতে পারল শরীর টা ভারসাম্য রাখতে পারছেনা! নিমেষে শরীর টা পড়ে যেতে যেতে পাশের রেলিং টা ক্ষিপ্র গতিতে ধরে ফেলল আকাশ! সাথেই সাথেই কানে এল একটা মধুর মেয়েলি কন্ঠ- "সামলে!!" মুখ তুলে চেয়ে দেখে এক ছাব্বিশ সাতাশ বছরের তরুণী উৎকন্ঠায় সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে! কপালের সামনের দিকে নেমে স্প্রিং এর মত কেশরাশির পিছনে ডাগর চোখ দুটি দেখে আকাশ একটু থমকে গেল! ভাল করে চেয়ে দেখল! নির্মেদ শরীর! ফর্সা গলার কাছটায় একটা পাতলা মুক্তোর মালা আলাদা আবেদন তৈরি করেছে! বাম দিকে ঠোঁটের নীচে তিলটি
আকাশ কে যেন সম্মোহিত করে রাখল বেশ কিছুক্ষন!
আচমকা অঞ্জনার কন্ঠস্বরে চমকে তাকাল মায়ের দিকে আকাশ,
- কি রে! দেখে নাম বাবু! আরেকটু হলেই তো যেতিস!
- কিছু না মা! সামলে নিয়েছি মা!
ততক্ষণে আড়চোখে দেখে নিয়েছে আকাশ মেয়েটি নিজেকে অনেকটা সামলে বসে পড়েছে নিজের জায়গায়!
- এ হচ্ছে দত্তবাবুর মেয়ে নীলাক্ষি! ভভদ্রমহিলার কন্ঠে অহমিকার রেশ টুকু আকাশের কানকে ফাঁকি দিতে পারে না!
- দত্তদা এদের দুজনকে একটু ছাদে পাঠানো যাবে কি? ততক্ষণ এরা দুজনকে আরো ভাল করে চিনুক!
- হ্যা.... হ্যা...! স্বছন্দে! যা মা! আকাশের সাথে একটু ঘুরে আয়!
আকাশ রক্তচক্ষু নিয়ে মায়ের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল তার মা মিটিমিটি হাসছেন! ছলনা কেন ঐ মহিলার মনে? আকাশ কিছু ভেবে কুল কিনারা করতে পারেনা! ততক্ষণে পাশে থেকে জুঁই ফুলের গন্ধ নিয়ে তন্বী উঠে এসেছে! আকাশ শুনতে পেল তাকে উদ্দেশ্য করে বলছে- খোলা আকাশের নীচে আকাশের গান শোনা যাবে কি একটা?
চমকে তাকাল আকাশ তার দিকে! দীঘল কালো দুটি চোখের অন্তরালে একটা ভালোলাগার আকুতি আকাশকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়! আকাশ শুধু মৃদু স্বরে বলে ওঠে - চলুন!
( সপ্তম কিস্তি সমাপ্য)
(অষ্টম কিস্তি)
অন্ধকার টা আরো বেশি ঘনিয়ে এসেছে বড় ছাদ টার আনাচে কানাচে! আকাশের লাল আভা ঘুচে গিয়ে এখন শুধুই নীলের খেলা!
- ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড ক্যান আই স্মোক? পাশে বসা নীলাক্ষি কে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় আকাশ!
- উঁ! তন্বীর এত ছোট প্রতিক্রিয়াতে আকাশ একটু বিব্রত বোধ করে! হ্যাঁ নাকি না বলল মেয়েটা! ভাল করে আলো আঁধারির মধ্যে তাকিয়ে দেখে নীলা ব্যান্ডের রিবন টা খুলে উন্মুক্ত করে দিয়েছে কেশরাশি খোলা বাতাসে! কিছুটা চুল আকাশের বাঁ কান ছুঁয়ে সারা শরীরে একটা শিরশিরে ভাব জাগিয়ে তুলেছে! অদ্ভুত মোহময়ী লাগছে নীলাকে! আকাশ সিগারেট ধরিয়ে একটা কুণ্ডলী ছাড়ল বাতাসে!
- গাইবেন না?
- কি গান করি বলুন তো? মানসিক অবস্থা তো ভাল নয়!
- কেন? কি হয়েছে?
এবার আকাশ একটু চমকে গেল! সেকি! মেয়েটা কি তার সম্বন্ধে কিছু না জেনেই তার সাথে দেখা করতে চলে এসেছে?
- কেন? আপনি কিছু জানেন না?
- কি জানব?? খুলে বলুন না?
- কাল আমার ডিভোর্স এর শুনানি! মিউচুয়াল কনসেন্টে এগ্রিমেন্ট হয়েছে! কিছু কি শোনেন নি?. মা কি কিছু বলেনি! এবার একটু অবাক হয়ে যায় আকাশ!
- হ্যা বলেছেন! নীলাক্ষি ঠোঁটের কোণে একটু অদ্ভুত হাসি হাসল! আকাশের মাথাটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল! বোকার মত জিজ্ঞাসা করে বসল
- তাহলে আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন কেন?
- ভালোবাসব বলে! নির্লিপ্ত উত্তর তন্বীর! এই জবাবের জন্য প্রস্তুত ছিলনা আকাশ! হাতের সিগারেট কখন জ্বলতে জ্বলতে বিপদসীমা পার করে গেছে তা সে বুঝতেই পারেনি! হাতে ছ্যাঁকা খেয়েই সিগারেট টা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল! খিল খিল করে হেসে মেয়েটি বলল
- আপনি সত্যি পারেন ও বটে!
- আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারব না সরি! আকাশ চোয়াল কঠিন করে উঠে দাঁড়ায়! আপনি থেকে তুমি তে নেমে আসায় মেয়েটি খুব একটা বিচলিত হল না! একটু মৃদু হেসে বলল
- আচ্ছা দেখা যাক! এখন চলুন নীচে যাই! অন্ধকার হয়ে গেছে!
আকাশ আলো আঁধারিতে মেয়েটার মুখটা ভাল করে দেখতে পারল না! হাসল কি??? কি জানি........!
(অষ্টম কিস্তি সমাপ্য)
( চলবে)
(নবম কিস্তি)
নীচে নামার সময়ে একটা অভাবনীয় কান্ড ঘটাল নীলাক্ষি! আকাশের ঘেমে যাওয়া হাতখানি পরম আশ্বাসে চেপে ধরে নীলাক্ষি বলে উঠল
- ভয় নেই আকাশ! সে আসবে তোমার জীবনে আবার! আমি না হয় ভাল বন্ধু হয়েই থাকব সারাজীবন! কি? থাকতে দেবে তো?
আকাশ তার মুখ টা একবার ভাল করে দেখল! তারপর আস্তে মাথাটা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল! একটু মৃদু হেসে দুই জনে যখন দুই পরিবারের সামনে এসে দাঁড়াল তখন গোটা বৈঠকী ঘর টা মৃদু হাসির আওয়াজে ভরপুর! বিস্ফোরণ টা নীলাক্ষিই ঘটাল প্রথমে...
- বাবা! এ বিয়ে আমি করব না!
গোটা ঘর জুড়ে তখন মৃত্যু নিঃস্তব্ধতা!
কারুর চোখের পলক পড়ছে না! আকাশ একবার আড়চোখে অঞ্জনাকে দেখেই বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল! মা ছেলের দিকে ভ্রুকুটি মেশানো দৃষ্টিতে দেখে চলেছে! আকাশ চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল! আচমকাই কানে এল কটি শব্দ
- আমার অ্যাফেয়ার চলছে বাবা! তোমাকে বলা হয় নি! তাকে ডিপ্রাইভ করতে পারব না আমি!
আকাশের কানে গরম তেল ঢাললেও বোধ করি এতখানি সে চমকাত না! চোখদুটি খুলে হাঁ করে চেয়ে রইল নীলার দিকে! নীলার ফর্সা মুখে তখন যন্ত্রণা মেশানো একটা হাসি ফুটে উঠছে আস্তে আস্তে! আকাশ বুঝল ব্যাপার টা! আস্তে করে সবার অলক্ষ্যে নীলার হাত টা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে একটু চাপ দিল! ঘরের হাস্যমুখর পরিবেশ নিমেষে বদলে গেল বিসর্জনের নিস্তব্ধতায়! চলে যাবার সময় নীলার চোখাচোখি হতেই আকাশ আর থাকতে পারেনা! জিজ্ঞেস করে- কোন দরকার ছিল মিথ্যা কথা বলার?
- কে বলেছে মিথ্যা কথা? সত্যি বলেছি তো!
- তার মানে....তোমার সত্যি ই......
- হ্যা! একদম! বলেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল! আকাশের কিরকম যেন অস্বস্তি হতে লাগল! অস্টিন টায় বসে জানলার কাঁচটা নামিয়ে আকাশকে মুখ বাড়িয়ে নীলাক্ষি বলে উঠল
- তোমরা ছেলেরা না কেমন যেন....মেয়েদের মন বোঝনা!
গাড়ির ধোঁয়ার সাথে পাক খেতে খেতে কথাগুলো যেন আকাশের বুকে ধাক্কা মারে! সে কি সত্যিই সায়নীকে বুঝেছিল? সায়নীর ভালো লাগাকে.....? মেয়েদের প্রেম কি সত্যি বোঝা যায় না???
( পরবর্তী কিস্তিতে সমাপ্য)
অন্তিম কিস্তি)
আদালত চত্বর আজ সকাল থেকেই মুখর! ব্যাপার টা ঠিক ঠাহর করতে পারেনা আকাশ! এত মানুষের ভিড়....প্রত্যেকেই দৌড়াচ্ছে! একটু জিরোনোর সময় বোধহয় কারুর নেই! গেটের মুখে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটি একইরকম আছে! শুধু তার ফুল গুলো ভালবাসার রঙ ছেড়ে আকাশের দিকে অভিমানী রক্তাক্ত হৃদয় নিয়ে তাকিয়ে আছে যেন!
- পারফেক্ট টাইমিং মিঃ সেন!
আচমকা একটা কন্ঠ স্বরে চমকে পিছনে তাকাতেই দেখল তার ল ইয়ারকে! কালো আলখাল্লায় স্যুটেড হয়ে রীতিমত জাঁদরেল দেখাচ্ছে তাঁকে! মুখে একটা অমায়িক হাসি! যেন যুদ্ধ জয়ের আগাম আভাষ টের পেয়ে গেছে!
- আপনি কোন চাপ নেবেন না! সব সামলে নেব! বাছাধন ঘুঁটি সাজাচ্ছে! শাসমলের বিরূদ্ধে..! হা হা! নাকানিচোবানি খাইয়ে ছাড়ব! আমার নাম দীপক শাসমল!
- সায়নী তো দোষ করেনি দীপক বাবু! নির্লিপ্ত গলায় থেমে থেমে কথা কটি বলল আকাশ!
আচমকা হাসি বন্ধ হয়ে গেল জাঁদরেল উকিলের! কঠোর চাউনি মেলে বলল
- শুনুন আকাশ বাবু! আমি হারতে শিখিনি! পনেরো বছরের উকিলি পেশায় পাঁচশো কেস উদ্ধার করে দিয়েছি! বিহেভ ইয়োর সেলফ! এভরিথিং ইজ ফেয়ার,ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার! লাইফ ইজ বিগ! কোন কিছুর জন্য থেমে থাকেনা! উনি যদি আপনাকে ভালবাসতেন লইয়ার দিয়ে নোটিশ পাঠাতেন না!
- আপনি ভালবেসেছেন কাউকে দীপক বাবু?
কথাটায় কিরকম যেন বিষণ্ণ হাসি হাসলেন কালো আলখাল্লা পরা লোকটি! বললেন - ভালো না বাসলে এই জায়গাটার টানে প্রতিদিন ছুটে আসতাম না!
কথাটা বোধগম্য হল না আকাশের! বোকার মত কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল - মানে?
- সময় আসলেই জেনে যাবেন খন! এখন চলুন! রেডি হন! কনসেন্টের লেটার বাকি কাগজপত্র গুলো দিন! নার্সিংহোম এর রিপোর্ট টা এনেছেন তো?
অনিচ্ছাসত্ত্বে ও অ্যাটাচি টা উকিলের হাতে দিয়ে দেয় আকাশ! ঠিক তখন ই চোখ পড়ে গেটের সামনে একটা দুধ সাদা স্করপিও র দিকে! গাড়ী থেকে একে একে নামছে সায়নীর পুরো পরিবার! আকাশ একটু গোড়ালি উঁচু করে দেখার চেষ্টা করল সায়নী কে! কি রে বাবা! আসেনি নাকি? অবশেষে সমস্ত প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দুধ সাদা সালোয়ারে নেমে এল সায়নী! কিন্তু একি! এই সায়নীকে যেন চিনতে পারছে না আকাশ! চোখের কোনে কালি মেরে গিয়েছে এ কদিনে! শরীরের সেই জৌলুষ ও নেই! আকাশের বুকটা একটু চিনচিন করে উঠল!
- লেটস হ্যাভ এ লুক মিঃ আকাশ! ওদের ল ইয়ার কে দেখে নিন!
আকাশ ভাল করে তাকাল এবার! আরেক কালো রঙের আলখাল্লা ধারিণী সায়নীকে ধরে ধরে এগিয়ে নিয়ে আসছেন! চুলটা রিবন করে পিছন দিকে টেনে বাঁধা! মুখ খানি ভারি মিষ্টি! এর মুখের দিকে তাকিয়ে অনায়াসে কেস হেরে যাবে অনেক দুঁদে উকিল ও! আকাশ শুধু একটু হেসে অস্ফুটে বলে উঠল - নাইস!
হয়ত আরো অনেক কিছুই বলত কিন্তু তার আগেই পিছন থেকে কাঁধের উপর একটা আলতো স্পর্শে চমকে তাকিয়ে দেখে তার উকিল বন্ধুটির চোখ ছলছল করছে! উকিল কাঁদছে!!! আকাশের নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছেনা! একটু থেমে দীপক শাসমল ধরা গলায় বলে উঠলেন
- শি ওয়াজ মাই ওয়াইফ! নাও মাই কম্পিটিটর! ল মেকস আস ডিফিটেড! কে জেতে কে হারে এক উপরআলা ছাড়া কেউ জানেনা মিঃ আকাশ!
কথা কটা বলেই কাগজ পত্র নিয়ে বিচারপতি র চেম্বারের দিকে পা বাড়ালেন! আকাশ থমকে দাঁড়িয়ে গেল! তার সামনে চারপাশে যেন এক বিশাল জাল বুনে চলেছে নিয়তি! লক্ষ লক্ষ ঊর্ণায় হাজার হাজার মানুষ ধরা পড়ছে! রক্তাক্ত হচ্ছে, ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে! আবার নতুন করে ভালবাসছে! আকাশের গলা পাকিয়ে একটা কান্না উঠে এল!
- মিঃ আকাশ! মিঃ আকাশ...... আচমকা এক নারীকন্ঠে আকাশের সমস্ত চিন্তাজাল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়! চেয়ে দেখে সায়নীর ল ইয়ার তাকেই সম্বোধন করে ডাকছেন!
- একটু শুনবেন প্লিজ? জানি রীতিবিরুদ্ধ তাও একটু সময় আপনাকে দিতেই হবে! প্লিজ সময় বেশি নেই!
- হ্যা শিওর! বলেই আকাশ একটু চোখ তুলে তাকাতেই সায়নী কে দেখল তার পরিবারের সাথেই একটা চায়ের দোকানের টেবিলে বসে আছে! হাতের চায়ের কাপ কিন্তু সেটা তার ঠোঁট স্পর্শ করছে না! কাঁধ টা একটু হেলানো! আকাশের কিরকম কান্না পেল! মনে হল ছুটে যায়! গিয়ে বলে সায়নী! বাড়ি ফিরে চল! অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিল! শুধু অস্ফুটে বলল - "বলুন!"
- সময় খুব কম! তাই আসল কথাটিই বলছি! কনসেণ্ট উঠিয়ে নিন মিঃ আকাশ! হারি ক্ষতি নেই! কিন্তু মেয়েটির কষ্ট আর দেখতে পারছি না! দেখুন মিঃ আকাশ অনেক সম্পর্ক আমার চোখের সামনে অনিচ্ছাসত্ত্বে ও নষ্ট হতে দেখেছি! পেশাদারিত্বের জীবনে এগুলো আমাদের আর গায়ে লাগেনা! কিন্তু তাও মানুষ কে যত টা পারি বোঝাই!
আকাশ ভাল করে তরুণী আইনজীবী র মুখটা দেখতে থাকে! একটু আগে পেশাদারিত্বর খোলসে থাকা কঠিন মুখ খানি দেখেছিল! কিন্তু এখন একি দেখছে সে!
- কিন্তু ম্যাডাম....ও কি মানবে?
- মানবে না! কেউ মানবে না! মানাবেন আপনি! একটা সরু তর্জনী তুলে বলে ওঠেন আইন জীবী!
- ভালোবাসা এত ঠুনকো জিনিষ নয় মিঃ আকাশ! কেউ ভালবেসে বাঁচে! কেউ ভাল বাসিয়ে!
- আপনার বন্ধুও তাই ই ভাবে!
কেমন যেন বিষণ্ণ হাসলেন তরুণী!
- আমাদের এই আদালতটাই ঘর বাড়ি হয়ে গেছে এখন আমাদের কাছে আকাশবাবু! ও একদিন না এলে অস্থির হয়ে পড়ি কোথাও কিছু হয় নি তো ওর! কতগুলো আইনের কাগজ আমাদের পিছনে তকমা এঁটে দিয়েছে যে আমরা ডিভোর্সি! মন যে আজো টানে আমাদের! আমাদের ইঁট কাঠ পাথরের বেড়াজালে প্রতিদিন তর্কাতর্কি চলে! অনেকে বোঝে না! এটাই আমাদের ভালবাসা! আমাদের কেন্দ্রাতিগ অভিমুখ! কেস দুজনেই তুলুন! আমরা সব সময়ে ভাঙতে দিই না! মানুষ কে হাত ধরে বাঁচার স্বপ্ন ও দেখাই! মেয়েটা বড় ভাল আকাশ বাবু! ওকে একা করে দেবেন না! যান! ওকে বুকে তুলে নিন!
মন্ত্রমুগ্ধের মত তরুণী আইনজীবীর কথাগুলো শুনছিল আকাশ! আচমকা চোখ গেল কোর্টের দ্বিতীয় তলের বারান্দার একপাশে! দুঁদে আইনজীবী দীপক শাসমল একটু মৃদু হেসে হাতের অ্যাটাচি টা দেখিয়ে আঙুলের ইশারায় নিষেধ ইঙ্গিত দেখালেন স্পষ্ট! তারপর স্পষ্ট আকাশ দেখল দুই হাতের আঙুল দিয়ে লাভ সাইন দেখিয়ে দূরে চায়ের দোকানে বসে থাকা সায়নীকে নির্দেশ করছে! হতবিহ্বল আকাশ দেখল তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণী আইনজীবী অস্ফুটে বলে উঠল- " মাই ভ্যালেন্টাইন " তারপরেই দোতলায় থাকা মানুষ টি কে থাম্বস আপ সাইন দেখিয়ে দিল!
আকাশের মাথা আস্তে আস্তে শূন্য হতে শুরু করেছে! কোথা থেকে একঝলক বৃষ্টি ভেজা ঠান্ডা বাতাস আকাশের মাথার চুল গুলোকে অবিন্যস্ত করে দিয়ে পিছনের কৃষ্ণচূড়া গাছটির দিকে ধেয়ে গেল! আকাশ বুক ভরে একটা শ্বাস নিল! তারপর লম্বা লম্বা পায়ে সায়নীর দিকে হাঁটা শুরু করল! মেয়েটা বড় একা! এইসময় আচমকা ধারেকাছে কোথাও একটা প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল! আকাশের কানে তালা ধরে গেল! গোটা চত্বর জুড়ে নিমেষে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল বিচার চাইতে আসা মানুষ গুলোর মধ্যে! ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে আকাশ চোখ বাঁচিয়ে দেখতে পায় সায়নী বিহ্বলের মত উঠে দাঁড়িয়ে বাড়ির লোকদের খুঁজছে! আকাশ কখন যে সায়নীর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তা সে টেরই পায়নি! পিছু হটতে গিয়ে একটা বলিষ্ঠ বুকের ধাক্কায় সায়নীর পশ্চাদ গতি রূদ্ধ হয়ে যায়! পিছন ফিরে মানুষ টি কে দেখে তার চক্ষুস্থির হয়ে যায়! মুখ দিয়ে শুধু অস্ফুটে একটা শব্দ বেরিয়ে আসে- " আকাশ!"
- সায়নী! ভুল আমরা করেছি! প্রায়শ্চিত্ত আমরাই করব! কেন নিজেকে একলা করে দিচ্ছ!
- আমাকে আর টেন না আকাশ! ফেরার রাস্তা বন্ধ আমার!
- রাস্তা দিয়ে ফেরা ছাড়া আরও একটা গন্তব্য আছে সায়নী! সামনেও যাওয়া যায়! আমার হাত ধর সোনা! এই বন্ধন আলগা কোরোনা!
আচমকা মেয়েটি মুখ ঢেকে ধুলো ভরা চত্বরের উপরেই বসে প্রবল কান্নার দমকে কাঁপতে লাগল! আকাশের বুকে একটা তীর এসে বিঁধল যেন! সায়নীকে ধরে তুলতে যাবে এমন সময় কয়েক পা পিছিয়ে আসে! এই দৃশ্যের জন্য মোটেই সে প্রস্তুত ছিলনা! দেখল প্রবল হাওয়ার মধ্যে এক অস্পষ্ট নারী শরীর ধুলোর আসন থেকে উঠিয়ে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল! বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখে আকাশ তার মা অঞ্জনা কে! এই মা কে সে চেনে না! যেমন টি সে নীলাক্ষিকেও চিনতে পারেনি! অঞ্জনা শুধু নিজের বুকের ভিতর চড়াই পাখির মত কাঁপতে থাকা মেয়েটিকে অস্ফুটে বলে ওঠে- মা রে! বাড়ি ফিরে চল! এক সন্তান চাইতে গিয়ে আরেক সন্তান কে কোল ছাড়া করছি! গোটা বাড়ি ফাঁকা লাগে! চল মা!
সায়নীর তখন অভিমান দুঃখ হতাশায় নরম বুক দুটো ওঠানামা করছে! আচমকা ছুটে গিয়ে আকাশ কে চড়ের পর চড় মারতে লাগল! আকাশ মুখ বুজে সেই মার হজম করে যেতে লাগল!
- তুমি...তুমি ফিরিয়ে দাও আমাকে সেই ছয় মাস! সেই রাত গুলো.... তোমার বুকে মুখ রেখে না ঘুমাতে পারার জ্বালা! আমার বুকের ক্ষত তুমি পারবে দূর করতে? বল....বল!
হঠাৎ ই মেঘভাঙা আলোয় আকাশের মুখ উজ্বল হয়ে ওঠে! গুন গুন করে অন্ধকারের ভিতর থেকে ছাইচাপা আগুনের মত একটা মুখ গেয়ে ওঠে বেঞ্জামিন আর্ল কিং এর স্ট্যান্ড বাই মি গানটির বিখ্যাত সেই কলি-
" হোয়েন দ্য নাইট হ্যাজ কাম
অ্যান্ড দ্য ল্যান্ড ইজ ডার্ক,
অ্যান্ড দ্য মুন ইজ ওনলি লাইট উই সি,
নো আই ওন্ট বি অ্যাফ্রেড,
নো আই ওন্ট বি অ্যাফ্রেড,
জাস্ট অ্যাজ লং ইয়ু স্ট্যান্ড
স্ট্যান্ড বাই মি!"
সায়নী র কান্নার দমক অনেক খানি কমে যায় সেই উদার কন্ঠে! দুই এক ফোঁটা বড় বড় জলকণা তাদের দিকে ধেয়ে আসে! সায়নী শুধু অস্ফুটে বলে ওঠে
- আকাশ! তুমি কাঁদছ?
- হ্যাঁ........বৃষ্টি হয়ে ঝরব বলে! তোমাকে ভেজাব বলে!
আকাশকে আর কথা বলতে দেয় না সায়নী! আকাশের মাথা খামচে পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ায়! তারপর নিজের তৃষিত অধর আকাশের কম্পিত ওষ্ঠের কাছে সমর্পণ করে দেয়! আকাশ অস্ফুটে সায়নীর কানের কাছে একবার উচ্চারণ করে-" হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন সোনা!" ভেজা সেই প্রেমের আস্বাদ নিতে নিতে আকাশ বোঝে এই পৃথিবী সত্যিই এক রঙ্গমঞ্চ! নিয়তি যে জাল বোনে সেই জালেই ভালবাসার পরিণতি! কেন্দ্রাতিগ অভিমুখ! আদালত চত্বরে বিহ্বল কতগুলি চোখের সামনে দুটি আবদ্ধ শরীর সেই অলৌকিক জলধারায় স্নান করতে থাকে! চোখে তাদের স্বপ্ন জাল বুনে চলে.....ঊর্ণনাভ র মতন!
(সমাপ্ত)
( এই কাহিনীর সমস্ত ঘটনা কাল্পনিক! বাস্তবের সাথে কোন মিল নেই!
ধন্যবাদ! সবাইকে জানাই ভ্যালেন্টাইন দিবসের শুভেচ্ছা)
♥
♥
♥
♥

No comments:
Post a Comment