
গল্পঃ তাহার নামটি রঞ্জনা
গল্পকারঃ অরিন্দম© নবপল্লী
পাতাপত্তর ডিঙিয়ে বাগানের ইউক্যালিপটাস গাছটা একা একা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে! রঞ্জনা জানলার পর্দা সরিয়ে তাই প্রায় একঘণ্টা ধরে দেখে চলেছে! সকাল থেকেই আকাশের মত তারও মুখ ভার! বাড়ির লোকেরা বুঝে উঠতে পারছেনা বাড়ির এই একরত্তি ফুটফুটে মেয়েটির মন ভার কেন?! পরিচারিকা দুই দুই বার রঞ্জনার ঘরের সামনে থেকে এসে ঘুরে গেছে খাবার নিয়ে!! দরজা সে খোলেনি! কখন যে তার চোখ থেকে বেরিয়ে আসা জলে বুকের কাছে জামাটা ভিজে গিয়েছে রঞ্জনার মালুম হয়না! আচমকা ডুকরে কেঁদে ওঠে মেয়েটি- - তুই আমাকে বুঝবি কবে? কবে বুঝবি? না হয় তোকে একটা থাপ্পড় ই মেরেছি শুধু! ওটা যে আমারো বুকে লেগেছে জানিস না হতভাগা? আমার চোখের দিকে একদিন তাকা রে ছাগল.....শেষ কটা কথা নিজের মনেই কাঁদতে কাঁদতে বলে চলে! বালিশ ভিজে যায় সে অনুরাগের কান্নায়!
-এই অঞ্জন প্রাইভেটে পড়া আছে না তোর? কি করছিস তখন থেকে বাথরুমে?
- যাই মা! আরেকটু! হয়ে এসেছে! কথা কটা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে তার! এতক্ষণ শাওয়ার টা খুলে নীচে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল! কানের নীচে এখনো জ্বলছে নরম পাঁচ আঙ্গুলের দাগ! কি দোষ ছিল তার......? নাহ আর সে ভাবতে পারে না! তাড়াতাড়ি গায়ে একটা তোয়ালে চাপিয়ে বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাড়ে নটা বেজে গেছে! প্রতাপ স্যরের বাংলা প্রাইভেট কোচিনে দশটার মধ্যে ঢুকতেই হবে! আজ কতগুলো সাজেশন দেবেন স্যর! না পেলে চিত্তির! টেবিলে ঢাকা দেওয়া খাবার একটু নাকে মুখে গুঁজেই ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সাইকেল টা সিড়ির তলা দিয়ে ঝটিতি বের করে নেয়! যাওয়ার সময় আড় চোখে বাবাকে দেখল সে! ল্যাপটপে কি একটা কাজ করছেন যেন! ভাগ্যিস ছেলের গালটা লক্ষ্য করেননি! না হলে ওই ফর্সা গালে আরো কয়েকটা রঙের পোঁচ লেগে যেত!
যাওয়ার আগে শুধু বলে গেল- মা......আমি আসছি! দেরী হলে চিন্তা কোরোনা! ফোন করে দেব!
- দুগগা, দুগগা!! রান্নাঘর থেকে একটা নারীকন্ঠ ঘোষণা করলেন!
অঞ্জন সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে দেখে শুভ কৃষ্ণচূড়া গাছ টার নীচে অনেক আগেই সাইকেলে তার জন্য অপেক্ষা করছে! তার ক্লাসমেট!
কিরে! কখন এলি?
অনেকক্ষণ! শালা বাথরুমে কি এতক্ষণ তানসেনের চর্চা করছিলেন বাবু? কোন মানে হয় এত দেরী করার??!
যাহ খালি বাজে বকিস! নে চল এবার! দেরী হয়ে যাবে!
এই শোন না! বলছি কি বাড়িতে কিছু বলেছিস নাকি?
তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?....বলে কিছু গুম মেরে যায় অঞ্জন! আর কিই বা করার ছিল তার? মৌনিকা কে কয়েকটা প্রশ্নর উত্তর যোগান দেওয়ার এত বড় মূল্য তাকে চোকাতে হবে স্বপ্নেও ভাবেনি সে!
(প্রথম কিস্তি সমাপ্য)
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
প্রতাপ সাহার মত রাশভারী মানুষ এই তল্লাটে দুটো দেখা যায় না! মানুষ টা সারাজীবন একাই কাটিয়ে দিল শুধু পাড়ার ছেলেমেয়েগুলোকে মানুষের মত মানুষ করবে বলে! শিক্ষকতা যে তিনি ভালই করেন বোঝা যায় দুই বেলা তার ঘরে ছাত্রছাত্রী দের ভিড় দেখে! গরীব অথচ মেধাবী ছাত্রছাত্রী দের কাছ থেকে বেতন হিসাবে একটা জিনিষই দাবী করেন ভাল রেজাল্ট আর আর পূর্ণ মানবিকতা! এই দুয়ের খামতি ঘটলে তাঁর মেজাজ সামলে রাখা দায়! তাঁর একটি আরো অভূতপূর্ব গুণ আছে....সেটা খানিকটা অলৌকিক ও বটে! এযাবতকাল তিনি যতগুলি সাজেশন ছেলেমেয়েদের দিয়েছেন তার ৯০ শতাংশই কমন পড়ে গেছে পরীক্ষায়! ওহ বলা হয়নি! তিনি বাংলা পড়ান! সাহিত্যের স্বচ্ছ সলিলা ফল্গুধারার মতন তার কলম চলে! দশম শ্রেণীর গোটা ব্যাচটা তার শোওয়ার ঘরের মেঝে দখল করে রেখেছে! সবেমাত্র পূর্বরাগের সংজ্ঞা টা তিনি বোঝাতে শুরু করেছেন এমন সময়ে দরজার দিক থেকে আওয়াজ এল- আ...আসব স্যর?
- কে? পড়া থামিয়ে ভারিক্কি গলায় জিজ্ঞাসা করেন তিনি!
- আমি! শুভ আর অঞ্জন স্যর! শুভর গলাটা কেঁপে গেল! সারা ব্যাচ জুড়ে একটা চাপা খিক খিক হাসির আওয়াজ উঠতে লাগল!
- চোপ! এত আওয়াজ কেন!.... গোটা ঘরে আবার শ্মশানের নিঃস্তব্ধতা!
- এত দেরী হল কেন তোমাদের? জলদগম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন স্যর?
- ইয়ে স্যর.... ঘুম ভাঙতে একটু দেরী....আর হবেনা স্যর! প্রমিজ!
স্যরের মেজাজ বোধহয় একটু নরম হল! চশমা নামিয়ে মৃদু গলায় বলে ওঠেন
- যাও কোণায় মৌনিকার পাশে গিয়ে বসো!
স্যারের মুখ দিয়ে বেরোনো শেষ কথা কটি যেন বিস্ফোরণ ঘটাল অঞ্জনের কানে! আবার মৌনিকা?? কানের লতির নীচটা একটু যেন জ্বালা জ্বালা করে উঠল! ভয়ে ভয়ে গোটা ব্যাচটার উপর চোখ বুলিয়ে নিল সে! না! রঞ্জনা আসেনি! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মৌনিকার পাশে জায়গা করে বসে পড়ল তারা দুজনে! গোটা ব্যাচ আবার ডুবে গেল বৈষ্ণব পদাবলীর সমুদ্রে!
- অঞ্জু! এই অঞ্জু!!......
আওয়াজ টা ফিসফিসানির মত......অঞ্জনের পাশ থেকেই আসছে! খাতা থেকে মুখ টা একটু তুলে দেখে মৌনিকা ডাগর দুটি চোখ মেলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে! চোখ দুটি ঈষৎ লাল মনে হল অঞ্জনের! কাঁদছিল নাকি....????
- কি হয়েছে?
- সরি রে! আমার জন্যই....
- মাই ফুট.....কথা শেষ করতে দেয় না অঞ্জন! চোখ দুটি যেন অপমানের আগুনে জ্বলছে!
- প্লিজ এরকম করিস নারে!
- এই! এই মৌনি! কথা হচ্ছে কেনরে? বাঁজখাই গলায় চেঁচিয়ে ওঠেন প্রতাপ স্যর! গগনভেদী সেই গলার আওয়াজে পিলে চমকে যায় সবার! অতঃপর আবার নীরবতা! পদাবলীর রাধা তখন ঝড় জল তুফান উপেক্ষা করে সমাজের বিপরীতে কানুর জন্য প্রতীক্ষারতা! বুকের মধ্যে তার জমছে অভিমানের বাষ্প! সেই অশ্রুরুদ্ধ বাষ্প অলক্ষ্যে আঘাত মৌনিকার বুকে! চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে তার!
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
- এই অঞ্জন যাসনে! দাঁড়া! দাঁড়া বলছি!
মৌনিকা পিছন থেকে পরিত্রাহি চেঁচিয়ে যাচ্ছে! কিন্তু অঞ্জনের থামার লক্ষণ নেই! তাড়াতাড়ি সাইকেল টা বের করে সিটে চেপে বসল! আজকের মত ব্যাচ শেষ! বাড়ি ফিরে প্রত্যেকে পড়াটুকু ঝালিয়ে নিয়ে আবার পরের দিনের জন্য প্রস্তুত হবে! অঞ্জন ও মনে মনে প্রস্তুত নিজের সাথে নিজের লড়াই করতে! না! সে মৌনিকার সাথে কিছুতেই কথা বলবে না! কিছুতেই না! প্যাডেলে চাপ মারতেই পিছন থেকে নরম দুটি হাত শক্ত করে অঞ্জনের জামার পিছন দিকটা খামচে ধরল!
- কি রে? এত তাড়া তোর? আমার সাথে কথাও বলতে ইচ্ছা করেনা তোর, না রে?
অঞ্জন লক্ষ করল কথা টা বলতে গিয়ে মৌনিকার পাতলা ঠোঁট দুটো কেঁপে গেল অবরূদ্ধ আবেগে! অঞ্জন কোন কথা না বলে মাটির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল! চোয়াল দুটো ক্রমে শক্ত হচ্ছে তার! একটা আগুন শিরদাঁড়া বেয়ে মস্তিষ্কে উঠে আসছে আস্তে আস্তে! এক ঝটকায় সে হাত টা সরিয়ে নিল মৌনিকার!
- রাস্তা ছাড়!
- এরকম কেন করছিস তুই? প্লিজ আমার কথা টা শোন!
- কি শুনব?? হ্যাঁ...? কি শুনব? তুই থাপ্পড় এর আওয়াজ গুলো শুনিসনি? গোটা ব্যাচের সামনে আমাকে ইনসাল্ট করল রঞ্জনা.....আর তুই কিছু বলতে পারলি না?? কেন বলবি বল?? আমি কে তোর?? কথা গুলো এক নিঃশ্বাসে বলে গেল রঞ্জন! শরীর টা থরথর করে কাঁপছে!
- তুই......এভাবে বলতে পারলি? গলা দিয়ে একডলা কষ্ট উঠে আসে মৌনিকার!
- অঞ্জন আমি ভাবতেও পারিনি রঞ্জনা এরকম রি অ্যাক্ট করবে! বিশ্বাস কর! স্টানড হয়ে গিয়েছিলাম! যখন ধাতস্থ হলাম দেখি সব শেষ হয়ে গিয়েছে.....
- এই তোমরা এখনো বাড়ি যাওনি? আচমকা পিছন থেকে আসা একটা কন্ঠস্বরে দুজনেই পিছনে তাকিয়ে ভুত দেখার মত চমকে উঠল! স্যর এসে দাঁড়িয়েছেন কখন তারা তা বুঝতেও পারেনি!
- ইয়ে...মম...মানে হ্যা...স্যর! এই যাচ্ছি! মৌনিকা তোতলাতে থাকে!
- আর তুমি! অঞ্জন.....তোমাকে প্রায়ই আজকাল একটু অন্যমনস্ক দেখি ক্লাসে! কি ব্যাপার তোমার?
- ক..কই..না তো স্যর! অঞ্জনের তখন গলদঘর্ম অবস্থা!
- যাও! তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও! কাল টাইম মত চলে আসবে! আকাশের অবস্থাও ভাল নয়!
- হ্যা স্যর এখুনি যাচ্ছি! জায়গাটা পেরোতে পারলে যেন বাঁচে সে! মৌনিকা কে বলল নে! সামনে বস! তাড়াতাড়ি কর! বৃষ্টি আসছে!
মৌনিকাকে সামনে বসিয়ে প্যাডেলে চাপ মারতেই আবার পিছন থেকে আবার একটা জলদগম্ভীর স্বর ভেসে এল
- মাই সন! একটা কথা অলওয়েজ মাথায় রেখো! অল ইজ ফেয়ার ইন লাভ ইন ওয়ার!
বলেই মুচকি হেসে চশমার ফাঁক দিয়ে দুই জনকে দেখে ঘরের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন অকৃতদার মানুষ টি!
সাইকেলে বসে মৌনিকাকে নিয়ে কুলকুল করে ঘামতে লাগল অঞ্জন! মাথার ভিতর তোলপাড়! স্যর কি বলে গেলেন শেষে.....?? তাহলে কি???
ঠিক তখনই নাড়ুদার তেলেভাজার দোকানের দিক থেকে এক দমকা ঠান্ডা বাতাস মৌনিকা নরম পাতলা ঠোঁট দুটিকে ছুঁয়ে অঞ্জনের মাথার চুলে বিলি কেটে পিছনের কৃষ্ণচূড়া গাছের ফাঁকে প্রবেশ করল! বৃষ্টি আসছে.......!
(দ্বিতীয় কিস্তি সমাপ্য)
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
বাড়ি ফিরেই তড়িঘড়ি অঞ্জন সাইকেল টা সিঁড়ির নীচে স্ট্যান্ড করতে গিয়ে সেই অতি পরিচিত জুঁই ফুলের গন্ধটি পেল! রঞ্জনার পারফিউমের গন্ধ!..............তার মানে......তার মানে রঞ্জনা তার বাড়ি এসেছে??! ক্রোধে তার মাথাটা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল! এত কান্ডর পরেও মেয়েটি তার বাড়িতে? সিঁড়ি দিয়ে এক এক ধাপ ওঠার সময়ে সে টের পেল বুকের ধুকপুকানি ও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে!
বাড়িতে কি মেয়েটি সবাইকে বলে দিয়েছে তার কীর্তির কথা? নিজের উপরেই তার খুব রাগ হতে থাকে এবার! কেন সে একাজ করতে গেল?
- কিরে অঞ্জু নাকি? কখন এলি?
আচমকা পিছন থেকে আসা মহিলা কন্ঠে অঞ্জনের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায়! চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখে মা হাতে একটা হাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! ফোঁটা ফোঁটা গরম তেল তা থেকে নীচের পাপোষে পড়ছে! সেই দৃশ্য দেখে অঞ্জনের বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়! মা বোধকরি সব জেনে গেছেন! এবার ওই গরম হাতা তার পিঠে পড়তে চলেছে! কিন্তু মা মিটিমিটি হাসছে কেন?
- যা! তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে নিজের ঘরে বোস! আমি লুচি বেগুন ভাজা আলুরদম নিয়ে আসছি! মেয়েটা এতদিন পর এসেই সোজা রান্নাঘরে আমার কাছে আবদার করছে আমার হাতে লুচি খাবে! আহা! বেচারির মুখটা শুকিয়ে এইটুকুন হয়ে গিয়েছিল! তোর ঘরে বসে আছে কখন থেকে! যা তাড়াতাড়ি যা! খাবার পাঠাচ্ছি!
কথা গুলো বলে তিনি আর দাঁড়ান না! অঞ্জনের সবকিছু গুলিয়ে যেতে লাগল! এতকান্ড ঘটার পরেও রঞ্জনা তাদের বাড়ি এসে তার জন্য বসে আছে! রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের কাছে ফরমাশ করছে.....কি ব্যাপার? চায় কি মেয়েটা?
আস্তে আস্তে নিজের ঘরের দরজা টা খুলল অঞ্জন।দেখল রঞ্জনা তার শোওয়ার খাটের উপর এক কোণায় চুপ করে বসে পড়ার টেবিলে অঞ্জনের ফোটোটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে! পরনের হলুদ সালোয়ার কামিজে তাকে একদম হলুদ প্রজাপতির মত লাগছে আজ! প্রতিমার মত কাটা মুখখানি! পিঠ ছাপানো এলোচুলে মুখটা ঈষৎ আড়াল করা! কিন্তু একটা দৃশ্য দেখে সে থমকে দাঁড়াল! ফোঁটা ফোঁটা চোখের জল মসৃণ গাল বেয়ে তার খাটের বিছানার চাদর ভিজিয়ে দিচ্ছে! রঞ্জনা কাঁদছে.....!!!
গতকাল দেখা সেই মেয়েটার সাথে এই মেয়েটিকে কিছুতেই মেলাতে পারছেনা! আস্তে আস্তে অঞ্জন রঞ্জনার পিছনে এসে দাঁড়াল! কি মনে করে মাথায় আলতো হাতখানি রাখতেই রঞ্জনা চমকে অঞ্জনের দিকে চেয়ে রইল! বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ! রঞ্জনাই প্রথম নীরবতা ভাঙে
- আজ গেছিলি স্যরের কাছে?
- হুম! একটা ছোট্ট জবাব দেয় অঞ্জন!
- আর ও গিয়েছিল?
- হুম! অঞ্জন বুঝতে পারে কার কথা বলতে চাইছে মেয়েটি!
- কিছু করেছিস ওর সাথে আজো?
- কি করব? কি বলতে চাইছিস? ঘরের মধ্যে যেন বোমা পড়ে!
- অঞ্জন! আমার চোখের দিকে তাকা! আমার দিকে তাকিয়ে বল!
অঞ্জন রঞ্জনার চোখের দিকে তাকায়! দীঘির মত কালো সে দুই চোখে যেন কতকালের আর্তি মেশানো! বাঁধ ভাঙা জল নামবে এবার!
- তুই মৌনিকাকে স্যরের ঘরের পিছনে ডেকে নিয়ে চুমু খেলি আর আমি কিছু জানব না নারে?
- রঞ্জু প্লিজ.....অঞ্জনের তখন গলদঘর্ম অবস্থা!
রঞ্জনা এবার উঠে দাঁড়ায় বিছানা থেকে! দরজার দিকে এগিয়ে যায় আস্তে আস্তে! তারপর আস্তে করে লক করে দেয় ভিতর দিয়ে!
- কি করছিস? কি চাইছিস তুই? এরকম করিস না প্লিজ মা এসে যাবে! অঞ্জন ছটফট করে উঠল!
- আমাকে তুই একটা কথা আজ বলবি অঞ্জন! সাপের মত হিসহিসিয়ে উঠল রঞ্জনা!
-কি জানতে চাইছিস?
- তুই ওর মধ্যে কি এমন দেখেছিস যা আমার মধ্যে নেই! আজ তোকে বলতেই হবে! বল....বল! অঞ্জন লক্ষ করল রঞ্জনা তার পায়ের উপর চেপে পুরো শরীরটা অঞ্জনের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে! নরম দুটি বুকের ওঠানামা স্পষ্ট অনুভব করছে অঞ্জন!
- নে! আমাকেও কিস কর!
- রঞ্জনা!! প্লিজ! পাগলামি করিস না! আমরা ভাল বন্ধু রে! পাগলি এরকম করিস না! তুই আমাকে থাপ্পড় মেরেছিস! আমি কিছু মনে করিনি! তুই শান্ত হ!
- চুপ! চুপ! একদম চুপ! তোদের দুজনকেই সরিয়ে দেব! তুই আমার না তো কারুর না! সাপিনীর মত হিসহিসিয়ে কথা গুলো বলে হাঁপাতে থাকে রঞ্জনা!
অঞ্জন ধপ করে বিছানায় উপর বসে পড়ে! দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে! এ কি শুনছে সে! বাল্য বান্ধবীর একি রূপ দেখছে সে আজ! একসাথে থাকতে থাকতে কখন তাদের মধ্যেকার বন্ধুত্বের সম্পর্ক টা অনুরাগে বদলে গিয়েছে সে নিজেও টের পায়নি?! দশ বছর আগের একটা দিন অঞ্জনের আজো মনে আছে! প্রতিদিন নিয়ম মত প্রথম শ্রেণীতে অঞ্জন সুতীর্থ র কাছে ক্যালানি খেত! মারকুটে স্বভাব আর কি! স্পষ্ট মনে আছে একটি বাচ্চা মেয়ে তার হাত ধরে বলেছিল তুই এত মার খাস কেন? ঘুসি মেরে দিবি! এমনি করে! বলে তার ছোট্ট হাতটি দিয়ে কিভাবে মারতে হয় সেটাও দেখাচ্ছিল মেয়েটি! টিফিনে বলাবাহুল্য সেই বিদ্যা কাজে লাগাতে পারেনি অঞ্জন! সুতীর্থর এলোপাথাড়ি মারের মধ্যেই সে দেখছিল মেয়েটি পিছন থেকে ঘুসি পাকিয়ে এগিয়ে আসছে! প্রথমে একটা পড়েছিল সুতীর্থ র মুখে! দাঁত ভেঙে রক্ত বেরিয়ে এসেছিল! তার সাথে এলোপাথাড়ি চড়! অঞ্জন ভয়ে সিঁটিয়ে গেছিল! উত্তমমধ্যম দেওয়ার পর যখন মিস এসে দুজনকে ছাড়িয়ে নিচ্ছে তখন অঞ্জনকে ধুলো থেকে হাত ধরে টেনে উঠিয়ে ডান হাতটি বাড়িয়ে চিকন গলায় বলেছিল- ফ্রেন্ডস?
হাতটি ধরে ফেলেছিল বাচ্চা ছেলেটি! ভরসা পেয়েছিল বলেই! ছেলেটি মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করেছিল তোমার নাম কি? মেয়েটি অস্ফুটে জবাব দিয়েছিল - রঞ্জনা...!!!
- বল অঞ্জু! কি হল কি ভাবছিস? কিস কর আমায়!!
আচমকা একটা মেয়েলি কন্ঠে অঞ্জনের স্মৃতিমেদুরতা কেটে গিয়ে একটা যন্ত্রণা তার গলা ঠেলে উপরের দিকে উঠে আসতে চায়! আচমকা অঞ্জন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে পেটের মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে! রঞ্জনা অবাক হয়ে তার মাথার চুল গুলো জড়িয়ে ধরে
- এই অঞ্জু কাঁদিস কেন পাগল? আরে কি হল তোর?
- আমি জানি না রে? কিছু জানি না! তুই আমাকে মাফ কর! তুই যা চাইছিস আমি তা দিতে পারব না! কিন্তু তোকে ছাড়া আমি থাকতেও পারব না রে! মরে যাব দেখিস!
- অঞ্জন??! মরার কথা বলবি না আমার সামনে একদম! আর তাছাড়া আমার সময় ও খুব কম...!
রঞ্জনার শেষ কথাটায় কিরকম যেন চমকে উঠল অঞ্জন! কি বলল? বলল কি মেয়েটা? সময় কম মানে?! তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল
- এই কি বললি? সময় কম মানে? কি এর মানে?
- আরে কি বললাম! বলছি দরজাটা খুলছি! মাসিমা এসে যাবে! একটা কিস দেনা! ওরকম না! ভালবেসে দে!
হেসে ফেলে অঞ্জন! মেয়েটা সত্যি পাগলি! বলল
- কাছে আয়! রঞ্জনা কাছে আসতেই অঞ্জন ওর কপালে একটা চকাস করে চুমু খেয়ে বলে - হয়েছে?
- ইসস! চুল ঘেঁটে দিল আমার! এত করে বাঁধলাম!
- তাই! বলে আরো বেশি করে রঞ্জনার চুল গুলো ঘেঁটে দিল অঞ্জন! ঠিক সেসময়েই বাইরের দরজায় টোকা মারার আওয়াজ পাওয়া গেল! মা খাবার নিয়ে এসেছে! অঞ্জন তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খুলে দিতেই মা খাবার নিয়ে ঢুকেই বলে উঠল দুই বন্ধুতে কি গল্প হচ্ছিল শুনি? ইস তোদের চুলের কি হাল রে! মারপিট করছিলি নাকি?!
আচমকা দুজনেই সশব্দে হেসে মা কে জড়িয়ে ধরে ! জুঁই ফুলের একটা গন্ধের সাথে বৃষ্টিভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়!
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
- এই দীপু খাতা দেখা! হয়েছে তোর!
- এই আরেকটু স্যর! হয়ে এসেছে প্রায়!
- তাড়াতাড়ি কর! আর তোদের কি খবর? প্রতাপ স্যর চশমার ফাঁক দিয়ে ঘরের কোণের দিকে গুটিসুটি মেরে থাকা চারজনের দিকে প্রশ্ন টা ছুঁড়ে দেয়!
চারজন বলতে রঞ্জনা,শুভ, মৌনিকা আর অঞ্জন! শুভই বলে ওঠে
- এই জাস্ট আর চার লাইন বাকি! হয়ে এসেছে স্যর!
- কি ব্যাপার তোমাদের রাধার প্রেমের স্বরূপ লিখতে এত সময় লাগাচ্ছ কেন!
- এইটা কি বললেন স্যর! মেয়েদের প্রেম বুঝতে ছেলেদের সারাজীবন কেটে যায় আর আপনি রাধা প্রেমের স্বরূপ চাইছেন মাত্র একঘন্টায়??
বলার সাথেই সাথেই গোটা ব্যাচ জুড়ে একটা চাপা হাসির রোল উঠল আর সাথেই শুভর মাথায় পড়ল এক চাঁটি! রঞ্জনা হাত চালিয়ে দিয়েছে!
- ছাগল! তোর মত ছেলের জন্য না কোন ধোপানীই ঠিক মানানসই! দিনেরাতে তোকে কাচবে!
- ওহ সত্যি কথা বললে বুঝি...
- আহ তোরা থামবি! লেখ লেখ! অঞ্জন একটু বিরক্ত হয়!
- কি লিখছিস দেখি! রঞ্জনা উঁকি মারে!
- নো টুকলি! নিজে লেখ! অঞ্জন হাসি চেপে বলে ওঠে!
- আচ্ছা আচ্ছা! শেষ হোক তারপর তোকে......কথাটা শেষ করতে পারেনা রঞ্জনা! আচমকা চোখ মুখ লাল করে কাশতে থাকে! কাশি কিছুতেই থামতে চায়না! অঞ্জন তাড়াতাড়ি বোতল খুলে জল দিতে যায় রঞ্জনাকে! মেয়েটি বোতল ধরে এক নিঃশ্বাসে জল খেতে থাকে! আর নির্দেশ করতে থাকে ব্যাগের চেন টা খোলার জন্য! আর দেরী করেনা অঞ্জন! ব্যাগের সামনের চেন টানতেই বেরিয়ে পড়ে ইনহেলারের একটা বাক্স! অঞ্জনের বিস্ফারিত দুটি চোখের সামনে ইনহেলার টি ছোঁ মেরে নিয়ে নেয় রঞ্জনা! তারপর মুখে নিয়ে বারতিনেক টেনে হাপড়ের মত হাঁপাতে থাকে! অঞ্জনের একটা জিনিষ দেখে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়! রঞ্জনার ঠোঁটে লেগে রয়েছে পাতলা রক্তের ছাপ! কাশির দমকে বেরিয়ে এসেছে! রঞ্জনা সেটা বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি মুছে নিয়ে কাষ্ঠ হাসি হেসে বলে
- ও কিছু না! এটা মাঝে মাঝেই হয়! একটু ঠাণ্ডা লেগেছে এই যা! সেরে যাবে! ভাবিস না!
- তোর ইনহেলার কবে থেকে! অঞ্জনের ঘোর কাটতে চায় না!
- উফ! মার খাবি! এত আগ্রহ কেন তোর মেয়েদের ব্যাপারে? ডাক্তার দিয়েছে! কেন? কি বৃত্তান্ত! জ্বালিয়ে খেলে!
অঞ্জন একবার মৌনিকার দিকে তাকাল! একটা তীব্র বুকফাটা যন্ত্রণা চোখ দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করছে যেন মেয়েটি! কি লুকাচ্ছে তারা অঞ্জনের কাছ থেকে! বুকটা হিম হয়ে আসে তার!
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
ব্যাচ থেকে ফিরে সেই রাতেই খুব ধুম জ্বর আসে রঞ্জনার! সাথে প্রবল শ্বাসকষ্ট আর প্রবল কাশি! কাশির দমকে গলা দিয়ে উঠে আসে কাঁচা রক্ত!! বেসিন টা রক্ত আল্পনায় ভরে যায়! বাবা একবার ডাক্তার নিয়ে এসেছিল! ডাক্তারের মুখ দেখে সে খুব একটা ভরসা পেলনা! পরিষ্কার সে দেখতে পেল ডাক্তার কাকুর চোখের কোণে জল চিক চিক করছে! খুব হাসি পেল রঞ্জনার! কিন্তু দমকে উঠে আসার বেগকে চাপতে আর হাসা হয় না তার!
গভীর রাতে ফেসবুকের পাঁচিলের ওপারে এপারে ল্যাপটপের নিভু নিভু আলোয় কত মান অভিমানের লেনদেন হয় অঞ্জন আর মৌনিকার মধ্যে! দুটি কিশোর প্রাণ প্রেমের আবেগে থর থর কাঁপতে থাকে! অনেক দূরে ধ্রুবতারার নীচে কোন এক গৃহস্থ বাড়ির প্রত্যেক মানুষের জাগ্রত থাকে অনাগত বিভীষিকাময় মূহুর্তের প্রতীক্ষায়! একটি মেয়ে সমস্ত শরীরের যন্ত্রণা নিয়েও শৈশবের সেই হারানো ছেলেটির চোখে প্রেমের সন্ধান করে বেড়ায় যে একদিন তার হাত ধরে বলেছিল তোমার নাম কি?
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
আজ পাঁচ দিন হয়ে গেল প্রতাপ স্যরের কোচিনে রঞ্জনা অনুপস্থিত! অঞ্জনের কিরকম যেন পাগল পাগল লাগে আজকাল! রঞ্জনার বাড়ি গিয়েও দেখে এসেছে গেটে তালা! মৌনিকাকে অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছে রঞ্জনার কথা! মৌনিকা ততবারই অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে গেছে অঞ্জনকে! আর দুই দিন বাদে দোল! সারা পৃথিবী রঙের উৎসবে মাতবে! স্যর বলেন রঙের মধ্যে দিয়ে নাকি হৃদয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয়! প্রিয় মানুষ কে রঙ মাখালে তারা নাকি জন্মজন্মান্তরের ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা পড়ে! কিন্তু আজ অঞ্জনের হৃৎপিন্ডের প্রকোষ্ঠের একটা বড় অংশ আটকে রঞ্জনার সাথে! এত মারামারি, চুলোচুলি, পিকনিক, গানবাজনা, ঘুরে বেড়ানো যে মেয়েটিকে নিয়ে সেই বন্ধুটিই আজ অঞ্জনের সাথে লুকোচুরি খেলছে! দোলের দিন অঞ্জনের কি বর্ণহীন হয়ে কাটবে? একদিনে মৌনিকার ভালোবাসাও যেন তার কাছে তিক্ত হয়ে উঠেছে! মাঝ রাতে ফেসবুক খুলে রঞ্জনার চ্যাটবক্সের দিকে অতন্দ্র তাকিয়ে থাকে কখন সিগন্যাল সবুজ হয়ে অনলাইনে আসবে! বুকের সমস্ত অভিমান টুকু ঢেলে দেবে অঞ্জন তার উপর! কিন্তু সে অনলাইনে আসেনা! বিনিদ্র রজনী শেষে অঞ্জনের দু চোখে জড়িয়ে আসে ক্লান্তির ঘুম! কখন যেন অনুভব করে রঞ্জনা তার শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে! মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে পাগল! আমার জন্য ভাবিস না! আমি আসব! তোকে ছেড়ে যাওয়ার জায়গা কোথায় আমার? গেলেই তো একা একা মার খেয়ে মরবি! খিল খিল করে হেসে ওঠে অপার্থিব কন্ঠে!
- এই অঞ্জন ওঠ! জলদি! আমাদের যেতে হবে! ওঠ!
আধো ঘুম জাগরনে কার ধাক্কায় ঘুম ভেঙে যায় অঞ্জনের! ধড়মড় করে উঠে বসে দেখে ঘরে রোদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক! হঠাৎ মনে পড়ে আজ তো দোল! তাছাড়াও আজ এই দিন টা অঞ্জনের কাছে আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ! আজ রঞ্জনার জন্মদিন!
- ওঠ অঞ্জন আমাদের যেতে হবে!
আবারো নারীকন্ঠের আওয়াজে চটকা ভাঙে তার! এ আওয়াজ তো তার মায়ের নয়! তাকিয়ে দেখে মৌনিকা দাঁড়িয়ে আছে বিধ্বস্ত হয়ে! মাথার চুল অবিন্যস্ত! ভেবে পেলনা এত সকালে মৌনিকা কোথা থেকে-
- তাড়াতাড়ি চল! দেরী করিস না!
ভাবনায় আবার বাধা পড়ে তার! বলে
- কোথায় যাব?
- রঞ্জনা....
- কোথায়? কোথায় সে? ডাক? কি পেয়েছে সে? আজ মুন্ডু ফাটাব ওর!
- অঞ্জু প্লিজ! বলতে বলতে কেঁদে ফেলে মৌনিকা হাপুস নয়নে!
অবাক হয়ে যায় অঞ্জন। বোঝে সিরিয়াস কিছু হয়েছে! নরম গলায় বলে
- কাঁদিস না! কি হয়েছে বল!
- রঞ্জনা! বেলেভিউ তে.....
মৌনিকার কথাগুলো শেষ হতে পারেনা! অঞ্জনের শোনার ক্ষমতা কমতে থাকে আস্তে আস্তে! মাথা ঘুরছে.......কি শুনছে সে! রঞ্জনা নার্সিং হোমে আজ ছয় দিন ধরে???! একটু ধাতস্থ হয়ে বলল
- বাইরে ওয়েট কর! আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি!
অঞ্জন পাঁচ মিনিটে তৈরি হয়ে মৌনিকাকে নিয়ে ট্যাক্সি ধরল বেলেভিউ এর উদ্দেশ্যে! সারারাস্তা আজ রঙের খেলায় মেতেছে! অঞ্জনের সেদিক তাকিয়ে থাকতে থাকতে জলের ধারা নামল দু চোখ থেকে! দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে শুধু বলল অস্ফুটে
- ঠাকুর ভাল করে দাও আমার পাগলিকে!
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
বেলেভিউ নার্সিংহোম এর আইসি ইউ কেবিনের সামনে কয়েকটি উদ্বিগ্ন মুখের ভিড়! তাদের মধ্যে দুই জনকে চিনতে পারল অঞ্জন! রঞ্জনার মা- বাবা! অঞ্জন আস্তে করে রঞ্জনার বাবার পাশে বসে পিঠে হাত দিতেই ভদ্রলোক অঞ্জনকে বুকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন! মা ও আঁচলে কান্না লুকালেন! এসব অঞ্জনের ক্রমে অসহ্য মনে হতে লাগল! চিৎকার করে বলে ওঠে- প্লিজ এসব বন্ধ করুন! কি হয়েছে রঞ্জনার বলুন প্লিজ! আমি আর পারছিনা! আমি আমার বন্ধুর কাছে যাব! নিজের চোখে দেখতে চাই তাকে!
জলভরা চোখে ভদ্রলোক একটা নার্সিংহোম এর লোগো দেওয়া কাগজ অঞ্জনের হাতে ধরিয়ে দেয়! অনেক হাবিজাবি ডাক্তারি দুর্বোধ্যতার মধ্যে একটা জায়গায় অঞ্জনের চোখ আটকে যায়! মোটা অক্ষরে লেখা আছে সেখানে
- স্কোয়ামসেল কার্সিনোমা ফাউন্ড! স্টেজ থ্রি!!
আর পড়তে পারছেনা অঞ্জন! চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে তার! লেখাটার মানে সে বুঝুক না বুঝুক! তার বন্ধু ভাল নেই!
আচমকা আইসি ইউ কেবিন থেকে একটা নার্স বেরিয়ে এসে ঘোষণা করে যায় - আপনাদের মধ্যে অঞ্জন কে আছেন? পেশেন্ট ডাকছেন!
হত বিহ্বলের মত দরজা ঠেলে অঞ্জন ভিতরে ঢুকল! বাতানুকুল ঘর!.......চারদিকে কত বিশাল মেশিন বসানো...... আর সামনের একটা দুধ সাদা বিছানায় নাকে নল ঢোকানো একটা কিশোরী শরীর! তার রঞ্জনা! দেখে বিশ্বাস হচ্ছেনা অঞ্জনের! শরীর টা একদিনে শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেছে! কন্ঠের হার বেরিয়ে গেছে! রঞ্জনা শুধু একবার অনেক কষ্টে অঞ্জনকে দেখল! তারপর চোখের কোণা দিয়ে জল বেরিয়ে এল! কাঁপতে কাঁপতে অঞ্জন তার চোখের জল মুছিয়ে দেয়!
- তোর কি হয়েছে?
- ছাগল। কি হবে! হাঁপ ধরা গলায় বলে ওঠে মেয়েটি!
- কার্সিনোমা কি সব দেখলাম!
- আরে বাদ দে! ওসব!
- কেন? কি হয়েছে তোর!
- ছাড়! রঙ এনেছিস! না রে?
- তুই কি করে বুঝলি?
- পাগল আজ দোল না? আমি জানি তুই রঙ না দিয়ে থাকতে পারবিনা!
অঞ্জন লক্ষ্য করল একটা তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে রঞ্জনার শরীরে! মনিটরে দেখল লাইফলাইন টাও খুব স্লো চলছে! বুকটা হিম হয়ে গেল তার!
- তোর খুব কষ্ট হচ্ছে নারে? ডাক্তার ডাকছি দাঁড়া!
অঞ্জন উঠতেই রঞ্জনা তার হাতটা চেপে ধরে!
- প্লিজ যাসনা ! আমার সময় খুব কম! দে আমায় রঙ দে! জলদি! সময় খুব কম!
অঞ্জন দেখল রঞ্জনা কিরকম যেন ভুল বকছে ঘোরে! সে তাড়াতাড়ি আবীরের ছোট প্যাকেটটা খুলে খানিকটা রঙ গালে ছুঁইয়ে দেয়!
- আর আমাকে ওই জিনিস টা দিবি?.প্লিজ
- চুমু? ঝাপসা চোখে জিজ্ঞাসা করে অঞ্জন!
- উঁ! আর কিছু বলতে পারেনা রঞ্জনা! সারা শরীরটা একটা অব্যক্ত যন্ত্রণায় মুচড়ে ওঠে! অঞ্জন তাড়াতাড়ি তার শুকনো ওষ্ঠে নিজের লবণাক্ত অধর সমর্পণ করে! রঞ্জনার দুই চোখ বেয়ে বেরিয়ে আসে অশ্রু! পালস রিডার মনিটরিং ইউনিট থেকে পিঁইইই করে একটানা আওয়াজে মুখরিত হতে থাকে কেবিন ঘরটি! অঞ্জন মুখ তুলে দেখে সামনে এক ফুটফুটে কিশোরী শুয়ে পরম নিশ্চিন্তের ঘুম ঘুমাচ্ছে! যন্ত্রণার আর কোন চিহ্ন নেই সারা মুখে! গালে অঞ্জনের ভালবাসার চিহ্ন! অঞ্জন ভাল করে চেয়ে দেখে এই মুখ সে যেন কোথায় দেখেছে! ছোটবেলায় দেখা সেই বাচ্চা মেয়েটি...... শীর্ণ নীলাভ শিরা ওঠা হাতটি সে তুলে নেয় নিজের হাতে! পাগলের মত চিৎকার করে বলে-
- ওই কোথায় গেলি! ওই দেখ! আমাকে মারতে আসছে! রঞ্জু আমাকে বাঁচা!
ঝাপসা হয়ে আসা চোখে অঞ্জন সেই শরীরে কোন ছন্দ খুঁজে পায়না! কেবিনের বাইরে কান্নার রোল ওঠে! রাস্তার দিক থেকেও একটা রোল শোনা যায়! তবে সেটা আনন্দের! সারা রাস্তায় আজ রঙের আলপনা!
( সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment