Wednesday, 15 August 2018

বউমা

গল্পঃ বউমা (সম্পূর্ণ)
গল্পকারঃ অরিন্দম ©

ভোরের দিকে একটা কর্কশ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় সুবিমল সান্যালের ! এ কদিন একটা ব্যাপার তিনি লক্ষ্য করছেন ঠিক একই সময়ে ঘুম টা ভাঙছে, তার পত্নী গত হবার পর থেকেই এটা হয়ে চলেছে ! ব্যাপার টা ঠিক ঠাহর করতে পারেন না তিনি ! সুখের সংসার ছিল তাঁর, রেলের উচ্চপদস্থ পদে চাকরীর সুবাদে উপার্জন ও নেহাত কম হয় নি তাঁর ! ইচ্ছা ছিল যা উপার্জন তিনি করেছিলেন তা দিয়ে শেষ বয়সে গয়া মথুরা কাশী ঘুরে বেড়াবেন সহধর্মিণীকে সাথে নিয়ে ! জীবনের খেলায় কে যে কখন ফাঁকি দিয়ে একা একা চলে যায় তা তিনি ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারেন নি ! শশীকলার বুকে আচমকা ওঠা একটা ব্যাথা যে তাঁকে এভাবে একা করে দিয়ে চলে যাবে এ বোধ করি বিধাতাও লিখে উঠতে পারেন নি! অবশ্য তিনি এখন একা নন! সংসারে আরো তিন তিনটে প্রাণের উপস্থিতি তাঁর একলা জীবনে নিভু নিভু প্রদীপ সলতের মত আলো দিয়ে চলেছে !

ক্যাঁ ক্যাঁ ক্যাঁ…….

উফফ! আবারো সেই কর্কশ আওয়াজ টা পাঁচিলের ওপার থেকে ভেসে আসে! অসহ্য মনে হয় সুবিমল বাবুর!

-কি হল বাবা? আপনি এখনো শুয়ে আছেন? বলি বাজার টা কি হাওয়ায় উড়ে আসবে? তুতানের স্কুল যেতে দেরী হয়ে যাবে রান্না চাপাতে দেরী হলে!

কর্কশ আওয়াজ গুলি নির্মম ভাবে ঘরের ইঁট পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে সুবিমল বাবুর কাছে!ধরা গলায় বলে ওঠেন

- এই যাই! বুঝতে পারেন তার বার্ধক্যে অনেকের নাপসন্দ! একটা সময় আসে সিংহাসন রাজ্যপাট ছেড়ে দেওয়ার! ঘোড়া বুড়ো হয়ে গেলে হয়ত দানাপানি খাওয়ানোতেও টান পড়ে! বউমার এই ব্যাবহার এতদিনে তাঁর গা সওয়া হয়ে গিয়েছে! কারণ তারঁ ছেলে…… নিজের ছেলেই তাঁকে বিপরীত মেরুতে টেনে ফেলেছে শশীকলা গত হবার পর থেকেই!

ভালবেসে বিয়ে করেছে! সম্মতি তো দূর যেদিন বিয়ে করে এনেছিল সেদিন তারা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেন নি!

বহুজাতিক সংস্থার অফিসে কাজ করতে গিয়ে ওখানকারই এক সহকর্মীর প্রেমে জড়িয়ে পড়ে তাঁর ছেলে যাকে এনে তুলেছিল তাঁদের গৃহে তার পিছনে বউমা তকমা দিতে সুবিমল বাবুর অভিমানী পিতৃহৃদয় বাদ সেধেছিল বৈকি!
কিন্তু সে অভিমান আজো কুড়ে কুড়ে খায় তাঁকে! শশীকলা যখন বুকে ব্যাথা নিয়ে আই সি ইউ তে ভর্তি হল তখন কাঁপা হাতে অসহায়ের মত ফোন করেছিলেন তাঁর ছেলের অফিসে! অপারেটরের নিস্পৃহ কন্ঠের ঘোষণা তাঁর মানসিক দৃঢ়তাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছিল! তার ছেলে বা বউমা কেউ আসেনি! যখন অন্তিম শ্বাস উপস্থিত হয়েছিল শশীকলার তখন ফ্যাঁস ফেঁসে গলায় জানতে চেয়েছিল ছেলে বা বউমা কখন আসবে! কি জবাব দিতেন তিনি মৃত্যুপথযাত্রীনি কে? অপরাধী র মত মুখ করে বলেছিলেন - পথে আছে! আসছে! সেই শেষ! শশীকলার খোলা দুটি ঘোলাটে চোখের আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে থাকা শরীর টা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছিল সুবিমলের! ডেথ সার্টিফিকেট দেবার পরেও অনেক ঘন্টা মর্গের সামনে মৃতদেহ আগলে বসেছিলেন তিনি! পরে অনেক রাতে ছেলে এসেছিল সৎকার সমিতির গাড়ি সাথে নিয়ে! কে নাকি তাকে ফোন করেছিল যে তার মা টা নাকি মরেছে! বহুজাতিক সংস্থার অফিসের পার্টি ছেড়ে ওভাবে আসা যায় নাকি! তারা দুজনেই নেশায় চুর হয়েছিল! কোনমতে বউকে বাড়িতে ড্রপ করেই হাসপাতালে টলতে টলতে নিয়ে এসেছিল তার মায়ের শেষকৃত্য র গাড়ি!
  - এই নিন টাকা! থলে টা ঝোলান আছে বাইরে,তাড়াতাড়ি বাজার টা সেরে আনুন! তুতানের আজ পরীক্ষা!
আচমকা বউমার কথায় চটকা ভাঙে বুড়োর! একটু আড়াল করে চোখের জল মুছে ধরা গলায় জিজ্ঞেস করে- দাদুভাই উঠেছে?
  - না! তবে উঠে পড়বে! আপনি যান তো! গলা খাঁকারি দিয়ে চলে যায় আধুনিকা তরুণী!
মনে একটা মোচড় দিয়ে ওঠে সুবিমলের! ধীরে ধীরে পাজামার উপর একটা পাঞ্জাবি গলিয়ে চটি পায়ে থলে হাতে রাস্তায় নামেন তিনি! মাথা উঁচু করে কাকটাকে দু এক বার দেখার চেষ্টা করেন! দেখতে পান না! আচমকা পিছন থেকে একটা তরুণী কন্ঠ ভেসে আসে
  - আপনি এত সকালে কোথায় চললেন জেঠুমণি?
  ফিরে তাকিয়ে দেখেন পাশের ফ্ল্যাটের ইন্দ্রাণী কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছে! মুখে একগ ভুবনমোহিনী হাসি! একটা দীর্ঘশ্বাস আপনা থেকেই থেকেই বেরিয়ে আসে সুবিমলের বুক থেকে! এই মেয়েটিকে বরাবরের পছন্দ ছিল তাঁর! কিন্তু তাকে আর ঘরে তোলা হল কই? বুকটা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে সুবিমলের!
  - জেঠুমণি এত সকালে কই চললেন?
  - এই যাই বাজারে! তুতানের আজ পরীক্ষা! বাজার তাড়াতাড়ি না সারলেই নয়!
  - তোমার পুত্র কি কোন কম্মের নয় জেঠু! সুবিমল কথাগুলো শোনার সময় লক্ষ করেন ইন্দ্রাণী র টানা টানা চোখ দুটি যেন নিস্ফল আক্রোশে জ্বলে উঠল!
সুবিমল তাড়াতাড়ি পাশ কাটানোর জন্য বলে ওঠেন
  - তুমি এত সকালে? কোথায় যাচ্ছ?
  - আমাদের পেশা তো জানেন! নার্সিং এর লাইনে কেন যে আসতে গেলাম ঈশ্বর জানেন! পার্থ খুব রাগারাগি করে! কি জ্বালায় যে আছি!
  সুবিমল লক্ষ করেন মেয়েটির ফর্সা মুখমণ্ডলে পাপড়ির মত মেলা দুই ঠোঁটের উপর জমছে মুক্তোবিন্দুর মত স্বেদ! মেয়েটাকে দেখে কেমন মায়ায় পড়ে যান সুবিমল! ছুটির দিনেও ছাড় পায় না বেচারি!
  - জেঠু আপনি বাজার সেরে নিন তাড়াতাড়ি! আমিও যাই! পরে আপনার বাড়িতে যাব! আসি....
  সুবিমলের একচিলতে হাসির সাথে মেয়েটিও প্রজাপতির মতন উড়ে যায় সেখান থেকে! সুবিমল ভাবে বিধাতা সুখ তার কপালে লিখে দিয়ে যায়নি! দিলে অন্তত তাকে এভাবে বেঁচে থাকতে হত না!
( প্রথম পর্ব সমাপ্ত)
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

  - ফ্লাইট কবে গো?
সুবিমল সান্যাল বাজারের থলি হাতে বাড়ির মধ্যে ঢুকতে গিয়েই এক কন্ঠস্বর শুনে থমকে দাঁড়ালেন! বউমার গলা! গলাটা শুনে বেশ খুশি মনে হল তাঁর! তাহলে নিশ্চয়ই কোন ভাল খবর আছে! আশা নিরাশায় তাঁর মন দুলে উঠল! খোকার কি প্রোমোশন হল নাকি?
  -  এই সপ্তাহেই মনে হয় কনফার্মেশন পেয়ে যাব কিন্তু আমি ভাবছি বাবাকে নিয়ে!
  ছেলের বলা কথাগুলো কর্ণকুহরে ধ্বনিত হতে লাগল বৃদ্ধের! কোনোদিন ছেলে যাদের কথা ভাবেনি আজ এ হেন বৈপরীত্য স্রোতে বৃদ্ধের মন আনচান করে উঠল!
  - বাবাকে নিয়ে আবার কি সমস্যা হল? ওটা তো একটা আগাছা! উপড়ে ফেলে দিলেই হয়!
সুবিমলের মনে হল তাঁর কানে কেউ যেন গরম সীসে ঢেলে দিচ্ছে! বুকে মোচড় দিয়ে একটা অব্যক্ত যন্ত্রনা গলা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে!পড়ে যাচ্ছিলেন কোনমতে নিজেকে সামলে নিলেন! শুনতে পেলেন ছেলে বলে চলেছে
  - উপড়ে ফেলে দিলে তো ল্যাঠা চুকে যেত কবে! ওই বুড়ির সাথে কেন এটাও গেলনা ভগবান জানে! এই শোন! বস বলে দিয়েছেন, আমেরিকায় যেকজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার দের পাঠাচ্ছেন আমাকে তাদের মেন্টরিং করতে বলেছেন! কাজটা ভাল করতে পারলেই আমেরিকায় পাকাপাকি ভাবে থাকার বন্দোবস্ত হয়ে যাবে! তুতান কে ওখানকার স্কুলে ভর্তি করে দেব তখন.......
  - দাদা! তুমি কি করছ?
  আচমকা পাঞ্জাবি তে একটা নরম হাতের টান পড়তেই চমকে নীচে তাকিয়ে দেখে তুতান কখন পায়ের নীচে দাঁড়িয়ে ডানহাত দিয়ে চোখ চুলকাচ্ছে! চুল পুরো উস্কোখুস্কো! দেখে কিরকম যেন মায়া লাগল তাঁর! থলে নামিয়ে তাকে কোলে তুলে নিতেই ছোট নরম হাত দুটি দিয়ে গলা জড়িয়ে আদুরে গলায় বলে উঠল
  - দাদা তুমি কি করছ?
  - কথা শুনছি দাদু!
  - কার কথা শুনচ?
  - তোমার মা বাবার কথা
  - লুকিয়ে লুকিয়ে?
  - হ্যাঁ দাদু!
  - জানো না! লুকিয়ে কথা শুনলে পাপ হয়?
  - জানি দাদু সেই জন্য ই তো পাপ স্খলন করছি!
  - সেটা কি দাদা?
  - পরে একদিন বলব দাদু! এখন যাও রেডি হয়ে নাও!  আজ পরীক্ষা ভাল করে দিতে হবে!
  তুতান কে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে দরজার ওপারে কান পেতে রইলেন! নৈঃশব্দ্যর প্রহেলিকা বৃদ্ধর অবস্থা দেখে ব্যঙ্গ করে উঠল! ওরা চলে গিয়েছে নিজেদের কাজে.....
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
  - বাবা স্নান করে নিন! খাবার বেড়ে দিয়েছি! খেয়ে নিয়ে তুতান কে স্কুলে পৌঁছে দিন! আজ দুজনেরই অফিসে ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে! বস বলে দিয়েছেন.....
  - তোমরা কোথায় যাবার প্ল্যান করছ বউমা! বৃদ্ধ নিস্পৃহ কন্ঠে কথার মাঝখানেই বলে ওঠেন! আচমকা কথার মাঝখানে বাধা পেয়ে আধুনিকা খেই হারিয়ে ফেলে! দ্বিধামেশানো কন্ঠে বলে ওঠেন
  - বাবা আপনি আগে স্কুলে দিয়ে আসুন!  পরে বলছি!
  - খোকা বিলেত যাচ্ছে, তাই না?
  - হ্যাঁ......ইয়ে....না...মানে এখনই নয়! একটু সময় লাগবে!
  - আমাকে বাড়ি থেকে উঠানোর জন্য?...স্মিত হেসে সুবিমল বউমার দিকে তাকালেন! সেই দৃষ্টির সামনে আধুনিকা কুঁকড়ে গেল যেন! বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ! তারপর এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিলেন বৃদ্ধ নিজেই!
  - দাদু চল! দেরি হয়ে যাচ্ছে!
  - সেকি বাবা! খেয়ে যাবেন না! আধুনিকা কিছু বুঝে উঠতে পারেনা!
  - নাহ! পেট ভরে গিয়েছে! যাই স্কুলে দিয়ে আসি! কই দাদু এসো!
  আস্তে আস্তে একটি ষাটোর্ধ্ব মানুষের হাত ধরে রক্ত টগবগে নবীন প্রজন্ম মোরাম বিছানো রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যায়! বাতাসে কি তাদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে এল? উত্তর পাওয়া যায় না....শুধু একটা দমকা চৈতালী বাতাস বুক কেমন করা বেদনা নিয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ টার পিছু ধাওয়া করে! কাক টা আবার কর্কশ শব্দে কোথাও ডেকে ওঠে!
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼
 
সাতদিন কেটে গিয়েছে.....সুবিমলের মনে পড়েনা একদিন ও খোকা তার খবর নিয়েছে! একদিন দুজনেই রাত করে বাড়ি ফিরেছিল! কি একটা পার্টি ছিল অফিসে! দুজনেরই গা থেকে ভুরভুর করছিল বিলিতি মদের গন্ধ! শত হোক বাপ তো! নিজের অশক্ত দুটি কাঁধে দুজনকে চাপিয়ে টলতে টলতে শোবার ঘর পর্যন্ত পৌছিয়ে "বাস্টার্ড " জাতীয় গালাগালি পর্যন্ত হজম করতে হয়েছে! তিনি চুপ থেকেছিলেন পাছে খোকার ঘুম না ভেঙে যায়! নিজের ঘরে এসে টেবিলে ঢাকা দেওয়া জলের গ্লাস থেকে গোগ্রাসে পুরোটা নিজের গলায় ঢেলে দিয়ে শশীকলার ফোটোর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন! পেটে ও মনে আগুন জ্বললেও তার আঁচ বৃদ্ধকে কাবু করতে পারেনি! ঠিক করেছিলেন পরের দিনই নিরুদ্দেশ হবেন কিন্তু পারেননি তুতানের জন্য! শশীকলা গত হবার পর থেকে ঐ একরত্তি শিশুটিই সুবিমলের প্রাণভোমরা! আহা! কালো দুটি ডাগর চোখের অন্তরালে তিনি তার শশীকে খুঁজে পান....মনে পড়ে যায় কোন এক গ্রাম্য প্রান্তরে এক সন্ধ্যায় ছাদনাতলায় এরকমই চোখ মেলে তাকিয়েছিল কেউ! তুতান তার ছোট্ট হাত দিয়ে দাদুর গলাটা জড়িয়ে ধরে তখন অজান্তেই সুবিমলের চোখের কোণাটা চিকচিক করে ওঠে! শশী ফিরে এসেছে বুঝি.......কিন্তু যে যায় সে ফিরে আসেনা কোনদিনই.... এই সহজ সত্যি টা কেন জানিনা তার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকে!
  - বাবা! শুনছ?
  আচমকা কার কন্ঠস্বরে সুবিমলের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায়! তাকিয়ে দেখে সামনে খোকা দাঁড়িয়ে! যাক, এতদিনে বাপকে মনে পড়েছে!
  - খোকা! কিছু বলবি?
  - হ্যাঁ বাবা! একটা কথা প্রতিদিনই বলব ভাবি বলা হয়ে ওঠেনা!
  - বলার জন্য সময় দিতে লাগে! সেটা আছে খোকা তোর আমার জন্য?...বৃদ্ধর গলায় অভিমান ছলকে ওঠে!
  - বাবা প্লিজ! তর্ক করতে আসিনি আমি! একটু অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে সভ্য পুত্র!
  - আচ্ছা,আচ্ছা বল! সুবিমল ঈষৎ অপ্রস্তুত!
  - বাবা এরকম ভাবে আর চলে না!  মা বেঁচে থাকাকালীন একরকম আর এখন মায়ের অবর্তমানে পরিস্থিতি পালটে গিয়েছে...
  - পালটে তো তোরা দিয়েছিস! আমি তো সবকিছু আঁকড়ে বাঁচতে চাই...সুবিমল বিড়বিড় করে ওঠেন! পুত্রের কানে পৌছায় না সে আওয়াজ!
  - দেখো বাবা প্রত্যেকের জীবনেই একটা এইম আছে! গোল আছে! মা কে হারিয়ে তোমার এখন কিছুই নেই! এখন তোমার এককাল! এরকম করে বেশিদিন চলেনা! তার উপর ছেলেটারও ভবিষ্যৎ আছে! ওকে আমি আমেরিকায় পড়াব! আমরা আমেরিকাতেই সেটল হব.....
  - খোকা.....! কথা শেষ করতে পারেন না বাপ! অবরূদ্ধ আবেগে কেঁপে যায় গলা!
  - হ্যাঁ বাবা! ঠিক বলছি! বউমার ও একই ইচ্ছা! তোমাকে আর গন্ধমাদনের মত টানা যাচ্ছেনা!
  - আমাকে ঠিক কি করতে হবে?.....সুবিমল চেয়ারের হাতল ধরে ধপ করে বসে পড়েন! কান্না এখন আর আসছেনা! বরং গলার কাছে কেমন যেন তিতকুটে ভাব!
  - একটা এগ্রিমেন্ট আছে! সাইন করে দাও! আর তোমাকে একটা ভাল বৃদ্ধাশ্রমে শিফট করে দিয়ে যাব! কোন অসুবিধা হবেনা! মাসের টাকাটা পাঠিয়ে দেব! আর এই বাড়ি আমার নামে উইল করে দিয়ে যাও! তুমি মরলে বারোভূতে ছিঁড়ে খাবে!..... নিস্পৃহ কন্ঠে কথা কটা বলে খোকা থামল! সুবিমল চশমা টা ভালো করে মুছে ভালো করে নিজের ঔরসজাত জাত সন্তানকে দেখার চেষ্টা করল! সেই ঘন কালো চোখ দুটি.....কোঁকড়া চুল.....নরম ফর্সা আঙুল দিয়ে আধো আধো গলা জড়িয়ে ধরা.....
  - দে পেন..... আর বাক্য ব্যয় হল না তার! গুণী পুত্র তড়িৎ গতিতে বাবার হাতে সমর্পণ করল সম্পর্ক কেনাবেচার ইস্তেহার! বৃদ্ধ সই করে শশীকলার ফোটো টা নামিয়ে বগলের নীচে নিয়ে ধরা দাদু এসেছে?
  - হ্যাঁ!  নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছে! আর হ্যাঁ বাবা! আজ রাত ৯ টায় ফ্লাইট!  তুমি কিছু চিন্তা কোরোনা! আশ্রমের সাথে ফাইনাল কথা হয়ে গিয়েছে! আট টায় এসে নিয়ে যাবে!  প্যাকিং আমরাই করে দিচ্ছি!.....
বৃদ্ধ র কানে সেসব কিছুই পৌছালো না! শুধু অস্ফুটে বলল- দাদুর কাছে যাব!
তুতানের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দেখে নাতি বউমার বুকে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে! দুজনেই তন্দ্রায় নিমগ্ন! শশীকলার বুকেও তার খোকা এরকম কত ঘুমিয়েছে! আজ বৃদ্ধাশ্রমে একা একা কত রাত কাটবে তাঁর! পিছন ঘুরে খোকাকে দেখল পরম আগ্রহে এগ্রিমেন্টের পেপারগুলো দেখে যাচ্ছে!  আস্তে আস্তে চোখ নামিয়ে নেয় সে! তারপর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় দুই চোখে শূন্যতা নিয়ে!.... কাক টা কাছে পিঠেই কর্কশ কন্ঠে আবার কোথাও ডেকে ওঠে....!
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

আদিগঙ্গার মজে যাওয়া ঘাটের পাশে ধপ করে বসে পড়েন সুবিমল বাবু! এককালে রেলের কন্ট্রোলিং ইউনিট দক্ষ হাতে সামলাতেন! তাঁর হাতেই অনেকবার বড়সড় দুর্ঘটনার হাত থেকে রেহাই পেয়েছেন অগণিত প্যাসেঞ্জার! আর আজ......তিনি অসহায়! কপর্দকহীন! অভিমানের কাছে মানুষ অসহায়! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘোলা জলের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন! মজা নদী হলেও আদিগঙ্গার এই অংশে এখনো জল গভীর....দুপুরের দিকে এই সাইড টা একেবারে নির্জন হয়ে পড়ে। লোকচলাচল ও কমে যায়! আচমকা সুবিমল বাবু উঠে দাঁড়ান‌‌! ধীরে ধীরে ঘোলা জলের মধ্যে গোড়ালি ডুবিয়ে দেন আস্তে আস্তে! যাদের নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন তারা কেউ তাকে আপন করে নেয়নি! তুতান কেও ওরা নিজেদের মত মানুষ করবে! তিনি তো একলা....জীবনের গলি থেকে রাজপথের জনারণ্যে পুরো একা!
জলস্তর আস্তে আস্তে তার বুক স্পর্শ করছে! শশীকলার ফোটো টাও তিনি বুকের কাছে সজোরে আঁকড়ে রয়েছেন! আদিগঙ্গার ঘোলা জলে আজ নিজেকে ভাসিয়ে দেবেন! আচমকা চোখ গেল ঘোলা জলের মাতনের দিকে! দেখলেন ঘোলাজলের মধ্যে আস্তে আস্তে কার একটা মুখের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে.....কি নরম কোমলকান্তি একটা নারীর মুখ....মায়াঘন চোখের চাউনি.... পদ্মপাপড়ির মত ওষ্ঠ.....শশীকলা কি??.....জলস্তর তত ক্ষনে চক্ষুসীমা ছাড়িয়ে গেছে! নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে সুবিমলের.... পিছন থেকে একটা ক্ষীণ নারীকন্ঠ শুনতে পেলেন তিনি.... জেঠুমণি...! ব্যস! তারপরেই অন্ধকারের যবনিকা নেমে আসতে থাকে তার দুই চোখে!
🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼🌼

চোখের সামনে ক্রমাগত একটা হলুদ আলোর ফোকাস নাড়াচাড়া করছে! আলোর বিন্দু টা ক্রমশ ছোট হচ্ছে বড় হচ্ছে! সুবিমল বুঝতে পারেন না তিনি কোথায় আছেন! তার ডান হাতের উপর একটা আলতো মেয়েলি চাপ অনুভব করেন তিনি! ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন তাকে একটা ধবধবে সাদা বিছানাতে শোওয়ানো হয়েছে! আস্তে আস্তে চোখ মেলে ধরেন তিনি! ঠিক মাথার পাশেই টানা টানা দুটি ব্যগ্র চোখের সাথে চোখাচোখি হয় সুবিমলের! আর ঠিক তখনই তিনি অস্বস্তিতে পড়ে যান! একটা চেনা ডাক ভেসে আছে কানে
  - জেঠুমণি এ তুমি কি করতে যাচ্ছিলে?
ইন্দ্রানী কে দেখে একটু অবাকই হয় সুবিমল! এমন অবেলায় এই মেয়েটিই বা কোথা থেকে এল?
আর কি অবস্থা করে রেখেছে এই মেয়ে! সর্বাঙ্গে ভিজে শাড়ি লেপ্টে আছে....তাকাতেও কিরকম অস্বস্তিবোধ করেন সুবিমল! ঘোরের মধ্যে জিজ্ঞাসা করেন
- আমি কোথায়? তুমিই বা এখানে কি ভাবে?.....আস্তে আস্তে তার স্মৃতিপট জাগ্রত হতে থাকে!
  - জেঠুমণি তোমাকে আমি জলের থেকে উদ্ধার করে এনেছি! ডুবে যাচ্ছিলে প্রায়....আমি না দেখলে....
  - আমি ডুবতেই গেছিলাম রে মা!.... বৃদ্ধ কথা শেষ হতে দেয় না!
  - জেঠু! ইন্দ্রাণী অস্ফুটে বলে ওঠে!.... এ তুমি কি করতে যাচ্ছিলে? গলাটা যেন ঈষৎ ধরে আসে!
  - আমার জীবনে বেঁচে থাকার আর কোন অর্থ নেই রে মা! ছেলে আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে চাইছে! ওরা আজই পাকাপাকি ভাবে চলে যাচ্ছে দেশ ছেড়ে! আমি একটা আশ্র‍য় চেয়েছিলাম রে মা!.....কথা কটা বলে বৃদ্ধ হাঁপড়ের মত হাঁপাতে লাগলেন! কিন্তু আচমকা থেমে গেলেন একটা কান্নার ফোঁপানির শব্দে! ইন্দ্রাণী কাঁদছে! নার্স কাঁদছে!
  সুবিমল আস্তে করে মেয়েটির মাথায় হাত রেখে সস্নেহে জিজ্ঞাসা করেন
  - কাঁদছিস কেন মা?
ইন্দ্রাণী অস্ফুটে বলে ওঠে- মা বলে ডাকছ জেঠুমণি! কখনো ভেবে দেখেছ সন্তান হারানোর দুঃখ একটা মায়ের বুকে কতটা আঘাত হানবে? প্রতিদিন সকালে কাজে বেরোনোর আগে তোমার সাথে দেখা না করে গেলে আমার কাজে মন বসত না! পার্থ কে দেখেও কি বোঝনি সে কতটা নিজের বাবার মত তোমাকে ভালবাসে? আজ সে শুনলে কি করবে ভাবতে পারছ?
সুবিমল অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকেন তার সামনে কাঁদতে থাকা এই মেয়েটির দিকে! রূপ লাবণ্য সমস্ত কিছু ছাপিয়ে একটা অসহায় বাপ হারা মেয়ের ছবি ফুটে উঠছে তার চোখের সামনে! মাথা নীচু করে চুপ করে বসে থাকেন বৃদ্ধ! জবাব কিছুই নেই তার কাছে! রক্ত যেখানে বেইমানি করে ভালোবাসা সেখানে নীরব.....আচমকা বৃদ্ধ অনুভব করে ইন্দ্রাণী তার নিজের ভেজা নরম বুকের মধ্যে তাকে জড়িয়ে ধরেছে! অস্ফুটে সে বলে ওঠে
  - বাবা বাড়ি চল!  আমাদের তিনজনের পেট হেসেখেলে কেটে যাবে! কিন্তু তোমাকে কোথায় পাব? আমিই তোমার মা.....আজ থেকে বউমা!  চল বাবা! পার্থ খুব খুশি হবে....
এক যুবতীর ভেজা বুকের মধ্যে সন্তানের ভালোবাসার আস্বাদ আজ বৃদ্ধ পেয়েছেন....কিছু সম্পর্ক আজীবন থেকে যায় যাদের নাম দেওয়া হয় না.... হয়ে ওঠেনা!
ঠিক তখনই বিশাল নার্সিংহোম চত্বরের উপর দিয়ে মেঘের আড়ালে একটা প্লেন সশব্দে উড়ে যায়! বৃদ্ধ শিশুর মত ইন্দ্রাণী কে আরো আঁকড়ে জড়িয়ে ধরে শুধু অস্ফুটে বলে ওঠে- ভাল থেকো দাদুভাই! বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা নাম না জানা সম্পর্কের মতন বেইমানীর পৃথিবীতে নেমে আসে ভালোবাসার আকাশ থেকে! 
( সমাপ্ত)

No comments:

Post a Comment

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন

ফার্স্ট পোলিং, রিজার্ভ থেকে রণাঙ্গন  প্রত্যাশা মতই ভোটের চিঠি টা হাতে পেয়েই বিরক্তিতে ভুরু দুটো কুঁচকে গেছিলো। জানতাম আসবেই, এ এমন প্রেম! কি...