#গুরুদক্ষিণা_পর্ব_১
- বল হারামজাদা! আমার ক্লাসে এগুলো কেন খাচ্ছিলি? বল!
শ্যামল বাবুর গমগমে গলার সাথে সপাং সপাং বেতের আওয়াজ হতবাক হয়ে যাওয়া ক্লাশরুমটির প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে যাচ্ছিল! প্রত্যেক টি বিস্ফারিত চোখের সামনে ছেলেটি নতজানু হয়ে অম্লান বদনে একের পর এক স্যরের মার হজম করে যাচ্ছে! কিন্তু যেটা সকলের চোখে পড়ছেনা সেটা বোধকরি উপরওয়ালা দেখছিলেন! এত মারের পরেও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি রেখে দিয়েছিলোছেলেটি আর মাঝেই মাঝেই তাকিয়ে দেখছিল মাঝের সারিতে জড়সড় হয়ে বসা এক বালিকাকে.....অবন্তী! শ্যামল স্যারের মেয়ে! একসময় বেতটি দু টুকরো হয়ে দুই দিকে ছিটকে পড়ে! ছেলেটি অম্লান বদনে উঠে দাঁড়ায়! তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্যরের দুই পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলে
- আমার জন্য বেকার আপনার হাতটাকে কষ্ট দিলেন স্যর! আগে জানলে এরকম করতাম না!
শ্যামল বাবুর একটু হাঁপ মতন ধরে গেছিল! পাঞ্জাবী র বোতাম টা একটু খুলে দিয়ে গভীর শ্বাস নেবার চেষ্টা করেন! বয়স অনেক হল! এই ছেলেটিকে একেবারে পঞ্চম শ্রেণী থেকেই প্রহারেণ ধনঞ্জয় করে আসছেন! টুয়েলভ এ উঠেও এতটুকু শুধরাল না! সবেমাত্র ছেলেটি বেঞ্চে বসেছে অমনি বাঁজখাই গলায় হাঁক পাড়লেন তিনি
- অবন্তী! উঠে আয়!
গোটা ক্লাসে বাজ পড়লেও মনে হয় সকলে এত চমকাত না! ছেলেটি বসতে ভুলে গেল! এত মার অম্লান বদনে হজম করে গেলেও কি একটা অজানা আতংক তাকে পেয়ে বসল! শুধু একটু অস্ফুটে বলার চেষ্টা করল- স্য..স্যর! ও কিছু....
- শাট আপ! আমি তোর কাছ থেকে কিছু শুনতে চাইনা! যাকে ডেকেছি সে আসুক! বজ্র নির্ঘোষে ঘোষণা করলেন সুভাষনগর হাইস্কুলের অঙ্কের মাষ্টার! ছেলেটির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল! ভয়ে ভয়ে মেয়েটির দিকে একবার তাকাল সে! অবন্তী ততক্ষণে ঝড়ে পড়া কপোতীর মত কাঁঁপতে আরম্ভ করেছে!
- কি হল আয়! আরো এক বার বজ্র নিনাদ!
অবন্তী এক পা দুই পা করে গুটি গুটি স্যরের টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়! সামনে আসতেই আবার চেঁচিয়ে ওঠেন শ্যামল বাবু
- দুটো হাত টেবিলের উপর রাখ!
মেয়েটি আতংকে অবশ হয়ে যাওয়া হাত দুখানি টেবিলের উপর রেখে দেয়! একটু মাথা ঝুঁকিয়ে বৃদ্ধ সামনে মেলে দেওয়া প্রসারিত সরু ফর্সা আঙুল গুলি শুঁকতে থাকেন! বড় মিল এই আঙুল গুলির সাথে তাঁর পরলোকগতা স্ত্রী র আঙুল গুলির! হবে নাই বা কেন? নিজেরই তো রক্ত! মিনতি একে জন্ম দিয়েই কোন সুদূরে চলে গিয়েছে সতেরো বছর পার হয়ে গেল! মেয়েটির মুখে যেন স্বর্গতা বউয়ের মুখখানি দেখতে পান তিনি! চশমার ঘষা কাঁচ খানি তিনি আরো একবার পাঞ্জাবীর খুঁট দিয়ে পরিষ্কার করে নেন! আঙুল থেকে পরিষ্কার আলু কাবলির গন্ধ ভেসে আসছে! মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন তিনি দুই গাল বেয়ে অঝোরে বর্ষা নেমেছে! কেমন যেন মায়া হয় মা হারা মেয়েটির উপর! পিছনের বেঞ্চে ছেলেটি এত মার খেয়েও নির্জীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! শ্যামল স্যর গলা খাঁকারি দিলেন
- ওই হারামজাদা! মিথ্যে বলিস কেন! আলুকাবলি কে খাচ্ছিল অঙ্কের ক্লাসে? তুই কি ভেবেছিলি? আমি বুঝবোনা?
- না স্যর.....আসলে স্যর....প্লিজ স্যর ওকে মারবেন না! যা বলার আমাকে বলুন!
কিরকম যেন একটা কৌতুকের হাসি খেলে গেল বৃদ্ধের মুখে! বলল
- কি রে মা অবু? আমার ক্লাসে এরকম করিস কেন?
অবন্তী আর স্থির থাকতে পারল না! দুই হাতে মুখে ঢেকে সশব্দে কেঁদে উঠল! শুধু অস্ফুটে বলে উঠল
-.......বাবা আজ আমার জন্মদিন! তাই সোমরাজ আমাকে আলুকাবলি খাওয়াবে বলেছিল!....
আর বাকি টা বলতে হয় না বৃদ্ধকে! জড়িয়ে ধরেন নিজের মেয়েকে! আরেক হাতে ইশারা দেন মার খাওয়া ছেলেটাকে কাছে আসার জন্য! সোম গুটি গুটি পায়ে দুজনের দিকে এগিয়ে যায়! ক্লাসের বাকিরা অবাক চোখে দেখে এবার সোমের চোখের কোণায় ও চিকচিক করছে হীরকদ্যুতি! দুই জনকে বুকে চেপে ধরে বৃদ্ধ একটু চোখ বোজেন! মনের অতলে স্মৃতির ওপার থেকে উঁকি দিতে থাকে কবেকার বিনুনী বাঁধা আঙুলে সুলেখা কালির গন্ধ লাগানো এক গ্রাম্য বালিকার স্মৃতি....!
********************************************************************
# গুরুদক্ষিণা পর্ব ২
*************************
পরীক্ষা জিনিষ টা যতই ভীতিজনক হোক জীবনে চলার পথে এক না একবার উঁকি মারবেই! কিন্তু সেটা বেশ মালুম হয় না সোমের কাছে! শালা বাপটা ঘিঞ্জি বস্তির এক ছাল ওঠা বাড়ির দাওয়ায় বসে প্রতি সন্ধেতে মাল খেয়ে সমাজের গুষ্টি উদ্ধার করতে লেগে যায়! প্রতিদিনই সন্ধেতে ভাবে কিছু পড়াশুনো করবে! এত ক্লাস তো টেনেটুনে কোনমতে পাশ করেছে! এবার পাশ না করতে পারলে অন্ধকার জীবন বেছে নিতে হবে! ভাবতেই গা টা কেমন শিউরে ওঠে সোমের! আবছা কুপির নিভু নিভু আলোয় ধুলোয় মলিন হয়ে যাওয়া মায়ের ঝোলানো ফটো টার সামনে এসে দাঁড়ায় সে! মায়ের সেই পানপাতার মত মুখখানি আজো চোখের উপর ভাসে ছেলেটার! সোমবারে জন্ম হয়েছিল বলে তার মায়ের দৃঢ় ধারণা ছিল তার এ বেটা সারা দুনিয়ার উপর রাজ করবে!তাই নাম রেখেছিল সোমরাজ! তার মা ছিল হিন্দুস্তানী! বাপ টা কোথা থেকে তার মাকে ধরে এনেছিল এ আজো তার অজানা! কিন্তু দুজনের খুব পেয়ার মোহাব্বত ছিল! বাপ টা মাল খেয়েই ছেলের সামনেই মা কে খুব সোহাগ করত! সে বাচ্চা ছিল তাই এতসব বুঝতনা! কিন্তু সেদিনের সন্ধেবেলার ঘটনা তার জীবনের মোড় পুরো ঘুরিয়ে দেয়! বাপ টা কাকে জানি তার ভাঙা ঘরে নিয়ে এসেছিল! হেব্বি দেখতে লোকটাকে! মাঝে মাঝেই সানগ্লাস টা খুলে গোটা ভাঙা বাড়িটার উপর জরীপ করে নিচ্ছিল! শুধু সে এটুকু জেনেছিল লোকটা নাকি প্রোমোটার! ইয়াব্বড় বাড়ি তৈরি করে দেয়! একদিন গভীর রাতে সে যখন মায়ের বুকের মধ্যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন কার ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভেঙে যায় বেচারার! দেখে সেই প্রোমোটার লোকটা আরো তিনজনকে নিয়ে এসেছে! আচমকা তারা ঝাপিয়ে পড়ল তার মায়ের শরীরের উপর! অসহায় চোখের সামনে মা কে মুখে রুমাল বেঁধে একটা গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়! নিয়ে যাবার সময় একবারই মায়ের চোখাচোখি হয়ে গেছিল তার! মা যেন তার দিকে খামচে ধরতে যাচ্ছিল! চোখ দিয়ে আকুতির কান্না ঝরে পড়ছিল মেঝেতে! বাপ টা কে হাসতে দেখেছিল হাতে প্রচুর নোটের তাড়া নিয়ে! আরেকটা অদ্ভুতদর্শন মেশিন দেখেছিল প্রোমোটার টার হাতে! মায়ের মাথায় ঠেকিয়ে রেখেছিল! কি জানি তার ছোট্ট মাথায় হয়ত এটাই এসেছিল ঐ যাদু মেশিন টা দেখালে হাতে প্রচুর টাকা আসে! প্রচুর টাকা! মা কে নিয়ে যেতে দেখে পাগলের মত বাধা দিয়েও কোন লাভ হয় নি! বাপটা ভারী কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করেছিল পিছন দিকে! তারপর আর কিছু মনে নেই! পরে যতবারই বাপু কে জিজ্ঞাসা করেছে মায়ের কথা বাপটা উপরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়েছে তাকে! উপরে বিশাল আকাশের বুকে অগণিত নক্ষত্ররাজির মধ্যে অবোধ বালক বুঝে পায়না কোনটা তার মা!!! মনে মনে ভাবে ওইরকম একটা মেশিন যদি তার থাকত!
আবারো বাইরে থেকে অশালীন খিস্তি ভেসে আছে! বাপ টা গিলেছে আজ! আজ আর পড়া হবে না! বই টা আস্তে করে বন্ধ করে ভাঙা দরজা খুলে বেরিয়ে আসে রাস্তায়! শুনতে পায় বাপে গান ধরেছে ঝুম বরাবর ঝুম শরাবী........!!
- বল হারামজাদা! আমার ক্লাসে এগুলো কেন খাচ্ছিলি? বল!
শ্যামল বাবুর গমগমে গলার সাথে সপাং সপাং বেতের আওয়াজ হতবাক হয়ে যাওয়া ক্লাশরুমটির প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে যাচ্ছিল! প্রত্যেক টি বিস্ফারিত চোখের সামনে ছেলেটি নতজানু হয়ে অম্লান বদনে একের পর এক স্যরের মার হজম করে যাচ্ছে! কিন্তু যেটা সকলের চোখে পড়ছেনা সেটা বোধকরি উপরওয়ালা দেখছিলেন! এত মারের পরেও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি রেখে দিয়েছিলোছেলেটি আর মাঝেই মাঝেই তাকিয়ে দেখছিল মাঝের সারিতে জড়সড় হয়ে বসা এক বালিকাকে.....অবন্তী! শ্যামল স্যারের মেয়ে! একসময় বেতটি দু টুকরো হয়ে দুই দিকে ছিটকে পড়ে! ছেলেটি অম্লান বদনে উঠে দাঁড়ায়! তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্যরের দুই পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলে
- আমার জন্য বেকার আপনার হাতটাকে কষ্ট দিলেন স্যর! আগে জানলে এরকম করতাম না!
শ্যামল বাবুর একটু হাঁপ মতন ধরে গেছিল! পাঞ্জাবী র বোতাম টা একটু খুলে দিয়ে গভীর শ্বাস নেবার চেষ্টা করেন! বয়স অনেক হল! এই ছেলেটিকে একেবারে পঞ্চম শ্রেণী থেকেই প্রহারেণ ধনঞ্জয় করে আসছেন! টুয়েলভ এ উঠেও এতটুকু শুধরাল না! সবেমাত্র ছেলেটি বেঞ্চে বসেছে অমনি বাঁজখাই গলায় হাঁক পাড়লেন তিনি
- অবন্তী! উঠে আয়!
গোটা ক্লাসে বাজ পড়লেও মনে হয় সকলে এত চমকাত না! ছেলেটি বসতে ভুলে গেল! এত মার অম্লান বদনে হজম করে গেলেও কি একটা অজানা আতংক তাকে পেয়ে বসল! শুধু একটু অস্ফুটে বলার চেষ্টা করল- স্য..স্যর! ও কিছু....
- শাট আপ! আমি তোর কাছ থেকে কিছু শুনতে চাইনা! যাকে ডেকেছি সে আসুক! বজ্র নির্ঘোষে ঘোষণা করলেন সুভাষনগর হাইস্কুলের অঙ্কের মাষ্টার! ছেলেটির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল! ভয়ে ভয়ে মেয়েটির দিকে একবার তাকাল সে! অবন্তী ততক্ষণে ঝড়ে পড়া কপোতীর মত কাঁঁপতে আরম্ভ করেছে!
- কি হল আয়! আরো এক বার বজ্র নিনাদ!
অবন্তী এক পা দুই পা করে গুটি গুটি স্যরের টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়! সামনে আসতেই আবার চেঁচিয়ে ওঠেন শ্যামল বাবু
- দুটো হাত টেবিলের উপর রাখ!
মেয়েটি আতংকে অবশ হয়ে যাওয়া হাত দুখানি টেবিলের উপর রেখে দেয়! একটু মাথা ঝুঁকিয়ে বৃদ্ধ সামনে মেলে দেওয়া প্রসারিত সরু ফর্সা আঙুল গুলি শুঁকতে থাকেন! বড় মিল এই আঙুল গুলির সাথে তাঁর পরলোকগতা স্ত্রী র আঙুল গুলির! হবে নাই বা কেন? নিজেরই তো রক্ত! মিনতি একে জন্ম দিয়েই কোন সুদূরে চলে গিয়েছে সতেরো বছর পার হয়ে গেল! মেয়েটির মুখে যেন স্বর্গতা বউয়ের মুখখানি দেখতে পান তিনি! চশমার ঘষা কাঁচ খানি তিনি আরো একবার পাঞ্জাবীর খুঁট দিয়ে পরিষ্কার করে নেন! আঙুল থেকে পরিষ্কার আলু কাবলির গন্ধ ভেসে আসছে! মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন তিনি দুই গাল বেয়ে অঝোরে বর্ষা নেমেছে! কেমন যেন মায়া হয় মা হারা মেয়েটির উপর! পিছনের বেঞ্চে ছেলেটি এত মার খেয়েও নির্জীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! শ্যামল স্যর গলা খাঁকারি দিলেন
- ওই হারামজাদা! মিথ্যে বলিস কেন! আলুকাবলি কে খাচ্ছিল অঙ্কের ক্লাসে? তুই কি ভেবেছিলি? আমি বুঝবোনা?
- না স্যর.....আসলে স্যর....প্লিজ স্যর ওকে মারবেন না! যা বলার আমাকে বলুন!
কিরকম যেন একটা কৌতুকের হাসি খেলে গেল বৃদ্ধের মুখে! বলল
- কি রে মা অবু? আমার ক্লাসে এরকম করিস কেন?
অবন্তী আর স্থির থাকতে পারল না! দুই হাতে মুখে ঢেকে সশব্দে কেঁদে উঠল! শুধু অস্ফুটে বলে উঠল
-.......বাবা আজ আমার জন্মদিন! তাই সোমরাজ আমাকে আলুকাবলি খাওয়াবে বলেছিল!....
আর বাকি টা বলতে হয় না বৃদ্ধকে! জড়িয়ে ধরেন নিজের মেয়েকে! আরেক হাতে ইশারা দেন মার খাওয়া ছেলেটাকে কাছে আসার জন্য! সোম গুটি গুটি পায়ে দুজনের দিকে এগিয়ে যায়! ক্লাসের বাকিরা অবাক চোখে দেখে এবার সোমের চোখের কোণায় ও চিকচিক করছে হীরকদ্যুতি! দুই জনকে বুকে চেপে ধরে বৃদ্ধ একটু চোখ বোজেন! মনের অতলে স্মৃতির ওপার থেকে উঁকি দিতে থাকে কবেকার বিনুনী বাঁধা আঙুলে সুলেখা কালির গন্ধ লাগানো এক গ্রাম্য বালিকার স্মৃতি....!
********************************************************************
# গুরুদক্ষিণা পর্ব ২
*************************
পরীক্ষা জিনিষ টা যতই ভীতিজনক হোক জীবনে চলার পথে এক না একবার উঁকি মারবেই! কিন্তু সেটা বেশ মালুম হয় না সোমের কাছে! শালা বাপটা ঘিঞ্জি বস্তির এক ছাল ওঠা বাড়ির দাওয়ায় বসে প্রতি সন্ধেতে মাল খেয়ে সমাজের গুষ্টি উদ্ধার করতে লেগে যায়! প্রতিদিনই সন্ধেতে ভাবে কিছু পড়াশুনো করবে! এত ক্লাস তো টেনেটুনে কোনমতে পাশ করেছে! এবার পাশ না করতে পারলে অন্ধকার জীবন বেছে নিতে হবে! ভাবতেই গা টা কেমন শিউরে ওঠে সোমের! আবছা কুপির নিভু নিভু আলোয় ধুলোয় মলিন হয়ে যাওয়া মায়ের ঝোলানো ফটো টার সামনে এসে দাঁড়ায় সে! মায়ের সেই পানপাতার মত মুখখানি আজো চোখের উপর ভাসে ছেলেটার! সোমবারে জন্ম হয়েছিল বলে তার মায়ের দৃঢ় ধারণা ছিল তার এ বেটা সারা দুনিয়ার উপর রাজ করবে!তাই নাম রেখেছিল সোমরাজ! তার মা ছিল হিন্দুস্তানী! বাপ টা কোথা থেকে তার মাকে ধরে এনেছিল এ আজো তার অজানা! কিন্তু দুজনের খুব পেয়ার মোহাব্বত ছিল! বাপ টা মাল খেয়েই ছেলের সামনেই মা কে খুব সোহাগ করত! সে বাচ্চা ছিল তাই এতসব বুঝতনা! কিন্তু সেদিনের সন্ধেবেলার ঘটনা তার জীবনের মোড় পুরো ঘুরিয়ে দেয়! বাপ টা কাকে জানি তার ভাঙা ঘরে নিয়ে এসেছিল! হেব্বি দেখতে লোকটাকে! মাঝে মাঝেই সানগ্লাস টা খুলে গোটা ভাঙা বাড়িটার উপর জরীপ করে নিচ্ছিল! শুধু সে এটুকু জেনেছিল লোকটা নাকি প্রোমোটার! ইয়াব্বড় বাড়ি তৈরি করে দেয়! একদিন গভীর রাতে সে যখন মায়ের বুকের মধ্যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন কার ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভেঙে যায় বেচারার! দেখে সেই প্রোমোটার লোকটা আরো তিনজনকে নিয়ে এসেছে! আচমকা তারা ঝাপিয়ে পড়ল তার মায়ের শরীরের উপর! অসহায় চোখের সামনে মা কে মুখে রুমাল বেঁধে একটা গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়! নিয়ে যাবার সময় একবারই মায়ের চোখাচোখি হয়ে গেছিল তার! মা যেন তার দিকে খামচে ধরতে যাচ্ছিল! চোখ দিয়ে আকুতির কান্না ঝরে পড়ছিল মেঝেতে! বাপ টা কে হাসতে দেখেছিল হাতে প্রচুর নোটের তাড়া নিয়ে! আরেকটা অদ্ভুতদর্শন মেশিন দেখেছিল প্রোমোটার টার হাতে! মায়ের মাথায় ঠেকিয়ে রেখেছিল! কি জানি তার ছোট্ট মাথায় হয়ত এটাই এসেছিল ঐ যাদু মেশিন টা দেখালে হাতে প্রচুর টাকা আসে! প্রচুর টাকা! মা কে নিয়ে যেতে দেখে পাগলের মত বাধা দিয়েও কোন লাভ হয় নি! বাপটা ভারী কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করেছিল পিছন দিকে! তারপর আর কিছু মনে নেই! পরে যতবারই বাপু কে জিজ্ঞাসা করেছে মায়ের কথা বাপটা উপরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়েছে তাকে! উপরে বিশাল আকাশের বুকে অগণিত নক্ষত্ররাজির মধ্যে অবোধ বালক বুঝে পায়না কোনটা তার মা!!! মনে মনে ভাবে ওইরকম একটা মেশিন যদি তার থাকত!
আবারো বাইরে থেকে অশালীন খিস্তি ভেসে আছে! বাপ টা গিলেছে আজ! আজ আর পড়া হবে না! বই টা আস্তে করে বন্ধ করে ভাঙা দরজা খুলে বেরিয়ে আসে রাস্তায়! শুনতে পায় বাপে গান ধরেছে ঝুম বরাবর ঝুম শরাবী........!!
# গুরুদক্ষিণা পর্ব-৩
*******************************************************************
*******************************************************************
- অবু! মা রে! একটু তুলসী তলায় সন্ধে দেখিয়ে আয় মা!
কথা কটা বলে বৃদ্ধ হাঁপাতে থাকে! আজকাল একটু বেশিই হাঁপ ধরে যেন! বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না! অবন্তী বাধ্য মেয়ের মত বাবার হুকুম পালন করে! প্রদীপ দিয়ে বাবার সামনে চুপ করে দাঁড়ায়!
- বাবা!!?
- হু! কিছু বলবি?
- বাবা সোম নির্দোষ!
- পাগলি! সে আমি জানি! কিন্তু মা রে! ছেলেটা ভাল হলেও ওর ব্যাকগ্রাউন্ড ভাল নয় রে! বাপ টা ওর মাকে মেরেছে! এবার ছেলেটা কেও খাবে!
- বাবা! প্লিজ! বুক টা ছ্যাঁত করে ওঠে যেন অবন্তীর!
- স্যর! আসব?
আচমকা একটা কিশোর কন্ঠ অন্ধকার ভেদ করে বাইরের উঠোন থেকে ভেসে আসে!
- কে?! কে ওখানে?
- আজ্ঞে! আমি সোম!
- অ! তা এখন এয়েচিস কেন! কিছু বলবি?
- স্যর একটু অঙ্ক দেখিয়ে দিলে ভাল হত!
অবন্তীর মুখচোখ অন্ধকারের মধ্যেও চকচক করে উঠল! বৃদ্ধ বাপের নজর এড়াল না সেটা! কৌতুক চেপে মেয়েকে বলে ওঠে
- অবু যা একটা শতরঞ্চি নিয়ে আয়! ছেলেটাকে বসতে দে!
অতঃপর ছেলেটিকে নিয়ে সংখ্যার সাগরে ডুবে যান বৃদ্ধ! দূরে বাবলা গাছের ডালে জোনাকির জ্বলা নেভা সন্ধ্যার আঁধার কে আরো মোহনীয় করে তোলে!
দুই ঘন্টা পরে বৃদ্ধর খেয়াল হয় উঠতে হবে তাকে! ছেলেটিকে ছুটি দিয়ে পিছন ফিরতেই কি একটা মনে করে আচমকা তার দিকে ফিরে যায়! সোম তখন বই খাতা গুছাতে ব্যস্ত! স্যরের এই চেয়ে থাকা তার নজরে পড়ে না! একটু পরে বৃদ্ধই নীরবতা ভাঙে!
- হ্যা রে সোম!
- আজ্ঞে!
- কিছু খেয়েছিস?!
- হ্যা....হ্যা স্যর! খেয়ে এসেছি! লজ্জায় কান লাল হয়ে সোমের!
- কি খেয়েছিস শুনি?
কিছু জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকে সোম! কি জবাব দিত সে! অনেক রাতে সে কিছু না খেয়ে স্রেফ জল খেয়েই শুয়ে পড়েছে! যেদিন বাপের পকেট কাটত সেদিন হয়ত পাড়ার দোকান থেকে তড়কা রুটি কিনে খেত! বাপটা হেবি কিপটে! কিছু খেতে দেয় না!
- অবু! রাতের খাবার নিয়ে আয়! তিনটে থালা নামা!
ষোড়শী উত্তীর্ণ কিশোরী দুটি বেণী দুলিয়ে আনন্দে রান্না ঘরের দিকে দৌড় লাগায়! সোমের দুই চোখে কেন জানিনা অকাল বর্ষণ নেমে আসে! স্যরের পা ধরে আচমকা ডুকরে কেঁদে ওঠে সে!
- স্যর মা এভাবে গেল কেন স্যর!
বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোমকে পদতল থেকে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে! তারপর তিনটে আঙুল জড়ো করে নিজের কপাল ছুঁয়ে পেটের দিকে ইঙ্গিত করে!
- পেট ই কি সব স্যর? ভালোবাসা? মায়া? মমতা?!
- সবই টাকা রে পাগল! দুনিয়া তে টাকা পেট কেও বেচে দেয়! কিনতে পারেনা শুধু ভালবাসা!
- ভুল স্যর! ভুল বলছেন!
বৃদ্ধ চমকে ওঠেন!
- ভুল কি রে?
- হ্যা স্যর ভুল! মেশিন হাতে থাকলে সব দুনিয়া আমার পায়ের তলায়! আর প্রচুর টাকা আসবে!
- চুপ চুপ বাবা! এরকম বলতে নেই! বৃদ্ধ এক অজানা আশংকায় সোমকে আরো নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে! মনে মনে ঈশ্বরকে বলে চলে - ঠাকুর ছেলেটিকে মতি দাও!
রান্নাঘরে তখন থালাবাসন সাজানো হয়ে গেছে! একটা চিকন গলার ডাক ভেসে আসে!
# গুরুদক্ষিণা পর্ব ৪
***********************************************************************
অবশেষে এগিয়ে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি! উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা!
স্নায়ু টানটান সেই জীবন যজ্ঞের আজ গুরুত্বপূর্ণ দিন! অঙ্ক পরীক্ষা! সুভাষনগর হাইস্কুলের সিট এবার পড়েছে সত্যভারতী অ্যাকাডেমিতে! বিশাল সেই অট্টালিকার কোণায় কোণায় আজ কাগজ কলমের সশব্দ সঞ্চালনে ভারী হয়ে উঠছে! ছাব্বিশ নম্বর ঘরটায় দুজনেরই সিট পড়েছে! অবন্তী সোমের ঠিক সামনের বেঞ্চে কোণাকুণি বসেছে! প্রশ্নপত্র দেবার আগে একবারই সে ভীরু কম্পিত চোখে সোমের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল! সোম তাকে চোখের ইশারায় জানিয়ে দিল সে আছে! ভয় পাবার কিছু নেই! সোমের চোখের ইশারায় কি ছিল কে জানে কিন্তু মা হারা মেয়েটি পরম আশ্বাস পায়! লাজুক চোখ দুটি নামিয়ে নেয় সে! প্রশ্নপত্র পাবার পরেই তাদের দুজনেরই মুখে এক খুশির ঝিলিক খেলে যায়! যে অঙ্ক গুলো আজ তাদের সামনে ওঁত পেতে আছে সেগুলোর প্রত্যেকটিরই গুপ্ত দ্বার খোলা গিয়েছে শ্যামল বাবুর স্নেহের পরশে! এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা! দুজনেই খুব দ্রুত কলম চালায়! কিন্তু ঘরে বাকি পরীক্ষার্থীদের মুখে ক্রমে ঘনিয়ে এসেছে আশংকার মেঘ! কিন্তু তাদের দুজনের কেউই লক্ষ করল না সোমের পাশে অবন্তীর ঠিক পিছনেই বসা একজোড়া চোখ পরম নিষ্ঠুরতার সাথে তাদের দুজনকে জরীপ করে চলেছে!
সোম সবে অবজেক্টিভ পার্টের উত্তর শেষ করে মূল উত্তর পত্রে হাত দিয়েছে আচমকা পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে শোনা গেল কয়েকটি শব্দাবলী যেগুলো শুনে তার কলম আপনা থেকেই আপনা থেকেই থেমে গেল.....কারণ শব্দগুলো অবন্তীকে উদ্দেশ্য করেই ধেয়ে আসছিল যেগুলো খুব শ্রুতিমধুর ছিল না! স্পষ্ট শুনতে পেল পাশে বসা বখাটে ছেলেটি অবন্তী কে বলেই চলেছে
- হাই সেক্সি! প্লিজ দেখানা! হেল্প মি বেবি প্লিজ!
সোম একবার ঠান্ডা চোখে ছেলেটার দিকে তাকায়! আদিত্য! ক্লাসের একনম্বরের বখাটে ছোকরা! সোম শুনেছে সে নাকি খুব প্রতিপত্তিশালী বাড়ির ছেলে! তার বাবার সামনে পিছনে নাকি মেশিন নিয়ে লোক ঘোরাফেরা করে! ও একদিন লুকিয়ে টিফিনে একটা মেশিন নিয়ে এসেছিল! সবাইকে দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সেদিন! অবাক চোখে সোম তার ধাতব ঠান্ডা নলটার দিকে তাকিয়েছিল! হাতলের নীচে একটা পাতলা বাক্স টিপতে বেরিয়ে এসেছিল! জেনেছিল একে ক্যাসেট বলে! এতে নাকি দানা ভরা হয়! আর জিনিষ টাকে বলে নাইন এম.এম! ওই দানা ভরে দিলে মানুষ নিকেশ হয়ে যায় দুনিয়া থেকে! সোমের খুব ইচ্ছা করে বুড়ো বাপটাকে দানা খাওয়াতে!
আবারো অশালীন উক্তি ভেসে আসে পাশ থেকে! এবার সোম ঠান্ডা চোখে তাকায় আদিত্যর দিকে! বলে
- প্লিজ এরকম করিস না! অসুবিধা হচ্ছে!
- তাতে তোর কি হচ্ছে বে বো****! একটা অশালীন শব্দ প্রয়োগে কান লাল হয়ে যায় সোমের!
সোম এবার সোজাসুজি তার চোখের ঠিক মাঝখানে তাকাল!
- দেখ তোর রক্ত কি দিয়ে তৈরি জানা নেই! সেটা তোর বাপ জানে! কিন্তু মেয়েমানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে শেখ! এতে পৌরুষ হানি হবেনা তোর!
তীরের মত কথা গুলো তার বুকে গিয়ে বিঁধল! আদিত্যর চোখ দুটো বাঘের মত জ্বলে উঠতে গিয়েও কিরকম যেন ঠান্ডা মেরে গেল! সোম আড় চোখে দেখে অবন্তী তার দিকে হাত দুটো জোড় করে দুই চোখে মিনতি ভরা তাকিয়ে আছে! সোমের চোয়াল দুটো শক্ত হল! খাতার দিকে মনোনিবেশ করতেই পাশ থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এল
- স্যর বাইরে যাব?
তাকিয়ে দেখে আদিত্য আর দুটো ছেলে উঠে দাঁড়িয়েছে!
- এতজন বাইরে যাবে? দুজনের বেশি নিয়ম নেই তো? ইনভিজিলেটর এর অবাক প্রশ্ন!
- আরে স্যর! নিয়ম তো তৈরি হয় নিয়ম ভাঙার জন্য! তাডাতাড়ি চলে আসব ভাববেন না!
পিছনের থেকে আওয়াজ টা ভেসে আসতেই সোম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে একটা লাল চুলের ছেলে উঠে দাঁড়িয়েছে! আদিত্যর স্যাঙাত!
ইনভিজিলেটর এর চোখ দুটো বাঘের মত জ্বলে উঠতে গিয়েও আদিত্যকে দেখে কেমন যেন মিইয়ে গেল! কেমন যেন ভয় পাওয়া গলায় বলে উঠলেন
- আচ্ছা যাও!
ওরা তিন জন বেরিয়ে যাবার আগে সোমের কানে স্পষ্ট একটা শাসানি ভেসে আসে- তোর ঠিকানা লাগাচ্ছি দাঁড়া!
সোম অতটা গা করল না! সে আবার ডুবে যায় অঙ্কের সমুদ্রে!
*******************************************************************
কথা কটা বলে বৃদ্ধ হাঁপাতে থাকে! আজকাল একটু বেশিই হাঁপ ধরে যেন! বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না! অবন্তী বাধ্য মেয়ের মত বাবার হুকুম পালন করে! প্রদীপ দিয়ে বাবার সামনে চুপ করে দাঁড়ায়!
- বাবা!!?
- হু! কিছু বলবি?
- বাবা সোম নির্দোষ!
- পাগলি! সে আমি জানি! কিন্তু মা রে! ছেলেটা ভাল হলেও ওর ব্যাকগ্রাউন্ড ভাল নয় রে! বাপ টা ওর মাকে মেরেছে! এবার ছেলেটা কেও খাবে!
- বাবা! প্লিজ! বুক টা ছ্যাঁত করে ওঠে যেন অবন্তীর!
- স্যর! আসব?
আচমকা একটা কিশোর কন্ঠ অন্ধকার ভেদ করে বাইরের উঠোন থেকে ভেসে আসে!
- কে?! কে ওখানে?
- আজ্ঞে! আমি সোম!
- অ! তা এখন এয়েচিস কেন! কিছু বলবি?
- স্যর একটু অঙ্ক দেখিয়ে দিলে ভাল হত!
অবন্তীর মুখচোখ অন্ধকারের মধ্যেও চকচক করে উঠল! বৃদ্ধ বাপের নজর এড়াল না সেটা! কৌতুক চেপে মেয়েকে বলে ওঠে
- অবু যা একটা শতরঞ্চি নিয়ে আয়! ছেলেটাকে বসতে দে!
অতঃপর ছেলেটিকে নিয়ে সংখ্যার সাগরে ডুবে যান বৃদ্ধ! দূরে বাবলা গাছের ডালে জোনাকির জ্বলা নেভা সন্ধ্যার আঁধার কে আরো মোহনীয় করে তোলে!
দুই ঘন্টা পরে বৃদ্ধর খেয়াল হয় উঠতে হবে তাকে! ছেলেটিকে ছুটি দিয়ে পিছন ফিরতেই কি একটা মনে করে আচমকা তার দিকে ফিরে যায়! সোম তখন বই খাতা গুছাতে ব্যস্ত! স্যরের এই চেয়ে থাকা তার নজরে পড়ে না! একটু পরে বৃদ্ধই নীরবতা ভাঙে!
- হ্যা রে সোম!
- আজ্ঞে!
- কিছু খেয়েছিস?!
- হ্যা....হ্যা স্যর! খেয়ে এসেছি! লজ্জায় কান লাল হয়ে সোমের!
- কি খেয়েছিস শুনি?
কিছু জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকে সোম! কি জবাব দিত সে! অনেক রাতে সে কিছু না খেয়ে স্রেফ জল খেয়েই শুয়ে পড়েছে! যেদিন বাপের পকেট কাটত সেদিন হয়ত পাড়ার দোকান থেকে তড়কা রুটি কিনে খেত! বাপটা হেবি কিপটে! কিছু খেতে দেয় না!
- অবু! রাতের খাবার নিয়ে আয়! তিনটে থালা নামা!
ষোড়শী উত্তীর্ণ কিশোরী দুটি বেণী দুলিয়ে আনন্দে রান্না ঘরের দিকে দৌড় লাগায়! সোমের দুই চোখে কেন জানিনা অকাল বর্ষণ নেমে আসে! স্যরের পা ধরে আচমকা ডুকরে কেঁদে ওঠে সে!
- স্যর মা এভাবে গেল কেন স্যর!
বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোমকে পদতল থেকে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে! তারপর তিনটে আঙুল জড়ো করে নিজের কপাল ছুঁয়ে পেটের দিকে ইঙ্গিত করে!
- পেট ই কি সব স্যর? ভালোবাসা? মায়া? মমতা?!
- সবই টাকা রে পাগল! দুনিয়া তে টাকা পেট কেও বেচে দেয়! কিনতে পারেনা শুধু ভালবাসা!
- ভুল স্যর! ভুল বলছেন!
বৃদ্ধ চমকে ওঠেন!
- ভুল কি রে?
- হ্যা স্যর ভুল! মেশিন হাতে থাকলে সব দুনিয়া আমার পায়ের তলায়! আর প্রচুর টাকা আসবে!
- চুপ চুপ বাবা! এরকম বলতে নেই! বৃদ্ধ এক অজানা আশংকায় সোমকে আরো নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে! মনে মনে ঈশ্বরকে বলে চলে - ঠাকুর ছেলেটিকে মতি দাও!
রান্নাঘরে তখন থালাবাসন সাজানো হয়ে গেছে! একটা চিকন গলার ডাক ভেসে আসে!
# গুরুদক্ষিণা পর্ব ৪
***********************************************************************
অবশেষে এগিয়ে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি! উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা!
স্নায়ু টানটান সেই জীবন যজ্ঞের আজ গুরুত্বপূর্ণ দিন! অঙ্ক পরীক্ষা! সুভাষনগর হাইস্কুলের সিট এবার পড়েছে সত্যভারতী অ্যাকাডেমিতে! বিশাল সেই অট্টালিকার কোণায় কোণায় আজ কাগজ কলমের সশব্দ সঞ্চালনে ভারী হয়ে উঠছে! ছাব্বিশ নম্বর ঘরটায় দুজনেরই সিট পড়েছে! অবন্তী সোমের ঠিক সামনের বেঞ্চে কোণাকুণি বসেছে! প্রশ্নপত্র দেবার আগে একবারই সে ভীরু কম্পিত চোখে সোমের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল! সোম তাকে চোখের ইশারায় জানিয়ে দিল সে আছে! ভয় পাবার কিছু নেই! সোমের চোখের ইশারায় কি ছিল কে জানে কিন্তু মা হারা মেয়েটি পরম আশ্বাস পায়! লাজুক চোখ দুটি নামিয়ে নেয় সে! প্রশ্নপত্র পাবার পরেই তাদের দুজনেরই মুখে এক খুশির ঝিলিক খেলে যায়! যে অঙ্ক গুলো আজ তাদের সামনে ওঁত পেতে আছে সেগুলোর প্রত্যেকটিরই গুপ্ত দ্বার খোলা গিয়েছে শ্যামল বাবুর স্নেহের পরশে! এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা! দুজনেই খুব দ্রুত কলম চালায়! কিন্তু ঘরে বাকি পরীক্ষার্থীদের মুখে ক্রমে ঘনিয়ে এসেছে আশংকার মেঘ! কিন্তু তাদের দুজনের কেউই লক্ষ করল না সোমের পাশে অবন্তীর ঠিক পিছনেই বসা একজোড়া চোখ পরম নিষ্ঠুরতার সাথে তাদের দুজনকে জরীপ করে চলেছে!
সোম সবে অবজেক্টিভ পার্টের উত্তর শেষ করে মূল উত্তর পত্রে হাত দিয়েছে আচমকা পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে শোনা গেল কয়েকটি শব্দাবলী যেগুলো শুনে তার কলম আপনা থেকেই আপনা থেকেই থেমে গেল.....কারণ শব্দগুলো অবন্তীকে উদ্দেশ্য করেই ধেয়ে আসছিল যেগুলো খুব শ্রুতিমধুর ছিল না! স্পষ্ট শুনতে পেল পাশে বসা বখাটে ছেলেটি অবন্তী কে বলেই চলেছে
- হাই সেক্সি! প্লিজ দেখানা! হেল্প মি বেবি প্লিজ!
সোম একবার ঠান্ডা চোখে ছেলেটার দিকে তাকায়! আদিত্য! ক্লাসের একনম্বরের বখাটে ছোকরা! সোম শুনেছে সে নাকি খুব প্রতিপত্তিশালী বাড়ির ছেলে! তার বাবার সামনে পিছনে নাকি মেশিন নিয়ে লোক ঘোরাফেরা করে! ও একদিন লুকিয়ে টিফিনে একটা মেশিন নিয়ে এসেছিল! সবাইকে দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সেদিন! অবাক চোখে সোম তার ধাতব ঠান্ডা নলটার দিকে তাকিয়েছিল! হাতলের নীচে একটা পাতলা বাক্স টিপতে বেরিয়ে এসেছিল! জেনেছিল একে ক্যাসেট বলে! এতে নাকি দানা ভরা হয়! আর জিনিষ টাকে বলে নাইন এম.এম! ওই দানা ভরে দিলে মানুষ নিকেশ হয়ে যায় দুনিয়া থেকে! সোমের খুব ইচ্ছা করে বুড়ো বাপটাকে দানা খাওয়াতে!
আবারো অশালীন উক্তি ভেসে আসে পাশ থেকে! এবার সোম ঠান্ডা চোখে তাকায় আদিত্যর দিকে! বলে
- প্লিজ এরকম করিস না! অসুবিধা হচ্ছে!
- তাতে তোর কি হচ্ছে বে বো****! একটা অশালীন শব্দ প্রয়োগে কান লাল হয়ে যায় সোমের!
সোম এবার সোজাসুজি তার চোখের ঠিক মাঝখানে তাকাল!
- দেখ তোর রক্ত কি দিয়ে তৈরি জানা নেই! সেটা তোর বাপ জানে! কিন্তু মেয়েমানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে শেখ! এতে পৌরুষ হানি হবেনা তোর!
তীরের মত কথা গুলো তার বুকে গিয়ে বিঁধল! আদিত্যর চোখ দুটো বাঘের মত জ্বলে উঠতে গিয়েও কিরকম যেন ঠান্ডা মেরে গেল! সোম আড় চোখে দেখে অবন্তী তার দিকে হাত দুটো জোড় করে দুই চোখে মিনতি ভরা তাকিয়ে আছে! সোমের চোয়াল দুটো শক্ত হল! খাতার দিকে মনোনিবেশ করতেই পাশ থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এল
- স্যর বাইরে যাব?
তাকিয়ে দেখে আদিত্য আর দুটো ছেলে উঠে দাঁড়িয়েছে!
- এতজন বাইরে যাবে? দুজনের বেশি নিয়ম নেই তো? ইনভিজিলেটর এর অবাক প্রশ্ন!
- আরে স্যর! নিয়ম তো তৈরি হয় নিয়ম ভাঙার জন্য! তাডাতাড়ি চলে আসব ভাববেন না!
পিছনের থেকে আওয়াজ টা ভেসে আসতেই সোম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে একটা লাল চুলের ছেলে উঠে দাঁড়িয়েছে! আদিত্যর স্যাঙাত!
ইনভিজিলেটর এর চোখ দুটো বাঘের মত জ্বলে উঠতে গিয়েও আদিত্যকে দেখে কেমন যেন মিইয়ে গেল! কেমন যেন ভয় পাওয়া গলায় বলে উঠলেন
- আচ্ছা যাও!
ওরা তিন জন বেরিয়ে যাবার আগে সোমের কানে স্পষ্ট একটা শাসানি ভেসে আসে- তোর ঠিকানা লাগাচ্ছি দাঁড়া!
সোম অতটা গা করল না! সে আবার ডুবে যায় অঙ্কের সমুদ্রে!
*******************************************************************
# পর্ব_৫
গোটা ক্লাসরুম টা ডুবে আছে কলমের খসখস আওয়াজের মধ্যে! পরীক্ষা শেষ হতে আর দেড় ঘন্টা বাকি! সোমের আর ত্রিশ নম্বরের উত্তর বাকি! করতে পারলেই একশোয় একশো একদম মুঠোতে! কিন্তু একটা অস্বস্তি কেবলই কাঁটার মত বিঁধছে! ছেলেগুলো পনেরো মিনিট হয়ে গেল ফেরার নাম নেই! আর অবন্তী টাও বাথরুম যাবার নাম করে পাঁচ মিনিটের বেশী বেপাত্তা! অবন্তীর ফাঁকা সিট টার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা চাপা আতঙ্ক গলা দিয়ে উঠে আসতে লাগল সোমের! কি হল কি মেয়েটার! তাহলে কি ছেলেগুলোর.....!
নাহ! আর ভাবতে পারল না সে! সটান উঠে দাঁড়িয়ে ইনভিজিলেটর কে বলে বসল- স্যর! একটু বাইরে যাব!
- আগের জন আসুক! অ্যালাউ নেই!
- স্যর খুব জোর পেয়েছে! যাব আর আসব! সোম মরিয়া হয়ে বলে উঠল!
- ঠিক আছে যাও! কিন্তু তাড়াতাড়ি! ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়েই বলে উঠলেন গার্ড! সোম একমূহুর্ত দেরী করল না! দ্রুত পদে ক্লাসরুমের বাইরে বেরিয়ে এল! অতবড় শূন্য করিডোর টা হাঁ করে সোম কে যেন গিলে খেতে আসছে! সময় উড়ে চলেছে! সে ভাল করে চারদিকটা একবার দেখে নিল! নাহ! অবন্তী কে দেখতে পেলনা কোথাও! আচ্ছা! মেয়েদের বাথরুমের ওদিকটায় দেখবে একবার? কথাটা ভাবতেই কেমন যেন লজ্জা পেয়ে যায় সোম! যাঃ! তা পসিবল না! কিন্তু সত্যি যদি কিছু হয়ে থাকে!
********************************************************************
# পর্ব ৬
একটু এগোতেই বাথরুমের লাগোয়া পোড়ো জমিটার পাঁচিলের আড়াল থেকে একটা অস্ফুট গোঙানির আওয়াজ ভেসে এল! সোমের ষষ্ঠেন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল আচমকা! কিছু একটা খারাপ ঘটতে চলেছে! স্নায়ু টান করে আচমকা দৌড় শুরু করল সে! পাঁচিল টপকে ভিতরে লাফিয়ে নামতেই সে নারকীয় দৃশ্য দেখে সোম স্তব্ধ হয়ে গেল!
দুটো ছেলে অবন্তীর শোয়ানো শরীর টার উপর চেপে বসেছে! আরেক জন প্রাণপণে তার মুখ টা চেপে ধরে রেখেছে! অবন্তী একটু বাতাস নেবার জন্য হাঁকপাঁক করছে কিন্তু পারছে না! সোমের হাতের মুঠি দুটো আপনা থেকেই শক্ত হয়ে গেল! আদিত্য তাকে দেখে হিংস্র জানোয়ারের মত খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠল
- আয় রে শুয়ার! প্রসাদ নিয়ে যা! শালা কি ডবকা প্রসাদ! খুব তড়পাচ্ছিলি না ক্লাসে! নে একে বাঁচা!
বলেই অবন্তী র সালোয়ারের একটা দিক পুরো অনাবৃত করে দিল এক হ্যাঁচকা টানে! সোম এদিকওদিক তাকিয়ে কোন সিভিক গার্ডের টিকিটিও দেখতে পেল না!
- কি দেখছিস বো#@#@! আমি কার ছেলে তুই জানিস না! আমার বাপ টাকা দিয়ে সমস্ত দুনিয়া কিনতে পারে আর এ তো কয়েকটা সিভিক! কেউ আসবে না মাকাল! সাপের মত হিস হিসিয়ে উঠল আদিত্য!
- ছেড়ে দে ওকে! কথা দিচ্ছি চলে যাব! বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠল সোম!
- উরেব্বাস গুরু! এ যে হুমকি দেয় আবার! অ্যাঁ! বলেই অসভ্য হাসি শুরু করল ছেলেটি!
সোমের শরীর টা আচমকা স্প্রিন্টারের মত তীরবেগে ছুটে গেল লালচুলের দিকে! একটা মৃদু খট করে শব্দ হল! আদিত্য অবাক চোখে দেখল লালচুলো নিস্পন্দ শরীর টা থপ করে অবন্তী র পাশে শুয়ে পড়ল! ঘাড় সমেত মুন্ডু পুরো পিছন দিকে ঘুরে গিয়েছে! নাক থেকে পাতলা রক্তের রেখা বেরিয়ে আসছে! আপনা থেকেই অবন্তীর শরীরের উপর থেকে চাপ হালকা হতে থাকে! আদিত্য অবাক চোখে দেখে সোম অদ্ভুত কায়দায় পা ফাঁক করে এক বিশেষ মুদ্রায় দাঁড়িয়ে আছে! চোখ দুটো জ্বলছে!
- তু.....তুই এসব....কি করে?
- আদি! তোকে আমি ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম! লাল্টুদার শেখানো এই বিদ্যা কারুর উপর জাহির করিনি! আজ তুই সেটা প্রয়োগ করতে বাধ্য করলি! কি বলছিলি যেন? তোর বাপের অনেক টাকা তাই না!
আদি লক্ষ্য করল সোম এক পা দুই পা তার দিকে এগিয়ে আসছে! অবন্তী ততক্ষণে ধুলোর শয্যা থেকে উঠে পড়ে কাঁপছে!তার দিকে তাকিয়ে সোম শুধু একটা কথাই বলে উঠল
- যা! পরীক্ষা হলে যা! আর ত্রিশ মিনিট বাকি! আমি আসছি!
বলেই আদিত্যর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল! আদিত্য কিছু বোঝার আগেই তার বাঁ হাত ধরে শূন্যে বেঁকিয়ে ধরেই পিছন দিকে ঘুরিয়ে দিল সোম! একটা মৃদু খট আওয়াজের সাথে একটা তীব্র আর্তচিৎকার পরীক্ষার নিস্তব্ধ পরিবেশ। খানখান করে ছড়িয়ে পড়ল চত্বরের কোণে! অবন্তী ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দেখতে পেল কয়েকটা সিভিক প্রাণপণে দৌড়ে আসছে তাদের দিকে! সোমের দিকে তাকাল সে! মনে হল সোম তার দিকে একবার করুণ হাসি হাসছে! আচমকা তার সামনে গোটা পৃথিবী দুলে উঠল! ব্যস! আর কিছু মনে নেই তার.......।
*********************************************************************
নাহ! আর ভাবতে পারল না সে! সটান উঠে দাঁড়িয়ে ইনভিজিলেটর কে বলে বসল- স্যর! একটু বাইরে যাব!
- আগের জন আসুক! অ্যালাউ নেই!
- স্যর খুব জোর পেয়েছে! যাব আর আসব! সোম মরিয়া হয়ে বলে উঠল!
- ঠিক আছে যাও! কিন্তু তাড়াতাড়ি! ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়েই বলে উঠলেন গার্ড! সোম একমূহুর্ত দেরী করল না! দ্রুত পদে ক্লাসরুমের বাইরে বেরিয়ে এল! অতবড় শূন্য করিডোর টা হাঁ করে সোম কে যেন গিলে খেতে আসছে! সময় উড়ে চলেছে! সে ভাল করে চারদিকটা একবার দেখে নিল! নাহ! অবন্তী কে দেখতে পেলনা কোথাও! আচ্ছা! মেয়েদের বাথরুমের ওদিকটায় দেখবে একবার? কথাটা ভাবতেই কেমন যেন লজ্জা পেয়ে যায় সোম! যাঃ! তা পসিবল না! কিন্তু সত্যি যদি কিছু হয়ে থাকে!
********************************************************************
# পর্ব ৬
একটু এগোতেই বাথরুমের লাগোয়া পোড়ো জমিটার পাঁচিলের আড়াল থেকে একটা অস্ফুট গোঙানির আওয়াজ ভেসে এল! সোমের ষষ্ঠেন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল আচমকা! কিছু একটা খারাপ ঘটতে চলেছে! স্নায়ু টান করে আচমকা দৌড় শুরু করল সে! পাঁচিল টপকে ভিতরে লাফিয়ে নামতেই সে নারকীয় দৃশ্য দেখে সোম স্তব্ধ হয়ে গেল!
দুটো ছেলে অবন্তীর শোয়ানো শরীর টার উপর চেপে বসেছে! আরেক জন প্রাণপণে তার মুখ টা চেপে ধরে রেখেছে! অবন্তী একটু বাতাস নেবার জন্য হাঁকপাঁক করছে কিন্তু পারছে না! সোমের হাতের মুঠি দুটো আপনা থেকেই শক্ত হয়ে গেল! আদিত্য তাকে দেখে হিংস্র জানোয়ারের মত খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠল
- আয় রে শুয়ার! প্রসাদ নিয়ে যা! শালা কি ডবকা প্রসাদ! খুব তড়পাচ্ছিলি না ক্লাসে! নে একে বাঁচা!
বলেই অবন্তী র সালোয়ারের একটা দিক পুরো অনাবৃত করে দিল এক হ্যাঁচকা টানে! সোম এদিকওদিক তাকিয়ে কোন সিভিক গার্ডের টিকিটিও দেখতে পেল না!
- কি দেখছিস বো#@#@! আমি কার ছেলে তুই জানিস না! আমার বাপ টাকা দিয়ে সমস্ত দুনিয়া কিনতে পারে আর এ তো কয়েকটা সিভিক! কেউ আসবে না মাকাল! সাপের মত হিস হিসিয়ে উঠল আদিত্য!
- ছেড়ে দে ওকে! কথা দিচ্ছি চলে যাব! বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠল সোম!
- উরেব্বাস গুরু! এ যে হুমকি দেয় আবার! অ্যাঁ! বলেই অসভ্য হাসি শুরু করল ছেলেটি!
সোমের শরীর টা আচমকা স্প্রিন্টারের মত তীরবেগে ছুটে গেল লালচুলের দিকে! একটা মৃদু খট করে শব্দ হল! আদিত্য অবাক চোখে দেখল লালচুলো নিস্পন্দ শরীর টা থপ করে অবন্তী র পাশে শুয়ে পড়ল! ঘাড় সমেত মুন্ডু পুরো পিছন দিকে ঘুরে গিয়েছে! নাক থেকে পাতলা রক্তের রেখা বেরিয়ে আসছে! আপনা থেকেই অবন্তীর শরীরের উপর থেকে চাপ হালকা হতে থাকে! আদিত্য অবাক চোখে দেখে সোম অদ্ভুত কায়দায় পা ফাঁক করে এক বিশেষ মুদ্রায় দাঁড়িয়ে আছে! চোখ দুটো জ্বলছে!
- তু.....তুই এসব....কি করে?
- আদি! তোকে আমি ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম! লাল্টুদার শেখানো এই বিদ্যা কারুর উপর জাহির করিনি! আজ তুই সেটা প্রয়োগ করতে বাধ্য করলি! কি বলছিলি যেন? তোর বাপের অনেক টাকা তাই না!
আদি লক্ষ্য করল সোম এক পা দুই পা তার দিকে এগিয়ে আসছে! অবন্তী ততক্ষণে ধুলোর শয্যা থেকে উঠে পড়ে কাঁপছে!তার দিকে তাকিয়ে সোম শুধু একটা কথাই বলে উঠল
- যা! পরীক্ষা হলে যা! আর ত্রিশ মিনিট বাকি! আমি আসছি!
বলেই আদিত্যর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল! আদিত্য কিছু বোঝার আগেই তার বাঁ হাত ধরে শূন্যে বেঁকিয়ে ধরেই পিছন দিকে ঘুরিয়ে দিল সোম! একটা মৃদু খট আওয়াজের সাথে একটা তীব্র আর্তচিৎকার পরীক্ষার নিস্তব্ধ পরিবেশ। খানখান করে ছড়িয়ে পড়ল চত্বরের কোণে! অবন্তী ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দেখতে পেল কয়েকটা সিভিক প্রাণপণে দৌড়ে আসছে তাদের দিকে! সোমের দিকে তাকাল সে! মনে হল সোম তার দিকে একবার করুণ হাসি হাসছে! আচমকা তার সামনে গোটা পৃথিবী দুলে উঠল! ব্যস! আর কিছু মনে নেই তার.......।
*********************************************************************
# পর্ব-৭
আচমকা একটা ঝাঁকুনিতে তন্দ্রার মতন ঘোর টা কেটে যায় অবন্তীর! আধো ঘুম জাগরণের মধ্যে অনুভব করে তাকে ঘিরে হলুদ নীল আলোগুলো যেন চারপাশে খেলা করে বেড়াচ্ছে! চারপাশ থেকে অনেক মানুষের গুঞ্জন ভেসে আসছে!
- মা! মা রে! ওঠ মা!
আচমকা একটা পরিচিত কন্ঠস্বরে তন্দ্রার জাল টা আস্তে আস্তে কাটতে থাকে! সাথে সে এটা ও টের পায় সারা শরীরে এবং মাথার পিছনে অসহ্য যন্ত্রণা!
আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখতে পায় পিতাকে! বৃদ্ধ তার দিকে কাকুতি ভরা দৃষ্টিতে আতংকের সাথে চেয়ে আছে! অবন্তী এদিক ওদিক তাকিয়ে সোম কে কোথাও দেখতে পেলনা!
- কি রে মা! ঠিক আছিস তো?! বৃদ্ধর গলা সামান্য কেঁপে যায় যেন!
- হ্যাঁ বাবা! কিন্তু সোম....! ও কে দেখছি না কেন?!
বৃদ্ধ চুপ করে যায়! অবন্তীর অসহ্য লাগে এই নীরবতা! মনে হয় গলা ফাটিয়ে ডাকে তার সোমকে! উঠতে চেষ্টা করতেই এক নার্স আর উলটো দিকে থাকা উর্দি পরা একটা পুলিশের লোক অবন্তীকে শুইয়ে দেয় বেডে! পুলিশটি বলে ওঠে
- একটু বিশ্রাম নাও। তোমার শরীরের অবস্থা ভাল নয়!
- কিন্তু কাকু সোম কই! ও না থাকলে আমার বাঁচার কোন রাস্তা ছিলনা! গলাটা কেঁপে গেল অবন্তীর!
পুলিশ অফিসার টাও নীরব হয়ে গেল! অবন্তী চিৎকার করে ওঠে
- সো ও ও ও ও ম!
- ও পুলিশ কাস্টডি তে আছে! জামিন অযোগ্য কেস জারি করা হয়েছে! একটা মার্ডার আর এক জনকে মারাত্মক জখম করার অপরাধে...!
তারপর একটু নীরব থেকে পুলিশ অফিসার টি বলেন- যে ছেলেটি জখম হয়েছে জান সে কে?
বিহ্বল অবন্তী দুই দিকে মাথা নাড়ায় সে চেনে না! চোখ দিয়ে নোনা জলের ধারা বয়ে যায়!
-সুরজ সিংহানিয়ার ছেলে আদিত্য সিংহানিয়া! এই এলাকার ধনকুবের! সবকিছুকে হাতের মুঠোয় পুরে রেখেছে!
অবন্তী লক্ষ্য করল শেষ কথাটা বলার সময় অফিসারের চোখ দুটো যেন বাঘের মত জ্বলে উঠল!
- কিন্তু কাকু ওরা তো আমাকে বাঁচতে দিতনা! সোম না থাকলে....
- জানিরে মা! পুলিশ অফিসার টা আচমকাই অবন্তীর বেডের পাশে বসে পড়ে! অবন্তী অবাক হয়ে চেয়ে দেখে অফিসার টার বর্ম ভেদ করে পেঁয়াজের খোসার মত একের পর এক পরত খুলে পড়ছে!
- আমারো ঠিক তোমার বয়সী একটা মেয়ে ছিল! জানোয়ার টা.......বলতে বলতে তার হাত চলে যায় কোমরে বাঁধা নাইন এম এম টা র দিকে! পরক্ষণেই সামলে নেয়! অশ্রুভেজা কন্ঠে অবন্তীর দিকে ফিরে বলে ওঠে
- প্রমাণের অভাবে জানোয়ার টাকে ফাটকে দিতে পারলাম না! গোটা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কে নিজের পকেটে এনে রেখেছে কুকুর টা! এখন দুনিয়ায় টাকাই শেষ কথা বলেরে মা!
- সোম ও এই কথাই বলত কাকু!
অফিসার টা একটু চমকে গেল! তারপর সটান উঠে দাঁড়িয়ে মাথায় টুপি দিয়ে বলে উঠল - তুমি কিছু চিন্তা কোরোনা! সোম কে আমি বের করে আনবই! বলে আর এক মূহুর্ত সেখানে দাঁড়ালেন না! ভারী জুতোর আওয়াজ তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন! অবন্তী সেদিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে হতভম্ব বৃদ্ধকে শুধায় - বাবা! সোম কি আবার আসবে আমাদের বাড়ী??
আচমকা বৃদ্ধ মেয়েকে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন- জানি না রে মা! কিছু জানি না! ঈশ্বর সহায় হোন!
(চলবে)
********************************************************************************************************
পর্ব-৮
শিরা ওঠা পেশীবহুল হাতে ধরা নাইন এম.এম টার দিকে নীলাভ দুটি চোখ মেলে অপলক দৃষ্টিতে চেয়েছিল মাথায় লাল ফেটি বাঁধা বলিষ্ঠ যুবকটি! পরক্ষণেই ঠোঁটের আড়াল থেকে লুকিয়ে রাখা গুটখার পিক টা প্রবল আক্রোশে পাশের ঝোপের উপর নিক্ষেপ করে! কি দোষ ছিল তার??? পিঠে তেল মাখানো বাঁশের বাড়ি গুলো এখনো দগদগে হয়ে জ্বলে তার মনে! মনে পড়ে অসমাপ্ত অঙ্ক গুলো সে অনায়াসে ছেড়ে দিয়ে এসেছিল শুধু একটি ষোড়শী কিশোরী কে কয়েকটি হায়েনার কবল থেকে উদ্ধার করার জন্য! সমাজ তাকে বুঝলো না! কারাগারের অন্ধকারে নিক্ষেপ করার সময়ে কেউ তার পাশে একটু এগিয়ে এলনা! না! সে ভুল ভাবছে! এগিয়ে এসেছিল একজন! পুলিশের উর্দিপরা একজন অফিসার! অনেক চেষ্টা করেছিল তাকে আইনের প্যাঁচ থেকে বাঁচাবার! কিন্তু সমস্ত এভিডেন্স তার বিপক্ষে! অবাক চোখে দেখেছিল তার যাবজ্জীবন ঘোষণার সাথে সাথেই পুলিশ অফিসার টা কেমন যেন আদালত চত্বরেই বসে পড়েছিল টুপি টা পাশে রেখে! আরেক জোড়া চোখ সে দেখেছিল তাকে অপলক দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছিল! চিনতে অসুবিধা হয়নি তার! অবন্তী কে চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয় তার! ভরা আদালতে সবার সামনে সোমকে চড়ের পর চড় মারতে মারতে পাগলিনী র মত কাঁদছিল! না! সোম নিজেকে বাঁচায় নি! এক অবুঝ কিশোরীর ভালোবাসা তার নরম হাতের চপোটাঘাতের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিল সে! কেটে গেছে সুদীর্ঘ পনেরোটি বছর!
কারাগারের ওপাশের অন্ধকারে সে প্রায়ই লক্ষ করত রোজই এক কোট প্যান্ট পরা চোখে সানগ্লাস পরা এক ব্যাক্তি সান্ত্রীদের সাথে কি একটা গোপন আলোচনা করত! তারপর ই বিহ্বল চোখে দেখত সান্ত্রী গুলো সোমকে উপরে বাঁশের সাথে বেঁধে বেধড়ক মারত! জেনেছিল লোকটির নাম সুরজ সিংহানিয়া! প্রভাবশালী লোক! অবন্তীকে সে একবারো দেখেনি জেলে! শুধু বাইরে একটা মেয়ের তীব্র আর্ত চিৎকার শুনেছিল সে একদিন! জেলের কঠিন নিরেট স্তর ভেদ করে অতটা তার কানে না পৌঁছালেও পরে এক সহৃদয় সান্ত্রীর কাছে শুনেছিল এক বৃদ্ধ আর তার মেয়েকে জেলের বাইরে দরজা থেকেই কুকুরের মত তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে! রাগে তার সমস্ত গা টা রি রি করে উঠেছিল সে দিন! অবন্তীর মুখটা মনে পড়তেই বুকের বাঁ দিক টা চিন চিন করে ওঠে তার! মেয়েটা যেন আজকাল তাকে প্রায় ভুলে ই গিয়েছে! মাষ্টারমশাই ও তাকে ঘেন্নার চোখে দেখে আজকাল! সেদিন তো বলেই দিল তাকে গুন্ডাদের কোন জাত হয় না! সে যেন তাদের বাড়িতে আর না আসে! গলার কাছে একটা দমবন্ধ করা কষ্ট সেদিন উঠে এসেছিল! ঘুরে ফিরে আসছিল আচমকা থমকে দাঁড়িয়েছিল সে! জানলার কাছে স্পষ্ট দেখেছিল অবন্তী কাঁদছে! আর দাঁড়ায়নি! বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে অন্ধকারে মিশে গিয়েছিল সে! যাওয়ার আগে আরো একটা জিনিষ সে ভালো ভাবে দেখতে পেয়েছিল! অবন্তীর হাতে ধরা ছিল তার জন্য রাতের খাবারের থালা!.......
- সোম...!এই সোম! কি ভাবছিস?
আচমকা কার কন্ঠস্বরে সোমের চিন্তাজাল ছিঁড়ে যায়! দেখে লাল্টু দা পাশে দাওয়ায় এসে বসেছে!
- ওহ সরি!
- কি রে কি ভাবছিলি! আর মেশিন টা ওভাবে রাস্তার পাশে বসে বের করেছিস কেন? লোকে দেখলে কি ভাববে?
- গুন্ডা! বদমাশ! লোফার! আর কি ভাবতে পারে লাল্টু দা!
- আর পাক্কা গান্ডু ভাবতে পারে লোকে! ইডিয়ট! ইলেকশনের বাজার! হাওয়া গরম! তুই আর গরম করিস নে বাপ! ওটা কোমরে ঢোকা! প্রণব দা ডাকছেন! চল!
নামটা শোনার সাথে স্নায়ু টানটান হয়ে গেল সোমের! জেল থেকেই বেরিয়েই লাল্টু দা হাত ধরে নিয়ে গেছিল সোমকে প্রণব দার কাছে! বুঝেছিল রাজনীতির গরম খেলা! এখানেও অঙ্ক আছে! সামান্য ভুলচুকে জান পর্যন্ত চলে যেতে পারে! প্রণবদা প্রথম দিনই সোমকে মাথায় হাত বুলিয়ে একটা অদ্ভুত কথা জিজ্ঞেস করেছিল
- তুই গুলি খেতে পারবি? কটা?
এরকম অদ্ভুত প্রশ্নে মাথা নীচের দিকে হেঁট হয়ে গেছিল সোমের! জবাব দিতে পারেনি! প্রণবদা উঠে এসে সোমের দুই হাতের আঁজলায় নিয়ে বলেছিল
- শোন! এই লাইনে আসতে হলে গুলি তোকে খেতেই হবে! তবে যতগুলো খাবি তার দ্বিগুণ ফেরত দিয়ে তবে মরবি! নাহলে এই লাইনে আসিস না!
বুকটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠেছিল সোমের! লাল্টুদা পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠেছিল - ভয় নেই তোর! আমি আছি! হ্যাঁ করে দে!
তারপরই প্রণবদা নিজের কোমরের পেছন থেকে নাইন এম এম তা বের করে তার হাতে দিয়ে বলেছিল- নে রাখ! দুনিয়া তোর বশে আসবে!
- কি রে! চল! আর কত বেলা করবি?
আচমকা লাল্টুদার কন্ঠস্বরে এলোমেলো চিন্তার মেঘগুলো কেটে যায়! দাঁড় করানো বাইক টাতে বসে স্টার্ট দিতেই পাশ দিয়ে এক রিক্সা হর্ণ দিতে দিতে বেরিয়ে যায়! কিন্তু সোমের সিক্সথ সেন্স জানান দেয় একজোড়া চোখ তার দিকে তাকাতে তাকাতে যাচ্ছে যেন! এক বৃদ্ধ মত লোকের পাশে বসে থাকা এক তন্বীর লাল ওড়না টুকু উড়তে থাকে সোমের মনকে ব্যাকুল করে দিয়ে!....
***************************************************************************************************
পর্ব_৯
আচমকা একটা ঝাঁকুনিতে তন্দ্রার মতন ঘোর টা কেটে যায় অবন্তীর! আধো ঘুম জাগরণের মধ্যে অনুভব করে তাকে ঘিরে হলুদ নীল আলোগুলো যেন চারপাশে খেলা করে বেড়াচ্ছে! চারপাশ থেকে অনেক মানুষের গুঞ্জন ভেসে আসছে!
- মা! মা রে! ওঠ মা!
আচমকা একটা পরিচিত কন্ঠস্বরে তন্দ্রার জাল টা আস্তে আস্তে কাটতে থাকে! সাথে সে এটা ও টের পায় সারা শরীরে এবং মাথার পিছনে অসহ্য যন্ত্রণা!
আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখতে পায় পিতাকে! বৃদ্ধ তার দিকে কাকুতি ভরা দৃষ্টিতে আতংকের সাথে চেয়ে আছে! অবন্তী এদিক ওদিক তাকিয়ে সোম কে কোথাও দেখতে পেলনা!
- কি রে মা! ঠিক আছিস তো?! বৃদ্ধর গলা সামান্য কেঁপে যায় যেন!
- হ্যাঁ বাবা! কিন্তু সোম....! ও কে দেখছি না কেন?!
বৃদ্ধ চুপ করে যায়! অবন্তীর অসহ্য লাগে এই নীরবতা! মনে হয় গলা ফাটিয়ে ডাকে তার সোমকে! উঠতে চেষ্টা করতেই এক নার্স আর উলটো দিকে থাকা উর্দি পরা একটা পুলিশের লোক অবন্তীকে শুইয়ে দেয় বেডে! পুলিশটি বলে ওঠে
- একটু বিশ্রাম নাও। তোমার শরীরের অবস্থা ভাল নয়!
- কিন্তু কাকু সোম কই! ও না থাকলে আমার বাঁচার কোন রাস্তা ছিলনা! গলাটা কেঁপে গেল অবন্তীর!
পুলিশ অফিসার টাও নীরব হয়ে গেল! অবন্তী চিৎকার করে ওঠে
- সো ও ও ও ও ম!
- ও পুলিশ কাস্টডি তে আছে! জামিন অযোগ্য কেস জারি করা হয়েছে! একটা মার্ডার আর এক জনকে মারাত্মক জখম করার অপরাধে...!
তারপর একটু নীরব থেকে পুলিশ অফিসার টি বলেন- যে ছেলেটি জখম হয়েছে জান সে কে?
বিহ্বল অবন্তী দুই দিকে মাথা নাড়ায় সে চেনে না! চোখ দিয়ে নোনা জলের ধারা বয়ে যায়!
-সুরজ সিংহানিয়ার ছেলে আদিত্য সিংহানিয়া! এই এলাকার ধনকুবের! সবকিছুকে হাতের মুঠোয় পুরে রেখেছে!
অবন্তী লক্ষ্য করল শেষ কথাটা বলার সময় অফিসারের চোখ দুটো যেন বাঘের মত জ্বলে উঠল!
- কিন্তু কাকু ওরা তো আমাকে বাঁচতে দিতনা! সোম না থাকলে....
- জানিরে মা! পুলিশ অফিসার টা আচমকাই অবন্তীর বেডের পাশে বসে পড়ে! অবন্তী অবাক হয়ে চেয়ে দেখে অফিসার টার বর্ম ভেদ করে পেঁয়াজের খোসার মত একের পর এক পরত খুলে পড়ছে!
- আমারো ঠিক তোমার বয়সী একটা মেয়ে ছিল! জানোয়ার টা.......বলতে বলতে তার হাত চলে যায় কোমরে বাঁধা নাইন এম এম টা র দিকে! পরক্ষণেই সামলে নেয়! অশ্রুভেজা কন্ঠে অবন্তীর দিকে ফিরে বলে ওঠে
- প্রমাণের অভাবে জানোয়ার টাকে ফাটকে দিতে পারলাম না! গোটা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কে নিজের পকেটে এনে রেখেছে কুকুর টা! এখন দুনিয়ায় টাকাই শেষ কথা বলেরে মা!
- সোম ও এই কথাই বলত কাকু!
অফিসার টা একটু চমকে গেল! তারপর সটান উঠে দাঁড়িয়ে মাথায় টুপি দিয়ে বলে উঠল - তুমি কিছু চিন্তা কোরোনা! সোম কে আমি বের করে আনবই! বলে আর এক মূহুর্ত সেখানে দাঁড়ালেন না! ভারী জুতোর আওয়াজ তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন! অবন্তী সেদিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে হতভম্ব বৃদ্ধকে শুধায় - বাবা! সোম কি আবার আসবে আমাদের বাড়ী??
আচমকা বৃদ্ধ মেয়েকে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন- জানি না রে মা! কিছু জানি না! ঈশ্বর সহায় হোন!
(চলবে)
********************************************************************************************************
পর্ব-৮
শিরা ওঠা পেশীবহুল হাতে ধরা নাইন এম.এম টার দিকে নীলাভ দুটি চোখ মেলে অপলক দৃষ্টিতে চেয়েছিল মাথায় লাল ফেটি বাঁধা বলিষ্ঠ যুবকটি! পরক্ষণেই ঠোঁটের আড়াল থেকে লুকিয়ে রাখা গুটখার পিক টা প্রবল আক্রোশে পাশের ঝোপের উপর নিক্ষেপ করে! কি দোষ ছিল তার??? পিঠে তেল মাখানো বাঁশের বাড়ি গুলো এখনো দগদগে হয়ে জ্বলে তার মনে! মনে পড়ে অসমাপ্ত অঙ্ক গুলো সে অনায়াসে ছেড়ে দিয়ে এসেছিল শুধু একটি ষোড়শী কিশোরী কে কয়েকটি হায়েনার কবল থেকে উদ্ধার করার জন্য! সমাজ তাকে বুঝলো না! কারাগারের অন্ধকারে নিক্ষেপ করার সময়ে কেউ তার পাশে একটু এগিয়ে এলনা! না! সে ভুল ভাবছে! এগিয়ে এসেছিল একজন! পুলিশের উর্দিপরা একজন অফিসার! অনেক চেষ্টা করেছিল তাকে আইনের প্যাঁচ থেকে বাঁচাবার! কিন্তু সমস্ত এভিডেন্স তার বিপক্ষে! অবাক চোখে দেখেছিল তার যাবজ্জীবন ঘোষণার সাথে সাথেই পুলিশ অফিসার টা কেমন যেন আদালত চত্বরেই বসে পড়েছিল টুপি টা পাশে রেখে! আরেক জোড়া চোখ সে দেখেছিল তাকে অপলক দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছিল! চিনতে অসুবিধা হয়নি তার! অবন্তী কে চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয় তার! ভরা আদালতে সবার সামনে সোমকে চড়ের পর চড় মারতে মারতে পাগলিনী র মত কাঁদছিল! না! সোম নিজেকে বাঁচায় নি! এক অবুঝ কিশোরীর ভালোবাসা তার নরম হাতের চপোটাঘাতের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিল সে! কেটে গেছে সুদীর্ঘ পনেরোটি বছর!
কারাগারের ওপাশের অন্ধকারে সে প্রায়ই লক্ষ করত রোজই এক কোট প্যান্ট পরা চোখে সানগ্লাস পরা এক ব্যাক্তি সান্ত্রীদের সাথে কি একটা গোপন আলোচনা করত! তারপর ই বিহ্বল চোখে দেখত সান্ত্রী গুলো সোমকে উপরে বাঁশের সাথে বেঁধে বেধড়ক মারত! জেনেছিল লোকটির নাম সুরজ সিংহানিয়া! প্রভাবশালী লোক! অবন্তীকে সে একবারো দেখেনি জেলে! শুধু বাইরে একটা মেয়ের তীব্র আর্ত চিৎকার শুনেছিল সে একদিন! জেলের কঠিন নিরেট স্তর ভেদ করে অতটা তার কানে না পৌঁছালেও পরে এক সহৃদয় সান্ত্রীর কাছে শুনেছিল এক বৃদ্ধ আর তার মেয়েকে জেলের বাইরে দরজা থেকেই কুকুরের মত তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে! রাগে তার সমস্ত গা টা রি রি করে উঠেছিল সে দিন! অবন্তীর মুখটা মনে পড়তেই বুকের বাঁ দিক টা চিন চিন করে ওঠে তার! মেয়েটা যেন আজকাল তাকে প্রায় ভুলে ই গিয়েছে! মাষ্টারমশাই ও তাকে ঘেন্নার চোখে দেখে আজকাল! সেদিন তো বলেই দিল তাকে গুন্ডাদের কোন জাত হয় না! সে যেন তাদের বাড়িতে আর না আসে! গলার কাছে একটা দমবন্ধ করা কষ্ট সেদিন উঠে এসেছিল! ঘুরে ফিরে আসছিল আচমকা থমকে দাঁড়িয়েছিল সে! জানলার কাছে স্পষ্ট দেখেছিল অবন্তী কাঁদছে! আর দাঁড়ায়নি! বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে অন্ধকারে মিশে গিয়েছিল সে! যাওয়ার আগে আরো একটা জিনিষ সে ভালো ভাবে দেখতে পেয়েছিল! অবন্তীর হাতে ধরা ছিল তার জন্য রাতের খাবারের থালা!.......
- সোম...!এই সোম! কি ভাবছিস?
আচমকা কার কন্ঠস্বরে সোমের চিন্তাজাল ছিঁড়ে যায়! দেখে লাল্টু দা পাশে দাওয়ায় এসে বসেছে!
- ওহ সরি!
- কি রে কি ভাবছিলি! আর মেশিন টা ওভাবে রাস্তার পাশে বসে বের করেছিস কেন? লোকে দেখলে কি ভাববে?
- গুন্ডা! বদমাশ! লোফার! আর কি ভাবতে পারে লাল্টু দা!
- আর পাক্কা গান্ডু ভাবতে পারে লোকে! ইডিয়ট! ইলেকশনের বাজার! হাওয়া গরম! তুই আর গরম করিস নে বাপ! ওটা কোমরে ঢোকা! প্রণব দা ডাকছেন! চল!
নামটা শোনার সাথে স্নায়ু টানটান হয়ে গেল সোমের! জেল থেকেই বেরিয়েই লাল্টু দা হাত ধরে নিয়ে গেছিল সোমকে প্রণব দার কাছে! বুঝেছিল রাজনীতির গরম খেলা! এখানেও অঙ্ক আছে! সামান্য ভুলচুকে জান পর্যন্ত চলে যেতে পারে! প্রণবদা প্রথম দিনই সোমকে মাথায় হাত বুলিয়ে একটা অদ্ভুত কথা জিজ্ঞেস করেছিল
- তুই গুলি খেতে পারবি? কটা?
এরকম অদ্ভুত প্রশ্নে মাথা নীচের দিকে হেঁট হয়ে গেছিল সোমের! জবাব দিতে পারেনি! প্রণবদা উঠে এসে সোমের দুই হাতের আঁজলায় নিয়ে বলেছিল
- শোন! এই লাইনে আসতে হলে গুলি তোকে খেতেই হবে! তবে যতগুলো খাবি তার দ্বিগুণ ফেরত দিয়ে তবে মরবি! নাহলে এই লাইনে আসিস না!
বুকটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠেছিল সোমের! লাল্টুদা পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠেছিল - ভয় নেই তোর! আমি আছি! হ্যাঁ করে দে!
তারপরই প্রণবদা নিজের কোমরের পেছন থেকে নাইন এম এম তা বের করে তার হাতে দিয়ে বলেছিল- নে রাখ! দুনিয়া তোর বশে আসবে!
- কি রে! চল! আর কত বেলা করবি?
আচমকা লাল্টুদার কন্ঠস্বরে এলোমেলো চিন্তার মেঘগুলো কেটে যায়! দাঁড় করানো বাইক টাতে বসে স্টার্ট দিতেই পাশ দিয়ে এক রিক্সা হর্ণ দিতে দিতে বেরিয়ে যায়! কিন্তু সোমের সিক্সথ সেন্স জানান দেয় একজোড়া চোখ তার দিকে তাকাতে তাকাতে যাচ্ছে যেন! এক বৃদ্ধ মত লোকের পাশে বসে থাকা এক তন্বীর লাল ওড়না টুকু উড়তে থাকে সোমের মনকে ব্যাকুল করে দিয়ে!....
***************************************************************************************************
পর্ব_৯
বাইক টা একটা দোতলা বাড়ির নীচে স্ট্যান্ড করতেই ভিতর থেকে উত্তপ্ত বাদানুবাদ সোমের কানে এল! প্রণব দার চিৎকার মাঝে মাঝে কানে ভেসে আসছে! কাকে যেন ধমকাচ্ছে খুব! লাল্টু দা পিছন থেকে সোমের কাঁধে হাত রেখে একটা ছোট্ট শব্দ বলল- চল!
- প্রণব দা আবার চেঁচাচ্ছেন কেন? কিছুটা হতভম্বের মতই জিজ্ঞেস করে সোম!
- জানি না রে! দাদার মুড যে কখন বিগড়ায়! আয় দেখি!
দুজনে বিশাল হলঘরটায় ঢুকে একটু তাজ্জব হয়ে গেল! প্রণব দা কে ঘিরে কয়েক জন শক্ত সমর্থ যুবক রা দাঁড়িয়ে রয়েছে! একটু তফাতে দুজন দাঁড়িয়ে আতংকে কেঁপেই চলেছে! মুখগুলো ঠিক ঠাহর করতে পারল না সোম! কিন্তু মনটায় কেমন যেন কু ডাকতে লাগল!
শুনতে পেল প্রণব দা বলছেন
- শুনুন মশাই! আপনার নাকি কান্না শোনার সময় বা সহ্য কোনটাই আমার নেই! ইলেকশন সামনে! পার্টির কর্মসূচী অনেক ব্যাপ্ত হয়েছে! একটা নতুন পার্টি অফিস না হলে নতুন ছেলে মেয়েদের সামলানো দায়! কত দাম হবে আপনার ঘর বাড়ির? দশ লাখ? বার লাখ? আপনাকে আমি কুড়ি লাখ দেব! প্লিজ এই এগ্রিমেন্টে সই করুন!
- বাবা! এই বৃদ্ধ বয়সে মেয়ে নিয়ে কোথায় যাব? দিনকাল ভাল নয়!
সোমের সামনে গোটা পৃথিবী টা যেন টাল খেয়ে গেল! এই গলার স্বর তো আর কারুর নয়.....এ তো... আর ভাবতে পারে না সে! ভিড় সরিয়ে সামনের দিকে এগোতেই সে শুনল প্রণব দা বলছেন
- আরে মাষ্টার মশাই খামোকা চাপ নিচ্ছেন! আমার পার্টির ছেলেরা আপনাকে প্রোটেকশন দেবে! শুধু একটা সই ব্যাস!
সোম ততক্ষণে প্রণব দার পাশে পৌঁছে গেছে! অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে সামনে শ্যামল স্যর আর অবন্তী কে! অবন্তীর মুখ টা একদম ভয়ে শুকিয়ে গেছে! জোর করেই সোম জিজ্ঞেস করে বসল
- কি হয়েছে প্রণব দা?
- ওহ সোমু! এসে গেছিস? দাঁড়া তোকে একটা জিনিষ বলছি তার আগে এদের হিল্লে করে নি!
শেষ কথাটা তীরের মত বুকে বিঁধল! আড় চোখে তাকিয়ে দেখে অবন্তীর বুকের ওড়না টা সরে গিয়ে বুকের ওঠানামা পার্টির বাকি ছেলে গুলো হাঁ করে গিলছে! অসহ্য মনে হল সোমের! আস্তে আস্তে অবন্তী কে আড়াল করে দাঁড়াল সে! তার চওড়া কাঁধের উপর দুটি ভীরু নরম চোখ মিট মিট করতে লাগল উৎকন্ঠায়!
- বলছিলাম কি দাদা! পার্টি অফিসের জন্য প্রচুর জায়গা খালি পড়ে রয়েছে! সেগুলোর একটা দেখে নিলেই.....
- কোথায় সই করতে হবে দাও!.....বৃদ্ধ কাউকে আর দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না! হাত বাড়ায় প্রণবের দিকে! চোয়াল আস্তে আস্তে কঠিন হতে থাকে!
- কিন্তু স্যর...... সোম হতবাক চোখে বৃদ্ধর চোখের দিকে তাকায়!
- আমি কোন গুণ্ডা মানুষ করার দায় নিয়ে পৃথিবীতে আসিনি! শিক্ষার অপমান করো না!
সোমের মনের হল তার হৃদপিন্ডে কে যেন জ্বলন্ত ডিজেল ঢেলে দিল! সাথে সাথে টের পেল পিছন থেকে একটা নরম হাত তার জামার পিছন টা খামচে ধরছে!
- স্যর আমি এ হতে দেব না!... একটা শেষ চেষ্টা করে সোম! আপনার বাসাবাড়ি বিক্রি হয়ে যাবে আমার চোখের সামনে আমি মেনে নিতে পারব না! ওই বাড়ির বারান্দায় কত রাত আপনার কাছে অংক শিখেছি....
- আমার ছেলে বেঁচে ছিল! এখন মরে গেছে! প্রণব এগ্রিমেন্ট দাও! কাল সকালে দিয়ে যাব! আয় মা!
বৃদ্ধ কাগজ খানি চিলের মত ছোঁ মেরে অবন্তীর হাতখানি ধরে টানতে টানতে ঘর হতে বেরিয়ে যায়! অবন্তীর শক্ত হাতে ধরে রাখা সোমের জামার কলারে টান লেগে কয়েকটা বোতাম ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে!
- কি রে সোমু!! হাঃ হাঃ! আজকাল।ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাচ্ছিস নাকি রে!
বলেই আবার পৈশাচিক হাসি হাসতে লাগল!
আচমকা সোম প্রণব দার পা দুটো জড়িয়ে ধরে আচমকা ব্যাকুল গলায় বলে উঠল
- দাদা এদের দুজনকে তুমি ছেড়ে দাও! কথা দিচ্ছি আমি তোমাকে নতুন জমির খোঁজ এনে দিচ্ছি দুই ঘন্টার ভিতর উইথ এগ্রিমেন্ট! কিন্তু দাদা প্লিজ....
- পা ছাড়! সোম তোর মতি ভ্রম হচ্ছে! পার্টির কাজে বাধা দিচ্ছিস! দাদার মুখের উপর কথা বলছিস...!
- দাদা আমি আপনার বিরুদ্ধাচার করতে চাইনি! কিন্তু......
- কিন্তু? কি......
- দাদা......
- হ্যা বল.....লুকাস না বল!
- অবন্তী.....!
- কে ওই মেয়েটা.....?
- ওকে আমি ভালবাসি দাদা....!
-কিঃ!! আহ হাঃ হাঃ হাঃ! ভালোবাসিস?? হা হা হা!
প্রণবের পৈশাচিক হাসির জবাবে সোম চুপচাপ মেঝের দিকে নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে!
- শোন! এই লাইনে ভালোবাসা হয় না রে পাগল! তুই আমি একদিন না একদিন ঠিক শেষ হয়ে যাব! ভালোবাসতে গেলে আগে টিঁকে থাকতে হয়!
- আমি কি টিঁকে থাকব না দাদা! ব্যাকুল ভাবে জিজ্ঞেস করে সোম!
প্রণব দা ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান! সোমকে ধরে উঠিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে হাত বুলিয়ে অস্ফুটে বলে ওঠেন- না....! তুই আমি কেউ থাকব না! এ বড় অনিশ্চিত জীবন রে!
সোম কেমন যেন দমে যায়! কিছু কি আঁচ করতে পারছেন রাজনীতির পোড় খাওয়া মানুষ টা? গোটা ঘর টাকে আস্তে আস্তে গ্রাস করছে মৃত্যু নৈঃশব্দ্য!
********************************************************************
# পর্ব_১০
বাইক টা স্টার্ট দিয়েই আচমকা সোমের মনে পড়ল, আরে! আজ তো মেয়েটার জন্মদিন না?! অবন্তী আলুকাবলি খেতে ভালোবাসত খুব! একদিন হাত ধরে ফেলেছিল তার....! জিজ্ঞেস করেছিল মেয়েটিকে- হ্যাঁ রে! তুই তো যা খেতে চাস আমাকে বলিস! আমার খিদে লাগলে কাকে বলব রে! মেয়েটি লাজুক চোখে একবার তাকিয়েছিল সোমের দিকে! তারপর রিনরিনে গলায় বলে উঠেছিল
- কেন? আমাকে বিয়ে করে নে! তোকে রান্না করে খাওয়াব!
- কি রে! চল! আচমকা লাল্টুদার গলার আওয়াজে চটক ভাঙে সোমের! তড়িঘড়ি বলে ওঠে
- লাল্টু দা আমি একটু অন্য জায়গায় যাচ্ছি কাজ আছে!
- মাষ্টারের বাড়ি! বলেই লাল্টু দা মুচকি হাসল!
- সবই তো জানো!
- সাবধানে যা! পিস্তল টা সামলে....
সোম একবার পিছনের বেল্ট স্পর্শ করে দেখে নেয় মেশিন টা যথাস্থানে আসে কি না! তারপর করুণ হেসে বলে
- না থাকলে আর কি! মুখে ধুনো জ্বেলে দিও দা!
- সেই!.... লাল্টুদার দীর্ঘশ্বাসের সাথে বাইকের ঘট ঘট আওয়াজ খানি রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যায় ক্রমশ!
*********************************************************************
শ্যামল স্যারের বাড়ির ঢোকার মুখের গলিটা আজ অস্বাভাবিক রকম অন্ধকার! পাড়ার কুকুর গুলোও সোমকে ঢুকতে দেখে এগিয়ে এলনা! তারাও যেন অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়েছে!
সোমের মত ডাকাবুকো ছেলের ও কেমন যেন অস্বস্তিকর ঠেকছিল পরিবেশ টা! কিছু একটা হতে চলেছে! আচমকা সোমের সিক্সথ সেন্স সজাগ হয়ে উঠল! তার মনে হল স্যারের বাড়ির পিছন দিকের দরজার দিকে কয়েকটি ছায়ার আনাগোনা চোখে পড়ছে যেন!.......
সোমের হাতখানি আপনা থেকেই জামার পিছন দিকে গোঁজা ধাতব ঠান্ডা জিনিষ টার দিকে চলে গেল! আরেকটু এগোতেই অন্ধকার টা একটু ফিকে হয়ে এল! দেখতে পেল কয়েকটা অচেনা মুখ নিজেদের মধ্যে কি সব আলোচনা করছে! নিজেকে যথাসম্ভব অন্ধকারের সাথে মিশিয়ে দিল সোম! কান খাড়া করে শুনতে পেল কয়েকটি উড়ে আসা কথাবার্তা
- শালা বুড়ো কি খচ্চর মাইরি! দাদা এত করে বলল কিছুতেই রাজি হল না?!
- প্রণব টা বুড়ো টাকে ঠিক টুপি পড়িয়ে জমিটা আদায় করে নিল! আমাদের কুড়িলাখের দাম টা এবার মেটাতে হবে ঠিকঠাক! মেয়েটাকে তুলতে হবে!
সোমের স্নায়ু আচমকা টানটান হয়ে ওঠে শেষের এই কথাতে! কারা এরা? এরা যে স্যরের ভালো চায় না তা এদের কথাবার্তা শুনেই পরিষ্কার! এরা তাদের পার্টির কেউ নয়! তাহলে? সুরজের দলের লোক নাকি? ভাবতেই মাথাটা কিরকম ঝিমঝিম করে উঠল! মনে পড়ে যাচ্ছিল বহুদিন আগের পরীক্ষার সেই অভিশপ্ত দুপুরের কথা! সেদিন ও অবন্তী কে কয়েক টি হিংস্র শ্বাপদের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে জীবনের গতিপথ টাই আমূল পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে! বিধাতা আজও তার সামনে এক চরম পরীক্ষা টেনে এনে হাজির করেছে! আচমকা গলির মুখটায় একটা ইনোভা এসে দাঁড়াল নিঃশব্দে! গাড়ির দরজাটা খুলে নিঃশব্দে! ভিতর থেকে দীর্ঘদেহী একটা ছায়াশরীর বেরিয়ে এসে অন্ধকারে মিশে গেল! সোমের স্নায়ু আরেকবার টানটান হয়ে গেল! অন্ধকারে মিশে থাকা দলটার মধ্যে একটা চাঞ্চল্য পড়ে গেল! হাওয়ার শিষ কেটে একটা আওয়াজ ভেসে এল সোমের কানে- বস আ গিয়া!
সোমের মনে হল পরীক্ষার ঘড়ি যেন আচমকা দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করেছে! নাহ! আর সময় নষ্ট করা ঠিক হবেনা! মাষ্টারমশাই তাকে যে চোখেই দেখুন না কেন সে তাদের আজো আগের মতই ভালবাসে! তার সামাজিক অবস্থান বদলে গিয়েছে! ভালবাসা তো বদলায়নি একটুও! পিছন থেকে ধাতব মেশিন টা বের করে নলটায় সাইলেন্সার লাগাতে শুরু করল সে! সবকটাকে নিকেশ করে ছাড়বে সে! অন্ধকার যেন আরো ঘন হয়ে ঘিরে ধরছে তাকে! অন্ধকারের মধ্যেই ম্যাগাজিন টা পরখ করে নিল সে! ফুল লোডেড! আচমকা দেখল দলেরই একজন তার মাত্র দুই হাত তফাতে দাঁড়িয়ে আছে! প্রস্রাব করবে হয়ত! আর দেরী করল না সে! হিংস্র বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ঘাড় টা বাঁ পায়ের ভাঁজের মধ্যে নিয়ে নিল সে! তারপরেই একটু হালকা চাপ! মট করে আওয়াজের সাথে সাথেই একটা দেহের ছটফটানি অন্ধকারে স্তিমিত হয়ে গেল! আস্তে আস্তে সোম সাইলেন্সারটা বাঁ পায়ের ভাঁজে আটকে থাকা বডিটার কপালে ঠেকিয়ে ট্রিগার চালিয়ে দেয়! বাতাসের শিসের সাথে কিছু তরল পদার্থ সোমের মুখে ছিটকে লাগে!
- একটা গেল! সাপের মত হিসহিসিয়ে উঠল! আচমকা দরজা খোলার আওয়াজে চমকে গেল সোম! মাষ্টারমশাই দরজা খুলে বেরিয়ে আসছেন! গাড়ি থেকে নামা দীর্ঘদেহী লোকটা একটা শ্যামলবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে! কিছু উত্তপ্ত কথাবার্তা তার কানে এল
- মাষ্টার আপনি সজ্জন মানুষ আছেন! এই বাড়ি জমি আপনি হামার করে লিয়েন! পার্টি থেকে ফুল প্রোটেকশন পাবেন!
কথাটা শুনে সোমের রক্তের মধ্যে বিদ্যুৎ দৌড়াতে শুরু করে! এই আওয়াজ....এই ভাঙা বাংলা সে যেন কোথায় শুনেছে! সোমের মনে পড়ে যাচ্ছে সেই অভিশপ্ত রাতের কথা! যে রাতে তার মা কে বন্দুকের নলের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল একরত্তি সোমকে বাঁচানোর তাগিদে! সু....র...জ!
নামটা সোমের মস্তিষ্কে যেন কয়েক লক্ষ ভোল্টের ঝটকা দেয়! আচমকা সামনে থাকা দুজনের শরীর লক্ষ করে ঝাঁপ দেয় সোম! ব্ল্যাকবেল্টের নিপুণ কৌশলে দুজনকেই ধরাশায়ী করতে দুই মিনিটের একটু বেশী সময় নিল সে! হাঁপাতে হাঁপাতে শুনল শ্যামল স্যার বলছেন
- দেখুন আমার যা বলার প্রণব বাবুকে বলে দিয়েছি আপনি প্লিজ এখন যান!
- ভেবে বলছেন তো! ইস্পাত কঠিন গলার আওয়াজে সুরজ প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেয় বৃদ্ধ র দিকে!..... মাষ্টার মশাই আপনার মেয়ের নিরাপত্তার কথাটা একবার ভাবুন!
সোম দেখল সামনে আর মাত্র দু জন! জাস্ট দুই পা এগিয়েছে পকেটের মোবাইল যন্ত্রটা সশব্দে উপস্থিতি জানিয়ে দিল তার! নিমেষে সোম ব্যাকভল্ট দিয়ে পাশের ঝোপ টায় সেঁধিয়ে গেল! সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দু জন হঠাৎ সচকিত হয়ে ওঠে! একজন বলে ওঠে
- এ আদি তুনে শুনা কুছ?
আদি নামটি কানে যেতেই সোমের সারা শরীরে বিদ্যুতের একটা চোরা স্রোত খেলে গেল! আদিত্য! একটা অসহায় মেয়েকে স্কুল কম্পাউন্ডে টেনে নিয়ে গিয়েছিল শ্বাপদের আহারের জন্য! আজ আবার সে ফিরে এসেছে! ভাল করে তাকাল সোম! দেখল সামনে থাকা ছায়াশরীর টার বাঁ হাত ঘাড়ের সাথে নেক ক্রাচ দিয়ে আটকানো! ডান হাতে মৃদু আলোয় চকচক করছে সাপের ফণার মত একটি ধারালো ড্যাগার!! সোম ঠোঁট টা চেটে নিল! আজ একেবারে নিকেশ করেই ছাড়বে সে! আস্তে করে পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখল লাল্টুদার মিসকল ছয় বার হয়ে গেছে! সাথে একটা মেসেজ ও ঢুকেছে! ঝটিতি মেসেজ অন করে দেখল লাল্টুদাই পাঠিয়েছে-" হতভাগা! আমি না আসা পর্যন্ত কিছু স্টেপ নিস না প্লিজ! ক্লাবের ছেলেরা আসছে! পুলিশকে ইনফর্ম করা হয়েছে!" চারলাইনের মেসেজের দিকে চেয়ে অন্ধকারেই একটু মৃদু হেসে উঠল সোম! পিছু হটতে সে শেখেনি! ফোনের সুইচ অফ করে পিস্তল টায় নতুন ম্যাগাজিন ভরে নিল সে! আচমকা শ্যামলবাবুর বাড়ির দিক থেকে একটি মেয়েলি আর্তচিৎকার ভেসে আসতেই কেমন যেন থমকে গেল সোম! অবন্তীকে জানোয়ারটা তাহলে কবজা করে নিয়েছে! সাথে বৃদ্ধের করুণ প্রাণভিক্ষার আওয়াজ ও সোমের কানে ভেসে আসতে লাগল! সোম আর নিজেকে সামলাতে পারল না! আচমকা বেরিয়ে আসতেই অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলনা সে! মোবাইলের আওয়াজ টা আগেই তার অবস্থান বিপক্ষের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছিল! শিকারকে চিনতে তারা আর ভুল করল না! ড্যাগারটা আড়াআড়ি ভাবে ঢুকে গেল সোমের পাঁজরের নীচে! সোমের মনে হল একটা গরম অনুভূতি যেন হৃদপিণ্ড এফোঁড়ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেল! ঝাপসা হয়ে যাওয়া দৃষ্টিপথে ক্রমশ একটা মুখ প্রকট হতে লাগল সোমের! আদিত্য হিংস্র শ্বাপদের মত ড্যাগার টা আরেকটু মোচড় দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল সোমের শরীরে! সোমের নাক দিয়ে ভলকে রক্ত বেরোতে লাগল এবার! আদিত্য সোমের কানের কাছে এবার মুখ টা নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল
- কি রে শুয়োরের বাচ্চা! তোর প্রেমিকাকে বাঁচাবি না? বুড়ো টা কেমন চেল্লাচ্ছে শুনতে পারছিস! খুব হাত নিয়েছিলি সেদিন! আজ মৃত্যুকে দেখ!
সোম বিড়বিড় করে কি একটা বলার চেষ্টা করল কিন্তু পারছে না! হৃদপিণ্ড দিয়ে হাওয়া যেন বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে! আচমকা ঝিম ধরে আসা কর্ণকুহরে একটা তীক্ষ্ণ মেয়েলি চিৎকার ভেসে আসে সোমের! জানোয়ার টা অবন্তীকে ঘর থেকে টেনে বের করে এনেছে! সুরজ সিংহানিয়ার পা ধরে শ্যামলবাবু ধুলোয় লুটোপুটি খেয়ে চলেছে! ঘামে ভেজা চোখ দুটো অনেক কষ্টে খুলল সোম! ড্যাগার টা পাঁচ ইঞ্চি ভিতরে ঢুকে গেছে সোমের পাঁজরে! আদিত্য শক্ত হাতে ধরে রেখেছে সেটি! ছাড়ানো মুশকিল! সোমের প্যান্ট জামা পুরো জবজব করছে রক্তে! শরীর ক্রমে অসাড় হতে শুরু করেছে! আচমকা একটা দৃশ্য দেখে সোম শক্ত হতে শুরু করল! অবন্তীর মাথায় লোহার নল ঠেকিয়ে আছে সুরজ! আচমকা সোম দেখল তার মা কে! অসহায় ভাবে ধুলোর মধ্যে হাঁটু গেড়েছে! আর দুই চোখ স্থির সোমের দিকে! শুধু অস্ফুটে সোমের গলা দিয়ে একটা আওয়াজ বেরোলো - "মা"!
তারপর ই বিদ্যুতবেগে আদিত্যর হাত সমেত ড্যাগার টা নিজের পাঁজরের নীচ থেকে টেনে বের করে আনল! এনেই সে হাত সমেত আদিত্যর কণ্ঠনালী বরাবর ঢুকিয়ে দিল ড্যাগারটা! আরেকজন ঝাঁপিয়ে পড়তেই ড্যাগার টা কণ্ঠনালী থেকে টেনে বের করেই আমূল তার হৃদপিণ্ডে বসিয়ে দিল সোম! এক লহমায় দুটো বডি ধপ করে পড়ে গেল তার সামনে! টলমল পায়ে অবন্তীর দিকে এগিয়ে যেতে গিয়ে পড়ে গেল সোম! একটু দূরে ঘটে যাওয়া এই নারকীয় ঘটনার আঁচ টুকু পেলনা শ্যামল স্যারের বাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ তিনটে! অনেক কষ্টে সোম আবার উঠে দাঁড়ায়! যেতে তাকে হবেই! সুরজের কাছে জানতে হবেই তার মা কোথায়! ওদের কাছাকাছি আসতেই অবন্তী একটা আর্তচিৎকার করে উঠল
- বাবা! সোমু!
বৃদ্ধ হতবিহ্বল হয়ে শুধু দেখল একটা রক্তমাখা শরীর টলতে টলতে তার মেয়ের মাথায় ধরে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র ধারীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে!
- কে তুমি?! একটা হুঙ্কার ছাড়ল!
- আমার মা কে কোথায় রেখেছিস? ফিসফিসিয়ে বলে উঠল সোম!
সুরজের বন্দুকের নল টা আস্তে আস্তে অবন্তীর মাথা থেকে সরে যেতে লাগল! ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করল
- কে? কে তুমি?
- সোম! যার মা কে তুলে এনেছিলি!
কথা গুলোর বলার ফাঁকেই অবন্তী লক্ষ্য করে সোম হাতের ধারাল অস্ত্রটাকে মাথা বরাবর ধরেছে সুরজের দিকে!
একটা পাশবিক হাসি হেসে উঠল সুরজ! বলল- তোর বাপ তোকে কিছু জানায় নি! হাঃ হাঃ হাঃ! উপর ভেজ দিয়া উসকো! বলতে বলতেই আগ্নেয়াস্ত্রর ঘোড়া টিপে দেয় সোম কে লক্ষ্য করে! অবন্তী অবাক হয়ে দেখে সোমের কণ্ঠনালী দিয়ে ভলকে রক্ত বেরিয়ে আসছে! উলটো দিকে সুরজের মাথা বরাবর আমূল গেঁথে গিয়েছে ধারালো অস্ত্রটি! একসাথে দুটো শরীরের ধপ করে পড়ে যাবার পরেই গোটা নাটকের উপর যবনিকা নেমে আসতে থাকে নৈঃশব্দ্যর! শুধু এদিকওদিক ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বডিগুলো আর রক্তের দাগ সাক্ষ্য দিচ্ছে একটু আগে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনাগুলির! আচমকা অবন্তীর বুক ফাটা আর্তনাদে সম্বিৎ ফেরে বৃদ্ধের! বিহ্বল চোখে শ্যামল স্যার দেখছেন তার মেয়ে পাগলিনীর মত দৌড়ে যাচ্ছে সোমের পড়ে থাকা শরীর টার দিকে! ছেলেটার শরীরের নীচ দিয়ে গড়িয়ে রক্তের ধারা আপন মনে রক্তের আলপনা আঁকছে ধুলোর মাটিতে! অবন্তী ঝটিতি সোমের মাথাটা নিজের বুকে তুলে নেয়!
- সোম! সোম! আয় খাবি আয়! রান্না বেড়ে রেখেছি আয়! খাবি আয়!
অদ্ভুত প্রলাপের মত ধ্বনি বৃদ্ধকে বিহ্বল করে দেয়! দেখে ছেলেটা তার দিকে চোখ স্থির রেখেই মরেছে! চোখের কোণা থেকে শেষবারের মত গড়িয়ে পড়েছে অন্তিম জলের কণা টুকু! চোখ টা আজ এত ঝাপসা লাগছে তাঁর??! ভাল করে চোখ মুছে দেখে তাঁর সামনে ধুলো মাখা দুটো শরীর..... তাঁরই ক্লাসের দুটো ছেলে মেয়ে! সারাশরীর সুলেখা কালিতে মাখামাখি........ অঙ্ক কষে চলেছে! ঋণের অঙ্ক.....সম্পর্ক মেলানোর অঙ্ক! বৃদ্ধ ফিসফিসিয়ে ধরা গলায় বলে ওঠেন
- এ ভাবে গুরুদক্ষিণা কেন দিলি সমু? কেন দিলি? ফিরিয়ে নিয়ে যা তোর দান! মেয়েটার কেউ নেই! সমু আয় বাবা!
যে শরীর টা সারাজীবনেও শ্যামল স্যারের একটা বাক্যও অমান্যি করেনি আজ সেই শরীর এমন কাতর আহ্বানেও স্যারের দিকে চোখে মেলে চেয়ে থাকে! আস্তে আস্তে বৃদ্ধ নীচু হয়ে বসে ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়! অবন্তী প্রাণপণে জাপটে ধরে সোমকে! তার নরম বুকের ওঠানামাতেও সোমের জীবনের অঙ্ক মেলে না! গুরুদক্ষিণা যেন সমস্ত কিছুকে গ্রাস করে চিরকালের মত অন্তর্হিত হয়েছে.....কালের গ্রাসে!!
( সমাপ্ত)
- প্রণব দা আবার চেঁচাচ্ছেন কেন? কিছুটা হতভম্বের মতই জিজ্ঞেস করে সোম!
- জানি না রে! দাদার মুড যে কখন বিগড়ায়! আয় দেখি!
দুজনে বিশাল হলঘরটায় ঢুকে একটু তাজ্জব হয়ে গেল! প্রণব দা কে ঘিরে কয়েক জন শক্ত সমর্থ যুবক রা দাঁড়িয়ে রয়েছে! একটু তফাতে দুজন দাঁড়িয়ে আতংকে কেঁপেই চলেছে! মুখগুলো ঠিক ঠাহর করতে পারল না সোম! কিন্তু মনটায় কেমন যেন কু ডাকতে লাগল!
শুনতে পেল প্রণব দা বলছেন
- শুনুন মশাই! আপনার নাকি কান্না শোনার সময় বা সহ্য কোনটাই আমার নেই! ইলেকশন সামনে! পার্টির কর্মসূচী অনেক ব্যাপ্ত হয়েছে! একটা নতুন পার্টি অফিস না হলে নতুন ছেলে মেয়েদের সামলানো দায়! কত দাম হবে আপনার ঘর বাড়ির? দশ লাখ? বার লাখ? আপনাকে আমি কুড়ি লাখ দেব! প্লিজ এই এগ্রিমেন্টে সই করুন!
- বাবা! এই বৃদ্ধ বয়সে মেয়ে নিয়ে কোথায় যাব? দিনকাল ভাল নয়!
সোমের সামনে গোটা পৃথিবী টা যেন টাল খেয়ে গেল! এই গলার স্বর তো আর কারুর নয়.....এ তো... আর ভাবতে পারে না সে! ভিড় সরিয়ে সামনের দিকে এগোতেই সে শুনল প্রণব দা বলছেন
- আরে মাষ্টার মশাই খামোকা চাপ নিচ্ছেন! আমার পার্টির ছেলেরা আপনাকে প্রোটেকশন দেবে! শুধু একটা সই ব্যাস!
সোম ততক্ষণে প্রণব দার পাশে পৌঁছে গেছে! অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে সামনে শ্যামল স্যর আর অবন্তী কে! অবন্তীর মুখ টা একদম ভয়ে শুকিয়ে গেছে! জোর করেই সোম জিজ্ঞেস করে বসল
- কি হয়েছে প্রণব দা?
- ওহ সোমু! এসে গেছিস? দাঁড়া তোকে একটা জিনিষ বলছি তার আগে এদের হিল্লে করে নি!
শেষ কথাটা তীরের মত বুকে বিঁধল! আড় চোখে তাকিয়ে দেখে অবন্তীর বুকের ওড়না টা সরে গিয়ে বুকের ওঠানামা পার্টির বাকি ছেলে গুলো হাঁ করে গিলছে! অসহ্য মনে হল সোমের! আস্তে আস্তে অবন্তী কে আড়াল করে দাঁড়াল সে! তার চওড়া কাঁধের উপর দুটি ভীরু নরম চোখ মিট মিট করতে লাগল উৎকন্ঠায়!
- বলছিলাম কি দাদা! পার্টি অফিসের জন্য প্রচুর জায়গা খালি পড়ে রয়েছে! সেগুলোর একটা দেখে নিলেই.....
- কোথায় সই করতে হবে দাও!.....বৃদ্ধ কাউকে আর দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না! হাত বাড়ায় প্রণবের দিকে! চোয়াল আস্তে আস্তে কঠিন হতে থাকে!
- কিন্তু স্যর...... সোম হতবাক চোখে বৃদ্ধর চোখের দিকে তাকায়!
- আমি কোন গুণ্ডা মানুষ করার দায় নিয়ে পৃথিবীতে আসিনি! শিক্ষার অপমান করো না!
সোমের মনের হল তার হৃদপিন্ডে কে যেন জ্বলন্ত ডিজেল ঢেলে দিল! সাথে সাথে টের পেল পিছন থেকে একটা নরম হাত তার জামার পিছন টা খামচে ধরছে!
- স্যর আমি এ হতে দেব না!... একটা শেষ চেষ্টা করে সোম! আপনার বাসাবাড়ি বিক্রি হয়ে যাবে আমার চোখের সামনে আমি মেনে নিতে পারব না! ওই বাড়ির বারান্দায় কত রাত আপনার কাছে অংক শিখেছি....
- আমার ছেলে বেঁচে ছিল! এখন মরে গেছে! প্রণব এগ্রিমেন্ট দাও! কাল সকালে দিয়ে যাব! আয় মা!
বৃদ্ধ কাগজ খানি চিলের মত ছোঁ মেরে অবন্তীর হাতখানি ধরে টানতে টানতে ঘর হতে বেরিয়ে যায়! অবন্তীর শক্ত হাতে ধরে রাখা সোমের জামার কলারে টান লেগে কয়েকটা বোতাম ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে!
- কি রে সোমু!! হাঃ হাঃ! আজকাল।ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাচ্ছিস নাকি রে!
বলেই আবার পৈশাচিক হাসি হাসতে লাগল!
আচমকা সোম প্রণব দার পা দুটো জড়িয়ে ধরে আচমকা ব্যাকুল গলায় বলে উঠল
- দাদা এদের দুজনকে তুমি ছেড়ে দাও! কথা দিচ্ছি আমি তোমাকে নতুন জমির খোঁজ এনে দিচ্ছি দুই ঘন্টার ভিতর উইথ এগ্রিমেন্ট! কিন্তু দাদা প্লিজ....
- পা ছাড়! সোম তোর মতি ভ্রম হচ্ছে! পার্টির কাজে বাধা দিচ্ছিস! দাদার মুখের উপর কথা বলছিস...!
- দাদা আমি আপনার বিরুদ্ধাচার করতে চাইনি! কিন্তু......
- কিন্তু? কি......
- দাদা......
- হ্যা বল.....লুকাস না বল!
- অবন্তী.....!
- কে ওই মেয়েটা.....?
- ওকে আমি ভালবাসি দাদা....!
-কিঃ!! আহ হাঃ হাঃ হাঃ! ভালোবাসিস?? হা হা হা!
প্রণবের পৈশাচিক হাসির জবাবে সোম চুপচাপ মেঝের দিকে নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে!
- শোন! এই লাইনে ভালোবাসা হয় না রে পাগল! তুই আমি একদিন না একদিন ঠিক শেষ হয়ে যাব! ভালোবাসতে গেলে আগে টিঁকে থাকতে হয়!
- আমি কি টিঁকে থাকব না দাদা! ব্যাকুল ভাবে জিজ্ঞেস করে সোম!
প্রণব দা ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান! সোমকে ধরে উঠিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে হাত বুলিয়ে অস্ফুটে বলে ওঠেন- না....! তুই আমি কেউ থাকব না! এ বড় অনিশ্চিত জীবন রে!
সোম কেমন যেন দমে যায়! কিছু কি আঁচ করতে পারছেন রাজনীতির পোড় খাওয়া মানুষ টা? গোটা ঘর টাকে আস্তে আস্তে গ্রাস করছে মৃত্যু নৈঃশব্দ্য!
********************************************************************
# পর্ব_১০
বাইক টা স্টার্ট দিয়েই আচমকা সোমের মনে পড়ল, আরে! আজ তো মেয়েটার জন্মদিন না?! অবন্তী আলুকাবলি খেতে ভালোবাসত খুব! একদিন হাত ধরে ফেলেছিল তার....! জিজ্ঞেস করেছিল মেয়েটিকে- হ্যাঁ রে! তুই তো যা খেতে চাস আমাকে বলিস! আমার খিদে লাগলে কাকে বলব রে! মেয়েটি লাজুক চোখে একবার তাকিয়েছিল সোমের দিকে! তারপর রিনরিনে গলায় বলে উঠেছিল
- কেন? আমাকে বিয়ে করে নে! তোকে রান্না করে খাওয়াব!
- কি রে! চল! আচমকা লাল্টুদার গলার আওয়াজে চটক ভাঙে সোমের! তড়িঘড়ি বলে ওঠে
- লাল্টু দা আমি একটু অন্য জায়গায় যাচ্ছি কাজ আছে!
- মাষ্টারের বাড়ি! বলেই লাল্টু দা মুচকি হাসল!
- সবই তো জানো!
- সাবধানে যা! পিস্তল টা সামলে....
সোম একবার পিছনের বেল্ট স্পর্শ করে দেখে নেয় মেশিন টা যথাস্থানে আসে কি না! তারপর করুণ হেসে বলে
- না থাকলে আর কি! মুখে ধুনো জ্বেলে দিও দা!
- সেই!.... লাল্টুদার দীর্ঘশ্বাসের সাথে বাইকের ঘট ঘট আওয়াজ খানি রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যায় ক্রমশ!
*********************************************************************
শ্যামল স্যারের বাড়ির ঢোকার মুখের গলিটা আজ অস্বাভাবিক রকম অন্ধকার! পাড়ার কুকুর গুলোও সোমকে ঢুকতে দেখে এগিয়ে এলনা! তারাও যেন অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়েছে!
সোমের মত ডাকাবুকো ছেলের ও কেমন যেন অস্বস্তিকর ঠেকছিল পরিবেশ টা! কিছু একটা হতে চলেছে! আচমকা সোমের সিক্সথ সেন্স সজাগ হয়ে উঠল! তার মনে হল স্যারের বাড়ির পিছন দিকের দরজার দিকে কয়েকটি ছায়ার আনাগোনা চোখে পড়ছে যেন!.......
সোমের হাতখানি আপনা থেকেই জামার পিছন দিকে গোঁজা ধাতব ঠান্ডা জিনিষ টার দিকে চলে গেল! আরেকটু এগোতেই অন্ধকার টা একটু ফিকে হয়ে এল! দেখতে পেল কয়েকটা অচেনা মুখ নিজেদের মধ্যে কি সব আলোচনা করছে! নিজেকে যথাসম্ভব অন্ধকারের সাথে মিশিয়ে দিল সোম! কান খাড়া করে শুনতে পেল কয়েকটি উড়ে আসা কথাবার্তা
- শালা বুড়ো কি খচ্চর মাইরি! দাদা এত করে বলল কিছুতেই রাজি হল না?!
- প্রণব টা বুড়ো টাকে ঠিক টুপি পড়িয়ে জমিটা আদায় করে নিল! আমাদের কুড়িলাখের দাম টা এবার মেটাতে হবে ঠিকঠাক! মেয়েটাকে তুলতে হবে!
সোমের স্নায়ু আচমকা টানটান হয়ে ওঠে শেষের এই কথাতে! কারা এরা? এরা যে স্যরের ভালো চায় না তা এদের কথাবার্তা শুনেই পরিষ্কার! এরা তাদের পার্টির কেউ নয়! তাহলে? সুরজের দলের লোক নাকি? ভাবতেই মাথাটা কিরকম ঝিমঝিম করে উঠল! মনে পড়ে যাচ্ছিল বহুদিন আগের পরীক্ষার সেই অভিশপ্ত দুপুরের কথা! সেদিন ও অবন্তী কে কয়েক টি হিংস্র শ্বাপদের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে জীবনের গতিপথ টাই আমূল পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে! বিধাতা আজও তার সামনে এক চরম পরীক্ষা টেনে এনে হাজির করেছে! আচমকা গলির মুখটায় একটা ইনোভা এসে দাঁড়াল নিঃশব্দে! গাড়ির দরজাটা খুলে নিঃশব্দে! ভিতর থেকে দীর্ঘদেহী একটা ছায়াশরীর বেরিয়ে এসে অন্ধকারে মিশে গেল! সোমের স্নায়ু আরেকবার টানটান হয়ে গেল! অন্ধকারে মিশে থাকা দলটার মধ্যে একটা চাঞ্চল্য পড়ে গেল! হাওয়ার শিষ কেটে একটা আওয়াজ ভেসে এল সোমের কানে- বস আ গিয়া!
সোমের মনে হল পরীক্ষার ঘড়ি যেন আচমকা দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করেছে! নাহ! আর সময় নষ্ট করা ঠিক হবেনা! মাষ্টারমশাই তাকে যে চোখেই দেখুন না কেন সে তাদের আজো আগের মতই ভালবাসে! তার সামাজিক অবস্থান বদলে গিয়েছে! ভালবাসা তো বদলায়নি একটুও! পিছন থেকে ধাতব মেশিন টা বের করে নলটায় সাইলেন্সার লাগাতে শুরু করল সে! সবকটাকে নিকেশ করে ছাড়বে সে! অন্ধকার যেন আরো ঘন হয়ে ঘিরে ধরছে তাকে! অন্ধকারের মধ্যেই ম্যাগাজিন টা পরখ করে নিল সে! ফুল লোডেড! আচমকা দেখল দলেরই একজন তার মাত্র দুই হাত তফাতে দাঁড়িয়ে আছে! প্রস্রাব করবে হয়ত! আর দেরী করল না সে! হিংস্র বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ঘাড় টা বাঁ পায়ের ভাঁজের মধ্যে নিয়ে নিল সে! তারপরেই একটু হালকা চাপ! মট করে আওয়াজের সাথে সাথেই একটা দেহের ছটফটানি অন্ধকারে স্তিমিত হয়ে গেল! আস্তে আস্তে সোম সাইলেন্সারটা বাঁ পায়ের ভাঁজে আটকে থাকা বডিটার কপালে ঠেকিয়ে ট্রিগার চালিয়ে দেয়! বাতাসের শিসের সাথে কিছু তরল পদার্থ সোমের মুখে ছিটকে লাগে!
- একটা গেল! সাপের মত হিসহিসিয়ে উঠল! আচমকা দরজা খোলার আওয়াজে চমকে গেল সোম! মাষ্টারমশাই দরজা খুলে বেরিয়ে আসছেন! গাড়ি থেকে নামা দীর্ঘদেহী লোকটা একটা শ্যামলবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে! কিছু উত্তপ্ত কথাবার্তা তার কানে এল
- মাষ্টার আপনি সজ্জন মানুষ আছেন! এই বাড়ি জমি আপনি হামার করে লিয়েন! পার্টি থেকে ফুল প্রোটেকশন পাবেন!
কথাটা শুনে সোমের রক্তের মধ্যে বিদ্যুৎ দৌড়াতে শুরু করে! এই আওয়াজ....এই ভাঙা বাংলা সে যেন কোথায় শুনেছে! সোমের মনে পড়ে যাচ্ছে সেই অভিশপ্ত রাতের কথা! যে রাতে তার মা কে বন্দুকের নলের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল একরত্তি সোমকে বাঁচানোর তাগিদে! সু....র...জ!
নামটা সোমের মস্তিষ্কে যেন কয়েক লক্ষ ভোল্টের ঝটকা দেয়! আচমকা সামনে থাকা দুজনের শরীর লক্ষ করে ঝাঁপ দেয় সোম! ব্ল্যাকবেল্টের নিপুণ কৌশলে দুজনকেই ধরাশায়ী করতে দুই মিনিটের একটু বেশী সময় নিল সে! হাঁপাতে হাঁপাতে শুনল শ্যামল স্যার বলছেন
- দেখুন আমার যা বলার প্রণব বাবুকে বলে দিয়েছি আপনি প্লিজ এখন যান!
- ভেবে বলছেন তো! ইস্পাত কঠিন গলার আওয়াজে সুরজ প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেয় বৃদ্ধ র দিকে!..... মাষ্টার মশাই আপনার মেয়ের নিরাপত্তার কথাটা একবার ভাবুন!
সোম দেখল সামনে আর মাত্র দু জন! জাস্ট দুই পা এগিয়েছে পকেটের মোবাইল যন্ত্রটা সশব্দে উপস্থিতি জানিয়ে দিল তার! নিমেষে সোম ব্যাকভল্ট দিয়ে পাশের ঝোপ টায় সেঁধিয়ে গেল! সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দু জন হঠাৎ সচকিত হয়ে ওঠে! একজন বলে ওঠে
- এ আদি তুনে শুনা কুছ?
আদি নামটি কানে যেতেই সোমের সারা শরীরে বিদ্যুতের একটা চোরা স্রোত খেলে গেল! আদিত্য! একটা অসহায় মেয়েকে স্কুল কম্পাউন্ডে টেনে নিয়ে গিয়েছিল শ্বাপদের আহারের জন্য! আজ আবার সে ফিরে এসেছে! ভাল করে তাকাল সোম! দেখল সামনে থাকা ছায়াশরীর টার বাঁ হাত ঘাড়ের সাথে নেক ক্রাচ দিয়ে আটকানো! ডান হাতে মৃদু আলোয় চকচক করছে সাপের ফণার মত একটি ধারালো ড্যাগার!! সোম ঠোঁট টা চেটে নিল! আজ একেবারে নিকেশ করেই ছাড়বে সে! আস্তে করে পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখল লাল্টুদার মিসকল ছয় বার হয়ে গেছে! সাথে একটা মেসেজ ও ঢুকেছে! ঝটিতি মেসেজ অন করে দেখল লাল্টুদাই পাঠিয়েছে-" হতভাগা! আমি না আসা পর্যন্ত কিছু স্টেপ নিস না প্লিজ! ক্লাবের ছেলেরা আসছে! পুলিশকে ইনফর্ম করা হয়েছে!" চারলাইনের মেসেজের দিকে চেয়ে অন্ধকারেই একটু মৃদু হেসে উঠল সোম! পিছু হটতে সে শেখেনি! ফোনের সুইচ অফ করে পিস্তল টায় নতুন ম্যাগাজিন ভরে নিল সে! আচমকা শ্যামলবাবুর বাড়ির দিক থেকে একটি মেয়েলি আর্তচিৎকার ভেসে আসতেই কেমন যেন থমকে গেল সোম! অবন্তীকে জানোয়ারটা তাহলে কবজা করে নিয়েছে! সাথে বৃদ্ধের করুণ প্রাণভিক্ষার আওয়াজ ও সোমের কানে ভেসে আসতে লাগল! সোম আর নিজেকে সামলাতে পারল না! আচমকা বেরিয়ে আসতেই অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলনা সে! মোবাইলের আওয়াজ টা আগেই তার অবস্থান বিপক্ষের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছিল! শিকারকে চিনতে তারা আর ভুল করল না! ড্যাগারটা আড়াআড়ি ভাবে ঢুকে গেল সোমের পাঁজরের নীচে! সোমের মনে হল একটা গরম অনুভূতি যেন হৃদপিণ্ড এফোঁড়ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেল! ঝাপসা হয়ে যাওয়া দৃষ্টিপথে ক্রমশ একটা মুখ প্রকট হতে লাগল সোমের! আদিত্য হিংস্র শ্বাপদের মত ড্যাগার টা আরেকটু মোচড় দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল সোমের শরীরে! সোমের নাক দিয়ে ভলকে রক্ত বেরোতে লাগল এবার! আদিত্য সোমের কানের কাছে এবার মুখ টা নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল
- কি রে শুয়োরের বাচ্চা! তোর প্রেমিকাকে বাঁচাবি না? বুড়ো টা কেমন চেল্লাচ্ছে শুনতে পারছিস! খুব হাত নিয়েছিলি সেদিন! আজ মৃত্যুকে দেখ!
সোম বিড়বিড় করে কি একটা বলার চেষ্টা করল কিন্তু পারছে না! হৃদপিণ্ড দিয়ে হাওয়া যেন বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে! আচমকা ঝিম ধরে আসা কর্ণকুহরে একটা তীক্ষ্ণ মেয়েলি চিৎকার ভেসে আসে সোমের! জানোয়ার টা অবন্তীকে ঘর থেকে টেনে বের করে এনেছে! সুরজ সিংহানিয়ার পা ধরে শ্যামলবাবু ধুলোয় লুটোপুটি খেয়ে চলেছে! ঘামে ভেজা চোখ দুটো অনেক কষ্টে খুলল সোম! ড্যাগার টা পাঁচ ইঞ্চি ভিতরে ঢুকে গেছে সোমের পাঁজরে! আদিত্য শক্ত হাতে ধরে রেখেছে সেটি! ছাড়ানো মুশকিল! সোমের প্যান্ট জামা পুরো জবজব করছে রক্তে! শরীর ক্রমে অসাড় হতে শুরু করেছে! আচমকা একটা দৃশ্য দেখে সোম শক্ত হতে শুরু করল! অবন্তীর মাথায় লোহার নল ঠেকিয়ে আছে সুরজ! আচমকা সোম দেখল তার মা কে! অসহায় ভাবে ধুলোর মধ্যে হাঁটু গেড়েছে! আর দুই চোখ স্থির সোমের দিকে! শুধু অস্ফুটে সোমের গলা দিয়ে একটা আওয়াজ বেরোলো - "মা"!
তারপর ই বিদ্যুতবেগে আদিত্যর হাত সমেত ড্যাগার টা নিজের পাঁজরের নীচ থেকে টেনে বের করে আনল! এনেই সে হাত সমেত আদিত্যর কণ্ঠনালী বরাবর ঢুকিয়ে দিল ড্যাগারটা! আরেকজন ঝাঁপিয়ে পড়তেই ড্যাগার টা কণ্ঠনালী থেকে টেনে বের করেই আমূল তার হৃদপিণ্ডে বসিয়ে দিল সোম! এক লহমায় দুটো বডি ধপ করে পড়ে গেল তার সামনে! টলমল পায়ে অবন্তীর দিকে এগিয়ে যেতে গিয়ে পড়ে গেল সোম! একটু দূরে ঘটে যাওয়া এই নারকীয় ঘটনার আঁচ টুকু পেলনা শ্যামল স্যারের বাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ তিনটে! অনেক কষ্টে সোম আবার উঠে দাঁড়ায়! যেতে তাকে হবেই! সুরজের কাছে জানতে হবেই তার মা কোথায়! ওদের কাছাকাছি আসতেই অবন্তী একটা আর্তচিৎকার করে উঠল
- বাবা! সোমু!
বৃদ্ধ হতবিহ্বল হয়ে শুধু দেখল একটা রক্তমাখা শরীর টলতে টলতে তার মেয়ের মাথায় ধরে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র ধারীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে!
- কে তুমি?! একটা হুঙ্কার ছাড়ল!
- আমার মা কে কোথায় রেখেছিস? ফিসফিসিয়ে বলে উঠল সোম!
সুরজের বন্দুকের নল টা আস্তে আস্তে অবন্তীর মাথা থেকে সরে যেতে লাগল! ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করল
- কে? কে তুমি?
- সোম! যার মা কে তুলে এনেছিলি!
কথা গুলোর বলার ফাঁকেই অবন্তী লক্ষ্য করে সোম হাতের ধারাল অস্ত্রটাকে মাথা বরাবর ধরেছে সুরজের দিকে!
একটা পাশবিক হাসি হেসে উঠল সুরজ! বলল- তোর বাপ তোকে কিছু জানায় নি! হাঃ হাঃ হাঃ! উপর ভেজ দিয়া উসকো! বলতে বলতেই আগ্নেয়াস্ত্রর ঘোড়া টিপে দেয় সোম কে লক্ষ্য করে! অবন্তী অবাক হয়ে দেখে সোমের কণ্ঠনালী দিয়ে ভলকে রক্ত বেরিয়ে আসছে! উলটো দিকে সুরজের মাথা বরাবর আমূল গেঁথে গিয়েছে ধারালো অস্ত্রটি! একসাথে দুটো শরীরের ধপ করে পড়ে যাবার পরেই গোটা নাটকের উপর যবনিকা নেমে আসতে থাকে নৈঃশব্দ্যর! শুধু এদিকওদিক ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বডিগুলো আর রক্তের দাগ সাক্ষ্য দিচ্ছে একটু আগে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনাগুলির! আচমকা অবন্তীর বুক ফাটা আর্তনাদে সম্বিৎ ফেরে বৃদ্ধের! বিহ্বল চোখে শ্যামল স্যার দেখছেন তার মেয়ে পাগলিনীর মত দৌড়ে যাচ্ছে সোমের পড়ে থাকা শরীর টার দিকে! ছেলেটার শরীরের নীচ দিয়ে গড়িয়ে রক্তের ধারা আপন মনে রক্তের আলপনা আঁকছে ধুলোর মাটিতে! অবন্তী ঝটিতি সোমের মাথাটা নিজের বুকে তুলে নেয়!
- সোম! সোম! আয় খাবি আয়! রান্না বেড়ে রেখেছি আয়! খাবি আয়!
অদ্ভুত প্রলাপের মত ধ্বনি বৃদ্ধকে বিহ্বল করে দেয়! দেখে ছেলেটা তার দিকে চোখ স্থির রেখেই মরেছে! চোখের কোণা থেকে শেষবারের মত গড়িয়ে পড়েছে অন্তিম জলের কণা টুকু! চোখ টা আজ এত ঝাপসা লাগছে তাঁর??! ভাল করে চোখ মুছে দেখে তাঁর সামনে ধুলো মাখা দুটো শরীর..... তাঁরই ক্লাসের দুটো ছেলে মেয়ে! সারাশরীর সুলেখা কালিতে মাখামাখি........ অঙ্ক কষে চলেছে! ঋণের অঙ্ক.....সম্পর্ক মেলানোর অঙ্ক! বৃদ্ধ ফিসফিসিয়ে ধরা গলায় বলে ওঠেন
- এ ভাবে গুরুদক্ষিণা কেন দিলি সমু? কেন দিলি? ফিরিয়ে নিয়ে যা তোর দান! মেয়েটার কেউ নেই! সমু আয় বাবা!
যে শরীর টা সারাজীবনেও শ্যামল স্যারের একটা বাক্যও অমান্যি করেনি আজ সেই শরীর এমন কাতর আহ্বানেও স্যারের দিকে চোখে মেলে চেয়ে থাকে! আস্তে আস্তে বৃদ্ধ নীচু হয়ে বসে ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়! অবন্তী প্রাণপণে জাপটে ধরে সোমকে! তার নরম বুকের ওঠানামাতেও সোমের জীবনের অঙ্ক মেলে না! গুরুদক্ষিণা যেন সমস্ত কিছুকে গ্রাস করে চিরকালের মত অন্তর্হিত হয়েছে.....কালের গ্রাসে!!
( সমাপ্ত)

Can I share this story?
ReplyDelete